বাংলাদেশ একটি নিচু বদ্বীপ, যার ওপর দিয়ে বহু নদী বয়ে গেছে। এ নদীগুলোর উত্পত্তি হয় হিমালয় পর্বতে অথবা উত্তর উজানে এবং এদের লক্ষ্য বঙ্গোপসাগর। এ নদীগুলো লক্ষ্যের যাত্রাপথে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করে, উভয় তীরের ক্ষয় করে এবং বিচ্ছিন্ন এক জমিন তৈরি করে, যাকে বলা হয় চর। আনুমানিক ২০ লাখ লোক বাংলাদেশের উত্তরের চরগুলোয় বাস করে। এদের অবস্থান ১০ জেলার ১ হাজার ২০০-এর বেশি গ্রামে। এদের জীবিকা উপাজর্নের প্রধান উপায় কৃষি (ফসল উৎপাদন, পশুপালন) এবং শ্রম অভিবাসন। চরে বাস করা এ লোকগুলোকে নিজ জীবন দশায় বারকয়েক নিজের বাসা ও কৃষিজমি হারাতে হয় এবং অন্য চরে চলে যেতে বাধ্য হতে হয়। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে বাজার ও সেবা গ্রহণের সুযোগ কম থাকায় এবং লেনদেনের উচ্চব্যয়ের কারণে চরবাসীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত।

বন্যা, নদী ভাঙন, খরা ইত্যাদির কারণে তৈরি অনিশ্চয়তা ও ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলে। দুর্বল বাজার প্রতিষ্ঠান, তথ্য ও যথাযথ ব্যবসায়িক বা সেবা মডেলের ঘাটতি, উচ্চতর ব্যয় ও ঝুঁকি চরগুলোকে সরকারি ও বেসরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের জন্য অনাকর্ষণীয় করেছে। পৌঁছা কঠিন এসব এলাকায় দারিদ্র্যের ব্যাপ্তি ও ঘনত্ব জাতীয় গড়ের (৩৫ শতাংশ বাস করে দারিদ্রসীমার নিচে— বাংলাদেশ এক্সট্রিম পভার্টি ম্যাপ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ডব্লিউএফপি ২০১০; এইচআইইএস২০১০, বিবিএস) তুলনায় বেশি। এখানে বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে, কেননা বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য ভালোভাবেই এগোচ্ছে।

মেকিং মার্কেটস ওয়ার্ক ফর দ্য যমুনা, পদ্মা অ্যান্ড তিস্তা রিভার (এম৪সি)-একটি প্রকল্প, যেটি ২০১৩ সালে গ্রহণ করে সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড করপোরেশন (এসডিসি) ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার। এ প্রকল্পের লক্ষ্য বাজার সুবিধা প্রদান করার মধ্যমে, যেটি উপার্জনকারীদের জন্য সুযোগ বৃদ্ধি করবে, উত্তরের ১০টি জেলার চরগুলোয় বসবাসকারীদের দারিদ্র্য ও ঝুঁকি কমানো। প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো— ক. বাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে চরবাসীর সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট বাজার সিস্টেমগুলোয় উন্নততর বাণিজ্যিক সেবা প্রদান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, খ. দরিদ্র চরবাসী সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট বাজার সিস্টেমগুলোয় পদ্ধতিগত পরিবর্তন জোরদার করা।

সুইস কনট্যাক্ট ও প্রাকটিক্যাল অ্যাকশন ইন পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়া সহযোগে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে মে ২০১৩ থেকে নভেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ১০ জেলার প্রায় ৯২ হাজার চর পরিবার উপকৃত হয় (মূল লক্ষ্য ছিল ৬০ হাজার পরিবার)। পরিবারপ্রতি আয় বেড়েছে ১১ হাজার টাকা (এম৪সি ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট ডাটা; ১ ডলার সমান ৮০ টাকা ধরে)। পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়ার সঙ্গে মিলে সুইস কনট্যাক্ট গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও কুড়িগ্রাম জেলায় এম৪সি বাস্তবায়ন করবে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত। এস৪সির লক্ষ্য হলো আরো ২৫ হাজার চর পরিবারকে ডিসেম্বর ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ সময়ে অতিরিক্ত ১৯ হাজার ২০০ টাকা আয় বাড়ানো। এম৪সির লক্ষ্য হলো চরের কৃষি পরিবারগুলোকে ২ দশমিক ৫ একর জমি বা দু-তিনটি গবাদিপশুর মালিক করে দেয়া। যেকোনো কৃষক এ প্রকল্পের হস্তক্ষেপের কারণে সুবিধা পেলে এবং ওপরের মানদণ্ড পূরণ করলে তাকে প্রকল্প সুবিধাভোগী হিসেবে ধরা হবে। এ পুরো প্রকল্পের তহবিল হলো: এসডিসি (দাতা) ৭৮ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা (১০ দশমিক ১০ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ) ও বাংলাদেশ সরকার ১৩ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা।

চরবাসীর অর্থনৈতিক অবস্থান উন্নতির জন্য স্থানীয় বাজার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে চরে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য সরকারি এজেন্সি (গবেষণা, সম্প্রসারণ ইত্যাদি), বেসরকারি কোম্পানি (এগ্রো-ইনপুট, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি) এবং স্থানীয় বাজার কুশীলবদের (খুচরা বিক্রেতা, ব্যবসায়ী ইত্যাদি) চর বাজারের সীমানা বৃদ্ধি এবং নিজেদের পণ্য ও সেবার প্রচারণার জন্য সময় আবদ্ধ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এম৪সি সহযোগিতা করে। এম৪সি আর্থিক ও আর্থিক বহির্ভূত সহযোগিতা প্রদান করে যেসব ক্ষেত্রে— ক. প্রাক ও পরবর্তী বাজার গবেষণা, খ. বাজার অনুঘটকদের মধ্যে সম্পর্ক বা সংযোগ শক্তিশালীকরণে, গ. অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবসা বা সেবা সরবরাহ মডেল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যাপ্তি বাড়াতে। এম৪সির আরো পরিকল্পনা রয়েছে তথ্য, জ্ঞান ও পাঠ্যকে সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এবং সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন খাত থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহ করে আনতে নির্বাচিত কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা তৈরিতে কাজ করার।

এম৪সির লক্ষ্য রাখে প্রধান ফসল (ভুট্টা, মরিচ, পাট, পেঁয়াজ, সরিষা, চীনাবাদাম ও চাল) এবং গবাদি পশু পালন (মে ২০১৬ থেকে) এবং একই সঙ্গে হস্তশিল্প, পরিবহন সেবা ও আর্থিক সেবায়। এখন পর্যন্ত, এম৪সি যৌথভাবে কাজ করেছে ছয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, প্রাণিসম্পদ সেবা বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ), ছয়টি এগ্রো-ইনপুট কোম্পানি, তিনটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান, তিনটি মাইক্রোফিন্যান্স ইনস্টিটিউশন এবং দেড় হাজারের বেশি স্থানীয় ব্যবসায়ী, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, সংগঠনের সঙ্গে। আজ পর্যন্ত এটি নিম্নের পদক্ষেপ (ইন্টারভেনশন) বা কার্যকমগুলো গ্রহণ করেছে: ১. ২৮টি পদক্ষেপ নিয়েছে, ১০টি অ্যাকশন রিসার্চ (১৬টি পদক্ষেপ ২০১৬-১৯), ২. ৯৩৯টি কৃষক দল তৈরি করেছে, সদস্য রয়েছে ২৫ হাজার, ৩. খুচরা ব্যবসায়ী, বণিক, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের (এসএএও) জন্য ২২০টি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন, ১১ হাজার ৬১৫ কৃষক প্রশিক্ষণ, ৫ হাজার ৩১ ডেমো প্লট, ১ হাজার ৩১৮ কৃষক মাঠ প্রশিক্ষণ ও ২৫৭ কৃষক ক্যাম্পেইন প্রোগ্রাম।

এ পদক্ষেপগুলো তৈরি করেছে ৭ কোটি টাকার সরকার অনুমোদিত মানের এগ্রো-ইনপুট এবং ৭ কোটি টাকার মৌসুমি ঋণ বিতরণ করেছে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো। ৩৫০ ব্যবসায়ী যুক্ত হয়েছেন উচ্চমান-উচ্চমূল্যের বাজারের সঙ্গে এবং ২০০ জনের বেশি স্থানীয় সেবাদাতা এখন ফসল-পরবর্তী সেবা দিচ্ছেন, যার ফলাফল হিসেবে ৪৬ হাজার টন মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য বাজারে আসছে, বিশেষ করে প্রাণ ৩৫০ টন আলু ও মরিচ কিনছে। এক হাজার চর নারীকে প্রশিক্ষণ ও চাকরি দিয়েছে তিনটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান, যারা মাসে ১ হাজার ১০০ টাকা অতিরিক্ত আয় করছেন। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) ৫ কোটি টাকা দিয়েছে ১৪টি যাত্রী ছাউনি, ছয়টি রাস্তা করার জন্য, যেখানে এ প্রকল্প যৌথ অর্থায়ন করেছে পাঁচটি ভাসমান ল্যান্ডিং স্টেশন, ১৮টি চলেরগাড়ি, ২৮টি মডেল নৌকা ও দুটি কাঁচা রাস্তার জন্য। এ সফলতা চরগুলোর ব্যবসায়িক দিক তুলে ধরেছে এবং এটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের অন্তঃপ্রবাহ তৈরি করেছে।

প্রকল্প চরের জন্য সংশ্লিষ্ট এগ্রো-ইনপুট ও চাষ বা ফসল কাটার পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে প্রচার করে, যা চরবাসীর জন্য দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়েছে। যে অতিরিক্ত আয় বেড়েছে, তা ব্যয় করা হচ্ছে পরিবারের ভালোর জন্য (বাড়ি মেরামত, আরো ভালো ভোগ, খাদ্যনিরাপত্তা); পুনর্বিনিয়োগ, জমি সম্প্রসারণ, সম্পদ সংগ্রহ (জমি, গবাদিপশু) ও শিশুদের শিক্ষার জন্য। ২০১৬ সালে পরিচালিত একটি মূল্যায়নের উপসংহারে বলা হয়েছে, প্রকল্পের পদক্ষেপ কাজ করেছে সম্পদ তৈরিতে এবং একই সঙ্গে সম্পদ ব্যয় করতেও, যার ফলে চর পরিবারগুলোয় স্থিতিস্থাপকতা তৈরি হচ্ছে এবং হ্রাস পাচ্ছে ঝুঁকি।

 

লেখক: পরিচালক, চর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার