অতি প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের লেখনী থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে উত্তরবঙ্গকে অনার্য ভাষায় বলা হতো পুণ্ড্র, যার অর্থ কৃষক জাতি। বর্তমানে বৃহত্তর রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর নিয়ে গঠিত প্রাচীন পুণ্ড্র জনপদের রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর, যার বর্তমান নাম মহাস্থানগড়। উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত কৃষিপণ্যগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল ধান। বর্তমানে দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত উত্তরবঙ্গে এখনো ধান প্রধান খাদ্যশস্য। উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের ধান থেকে তৈরি চাল সুপ্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কীভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য জোগানোর ভূমিকা পালন করে আসছে এবং অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রেখে চলেছে, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
অনেকের মতে, প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই দেশের উত্তরবঙ্গ তথা উত্তরাঞ্চলে কৃষির গোড়াপত্তন হয়েছে এবং তা ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়েছে। প্রচীনকালে এ অঞ্চলে উত্পন্ন কৃষিপণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল— ধান, পাট, মরিচ, হলুদ, আদা, রসুন, তুলা, রেশম, আখ, পান, সুপারি ও বিভিন্ন ফলমূল। বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ধান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীনতম শস্যগুলোর একটি। মহাস্থান ব্রাহ্মী শিলালিপিতে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় শতকে ধানের সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্য কয়েকটি লেখায়ও এ শস্যের উল্লেখ রয়েছে কালিদাসের ‘রঘুবংশ’ ও ‘রামচরিত’ গ্রন্থে এবং ‘কাসাপালা’ ও ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ প্রভৃতি রচনায়। প্রাচীনকালের মতো মধ্যযুগের প্রধান কৃষিপণ্য ছিল ধান। এটি এত উত্পন্ন হতো যে, স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর রফতানির জন্যও যথেষ্ট উদ্বৃত্ত থাকত।
ব্রিটিশ আমলেও উত্তরবঙ্গে ধান ছিল প্রধান কৃষিপণ্য। এর সত্যতা পাওয়া যায় উত্তরবঙ্গের একটি জেলা রংপুরে বিভিন্ন কৃষিপণ্য আবাদে ব্যবহূত জমির পরিমাণ থেকে। ডব্লিউডব্লিউ হান্টারের ‘Statistical Account of Rangpur’ গ্রন্থের বরাত দিয়ে ‘রংপুর জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ১৮৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দে রংপুর জেলার আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৯৫০ একর; যার মধ্যে বর্ষাকালে ১২ লাখ ৬৩ হাজার ২৬৬ একর জমিতে ধান, ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৬৯ একরে পাট ও আঁশজাতীয় দ্রব্য, ১৩ হাজার ৩০২ একরে নীল, ২০ হাজার ৪৬৪ একরে আখ ও ১৫ হাজার ২২৪ একর জমিতে শাকসবজি আবাদ করা হতো। অন্য এক সূত্রে জানা যায়, জমির গুণাগুণ বিচারে প্রতি একরে ৮-২০ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদন হতো।
বোরো ধান উৎপাদন শুরুর আগ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে দুই ধরনের ধান চাষ হতো। এক. আউশ ধান। এ ধান ছিল তিন ধরনের— ক. উঁচু জমির আউশ, খ. মাঝারি জমির আউশ ও গ. নিচু জমির আউশ ধান। তিন ধরনের আউশের মোট জাতের সংখ্যা ছিল ৮৩। এসব জাতের মধ্যে যোগী, তালই, থুকরী, মনি, ডুমরা, লহ্মমী, আঁচুল, মামরাজখান প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুই. আমন ধান। আমন ধানকে রোপা বা রোয়া ধান বলা হতো এবং এখনো তা চালু আছে। বর্তমানের মতো আগেও দুই ধরনের আমন ধান, রোপা আমন ও বোনা আমন চাষ হতো। দুই ধরনের আমনের জাতের মোট সংখ্যা ছিল ১৯২। এর মধ্যে মালসিরা, কাচুডুমা, সাথীরা, মাগুরা, বেতো, চাঁপাকলি, সিনগারিয়া ইত্যাদির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সুগন্ধি ধান বা চাল উৎপাদনে উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এখনো সে ধারা বজায় আছে। যদিও একাধিক কারণে দিনাজপুরে স্থানীয় জাতের সুগন্ধি ধানের চাষ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। আগে ও বর্তমানে বৃহত্তর দিনাজপুরে উৎপাদিত সুগন্ধি ধান বা চালের মধ্যে কাটারি, চিনিগুঁড়া, চল্লিশাজিরা, বাদশাভোগ, কালোজিরা, জটা কাটারি, চিনি কাটারি ও বেগুন বিচি প্রজাতিগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসবের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সুগন্ধি ব্রিধান-৩৪ ও ৫০। একমাত্র ব্রিধান-৫০ ছাড়া অন্য সব জাতের সুগন্ধি ধান রোপা আমন ও খরিপ-২ মৌসুমে আবাদ হয়। ব্রিধান-৫০ রবি বা বোরো মৌসুমে আবাদ হয়। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত সুগন্ধি ধান ব্রি৩৪-এর ফলন দেশীয় জাতের সুগন্ধি ধানগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় কৃষকরা এখন ব্রি৩৪ আবাদের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ফলে হ্রাস পাচ্ছে দেশীয় জাতের সুগন্ধি ধান বা চালের আবাদ। শুধু সুগন্ধি জাতের ধানগুলো নয়, ব্রি কর্তৃক উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান উদ্ভাবিত হওয়ায় স্থানীয় অন্যান্য জাতের ধান আবাদ ভীষণভাবে কমে গেছে। স্থানীয় জাতের ধানের ফলন কম হওয়াই এর মূল কারণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক স্মারকে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বোরো (হাইব্রিড), উচ্চফলনশীল ও স্থানীয় জাতের হেক্টরপ্রতি ফলনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ৪ দশমিক ৭৫ টন, ৩ দশমিক ৮৬ ও দুই টন। এতে দেখা যায়, স্থানীয় জাতের তুলনায় হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল জাতের ফলন দ্বিগুণ বা তার বেশি।
সুদূর অতীত থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ চালের সিংহভাগ উৎপাদন করে দেশবাসীর প্রধান খাদ্যের জোগান দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন বছরে সরকারের চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণসংক্রান্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশে চাল উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে উত্তরবঙ্গ। গত কয়েক বছরে যে দেশ চাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিল, তার পেছনে মূল অবদান রেখেছিল উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত চাল। চলতি বছর চালের যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ হলো চাল উৎপাদনে শীর্ষে থাকা বোরোর উৎপাদন হ্রাস। উৎপাদন হ্রাসের পেছনে চিহ্নিত কারণগুলো হলো— বৃহত্তর সিলেটের হাওড়াঞ্চলে অকালবন্যায় বোরো ফসলের ক্ষতি, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে বোরোর ব্লাস্ট রোগ এবং ভারত তিস্তা নদীতে বাঁধ দেয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয় এড়াতে উত্তরাঞ্চলে বোরোর আবাদ হ্রাসে সরকারি পরিকল্পনা। খাদ্যমন্ত্রীর হিসাবে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে ১ কোটি ৯১ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০ লাখ টন বোরো চাল কম উৎপাদন হয়েছে। যদিও অভিজ্ঞজনদের মতে, বোরো চাল উৎপাদন হ্রাসের পরিমাণ আরো বেশি হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক জরিপমতে, বৃহত্তর সিলেটের হাওরাঞ্চলে এবার অকালবন্যায় প্রায় আট লাখ টন বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছে (৯ আগস্ট বণিক বার্তায় লেখকের নিবন্ধ ‘বোরোর প্রকৃত উৎপাদনের ভিত্তিতে চালের সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার’)। সেক্ষেত্রে অবশিষ্ট ১২ লাখ টন বোরো চাল কম উৎপাদন হয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এখানে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হলো, এবারের চালের সংকট ও নজিরবিহীন উচ্চমূল্যের মূল কারণ উত্তরবঙ্গে চাল উৎপাদন হ্রাস। এর সঙ্গে অন্য যেসব কারণ যুক্ত হয়েছে সেগুলো হলো— সরকার অভ্যন্তরীণ চাল সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়া, সরকারি খাতে চাল আমদানির উদ্যোগ সময়মতো না নেয়া ও বেসরকারি খাতে চাল আমদানি উত্সাহিত করতে দেরিতে চালের আমদানি শুল্ক হ্রাস না করা।
উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হওয়ায় অঞ্চলটি অর্থনৈতিক দিক থেকে রয়ে গেছে অনুন্নত। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্পায়নের বিকল্প নেই। উত্তরবঙ্গে ঘটেনি শিল্পের প্রসার। ইংরেজ আমলের কথা বাদ দিলেও পাকিস্তান আমলে শিল্প খাতে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, তা ছিল ভারী শিল্প খাতে এবং উত্তরবঙ্গে এ ধরনের কোনো শিল্প স্থাপিত হয়নি। বাংলাদেশ আমলেও এখানে বড় বা মাঝারি ধরনের শিল্পের তেমন প্রসার ঘটেনি। ফলে বাড়ছে না এখানকার মানুষের কর্মসংস্থান, লাঘব হচ্ছে না তাদের আর্থিক দুরবস্থা। এর সর্বশেষ প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানার (household) আয়-ব্যয় নির্ধারণ জরিপ ২০১৬তে। সম্প্রতি প্রকাশিত এ জরিপ অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা উত্তরবঙ্গ। সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ বাস করে উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগে। দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি এমন ১০টি জেলার মধ্যে পাঁচটি রংপুর বিভাগের। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষের বাস। কুড়িগ্রাম ছাড়া তালিকায় আছে রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর।
সর্বশেষ যা বলতে চাই তা হলো, উত্তরবঙ্গের মোটা, মাঝারি, সরু ও সুগন্ধি চাল যুগ যুগ ধরে দেশের প্রধান খাদ্য চালের জোগানে মূল ভূমিকা পালন করে আসছে। মধ্যস্বত্বভোগী বিপণন ব্যবস্থায় এখানকার কৃষকরা চালসহ কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। তাছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য শিল্পায়নের প্রসার এখানে তেমন ঘটেনি। সব মিলে এখানকার মানুষ আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত। তাদের এ দুর্দশার আশু অবসান কাম্য।
লেখক: সাবেক সচিব ও কলাম লেখক





