এক বছর হয়ে গেল আবেদ ভাই চলে গেছেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার উচ্ছ্বাস এখনো প্রবাহিত। উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা ছাড়াও বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই আবেদ ভাইয়ের প্রতি তাদের আবেগের বিশেষ অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। আমারও বেশ কয়েকবার লেখার সুযোগ হয়েছে। আমি জানি, এ অনুভূতি শুধু আমার নয়, দেশের আপামর জনগণের। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘এটা বললে বোধ হয় বাড়িয়ে বলা হবে না যে বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে খুব কম মানুষই আছেন, যিনি জীবনে কোনো না কোনোভাবে আবেদের কর্মকাণ্ডের সুফল ভোগ করেননি। আর তিনি যদি হন গ্রামবাংলার দরিদ্রদের একজন, মহিলাদের একজন তাহলে তো তাঁকে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে আবেদের সাক্ষাৎ পেতে হয়েছে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোজগার, আত্মোপলব্ধিসহ আরো অনেক কিছুতে। আমাদের অজান্তে যে আবেদ আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী, তাঁকে আমরা বিদায় জানাব কীভাবে?’

স্মৃতিপট ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের ছাত্র এবং বাংলাদেশ ফার্টিলিটি সার্ভের সেকশন লিডার হওয়ার সুবাদে পরিচয় ছিল বাংলাদেশ আদমশুমারি অফিসের এক বিদেশী পরামর্শক ড. স্টেন ডি’সুজার সঙ্গে। তিনিই প্রথম আমাকে আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মগবাজারের ব্র্যাক অফিস—পাশাপাশি দুটি দোতলা ভবন। মূল ভবনের নিচতলায় নির্বাহী পরিচালকের (প্রতিষ্ঠাতা শব্দটি তখনো ব্যবহূত হতো না) অফিস। সাহস সঞ্চয় করে ঢুকলাম। বসতে বললেন। অনেক প্রশ্ন করলেন—কোনোটাই আমার জ্ঞানভাণ্ডার যাচাই করার জন্য নয়, অনেকটা গল্পের মতোই। জানালেন, শাল্লাতে (ব্র্যাকের আদি প্রকল্প; বর্তমানে সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত) ব্র্যাক অনেক উন্নয়ন কাজ করছে: স্বাস্থ্য, বয়স্ক শিক্ষা, কৃষি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইত্যাদি। আরো জানালেন, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা অনেক তথ্য সংগ্রহ করে, যার উপযুক্ত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বললাম, আমার পড়াশোনা পরিসংখ্যান বিষয়ে তাই এ ধরনের কাজে আমার আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। বললেন, তাহলে তাড়াতাড়ি যোগদান করো। আরো বললেন, আমার মাহিনা হবে প্রতি মাসে ১০০০ টাকা। আর কোনো কিছু আলোচনা বা প্রশ্ন না রেখেই সম্মতি জানিয়ে দিলাম এবং মার্চের ১৭ তারিখে যোগদান করলাম। এমনই ছিল আবেদ ভাইয়ের ব্যক্তিত্ব ও তাঁর চরিত্রের আকর্ষণ। সত্তর দশকের ব্র্যাক আর আজকের ব্র্যাকের মাঝে অনেক তফাৎ। তখন ব্র্যাককে খুব কম লোকই চিনত। আজ যেমন ব্র্যাকে কাজ করাকে অনেকেই তাদের জীবনের স্বপ্ন বলে মনে করেন, তখন কিন্তু সেটা ছিল না। আমার মতো অনেকেই তখন দেশমাতৃকার জন্য ব্র্যাকের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল।

আরো দুটো ঘটনা মনে পড়ছে। ২০০৩ সালের জুন মাস। তখন আমি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করছি। সেখানকার স্কুল অব পাবলিক হেলথের ডিন এলেন রোজেনফিল্ড চিন্তা করছিলেন ‘টেনুয়র্ড প্রফেসর’ হিসেবে আমাকে অফার দিতে। ঢাকায় এলাম ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনের প্রথম সভায় যোগ দিতে। আবেদ ভাই বললেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি যা বললেন তাঁর জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। তোমাকে আমি ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক করতে চাই। বললাম, আমি এ পদের জন্য মোটেও উপযুক্ত নই। আমি আপনাকে দেখেছি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে। আপনার ১০০ ভাগের এক ভাগও আমি নই। আমাকে থামিয়ে বললেন, নেতৃত্বে যারা সফলকাম তারা সবাই স্টোরি-টেলার। এর বেশি কিছু নয়। তুমি ব্র্যাকে অনেক পপুলার। আমি নিশ্চিত যে এ কাজ তুমি ভালোভাবে করতে পারবে। আমি ফারুকের (ফারুক চৌধুরী, তদানীন্তন ব্র্যাক উপদেষ্টা) সঙ্গে কথা বলেছি। সেও আমার সঙ্গে পুরোপুরি একমত। পরের বছরই ফিরে এলাম ব্র্যাকে।

আরেকবার ২০১২ সালে। আমি তখন ব্যাংককে রকফেলার ফাউন্ডেশনের সিনিয়র অ্যাডভাইজার ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। একটি বিশেষ ধরনের সংক্রমণের ফলে আবেদ ভাইয়ের স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি হওয়ায় তাঁকে ব্যাংককের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছুটা ভালো বোধ করলে তাঁকে ও সারওয়াত ভাবীকে আমরা আমাদের একামাই’র বাসায় নিয়ে আসি, যেখানে তারা সপ্তাহ দুয়েক ছিলেন। আমার স্ত্রী নীলুফার ও আমার জীবনে ওই সময়টা ছিল মহামূল্যবান। এত কাছে নিবিড়ভাবে তাদের পেয়েছিলাম যা চিরদিন আমাদের স্মৃতিতে অম্লান থাকবে। সেই সময় একদিন আবেদ ভাই তাঁর বহুদিনের বন্ধু ও পরামর্শক কোল ডোজকে ঢাকা থেকে ডেকে পাঠালেন। কোল ডোজও আমাদের বাসায় উঠলেন। তারা দীর্ঘ সময় কিছু একটা আলোচনা করে আমাকে ডাকলেন। আবেদ ভাই বললেন, আমার এ অসুস্থতা একটি বিষয় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাড়াতাড়িই আমার একজন উত্তরাধিকারী বা সাকসেসার ঠিক করা দরকার। ব্র্যাকের বোর্ডের অন্যান্য সদস্য এবং আমি মনে করি তোমাকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে। প্রথমে তুমি ভাইস চেয়ারপারসন হিসেবে ব্র্যাকে ফিরে যাবে। আবার আকাশ থেকে পড়লাম। আগের বারের মতো সঙ্গে সঙ্গেই আমি সম্মতি না দিয়ে বললাম যে আমার তো এখানে (রকফেলার ফাউন্ডেশনে) অনেক দায়িত্ব আছে। উপরন্তু আমার পরিবারের সঙ্গেও একটু কথা বলা দরকার। ব্যাংককের বিলাসবহুল জীবন, স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান রকফেলারের মোহনীয় চাকরি এবং মাসিক আয়ের নব্বই ভাগ বিসর্জন দিয়ে ফিরে এলাম ঢাকায়। সেটা হয়েছিল ব্র্যাক এবং আবেদ ভাইয়ের জন্য। এমনই আকর্ষণ আবেদ ভাইয়ের!

ব্যাংককে থাকতে একবার আবেদ ভাই ও ভাবীকে নিয়ে আমরা যাই সমুদ্রতীরবর্তী হুয়াহিনে। উদ্দেশ্য একটু হাওয়া বদল। রওনা হব, নিচে গাড়ি অপেক্ষমাণ। আমার পরনে টি-শার্ট দেখে ভাবী বললেন, আবেদ, তুমি তো টি-শার্ট আনোনি। সঙ্গে সঙ্গে নীলুফার নিয়ে এল ফিরোজা রঙের নতুন একটি টি-শার্ট। হুয়াহিনে সাগর পারে বসে সেই টি-শার্ট পরা আবেদ ভাইয়ের একটি ছবি আমার ব্ল্যাকবেরি থেকে পাঠিয়েছিলাম তখনকার নির্বাহী পরিচালক মাহবুব হোসেনের কাছে। উদ্দেশ্য, ছবিটা দেখে ব্র্যাকের কর্মীরা বুঝতে পারবে যে আবেদ ভাইয়ের জীবন এখন আর সংকটাপূর্ণ নয়। হুয়াহিনে এবং গাড়িতে আমাদের অনেক কথাবার্তা আর আলাপ হয়েছিল। কবিতার প্রতি ছিল আবেদ ভাইয়ের বিশেষ ঝোঁক। নীলুফার এবং আমারও তাই। আবেদ ভাই অনেক কবিতা আবৃত্তি করলেন— শেকসপিয়ারের হেমলেট আর রবীন্দ্রনাথের শাহজাহান। আমরাও করলাম নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। সুন্দরভাবে কেটেছিল আবেদ ভাই আর ভাবীর সঙ্গে আমাদের এ ক’টি দিন, যা কোনোদিনও ভোলার নয়।

উন্নয়নের নতুন নতুন ক্ষেত্রে ছিল তাঁর অনাবিল আগ্রহ। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঠিক হলো যে পরিবার পরিকল্পনার দিকে ব্র্যাক বিশেষ নজর দেবে। সত্তর দশকে শাল্লায় পরিবার পরিকল্পনায় অনেক সাফল্য নিয়ে এসেছিল ব্র্যাক। এবার দেশব্যাপী কী করা যায় তা নির্দিষ্ট করতে আবেদ ভাই ঠিক করলেন ইন্দোনেশিয়া যাবেন। উদ্দেশ্য, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ কী শিখতে পারে তা সরাসরি দেখে নেয়া। সঙ্গী হলাম তখনকার স্বাস্থ্য পরিচালক সাদিয়া চৌধুরী ও আমি। এক সপ্তাহের এ সফরে পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা গেল, যা পরবর্তী পর্যায়ে বেশ কাজে লেগেছিল। আরেকটি জিনিস দেখে বেশ অবাক হলাম। দেখলাম, আবেদ ভাইয়ের পরিবার পরিকল্পনা বিষয়টির সঙ্গে আরেকটি বিষয়ে প্রচুর আগ্রহ। সেটি হলো ‘টিস্যু কালচার’। সে সময় এটা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। উনার সঙ্গে আমরাও বেশ কয়েকটি টিস্যু কালচার ফার্মে গেলাম সম্যক অভিজ্ঞতা লাভের জন্য। আবেদ ভাইয়ের টিস্যু কালচার সম্পর্কে আগ্রহ ও জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ফিরে আসার পরই আবেদ ভাই ডাকলেন আমিন ভাইকে (আমিনুল আলম, তত্কালীন পরিচালক) এবং এর পরই কৃষিক্ষেত্রে ব্র্যাকের এক নবতর যাত্রা শুরু হলো।

গবেষণার প্রতি ছিল আবেদ ভাইয়ের বিশেষ অনুরাগ। তাঁর সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতার কারণে ব্র্যাকের গবেষণাকাজ এত বিস্তৃত হতে পেরেছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ব্র্যাকের মতো গবেষণা কাজে পারদর্শী পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোনো এনজিও আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু এ অর্জন কখনই সম্ভব হতো না যদি না আবেদ ভাই আমাদের পেছনে থাকতেন এবং উৎসাহিত করতেন। গবেষণা কাজে অর্থায়ন একটি বিশ্বজোড়া সমস্যা। কিন্তু আবেদ ভাই এর একটা সহজ সমাধান বের করেছিলেন। ব্র্যাকের প্রতিটি প্রকল্পে গবেষণা কাজের জন্য একটা থোক বরাদ্দ থেকে যেত যার ফলে অর্থায়ন কখনো কোনো সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়নি। আবেদ ভাই গবেষণা বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনে তাদের সুরক্ষা করতেন। নব্বই দশকের প্রথম দিকে ব্র্যাকের গবেষণা কাজের একটি মূল্যায়ন করেন লন্ডন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পেট্রিক ভোন। তাঁর একটি মন্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। অধ্যাপক ভোন বলেছিলেন, ব্র্যাকের মতো একটি মাঠধর্মী এনজিও যেভাবে গবেষণা কাজের জন্য একটি পরিচালক পদ সৃষ্টি করেছিল, সেটা থেকেই বোঝা যায় ব্র্যাক এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা কীভাবে গবেষণা কাজের মূল্যায়ন করেন। বলা বাহুল্য, ১৯৯২ সালের প্রথম দিকে তিনজন ব্র্যাক কর্মী একযোগে পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। আমিনুল আলম এবং সুখেন্দ্র কুমার সরকার ছাড়া তৃতীয় ব্যক্তিটি ছিলাম আমি।

আবেদ ভাইয়ের সংখ্যাজ্ঞান নিয়ে আমরা সবসময় খুব কৌতূহলোদ্দীপক ছিলাম। তিনি ছিলেন সত্যিকারভাবে একজন ‘নাম্বার পারসন’। একবার একটি সংখ্যা তাঁর গোচরে এলে তা কখনো ভুলতেন না। ২০১৩ সালের কোনো এক সময় আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে তানজানিয়া যাই। সঙ্গে ফারুক আহমদ (ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের তত্কালীন নির্বাহী পরিচালক) এবং তামারা আবেদ (ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক)। হঠাৎ তামারার মনে প্রশ্ন এল যে আফ্রিকার জনসংখ্যা কত। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল ফারুককে। সে বলতে পারল না। তারপর আমাকে। আমি সরাসরি উত্তর দিতে না পেরে চিন্তা করলাম— নাইজেরিয়া আফ্রিকার সবচেয়ে বড় দেশ এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ২০০ মিলিয়ন। আর আফ্রিকায় প্রায় ৫৭টি দেশ। বললাম সম্ভবত আফ্রিকার জনসংখ্যা হবে এক বিলিয়নের মতো। তারপর সে সরাসরি আবেদ ভাইকে জিজ্ঞেস করল। কোনো চিন্তা না করেই আবেদ ভাইয়ের সোজা জবাব— ৯৫০ মিলিয়ন।

আগেই বলেছি, আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে খুব কাছে থেকেই আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। মনে হতো আমার ওপর তাঁর একটা বিশেষ আস্থা। মাঝে মাঝে মনে হতো তিনি আমার জন্য গর্বও অনুভব করছেন। আমি ছিলাম তাঁর বক্তৃতা লেখক। তিনি আইডিয়া দিতেন আর আমি তা লিখে দিতাম। এ রকম কত বক্তৃতা যে আমি লিখেছি তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু তাঁর যে বক্তৃতাটি আমার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছিল, সেটি কিন্তু আমার নিজের লেখা ছিল না। ১৯৮০ সালের কথা। আবেদ ভাই সবেমাত্র ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যাকে কিনা বলা হতো এশিয়ার নোবেল। ব্র্যাকে আমরা সবাই খুব আবেগাপ্লুত। আবেদ ভাই গেলেন ম্যানিলায় পুরস্কার গ্রহণ করতে। সঙ্গে বাহার ভাবী। ফিরে আসার পর আবেদ ভাইয়ের বক্তৃতার একটি কপি আমি পেয়েছিলাম। পড়লাম এবং মুগ্ধ হলাম। জানি না সেই বক্তৃতা কে লিখেছিলেন— সম্ভবত আবেদ ভাই নিজে অথবা বাহার ভাবীর সঙ্গে। সেই বক্তৃতায় একটি লাইন আমার এখনো মনে আছে, যা প্রেরণার উদ্রেক করে। দেশের গরিব মানুষের অবস্থা এবং কীভাবে তারা অবহেলিত, বঞ্চিত এবং শোষিত হচ্ছে সেটা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আ কমিউনিটি অব গ্রিড হ্যাজ ট্যাকেন ওভার দ্য কমিউনিটি অব নিড’। আবেদ ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা আর সমাজ পরিবর্তনে তাঁর অঙ্গীকার একাকার হয়ে গিয়েছিল।

আগেই বলেছি, আমার প্রতি আবেদ ভাইয়ের একটা বিশেষ আস্থা ছিল। মনে পড়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের লন্ডন। ব্র্যাকের অতিদরিদ্র কর্মসূচির ওপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন যা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স (এলএসই) আয়োজন করে। সেখানে এ কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয় যেখানে অনেক খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা যোগদান করেন। ছিলেন এলএসইর ওরিয়ানা বেনডিয়ারা ও রবিন বারজেস এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অভিজিৎ ব্যানার্জী (২০১৯ সালের নোবেলজয়ী)। সন্ধ্যার পর এলএসইর পাবলিক লেকচার, যেখানে মূল বক্তা আবেদ ভাই। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে ফোন এলো— ওপারে আবেদ ভাই। বললেন, তাঁর শরীরটা ভালো লাগছে না এবং তাঁর বদলে ‘কী-নোট’টা যেন আমিই দেই। আমি তো পড়লাম এক মহাচিন্তায়— কোনো প্রস্তুতি নেই। তাঁর ওপর এলএসইর পাবলিক লেকচার! লোকভর্তি মিলনায়তন। সাহস সঞ্চয় করে পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে বলেছিলাম ব্র্যাকের গল্প।

আবেদ ভাই সবার সঙ্গে সহজেই মিশতে পারতেন— প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন, রানী সোফিয়া থেকে শুরু করে বস্তিবাসী নিঃস্ব লোকজন। ব্র্যাকে তো তাঁর দুয়ার ছিল সব কর্মীর জন্য অবাধ। কর্মীদের নিজের অথবা সন্তান-সন্ততির বিয়েতে তিনি উপস্থিত থাকতেন প্রচুর উৎসাহভরে। আমার ছেলে ওয়ামেক তখন হল্যান্ডে পিএইচডি করছিল। ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের বোর্ড মিটিংয়ে যোগদান করতে আবেদ ভাই একবার হেগে গেলেন এবং ওয়ামেক ও তাঁর স্ত্রী মিশার আমন্ত্রণে অন্য এক শহর রটারডেমে তার ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে উপস্থিত হয়েছিলেন। সঙ্গে ব্র্যাকের পরিচালক র্যাচেল কবির। তাদের এক বছরের সন্তান ইয়ানাকে একটি উপহারও দিয়েছিলেন। আরেকটি ঘটনা। এবার উগান্ডার কাম্পালা। ওয়ামেক তখন পিএইচডি শেষ করে ব্র্যাক আফ্রিকা গবেষণা বিভাগে কাজ করছে। আবেদ ভাই গেলেন কাম্পালায় উগান্ডার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। সঙ্গী নির্বাহী পরিচালক ফারুক আহমদকে বললেন যে তিনি ওয়ামেকদের বাসায় যেতে চান। যেমন খুশি তেমন কাজ। চলে গেলেন সন্ধ্যায় তাদের বাসায় নৈশ আহারে যোগ দিতে। মিশার রান্না করা বিরিয়ানির অনেক প্রশংসা করলেন। ৩-৪ ঘণ্টা ছিলেন সেখানে যার বেশির ভাগ সময়ই ওয়ামেকের কনিষ্ঠ সন্তান ইজায়াকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন।

আবেদ ভাইয়ের রসবোধ ছিল বেশ। একবার সিলেটের কোনো এক গ্রামে গেছি তাঁর সঙ্গে। উদ্দেশ্য ব্র্যাকের ডায়রিয়ার স্যালাইন প্রকল্প ‘অটেপে’র কার্যাবলি দেখা। গ্রাম থেকে ফিরছি এমন সময় এক চা-স্টলে যাত্রাবিরতি করা গেল। সেখানে কিছু স্থানীয় মিষ্টান্ন ছিল। বুন্দিয়া খেতে খেতে আবেদ ভাইয়ের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক স্মৃতি জেগে উঠল। বিলাত থেকে ভারতে এসে যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করতে। আজকের মতো সেদিনও এক চা-স্টলে বসে বুন্দিয়া অর্ডার করলেন। সঙ্গে সঙ্গে স্টলের বেয়ারা চিত্কার করে ভেতরে জানাল, আড়াইশ বুন্দিয়া। তিনি তো অবাক— এরা কি একটি একটি করে গুণে আড়াইশ দেবে! পরে বুঝেছিলেন এর পেছনের কথা। ভারতে তখন মেট্রিক পদ্ধতি চালু হয়ে গিয়েছিল কিন্তু বাংলাদেশে (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) তখনো সেই সের, পোয়া ইত্যাদি। আড়াইশ ছিল আসলে আড়াইশ গ্রাম!

