দুগ্ধ শিল্প কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এ শিল্প হতে আমরা পাই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ পানীয় দুধ, আমিষের উত্স হিসেবে মাংস, জ্বালানি ও জৈব সারের উত্স হিসেবে গোবর, আর চামড়া রফতানি করে অর্জিত হয় বৈদেশিক মুদ্রা। তাছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন, চাকরির ক্ষেত্র তৈরি ও বাংলাদেশের জিডিপিতে দুগ্ধশিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। গাভীকে কৃষকের জীবন্ত ব্যাংক হিসেবে অনেকেই উল্লেখ করে থাকেন। প্রতিদিন যেমন দুধ বিক্রি করে সংসার চালাতে গাভীর ভূমিকা ব্যাপক, ঠিক তেমনি বিপদের সময় বিক্রি করে নগদ অর্থ অর্জন করা যায়। দুধ প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ খাবার। খাদ্যের প্রতিটি উপাদান দুধের মাঝে সুষমভাবে বিদ্যমান থাকায় শুধু দুধ খেয়েই মানব শিশু জন্মের পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত তার প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারে। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত জীবনের প্রতি স্তরেই দুধ আদর্শ খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। তাই গাভীর দুধকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। আদিকাল হতেই এ দেশে অনেক ঘোষ পরিবার কৃষকদের বাড়ি থেকে দুধ সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধরনের দুগ্ধসামগ্রী, যেমন— ছানা, দই, রসগোল্লা, রসমালাই, চমচম, মাখন, পনির, ঘি ইত্যাদি দেশী মিষ্টিজাতীয় খাদ্য তৈরি করে মানুষের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করে আসছে। বর্তমানে দুধ ও দুগ্ধজাতীয় ব্যবসা ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়েছে, দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রচুর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা, যেগুলো কৃষকের উৎপাদিত দুধ পাস্তুরিত করে বাজারজাত করছে। দুধের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে উন্নত মানের দুগ্ধসামগ্রী, যেমন— বিভিন্ন ধরনের আইসক্রিম, চকোলেট, কনডেন্সড মিল্ক, ইউএসটি মিল্ক, ফ্লেভার্ড মিল্ক, লাচ্চি, লাবান, পনির, বাটার, ঘি, গুঁড়ো দুধ ইত্যাদি। দুধকে কেন্দ্র করে গ্রামগঞ্জে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেক দুগ্ধ খামার, যারা সরাসরি দুধ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে লক্ষাধিক দুগ্ধ খামার রয়েছে, যেগুলোর কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে দুগ্ধ শিল্প ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।
গরু, মহিষ ও ছাগল— এই তিন প্রজাতির প্রাণীই বর্তমানে বাংলাদেশে দুধের উত্স হিসেবে বিবেচিত। পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে গরুর সংখ্যা প্রায় ২৪ মিলিয়ন, মহিষের সংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন এবং ছাগলের সংখ্যা প্রায় ২৬ মিলিয়ন। বর্তমানে দেশে বার্ষিক দুধ উৎপাদন হয় প্রায় ৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন, অথচ ১০ বত্সর আগে উৎপাদন ছিল বার্ষিক ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ মিলিয়ন টন। গত ১০ বছরে দুধের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেলেও আমরা আমাদের চাহিদা পূরণের লক্ষ্য থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। আমরা যদি দুধের বার্ষিক উৎপাদন ১৫ লাখ টনে নিয়ে যেতে পারি, তবেই আমাদের জনগণের দুধের কাঙ্ক্ষিত চাহিদা পূরণ হবে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিন একজন লোকের প্রায় ২৫০ মিলিলিটার দুধ প্রয়োজন, কিন্তু আমরা পাচ্ছি প্রায় ১২৫ মিলিলিটার। এতে বোঝা যায় আমাদের দেশে দুধের ঘাটতি রয়েছে এখনো শতকরা ৫০ ভাগের মতো। এই উপমহাদেশের আরো দুটি দেশ যেমন ভারত ও পাকিস্তানের দুগ্ধ শিল্পে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে এবং দেশ দুটি তাদের জনগণের দুধের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে দুগ্ধজাত সামগ্রী রফতানি করছে। বর্তমানে ভারত বিশ্বের এক নম্বর দুধ উৎপাদনকারী দেশ।
বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্পে উত্তরবঙ্গের অবদান অপরিসীম। বিভিন্ন কারণে উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলায় দুগ্ধ শিল্পের অগ্রগতি ব্যাপক। প্রথম কারণ হিসেবে বলা যায়, প্রাচীনকাল হতেই ওই অঞ্চলে প্রচুর ঘোষ পরিবার বাস করত, যারা কৃষকের বাড়ি থেকে দুধ সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করত এবং দুধ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু দেশী মিষ্টি তৈরি করত। এতে কৃষক ও ঘোষ উভয়ই লাভবান হতেন বলে গাভী পালনের উত্সাহ বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত. ওই অঞ্চলের লোকজন আগে থেকেই গাভী লালন পালনে অভ্যস্ত ছিল এবং তারা গবাদি পশুকে অত্যন্ত ভালোবাসত এবং নিজ হাতে এসবের সেবাযত্ন করত। এখনো দেখা যায় অনেকে তার প্রিয় গাভীটির জন্য বড় ধরনের মশারি তৈরি করে মশা-মাছির উপদ্রব হতে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। নিজে অভুক্ত থেকেও গাভীর জন্য প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এসব গুণ উত্তরাঞ্চলের লোকজনের মাঝে বিদ্যমান ছিল বলেই দুগ্ধ শিল্প ওই অঞ্চলে দ্রুত প্রসার লাভ করে। তৃতীয় কারণ হিসেবে বলা যায়, তত্কালীন ইংরেজ আমলের গভর্নর লর্ড লিনলিথগ্রো ১৯৩৬ সালে অবিভক্ত বাংলার পাবনা সিরাজগঞ্জ অঞ্চল সফরকালে ওই এলাকার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল থেকে মুগ্ধ হন এবং তা গবাদি পশু পালনের উপযোগী মনে করে ভারত থেকে হারিয়ানা জাতের প্রায় এক হাজার উন্নত মানের ষাঁড় ওই অঞ্চলে পাঠান। সেসব উন্নত ষাঁড়ের সঙ্গে স্থানীয় গাভীর প্রজননের ফলে অধিক দুধ উৎপাদনশীল এক গাভীর জাতের তৈরি হয়, যা ‘পাবনা গ্রে’ নামে পরিচিতি পায়। পাবনা হতে নদী ও রেলপথে কলকাতায় দুধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রী সরবরাহ করার উদ্দেশ্যেই ইংরেজ গভর্নর ওই উদ্যোগ নিয়ে ছিলেন বলে শোনা যায়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, পাবনা জাতের গাভী প্রতিদিন ১০-১২ লিটার পর্যন্ত দুধ দেয়। বর্তমানে আরো বেশি দুধ পাওয়ার জন্য হলস্টিন ফ্রিজিয়ান ও জারসি জাতের ষাঁড়ের সংকরীকরণের ফলে পাবনার নিজস্ব জাতটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। চতুর্থ কারণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা হতে নদীপথে বজরায় করে তার জমিদারি পরিচালনার জন্য মাঝে মাঝে সিরাজগঞ্জের কুঠিবাড়িতে আসতেন। ওই সময় স্থানীয় ঘোষেরা কবির জন্য দুধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রীর ব্যবস্থা করতেন। এক সময় ঘোষেরা বিশ্বকবির কাছে গবাদি পশুর চারণ ভূমির জন্য কিছু জায়গা দেয়ার আবদার করেন। সময়টি ছিল ১৯৩৯ সাল এবং বিশ্বকবি তার জমিদারির পাঁচ হাজার একর জমি ঘোষদের পত্তনি দিয়েছিলেন। ওই জমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বর্তমানে বাথান ব্যবস্থাপনায় গবাদি পশু পালন। বড়াল নদীর মিষ্টি পানি বাথানের গবাদি পশুর পানির উত্স হিসেবে কাজ করছে। বর্ষাকাল বাদে বছরের প্রায় পুরো সময় ওই অঞ্চলের দুগ্ধ খামারিরা বাথানে তাদের গবাদি পশু উন্মুক্ত জায়গায় ছেড়ে লালনপালন করার সুযোগ পাচ্ছেন। উন্মুক্ত পরিবেশে চড়ে ঘাস খাওয়ার ফলে গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ছে, রোগবালাই কম হচ্ছে এবং খামারিদের দুধের উৎপাদন খরচ কমায় তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এতে উত্তরবঙ্গের দুগ্ধ খামারিরা গাভী পালনে আরো উত্সাহিত হচ্ছেন।
