আবেদ ভাই ছিলেন আমার নেতা, গুরু, বড় ভাই ও পিতৃতুল্য একজন অভিভাবক। উনার সঙ্গে আমি দীর্ঘ ৪৪ বছর কাজ করেছি। আমি ব্র্যাকে যোগদান করি ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই এবং ব্র্যাক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪ বছর কাজ করার পর ২০১৭ সালের ১ জুলাই অবসরে যাই। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমি সব সময় আদেশ, উপদেশ ও দিকনির্দেশনা পেয়েছি আবেদ ভাইয়ের কাছ থেকে। এদিক থেকে বলতে গেলে বলতে হয় আমি একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যে এত বড় মাপের একজন গুণী মানুষের সান্নিধ্যে দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে উন্নয়নের পাঠ গ্রহণ করতে পেরেছি। এ সুযোগ মনে হয় খুব কম কর্মীই পেয়েছে সরাসরি উনার তত্ত্বাবধানে এত দীর্ঘ সময় কাজ করার। মনে পড়ে ১৯৭৩ সালের জুন মাসে আমি ব্র্যাকে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিই। তখন ব্র্যাকের অফিস ছিল ৩, নিউ সার্কুলার রোড, মগবাজার, ঢাকা। নাম ছিল বাংলাদেশ পুনর্বাসন সহায়ক সমিতি (বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি)। আমি লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষা দিই। মৌখিক পরীক্ষা নেন আবেদ ভাই ও ইমাউল হক। আবেদ ভাই তখন ছিলেন তরুণ। বয়স সবেমাত্র ৩৭ বছর। অফিস ছিল খুবই সাধারণ। দু-তিনটি চেয়ার ও একটি টেবিল। মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে অফিসের ধরন ও তরুণ আবেদ ভাইকে দেখে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। পরে অবশ্য ব্র্যাকের প্যাডে নিয়োগপত্র পেয়ে দ্বিধা দূর হয়। ১৯৭৩ সালে ব্র্যাকের তখন একটাই মাত্র প্রকল্প। নাম শাল্লা প্রকল্প। প্রকল্পের কন্ট্রোলিং ক্যাম্প বানিয়াচং উপজেলার মার্কুলীতে। যথারীতি ১ জুলাই কাজে যোগদানের জন্য আমি মার্কুলীতে যাই। মার্কুলীতে পৌঁছে দেখি যেদিকে দুচোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। আমার বাড়ি ঝিনাইদহে। তাই এ রকম চিত্রের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না বললেই চলে। মার্কুলী বাজার থেকে ব্র্যাকের অফিস যেতে পেলাম বাঁশের সাঁকো। অফিস থেকে ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য পেলাম নৌকা। ক্যাম্পে শোবার ব্যবস্থা ছিল ডাবল বাংকার (কাঠের দোতলা চৌকি)। মার্কুলী যেয়ে জানতে পারলাম আমাদের ভাগ্য ভালো, তাই পেয়েছি দোতলা চৌকি। কিন্তু আমাদের আগে যারা যোগদান করেছেন তাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল অফিসের মেঝের মাটিতে। এমনকি আবেদ ভাই নিজেও নাকি মার্কুলীর ওয়্যারলেস অফিসের মেঝের মাটিতে ঘুমিয়েছেন। শাল্লা প্রকল্পে নিয়মিত মাসিক সভা হতো। মাসিক সভা পরিচালনা করতেন আবেদ ভাই নিজে। সভা শেষে আবেদ ভাই ক্যাম্পগুলোর সমস্যা জানার জন্য প্রতিটি ক্যাম্পের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাপ করতেন। এরপর কোনো কর্মী ব্যক্তিগতভাবে আলাপ করতে চাইলে উনি তাদের সময় দিতেন। উনার এসব কাজ করতে রাত একটা-দুটো বেজে যেত। আমি শুনেছি একবার এক মাসিক সভা সন্ধ্যায় শুরু করেছিলেন এবং শেষ করেছিলেন পরের দিন সকাল সাতটায়। মাঝখানে এক ঘণ্টার খাবারের বিরতি দিয়েছিলেন। আবেদ ভাইয়ের মাসিক সভাগুলো ছিল খুবই শিক্ষামূলক। সেই সত্তর দশকে উন্নয়নের এত ধ্যানধারণা বা মডেল এ দেশে ছিল না। ফলে উনি কর্মীদের দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার জন্য মাসিক সভাগুলোর প্রথম ভাগে শিক্ষামূলক আলোচনা করতেন। নতুন নতুন থিওরি, মডেল ও ধ্যানধারণা নিয়ে আলোচনা করতেন। উন্নয়নের থিওরি ও মডেল আলোচনার সময় উনি নিজে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। প্রয়োজনে ব্ল্যাকবোর্ড ব্যবহার করতেন। সভার দ্বিতীয় ভাগে ক্যাম্পগুলোর সমস্যা ও তার সমাধানের সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। এভাবে আবেদ ভাই প্রত্যেক মাসিক সভায় কর্মীদের উন্নয়নের অনেক বিষয়ের ওপর শিক্ষা দিয়েছেন। শেখানো পাঠ ঠিকমতো কর্মীরা বুঝতে পেরেছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য শেখানো পাঠের ওপর অনুশীলনী দিয়ে উনি বিভিন্ন ক্যাম্পে ও গ্রামে ঘুরতে যেতেন। গ্রাম থেকে ঘুরে এসে ওই অনুশীলনীগুলো চেক করে দেখতেন। গ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল গ্রামের জনগণের কাছ থেকে তাদের সমস্যা জানার চেষ্টা করা। কারণ আবেদ ভাই ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরির দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। দর্শনটি হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে জনগণকে মুখ্য ভূমিকায় রাখতে হবে। জনগণই তার অবস্থান পরিবর্তন ঘটানোর ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। উন্নয়ন কর্মীর কাজ হলো জনগণের দ্বারপ্রান্তে যাওয়া, তার সমস্যাগুলো শোনা ও জানা এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেই সব সমস্যার সমাধান করা। এ কথা আবেদ ভাই গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে জনগণের সমস্যা বুঝতে হলে, জনগণের আস্থাভাজন হতে হলে এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ করাতে হলে তাদের দ্বারপ্রান্তে যেতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের ভালোভাবে চিনতে, জানতে ও বুঝতে হবে। তাদের ভালোবাসার আসনে নিজেকে বসাতে হবে। সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তার সমাধান উভয় ক্ষেত্রেই জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প বা সহজ পথ নেই। তাই ১৯৭৩ সালে উনি ব্র্যাকের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করেন ডোর টু ডোর অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে। এটি ছিল উন্নয়নের একটি কৌশল।

আবেদ ভাই অসুস্থ হওয়ার পর ২০১৯ সালের ২ অক্টোবর আমি, সাব্বির ভাই, কৈরী ও শীপা হাফিজা আবেদ ভাইকে দেখতে আবেদ ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলাম। সেদিন মনে হয় উনি কিছুটা সুস্থ বোধ করছিলেন। আমরা যেয়ে দেখি উনি সাজগোজে বেশ পরিপাটি হয়ে ড্রয়িংয়ে সোফায় বসে আছেন। আমাদের সঙ্গে প্রায় ঘণ্টা খানেক আলাপ করলেন। উঠে যাওয়ার সময় ভাবিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ডাক্তারের মতে আমার আর কয়দিন যেন বাকি আছে?’ এটাই প্রমাণ করে যে উনি খুবই সাহসী মানুষ ছিলেন। আবেদ ভাই ছিলেন একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা (ভিশনারি লিডার)। ১৯৭৭ সালে আমরা আবেদ ভাইকে বললাম আবেদ ভাই শাল্লা প্রকল্পে শিক্ষা কর্মসূচি চালু করেন। কারণ সিলেটে হাওড় অঞ্চলে শিক্ষিতের হার কম। ফলে উন্নয়নের একই বার্তা নিয়ে বারবার জনগণের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও তাদের ওই বার্তা গ্রহণ করাতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করাতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছিলাম। আমাদের যুক্তি ছিল যদি জনগণের ভেতর শিক্ষার বিস্তার ঘটানো যায় তাহলে উন্নয়ন কর্মী জনগণের দ্বারপ্রান্তে একবার বা দুবার গেলেই জনগণ সেই বার্তা সাদরে গ্রহণ করবে এবং তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে। এতে করে খুব কম সময়ে জনগণের অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে। উনি বললেন, ‘তোমাদের যুক্তি সঠিক। তবে দেখতে হবে বিশ্ব পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে দাতাগোষ্ঠীর নজর এখন কোন দিকে। দাতাগোষ্ঠী এখন তহবিল সরবরাহ করতে চায় স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে। শিক্ষা কর্মসূচি নিতে হলে তোমাদের অপেক্ষা করতে হবে নব্বই দশক পর্যন্ত। আশির দশকের মাঝামাঝি আমি শিক্ষা কর্মসূচির বিষয়বস্তু, পদ্ধতি, উপকরণ ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করব এবং নব্বই দশক থেকে জোরেশোরে শিক্ষা কর্মসূচির ওপর কাজ করব। তোমরা এখন স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচির ওপর চিন্তাভাবনা করো এবং শিগগির আমরা স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি শুরু করব।’ পরবর্তী সময়ে দেখা যায় উনি ১৯৭৭ সালে যা বলেছিলেন ঠিক সেই মোতাবেক কাজ করেছেন। ১৯৮০ সালে স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসূচি হিসেবে ডায়রিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি বা লবণ-গুড় স্যালাইন বানানো জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি হিসেবে হাতে নেয়। এ কর্মসূচিতে ব্র্যাকের মহিলা কর্মীরা বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে একজন মহিলাকে ডায়রিয়া হলে কীভাবে লবণ-গুড় স্যালাইন তৈরি করে ডায়রিয়া রোগীকে খাওয়াতে হবে সে সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছে। এরপর আশির দশকের মাঝামাঝি উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের সব রকমের প্রস্তুতি ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেন। 

২০০৪ কিংবা ২০০৫ সালের সকালের দিকে আমি ব্র্যাক প্রধান কার্যালয় থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলাম। কারণ আমি ওই সময় ব্র্যাকের পরিচালক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের দায়িত্বে ছিলাম। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতাম। ব্র্যাক বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে দেখি এক ভদ্রলোক ক্যামেরা দিয়ে ব্র্যাক বিল্ডিংয়ের ছবি তুলছে। আমি কৌতূহলবশত তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কী করেন? উনি বললেন, ‘উনি একজন সাংবাদিক এবং উনি জানেন ব্র্যাক বিল্ডিংয়ের মালিক আবেদ সাহেব এবং আড়ং বিল্ডিং অর্থাৎ যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় আছে এটার মালিক মিসেস আবেদ। উনি আরো বললেন ব্র্যাক ব্যবসা করে যেমন—আড়ং, ডেইরি, প্রেস ইত্যাদি।’ আমি তাকে বললাম এনজিওর কোনো মালিকানা নেই এবং ব্যবসার কথা যেটি বলছেন তা কোনো পারিবারিক ব্যবসা না। এটা একটা সামাজিক ব্যবসা। এসব ব্যবসা থেকে যে মুনাফা হয় তা আবার ব্র্যাকের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় হয়। কোনো ব্যক্তি বা পরিবার কোনো লভ্যাংশ পায় না। এরপর আমি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরত আসার পর আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম এবং ওই সাংবাদিকের বক্তব্য উনাকে বললাম। উনি বললেন, ‘এসব সাংবাদিকদের বলতে দাও বা লিখতে দাও। আমি হয়তো দেখে যেতে পারব না, কিন্তু তোমরা দেখবে এ সাংবাদিকরাই একদিন লিখবে ফজলে হাসান আবেদ ঠিক কাজটি করেছেন। কারণ এখনই দাতাগোষ্ঠীর তহবিল পেতে কষ্ট হয়। আজ থেকে ১০-১৫ বছর পর হয়তো দাতাগোষ্ঠীর তহবিল একেবারেই পাওয়া যাবে না। তখন এ প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলবে? ফলে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানেরই উচিত অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়া। আর অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে হলে সামাজিক ব্যবসা শুরু করা উচিত।’ আবেদ ভাই ছিলেন সৃজনশীল ব্যক্তি। সব সময় চিন্তা করতেন কী ধরনের কাজ করলে দরিদ্র জনগণের উপকারে আসবে। একটা দুইটা সৃজনশীল কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন না। চিন্তা করতেন আরো নতুন কী কাজ করলে জনগণ উপকৃত হবে। এসব চিন্তাভাবনা থেকেই কর্মসূচির নতুন নতুন আঙ্গিক যুক্ত হয়েছে এবং কর্মসূচির পরিধি বিস্তার লাভ করেছে। যেমন দারিদ্র্য বিমোচনে দরকার আয় বৃদ্ধি। আয় বৃদ্ধি করতে হলে দরকার কর্মসংস্থান। যেহেতু মহিলা সদস্য বেশি তাই শুরু করা হলো ধান কিনে তা ভাঙিয়ে চাল করে বাজারে বিক্রি করা। কিন্তু এই একটি মাত্র কাজ দিয়ে সবার কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। তখন পাশাপাশি শুরু করলেন মুরগি পালন। মুরগি পালনে দেখা গেল একদিন বয়সী যে বাচ্চা লাগে তা বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। তখন আবেদ ভাইয়ের মাথায় এল পোলট্রি হ্যাচারি করার। হ্যাচারি করার পর দেখা গেল হ্যাচারিতে যে পরিমাণ বাচ্চা উৎপাদন হয় সেই পরিমাণ বাচ্চার খাবার বাজারে পাওয়া যায় না। তখন উনি চিন্তা করলেন ফিড মিল করার। ফিড মিল করার পর দেখা গেল যে ফিড তৈরিতে যে পরিমাণ কাঁচামাল বিশেষ করে ভুট্টা দরকার তা বাজারে পাওয়া যায় না। তখন উনি শুরু করলেন ভুট্টা চাষ। এভাবে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব প্রতিটি কর্মসূচি বা কার্যক্রমের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন উদ্ভূত সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যায় তার পথ খুঁজতে গিয়ে। একইভাবে আমরা যদি ১৯৮০-এর দশকের লবণ-গুড় স্যালাইন শিক্ষা কার্যক্রমের কলেবর বৃদ্ধি কীভাবে হলো তা জানতে চাই, তাহলে দেখব প্রথমে ধারণা ছিল মহিলা কর্মীরা মায়েদের ডায়রিয়ার ওপর শিক্ষা দিয়ে আসলে বাড়িতে কারো ডায়রিয়া হলে মহিলারা তা ব্যবহার করবে। কিন্তু পরে দেখা গেল পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষদের সহযোগিতা ছাড়া মহিলারা লবণ-গুড় স্যালাইন ব্যবহার করতে পারে না। তাই পরবর্তী সময়ে পুরুষদের, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের, ডাক্তারদের, মসজিদের ইমামদের ডায়রিয়ার ওপর শিক্ষা দেয়া হয়। এগুলো করার ফলে লবণ-গুড় স্যালাইনের ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এবং ওটেপ কর্মসূচির কলেবর বৃদ্ধি পায়। সংক্ষেপে বললে বলতে হয় উনি অ্যাকশন রিসার্চে বিশ্বাসী ছিলেন। অর্থাৎ কাজ করতে হবে অ্যাকশন-রিফ্লেকশন-অ্যাকশন এ ধারায়। অর্থাৎ কর্মসূচি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা মেটাতে পারছে কিনা তা প্রতিনিয়ত খেয়াল রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে কর্মসূচির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে হবে। আবেদ ভাই শুনতেন বেশি এবং শোনার ফাঁকে ফাঁকে প্রশ্ন করতেন। প্রশ্ন করে করে সমস্যার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি এ আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন যে কাউকে কোনো ধরনের সাহায্য করতে হলে তার কাছে যেয়ে তার সমস্যা ভালো করে জানতে হবে। আর জানতে হলে তার কাছ থেকে শোনা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তাই উনি ধৈর্য সহকারে সবার কথা শুনতেন। সমস্যা জানার পর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করতেন। সব সময় মনে করতেন যারা সমস্যায় জর্জরিত তারাই সমস্যাটা ভালো করে তুলে ধরতে পারবে। আর সমস্যার গভীরে যেয়ে তার মূলে আঘাত করতে পারলে সমস্যা সমাধান সহজ হবে। এ ফর্মুলা উনি শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বেলায় নয়, কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেছেন। তাই কর্মিসভা হতো সব সময় অংশগ্রহণমূলক। আবেদ ভাই যেকোনো জিনিসের গুণগতমান বজায় রাখার ব্যাপারে জোর দিতেন। উনি বলতেন, যে জিনিস গুণে মানে ভালো তা টিকে থাকবে। গুণগত মান যদি বজায় না থাকে সে জিনিস সংখ্যায় বেশি হলেও বেশিদিন টিকে নাও থাকতে পারে। তাই ব্র্যাক, যেকোনো জিনিস সে অফিস সার্কুলার, রিপোর্ট, প্রবন্ধ, পণ্য উৎপাদন ইত্যাদিতে গুণগত মান বজায় রাখার চেষ্টা করে। উনি বিশ্বাস করতেন প্রতিটি ব্যক্তিই কিছু না কিছু করতে পারে। তাই দরকার তার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সেজন্য ব্র্যাকের গ্রুপ সদস্য থেকে শুরু করে কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উনি প্রচুর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। কর্মীদের আরো সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার জন্য পাঠিয়েছেন। প্রশিক্ষণবিহীন কোনো কর্মী ব্র্যাকে নেই বললেই চলে। উনি মনে করতেন দক্ষ এবং যোগ্য কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে পারলে জনগণের দ্বারপ্রান্তে দারিদ্র্য বিমোচনের সেবা গুণমান সহকারে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। আবেদ ভাই ব্র্যাকের কর্মীদের নতুন নতুন চিন্তাভাবনা করা ও সে অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। বলতেন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব খরচ ব্র্যাক বহন করবে। যত খুশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করো। এর ফলে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কাছ থেকে ব্র্যাক কর্মসূচির অনেক ধ্যানধারণা এসেছে এবং কর্মসূচির সঙ্গে তা সংযোজিত হয়েছে।

আবেদ ভাই বহু গুণের অধিকারী ছিলেন। এ লেখায় তাঁর খুব সামান্যই তুলে ধরতে পারলাম। আবেদ ভাইয়ের বিশাল কর্মযজ্ঞ দারিদ্র্য বিমোচনে ও সামগ্রিক উন্নয়নে বাংলাদেশে ও দেশের বাইরে কী কী অবদান রাখতে পেরেছে, যদি সুযোগ হয় আগামীতে তা লেখার ইচ্ছা থাকল। সব শেষে বলব, আবেদ ভাই, দারিদ্র্য বিমোচনের যে মশাল আপনি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন তা আমরা নিভে যেতে দেব না, বরং এটি যাতে আরো প্রজ্বলিত হয় তার জন্য যা যা করণীয় তা করতে আমরা প্রস্তুত।

 সুখেন্দ্র কুমার সরকার: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষ

ব্যুরো বাংলাদেশ এনজিওর সাবেক চেয়ারপারসন