ফিরে আসি গত বছরে। জুলাইয়ের ২০ তারিখ। তখন আমি ব্র্যাক ছেড়ে দিয়েছি। আবেদ ভাই খবর দিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। গেলাম উনিশতলার সেই পরিচিত কক্ষে। মনে হলো অপেক্ষা করছিলেন। বসতে বলেই বললেন, আমার ক্যান্সার হয়েছে। আমার তো মাথায় বাজ পড়ল। সেদিন প্রায় ২ ঘণ্টা তাঁর সঙ্গে ছিলাম। অনেক কিছুই বললেন যা পরবর্তী পর্যায়ে বিস্তৃতভাবে লেখা যাবে। দেখলাম একটার পর একটা সিগারেট ধরাচ্ছেন। বললাম, আপনি আবার শুরু করেছেন? উত্তরে বললেন, কী লাভ বলো। এটা না খেলে তো আমার আর আয়ু বাড়বে না, তারচেয়ে বরং একটু আনন্দ পেলে ক্ষতি কী? আমার কোনো উত্তর ছিল না।

তারপর আরো কয়েকবার দেখা হয়েছে। অক্টোবরের ২৯ তারিখে আবেদ ভাই এসেছিলেন ব্র্যাক সেন্টারে। ব্র্যাকের জ্যেষ্ঠ কর্মীদের সঙ্গে ছবি ওঠাবেন বলে। আমিও গিয়েছিলাম সেই উনিশ তলায় ব্র্যাকের কৃষিসংক্রান্ত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন নিয়ে কথা বলতে। পরিচালক র্যাচেল কবিরের আমন্ত্রণে ঢুকে পড়লাম আবেদ ভাইয়ের কক্ষে। দেখলাম তিনি ডিভানের ওপর শুয়ে আছেন। রোগটি তখন আস্তে আস্তে জেঁকে বসেছে। চোখ বোজা। র্যাচেল তাঁকে জানালেন যে আমি এসেছি। বসতে বললেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন কেমন আছি, সন্তানরা এবং তাদের পরিবার কেমন আছে। আরো অনেক খুঁটিনাটি প্রশ্ন— তোমার মেয়ে ইমিতা কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, জব্বল তারিকের কথা জানো? জিব্রাল্টারের সেই ‘রক’ বা পাথর যা দেশটিকে তাঁর শত্রুদের থেকে বছরের পর বছর আগলে রেখেছিল? তুমি হলে ব্র্যাকের সেই ‘রক’, সেই জব্বল তারিক। তুমি সারা জীবন তোমার কাজের মাধ্যমে ব্র্যাকের ভাবমূর্তি বাইরের জগতে তুলে ধরেছ। ব্র্যাকের সম্মান বৃদ্ধি করেছ। তোমরাই ব্র্যাককে এগিয়ে নিয়ে গেছ।

আজ এক বছর হলো আবেদ ভাই চলে গেছেন। এ বছরটা বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর জন্য এক বিশেষ সময়। করোনা এখনো তার উপস্থিতি জানিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে আবেদ ভাইকে। আমার বিশ্বাস তিনি বেঁচে থাকলে আমরা আরো দৃঢ় এবং কার্যকরীভাবে এর মোকাবেলা করতে পারতাম। আবেদ ভাই, আপনি ভালো থাকুন, শান্তিতে থাকুন। আপনি কোটি মানুষের সঙ্গে আছেন। থাকবেন সরবে।

 আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী: কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক; ব্র্যাকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও ভাইস চেয়ার