পঞ্চম কারণ হিসেবে বলা যায়, কারখানাভিত্তিক দুগ্ধ শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ। পাবনা সিরাজগঞ্জ অঞ্চল থেকে কলকাতার শিয়ালদহ পর্যন্ত তখন সরাসরি ট্রেনেরও ভালো যোগাযোগ ছিল। এর ফলে ব্যবসাভিত্তিক টার্গেট মার্কেট হিসেবে কলকাতাকে চিহ্নিত করে ১৯৪৬ সালে ‘ন্যাশনাল নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি’ নামে একটি সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান এ দেশের সিরাজগঞ্জ জেলার লাহিড়ীমোহনপুরে একটি দুগ্ধ কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তিতে ওই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে মো. মুখলেসুর রহমান নামে এক ব্যক্তি নিজস্ব সম্পদ বিনিময় সূত্রে কারখানাটির মালিকানা লাভ করেন। কারখানা থেকে পাস্তুরিত দুধ, ঘি, মাখন, পনির ইত্যাদি উৎপাদন শুরু হলে ঢাকার মার্কেটকে টার্গেট করে ‘মিল্ক ভিটা নাম দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ওই সময়ে লাহিড়ীমোহনপুর হতে ঢাকায় আসার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। এতে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য ঢাকায় এনে বিক্রি করা হতো খুবই কঠিন এবং এতে কারখানাটির লোকসানের পরিমাণ বাড়তে থাকে। অনেক প্রচেষ্টাতেও যখন এ লোকসানের চাপ বহন করা আর সম্ভব হচ্ছিল না, তখন ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে সমবায় ব্যবস্থাপনায় এনে সমবায়ভিত্তিক প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমিতি গড়ে তোলা হয়। তখন পুরনো নাম বদলে প্রতিষ্ঠানের নাম করা হয় ‘ইস্টার্ন মিল্ক প্রডিউসার্স কো-অপারেটিভ ইউনিয়ন লিমিটেড’। সমবায় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিও ফলপ্রসূ না হওয়ায় ১৯৬৮ সালে ‘সমবায় মার্কেটিং সোসাইটি’ কারখানটির দায়িত্বভার গ্রহণ করে। এর পরও এর আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়নি এবং ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৩ সালে আবার প্রতিষ্ঠানটিকে চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনডিপি) ও ডেনমার্কের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ডানিডার সহায়তায় এবং ভারতের আনন্দ মিল্ক ইউনিয়ন লিমিটেডের (আমুল) আদলে আবার প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হয়। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠানটির নতুন নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড’। কিন্তু পণ্যের ব্রান্ড নাম ‘মিল্ক ভিটা’ই থেকে যায়। এভাবে হাঁটি হাঁটি পা পা করে উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে মিল্ক ভিটার যাত্রা শুরু এবং বর্তমানে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ঘাটে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির মিল্ক প্রসেসিং কারখানা প্রতিদিন প্রায় ২ দশমিক ৫ লাখ লিটার দুধ প্রসেসিং করে। এটি সম্ভব হচ্ছে শুধু উত্তরবঙ্গের দুগ্ধ বিপ্লবের কারণে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্র্যাক ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রজেক্টের আওতায় আড়ং দুধ ও প্রাণ ডেইরি লিমিটেড উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক দুধ কালেকশন সেন্টার স্থাপনের ফলে দুধ বাজারজাত আরো সহজ হয়ে গেছে। প্রাণ ডেইরি লিমিটেড উত্তরবঙ্গে অনেকগুলো ডেইরি হাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, যা এ অঞ্চলের দুগ্ধ শিল্পকে আরো সম্প্রসারণ করবে। ইদানীং আমেরিকান ডেইরিও উত্তরবঙ্গে তাদের কার্যপরিধি বাড়িয়েছে। তাছাড়া বগুড়ার আর ডিএ, গ্রামীণ ডেনোম, গ্রামীণ সিএলডিডিপি, উত্তরা শিলাইদহ ডেইরি, রংপুর ডেইরিসহ অনেক সংস্থা বর্তমানে উত্তরবঙ্গে দুগ্ধ শিল্পের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এতে দুধের উৎপাদন বাড়ছে। খামারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। বদলে যাচ্ছে তাদের জীবনধারা। খাঁটি দুধ খেয়ে শিশুরা হচ্ছে মেধাবী, মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণসহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় কমছে বেকারত্ব। উত্তরবঙ্গের দুধের চাহিদা পূরণ করে এসব প্রতিষ্ঠান দুধ সরবরাহ করছে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে। মোটের ওপর বলা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে যে শ্বেত বিপ্লব শুরু হয়েছে, তার মূল কর্ণধার উত্তরবঙ্গের পাবনা, সিরাজগঞ্জ অঞ্চল।
বাংলাদেশে দুগ্ধ শিল্পের অগ্রগতি শুরু হলেও নানা সমস্যায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে দেরি হচ্ছে। বিভিন্ন কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভালো জাতের দুধেল গাভীর অভাব, গো-খাদ্যের স্বল্পতা ও উচ্চমূল্য, বাজারজাতের সমস্যা, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসমৃদ্ধ জনবলের অপ্রতুলতা, উচ্চ সুদের ব্যাংক লোন ইত্যাদি। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার গুঁড়ো দুধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে, যার বাজারমূল্য দেশে উৎপাদিত গুঁড়ো দুধের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় দেশী শিল্প বিকাশের সুযোগ কমে যাচ্ছে। তাছাড়া আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধ মানব স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে চীনে গুঁড়ো দুধের সঙ্গে মেলামাইন মেশানোর ফলে অনেক শিশু মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছিল, যার ফলে এ বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
দুগ্ধ শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে বর্ণিত কিছু বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। যেমন— উন্নত জাতের গাভী উৎপাদনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে, চরাঞ্চলের সরকারি খাস জায়গা ঘাস চাষের জন্য দুগ্ধ খামারিদের লিজ দেয়া যেতে পারে, আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণসহ অধিক হারে ট্যাক্স বসাতে হবে, দুগ্ধ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরকে অল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, দুগ্ধ শিল্পে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে ট্যাক্স, ভ্যাট ইত্যাদির পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে এবং দেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুগ্ধ শিল্পে ব্যবহূত যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য কম সুদে ঋণ দিয়ে উত্সাহিত করতে হবে। তাছাড়া মানুষের মাঝে দুধ খাওয়ার প্রবণতা বাড়ানোর জন্য এর পুষ্টিগত মান সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন। ভারতের দুগ্ধশিল্পকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সত্তরের দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ও ন্যাশনাল ডেইরি রিসার্চ ইনস্টিটিউট। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের অবদানের ফলে ভারত আজ বিশ্বের এক নম্বর দুধ উৎপাদানকারী দেশ। বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্পকেও এগিয়ে নিতে হলে ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড এবং উত্তরবঙ্গে একটি ডেইরি রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। সর্বোপরি এসব ব্যবস্থার দিকে বাস্তব নজর দিলে আশা করা যায়, উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে দুগ্ধ শিল্পের যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছে, তার সুফল অচিরেই সারা দেশের মানুষ ভোগ করতে শুরু করবে। মনে রাখতে হবে, খাদ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও পুষ্টির নিরাপত্তা আমরা এখনো জাতিকে দিতে পারিনি। আর এ কাজটি করতে হলে দুধের উৎপাদন বাড়াতে হবে। একটি মেধাবী জাতি গঠনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ খাওয়া অত্যাবশ্যক। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে যে জাতি বেশি দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাদ্য খায়, তাদের মধ্যে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীদের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই দুধ খাওয়ায় অভ্যাস বাড়াতে হবে এবং উত্তরবঙ্গ হতে সাধিত দুগ্ধ বিপ্লব বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই ছড়িয়ে দিয়ে দুধের উৎপাদন বাড়াতে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া আজ সময়ের দাবি।
লেখক: অধ্যাপক, ডেইরি বিজ্ঞান বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়





