চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলটি মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় মোগল শক্তি হীনবল হয়ে পড়ে ও বাংলার সুবেদাররা নামমাত্র মোগল আধিপত্য পেলেও প্রকৃত প্রস্তাবে তারা স্বাধীনভাবেই রাজত্ব করছিলেন। এ সময়ে নবাব আলীবর্দী খান নবাব সরফরাজ খানকে পরাজিত ও হত্যা করে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে আরোহণ করেন। নবাব আলীবর্দী খানের সময়েই এ এলাকার নাম হয় নবাবগঞ্জ। নবাবগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র, আম ও চালের ব্যবসা এবং কাঁসা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। আমই হলো এ জেলার অধিবাসীদের প্রধান অর্থকরী ফসল। আগে নবাবগঞ্জ গ্রাম মালদহ জেলার (পশ্চিম বাংলা) অধীনেও নবাবগঞ্জ উপজেলার সদর ছিল। ১৯২৫ সালে এ স্থানের নামকরণ করা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এরপর ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ জন্ম হয় আমপ্রধান এ নবাবগঞ্জ জেলার। কিন্তু জেলাবাসীর দাবি ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ হিসেবে নামকরণের জন্য। পরবর্তী সময়ে জেলাবাসীর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নিকার ৮৬তম বৈঠকে নবাবগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ করার সিদ্ধান্ত হয়। ২০০১ সালের ১ আগস্ট সরকারি প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়। মালদহ জেলায় প্রচুর আমবাগান ছিল। দেশ বিভক্তির পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগানের কিছু অংশ প্রাপ্ত হয় এবং এটি একটি লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে জেলার অন্য জায়গায় আমের চাষ সম্প্রসারণ হতে থাকে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের জেলাগুলোয় সবচেয়ে বেশি ও ভালো মানের আম উৎপাদন হচ্ছে। এর সঙ্গে আরো যোগ হয়েছে দক্ষিণ অঞ্চলসহ পাহাড়ি অঞ্চল। দেশের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। পৈতৃকভাবে এ এলাকার চাষীরা আমের আধুনিক চাষাবাদে অভ্যস্ত এবং সবচেয়ে ভালো মানের আম এ জেলাই উৎপাদন হয়। এ জেলার ৮০-৮৫ ভাগ মানুষই আমের চাষ, আমের ব্যবস্থা ও আমকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন ধারণ করে, যার প্রমাণ মিলবে আম মৌসুমে এ জেলায় ভ্রমণ করলে। আমের মৌসুমে জেলার সর্বত্রই যেন আম নিয়ে ব্যস্ত এ জেলার মানুষ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী এ জেলার ২৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ হচ্ছে এবং প্রতি বছর আড়াই লাখ টন আম উৎপাদন হয়। এ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদযোগ্য জাতগুলো হলো— গোপালভোগ, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, বোম্বাই, রানীপছন্দ, ফজলি ও আশ্বিনা। পরবর্তীতে বারি উদ্ভাবিত কিছু জাত যেমন— বারি আম-১, বারি আম-২ (লক্ষ্মণভোগ), বারি আম-৩ (আম্রপালি), বারি আম-৪ বিভিন্ন জায়গায় চাষাবাদ হচ্ছে। তবে বর্তমানে এ জেলায় তিন শতাধিক আমের ধরন রয়েছে। এখন পর্যন্ত আশ্বিনা আমের জাতটি এ এলাকায় একটি বাণিজ্যিক জাত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এ জেলার জন্মানো আমের জাতগুলোর মধ্যে ৩০-৩৫ ভাগই হলো আশ্বিনা জাতের আম। এ জেলায় আশ্বিনা জাতের আম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ হিসেবে কেনাবেচা শুরু হয় এবং বর্তমান সময়ে ২০ হাজার টাকা মণ হিসেবে কেনাবেচা হতে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এক কেজি আশ্বিনা আমের দাম ৫০০ টাকা দেশীয় বাজারে। শুধু তা-ই নয়, এ আম পাওয়ার জন্য রীতিমতো লাইন ধরতে হয়। অথচ মৌসুমের শুরুতে আশ্বিনা আম কেনাবেচা হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ দরে। এ জেলার পর পরই আসে রাজশাহী জেলার অবস্থান। জেলার বাঘা উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আমের বাগান রয়েছে। এ উপজেলায় অনেক পুরনো ও বয়স্ক ফলবান গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক অথবা অন্য কোনো সম্পর্কের জের ধরে অনেকে দেশ বিভক্তির আগেই আমবাগানগুলো করেছেন। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় জন্মানো জাতগুলো প্রায় একই ধরনের। কিন্তু রাজশাহী জেলায় খিরসাপাত, ল্যাংড়া, বারি আম-২ (লক্ষ্মণভোগ), বারি আম-৩ (আম্রপালি) ও ফজলি জাতের চাষ সবচেয়ে বেশি। তবে বাঘা ও চারঘাট উপজেলায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় বারি আম-২ (লক্ষ্মণভোগ) জাতের আমটি। এছাড়া পবা, পুঠিয়া, মোহনপুর উপজেলায় আমের চাষ হয়। এরপর নওগাঁ জেলার অবস্থান। এ জেলাও আম উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বিগত কয়েক বছর ধরে। জেলার পোরশা ও সাপাহার উপজেলা সবচেয়ে অগ্রগামী। এ জেলায় সবচেয়ে বেশি সম্প্রসারণ হয়েছে বারি আম-৩ (আম্রপালি) জাতের চাষ। আম চাষ লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছর ধানের জমি পরিবর্তিত হচ্ছে আমবাগানে। এছাড়া বারি আম-৪, খিরসাপাত, ল্যাংড়া ও ফজলি জাতের উৎপাদন হচ্ছে এ জেলায়। নাটোর জেলায়ও আমচাষ প্রতি বছর বাড়ছে। আমের বাণিজ্যিক ব্যবসা ততটা জমজমাট না হলেও প্রাণ-আরএফএল কোম্পানির বিভিন্ন কর্মতত্পরতার কারণে আমের উৎপাদন বাড়ছে। এ এলাকার বেশির ভাগ আম প্রাণ কোম্পানি জুস বা আমজাত পণ্য তৈরির উদ্দেশে চাষীদের কাছ থেকে কেনে। বর্তমানে প্রাণ কোম্পানি গোদাগাড়ী উপজেলার আমানতপুরে একটি আমকেন্দ্রিক কারখানা স্থাপন করেছে। আশা করা যায়, কারখানা স্থাপনের কারণে এ অঞ্চলে আম চাষ আরো দ্রুত সম্প্রসারণ হবে। এ দেশে বর্তমানে পেয়ারার চাষ দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে পেয়ারার চাষ। ফলে দেশীয় বাজারগুলোয় লক্ষ করলে দেখা যাবে, সারা বছর পেয়ারা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে এবং দেশের মানুষ গুরুত্ব দিয়ে দেশীয় ফল খাচ্ছে। বর্তমানে বিদেশী ফলগুলোর চাহিদা দেশীয় বাজারে কমে আসছে। ফল আমদানিকারকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিগত সময়ের তুলনায় ফলের আমদানিনির্ভরতা কমে আসছে। যদি এ কথাটি সত্য হয়, তাহলে এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য সুখবর। দেশীয় ফলগুলো দেশীর ক্রেতাদের জন্য বেশি পরিমাণে নিরাপদ ও বিষমুক্ত উৎপাদনে উত্সাহিত করা ও এর সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা তৈরি করা। তাহলেই দেশী ফলের চাহিদা দিন দিন বাড়বে ও ফল আমদানি ব্যয় কমে আসবে ফলে দেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় হবে। এ দেশের আম রফতানি মূলত শুরু হয়েছে কয়েক বছর আগে। শুরু হওয়ার পর প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে রফতানিতে ছন্দপতন হলো অজানা কারণে। উৎপাদন প্রক্রিয়া, আমের গুণগত মান আগের যেকোনো বছরের তুলনায় ভালো হলেও রফতানি হয়নি আশানুরূপভাবে। পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো আমবাগানের যে ব্যবস্থাপনা দেখিয়েছিল, তাতে এবার কয়েক হাজার টন আম রফতানি হতে পারত। কিন্তু আম রফতানিতে কিছুটা খামখেয়ালিপনা, দায়িত্বহীনতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সবার সমন্বয়ের মাধ্যমে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন করা হলেও আম রফতানির সময় কোনো সমন্বয় লক্ষ করা যায়নি। কখন কোন এলাকার আম রফতানি করা হবে, সে বিষয়টি আম রফতানি হওয়ার আগেই রফতানিকারকদের মনোনীত প্রতিনিধি, রফতানিকারকদের উপদেষ্টা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানা থাকলেও আম রফতানি শুরু হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের ১০-১২ দিন পর। ফলে অনেক আম গাছে থাকা অবস্থায় রফতানি অনুপযোগী হয়েছিল। বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে ঢালাওভাবে প্রচার করা হয়েছিল, আমে দাগসহ অনেক কিছু সমস্যার ফলে রফতানি করা সম্ভব নয়। যারা আম সম্পর্কে একটু ধারণা রাখেন, তারা সহজেই বুঝতে পারবেন, একটি আম পরিপক্ব হওয়ার পর ১০-১২ দিন গাছে রেখে দিলে কী হবে? যদি রেখে দেয়া সম্ভব হতো, তাহলে তো আর আগাম, মধ্যম, নাবি নামকরণ হতো না। গোপালভোগ জাতের পর হিমসাগর বা খিরসাপাত পরিপক্ব হতো না। আমরা সবাই চাষীর ভুল ধরতে অভ্যস্ত। শেষে এসে ভুল ধরা নিয়ে ব্যস্ত সবাই। কিন্তু শুরুতে একটি বিষয় ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলে যে ভুল হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়। বিষয়টি জানা থাকলেও বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োগ দেখা যায় না। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি বোধগম্য হবে। আগামী বছর কি আম রফতানি হবে? কতটুকু আম রফতানি হবে? কোন চাষীদের আম রফতানি হবে? কোন জেলার আম রফতানি হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য চাষী পর্যায় থেকে জানা যায়নি। কিন্তু কন্ট্রাক্ট ফার্মি ধারণামতে, আম সংগ্রহ করার পর পরই শুরু হবে চাষী নির্বাচন, চুক্তি স্বাক্ষর, উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন না করে আমরা মনিটরিং নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকি। ফলে সুফল খুব বেশি আশা করা যায় না। আম যেহেতু বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় খাত এবং এর ভবিষৎ অনেক উজ্বল, তাই প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে একসঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে যেকোনো কাজ করতে হবে। তাহলেই দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এখনো সময় আছে। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশের চাহিদানুযায়ী আম উৎপাদনের সক্ষমতা আছে দেশের ফল বিজ্ঞানীদের। শুধু প্রয়োজন সময়মতো অবহিতকরণ ও কার্যকর পদক্ষেপ। রফতানিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো, রফতানিকারক, আমচাষী) একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনা স্থির করে সবার সমন্বয়ের মাধ্যমে চাহিদানুযায়ী আম উৎপাদন করবেন এবং সে আমগুলো নির্দিষ্ট সময়ে রফতানি করে দেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্বল করবেন এমনটিই প্রত্যাশা দেশবাসীর।
লেখক: কৃষিবিদ, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ





