১৯৭০ সালের নভেম্বরে উপকূলীয় এলাকায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর ফজলে হাসান আবেদ যেভাবে সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেন ও পরবর্তী সময়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করেন—এর মাধ্যমে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ গড়ার কাজে সরকারের পাশাপাশি যে সামাজিক শক্তিরাও রয়েছে সে বিষয়টি তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন। দেশ গড়ার কাজে সরকারি শক্তির পাশাপাশি বেসরকারি সামাজিক শক্তির গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি তিনি তৈরি করেন। এটি ছিল তাঁর প্রথম কাজ। এ ধরনের কাজের ভীষণ প্রয়োজন তখন ছিল। সে সময় কিন্তু এগুলো কোনো অনুমতির ভিত্তিতে হচ্ছিল না, হচ্ছিল সামাজিক উদ্যোগের ভিত্তিতে। আর এটা ছিল শুরুর ধাপ।

১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে দারিদ্র্যের বিষয়টা সামনে উঠে আসে। এমনকি ১৯৭৫ সালের পর সরকারও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিকে গ্রহণ করে। এ পর্যায়ে ফজলে হাসান আবেদ তাঁর দ্বিতীয় ভূমিকাটা রাখেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসও একই সমান্তরালে ভূমিকা পালন করেছেন। সত্তরের মাঝামাঝি থেকে দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক এক নম্বর এজেন্ডা হয়ে গেল দারিদ্র্য বিমোচন। আমার ধারণা, তারা উভয়ই দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী সমাধান কীভাবে হতে পারে—সে বিষয়টা নিয়ে কাজ শুরু করলেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে কাজ শুরু করলেন। ফজলে হাসান আবেদ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিলেন। প্রফেসর ইউনূস যেমন নারীদের আর্থিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের জন্য অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের দুয়ার খুললেন, ফজলে হাসান আবেদও সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলেন। আর তা হচ্ছে নারীর ওপর থেকে তার প্রজনন দায়িত্বের বোঝা (তখন একজন নারী ছয়-সাতটি সন্তানের মা হতেন) কমানো। প্রজনন দায়িত্বের ওই বোঝা নিয়ে নারীর কোনো  ধরনের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ সম্ভব ছিল না। নারীকে প্রজনন বোঝা থেকে মুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দিলেন তিনি। শুরু করলেন পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি। এভাবে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ তৈরির উদ্যোগ নিলেন। এদিকে আইসিডিডিআর,বি ওরস্যালাইন আবিষ্কার করাতে শিশুমৃত্যুর হার কমার ফলে অধিক সন্তান নেয়ার প্রবণতাও কিছুটা কমে যায়।

সত্তরের দশকের সে সময়টাতেই মূলত সামাজিক শক্তি ও এনজিও শব্দটির এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। এরপর দারিদ্র্য বিমোচন করাটা যখন এক নম্বর এজেন্ডা হয়ে গেল তখন দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী সমাধানগুলো খোঁজার চেষ্টায় পদপ্রদর্শক হিসেবে ফজলে হাসান আবেদ ভূমিকা রাখতে শুরু করলেন। নারীকে প্রজনন বোঝা থেকে মুক্ত করার বিষয়টা ধরে নারী শিক্ষার বিষয়টা তখন সামনে চলে আসে। এটিও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক।

আমি যদি দশক ধরে অগ্রসর হই তাহলে সত্তর দশকের শেষার্ধে দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী সমাধান খোঁজার চেষ্টাগুলোর কথা বলব। সে সময় এনজিওর বিষয়টা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পথে চলে যেতে পারত। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী সমাধানটা কীভাবে হবে তা নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোকেন্দ্রিক সমাধানের পথ নয়, মাঠ পর্যায়ে, দরিদ্র পরিবার পর্যায়ে পরিবর্তন করার বিষয়টি তুলে ধরেন। মাঠ পর্যায়ে সমাধানের চেষ্টাটা করা থেকে আসলে এনজিওদের যাত্রা শুরু হলো। প্রফেসর ইউনূস যেমন আর্থিক ক্ষমতায়নের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিলেন, ফজলে হাসান আবেদ তেমন আর্থিক ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সামাজিক বিষয়গুলোতেও জোর দিলেন। যার সূত্র ধরে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বিষয়টা জোরালোভাবে চলে আসে।

আশির দশকে এসে মাঠ পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচনের কাজটা গতি পেলে অনেক এনজিও প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এখানেও ফজলে হাসান আবেদের অবদান রয়েছে। ব্র্যাক থেকে বের হয়ে অনেকেই এনজিও শুরু করে। এ অর্থে নতুন প্রজন্মের এনজিও নেতৃত্ব তৈরি করতে ব্র্যাক ভূমিকা রেখেছে। আশির দশকের শেষে তিনি আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন আর তা হচ্ছে, রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিক শক্তির বিকাশ। ফজলে হাসান আবেদ উপলব্ধি করেছিলেন যে এনজিওগুলোরও একটা প্লাটফর্ম দরকার। এ সময় তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয় অ্যাসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি অব বাংলাদেশ (অ্যাডাপ)। দারিদ্র্যের স্থায়ী সমাধানের জন্য যে সামাজিক শক্তিগুলো বিভিন্ন ধরনের কাজ করে যাচ্ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কথা বলার প্লাটফর্ম এটি। আশির দশকের শেষের দিকে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি জোরালো হলে নীতিগতভাবে প্রভাব রাখার জন্য এ প্লাটফর্মটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এভাবে এনজিও খাতের বিকাশ শুরু হয়।

নব্বই দশকে এরশাদ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসে গণতান্ত্রিক সরকার। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের আমলেও কিন্তু এনজিওর বিকাশ থেমে ছিল না। তাই গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এনজিওগুলোকে যদি তাদের দোসর হিসেবে চিন্তা করতে শুরু করত তাহলেও কিন্তু এনজিও কার্যক্রমগুলো এগিয়ে নিতে সমস্যা হতো। এখানেও ফজলে হাসান আবেদ নেপথ্যে থেকে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন। নতুন গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর কাছে এনজিওর গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে সমর্থ হন। এভাবে এনজিও কর্মকাণ্ডের একটা ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। চমত্কার বিষয় হচ্ছে, সত্তরের দশকে দেশে যেভাবে এনজিও কার্যক্রমের শুরু হয় পরবর্তী সময়ে তাতে তেমন বড় ধরনের ছেদ পড়েনি। ধরন অনুসারে কাজের হয়তো উত্থান-পতন ছিল কিন্তু এনজিও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটেনি। বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশে এ ধারাবাহিকতাটি নিশ্চিত করে এনজিওর কার্যক্রমগুলো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নেপথ্যে থেকে রাজনৈতিক সরকারগুলোর সঙ্গে আলোচনা ইত্যাদির আলোকে এনজিও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই কিন্তু নতুন অনেক এনজিও তৈরি হলো। যার মানে রাষ্ট্র এনজিওগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ফজলে হাসান আবেদ এক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেছেন তা হচ্ছে ফ্রন্টলাইনের ইনোভেশন। বিষয়টি এমন নয় যে প্রথমে তিনি একটা কাজ শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তারই আকার বড় করতে থাকলেন। দারিদ্র্য বহুমাত্রিক, তাই দারিদ্র্য বিমোচনের চেষ্টাগুলোও বহুমাত্রিক হতে হবে। বাস্তব অবস্থা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। দারিদ্র্য থেকে চরম দারিদ্র্যের বিষয়টা আসে—এটার ব্যাপারেও সমাধান প্রয়োজন। ফ্রন্টলাইনে বসে উদ্ভাবনের জায়গাটিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন আবেদ ভাই। এনজিওর জন্য নতুন নতুন কর্মক্ষেত্রও আবিষ্কৃত হতে থাকে।

এনজিওদের জন্য আরো একটি জায়গায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সত্তরের দশকে এনজিওর শুরুটা ছিল সামাজিক শক্তি হিসেবে, পরবর্তী সময়ে দাতা সংস্থাদের অর্থ সহায়তার ওপর যখন নির্ভরশীলতা বাড়ছিল তখন একটা প্রশ্ন তৈরি হতে পারত যে দাতা সংস্থাদের সহযোগিতা চলে গেলে এনজিও কার্যক্রমে ধস নামবে কিনা? এনজিও কার্যক্রমের শুরুটা হয়েছিল সামাজিক শক্তি হিসেবে, দাতা সংস্থার সাহায্য থেকে নয়। ফজলে হাসান আবেদ প্রথম থেকেই আবার ওই বিষয়টা সামনে নিয়ে আসেন যে এনজিওগুলো নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারে কিনা। আমরা যেটাকে স্থায়িত্বশীলতা বলি। খুব গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে বিষয়টি তিনি

এনজিও জগতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে এন্টারপ্রাইজের আইডিয়াটা নিয়ে এলেন। দরিদ্রদের আমরা শুধু ঘরে গিয়ে সহায়তা করব তা নয়, বাজার ব্যবস্থার মধ্যেও তাদের অবস্থান তৈরি করা যায় কিনা তা নিয়ে কাজ শুরু করলেন। শুধু সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এক ধরনের ভূমিকা রাখার মাধ্যমেও দারিদ্র্য বিমোচন করা যায়। আড়ং দিয়ে শুরু করলেন। এরপর আড়ং ডেইরি, সিল্কসহ ধাপে ধাপে অনেক কিছু নিয়ে এলেন। দাতা সংস্থাদের নির্ভরশীলতার বাইরে

এনজিগুলো কীভাবে টেকসই হতে পারে সে ধারণাও কিন্তু তিনি জোরলোভাবে নিয়ে এসেছেন, যা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।

দেশের মধ্যে রাষ্ট্রের পাশাপাশি এনজিওগুলো ভূমিকা রাখবে। তিনি আরো একটি চিন্তা সামনে নিয়ে এলেন তা হচ্ছে শুধু দেশের মধ্যে নয়, বিশ্বব্যাপী এনজিওগুলো এ ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। ব্র্যাকের যে ইন্টারন্যাশনাল কর্মকাণ্ডগুলো আছে সেখানেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। ধাপে ধাপে অনেক কাজ তিনি করেছেন যেমন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ। সবই কিন্তু এসেছে দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী সমাধানের ধারণা থেকে যে দরিদ্র পরিবারের শিশু সন্তানটা যখন ক্রমান্বয়ে শিক্ষিত হয়ে আরো উন্নততর জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করবে তখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারণাটি এল। এভাবে ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ধারণাটি এল যে শুধু সাপ্তাহিক ঋণ নয়, মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ও দরিদ্ররা ভূমিকা রাখতে চায়।

আমি মনে করি ধাপে ধাপে এনজিও জগতের পথপ্রদর্শক হিসেবে, নিজের সামাজিক অবস্থানের জায়গা থেকে সার্বিক খাতটিকে কখনো সম্মুখসারি থেকে কখনো পেছন থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়েছেন। নেতৃত্ব বলতে কিন্তু শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব নয়, ধারণার নেতৃত্ব। রাষ্ট্রের সঙ্গে সহায়তার জায়গাগুলোয় নেতৃত্ব, সুনামের নেতৃত্ব। ফলে সরকারি কার্যক্রমে এনজিওগুলোর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মকাণ্ডে সরকার এখন এনজিওগুলোর সন্ধান করে। যা বড় অর্জন।

ফজলে হাসান আবেদ সমাজের মধ্যে এনজিওর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। সরকারের যেমন বিভিন্ন খাত রয়েছে, কৃষি খাত, শিল্প খাত কিংবা বেসরকারি খাত—এনজিও একটা খাত হিসেবে তাঁর হাত ধরেই এসেছে। পাশাপাশি এ খাতের বিকাশ ও পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে এ খাতকে নতুন নতুন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যুগোপযোগী করে তোলার বিষয়টিতেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাতা নির্ভরশীলতার বাইরে টেকসই ভিত্তিতে এ খাতের বিকাশকে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি বিশাল ভূমিকা রেখেছেন।

আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী—আমার মনে হয় এখানে তাঁর ভূমিকাগুলোকে স্মরণ করা উচিত। তিনি হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন। পরবর্তী সময়ে এ খাতের বিকাশের জন্য তাঁর অবদানগুলোকে মনে রাখা জরুরি। তাঁর অবদানগুলো শুধু ইতিহাসের বিষয় নয়, পরিপূর্ণভাবে নীতি ও ধারণার অবদান। যেমন দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা, দাতা নির্ভরশীলতার বাইরে নিজেদের পায়ে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা, যে সুবিধাবঞ্চিত তার দিকে নজর বেশি দেয়া—ভবিষ্যতেও কিন্তু এ ধারণাগুলো নিয়েই অগ্রসর হতে হবে। এ নীতিগুলো ফজলে হাসান আবেদের উত্তরাধিকারের অন্যতম একটি অংশ।

 হোসেন জিল্লুর রহমান: চেয়ারপারসন, ব্র্যাক ও নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি; সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা