১৪৭ বছর আগের কথা। আজকের আধুনিক নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের শুরুটা ছিল আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে ঘিরে। সৈয়দপুর ছিল সাধারণ একটি গ্রাম। পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্পদ আহরণের জন্য নির্মাণ করতে থাকে রেলপথ। আর সেই রেলপথগুলো পুরো ভারত উপমহাদেশকে একসঙ্গে বেঁধেছিল। সেই সময়ে ইংরেজ বেনিয়ারা সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল রেলওয়ে কারখানা, যা আজো বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে পরিচিত। এই রেল কারখানাকে কেন্দ্র করেই আজকের আধুনিক শহর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে সৈয়দপুর। শুধু তাই নয়, দেশের অষ্টম ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আর এজন্যই সৈয়দপুর শুধু বাণিজ্যিক শহরই নয়, রেলওয়ে শহর হিসেবেও খ্যাত।

১৮৭০ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলপথকে ঘিরে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার ১১০ একর জায়গার ওপর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ১৯০৩ সালে কারখানাটি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ও মালবাহী গাড়ি এবং স্টিম লোকোমোটিভ মেরামত কারখানায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের দিকে কারখানায় বিভিন্ন মেশিন শপ স্থাপন করে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি মেরামত ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সৈয়দপুর কারখানায় আছে ২১টি শপ (উপকারখানা)। কারখানাটি পশ্চিম রেলের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ রেলপথের যাত্রীবাহী বগি (ক্যারেজ), মালবাহী বগি (ওয়াগন) এবং পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের স্টিম রিলিফ ক্রেনের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ এবং আয়ুষ্কাল ঠিক রাখার পাশাপাশি কোচের গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এখানে ক্যারেজ, ওয়াগন ও লোকোমোটিভের ১ হাজার ২০০ রকমের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা আছে। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান উভয় আমলেই যে কারখানাটি শত শত মেশিনের শব্দ ও কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদচারণায় মুখরিত ছিল, সেই কারখানাটি বছরের পর বছর জনবল, অর্থ ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকট এবং যুগোপযোগী পরিকল্পনার অভাবে মৃতপ্রায়। সম্ভাবনাময় কারখানাটির অবস্থা আজ গ্রামবাংলার সেই প্রবাদের ভূমিকায় ‘যার দউলতে রামের মা তারে তুমি চেন না’। যে কারখানাটি একটি গ্রামকে বাণিজ্যিক শহরে রূপ দিয়েছে, দীর্ঘ ১৪৭ বছর ধরে ক্যারেজের (যাত্রীবাহী বগি) গতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, সেই কারখানাটিকে আধুনিকায়নের পরিবর্তে অবহেলিত করে রাখা হয়েছে।

রেলওয়েকে আলাদা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে যখন ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়েতে সম্পৃক্ত হয়ে একটি যথার্থ পরিবহন মাধ্যম হিসেবে দেশ-বিদেশে সম্প্রসারিত হচ্ছে, সে সময় আমরা রেলওয়ের প্রাণ কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন না করে পশ্চাত্পদ করে রেখেছি।  ব্রডগেজ ও মিটারগেজ উভয় ধরনের কোচ ও ওয়াগন মেরামতে রেলের প্রধান ভরসা সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। কারখানাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আধুনিকায়নের ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে কারখানাটির কার্যক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এর মধ্যে জনবল সংকট, পুরনো যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও নতুন মেশিনপত্র কেনার উদ্যোগ গ্রহণ না করা, খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব এবং সর্বোপরি অপর্যাপ্ত বাজেট উল্লেখযোগ্য। 

লোকবল সংকট : ১৯৯১ সালে রেলওয়ে রিকভারি প্রোগ্রামের আওতায় রেলওয়ের লোকবল ৫৮ হাজার থেকে ৩৫ হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে কারখানার লোকবলের হিসাবও রাতারাতি বদলে যায়। বর্তমানে সৈয়দপুর রেল কারখানায় শ্রমিক সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। কারখানায় মঞ্জুরীকৃত ৫৬% শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও নতুন লোকবল নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ৩৭০ জন মঞ্জুরীকৃত খালাসি পদে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৯৮ জন। শ্রমিকের অভাবে কাজের পরিধি কমে যাওয়ায় যে অল্পসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী রয়েছে, তারাও অলস সময় পার করছে। ফলশ্রুতিতে রেল কারখানায় যেখানে প্রায় ১৪ লক্ষ টাকায় একটি বগি মেরামত করা যায়, তা বাইরের ঠিকাদার কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় ২৯ লাখ টাকায় মেরামত করানো হচ্ছে। লোকবলের অভাবে কারখানার বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়াসহ যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক যাত্রীবাহী কোচ ও ওয়াগন মেরামত করে সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমানে কারখানায় মঞ্জুরীকৃত জনবলের সংখ্যা, কর্মরত জনবল এবং শূন্যপদের সংখ্যা

&dquote;&dquote;

(সূত্র: সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, ২০১৭)

অতি সম্প্রতি রেলওয়ের উন্নয়নে ৩০ বছরমেয়াদি (২০১৬-৪৫) খসড়া মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করা হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যানে ৩০ বছরে ৫ হাজার ১৪৩টি কোচ এবং ৬ হাজার ৪৩৯টি ওয়াগন সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে। কাজেই অতি দ্রুত শূন্য পদে লোক নিয়োগ করা প্রয়োজন। নতুন নিয়োগ দেয়া হলে এসব জনবল ক্রমান্বয়ে দক্ষ জনবলে রূপান্তরিত হয়ে রেল কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এজন্য প্রয়োজনে Vocational পাস এবং Trade Apprentice নিয়োগ করা যেতে পারে।

অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরির বয়স শেষ পর্যায়ে: কারখানায় নিয়োজিত অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বয়স ৫০-এর উপরে চলে গেছে। এর মধ্যে কর্মকর্তাদের শতকরা ৭০ ভাগ, আর কর্মচারীদের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগের বয়স ৫০-এর উপরে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ১০০, ২০১৯ সালে ১৩০ এবং ২০২১ সালে ১৫০ জন অবসরে যাবে। এতে করে কারখানায় বিদ্যমান জনবল সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করবে। উল্লেখ্য, কারখানায় একজন দক্ষ কর্মী তৈরি হতে প্রায় ১০ বছর সময় লেগে যায়। সে হিসাবে দক্ষ কর্মীদের অবসরে যাওয়ার হিসাব করে পূর্বেই নতুন লোকবল নিয়োগ ও পুরনোদের তত্ত্বাবধানে কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে রেলওয়ের কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য অতিসত্বর লোকবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রয়োজনীয় কাঁচামালের স্বল্পতা : কারখানায় যাত্রীবাহী মিটারগেজ গাড়ি প্রতিমাসে ৪৫টা, ব্রডগেজ গাড়ি ৩০টা এবং মালবাহী গাড়ি দৈনিক ৭টা মেরামতের কথা থাকলেও পর্যাপ্ত লোকবল, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল না থাকার পাশাপাশি নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ করার কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। পশ্চিমাঞ্চলে যাত্রীবাহী গাড়ি আছে মোট ৬৯৩টি। কারখানায় দৈনিক যাত্রীবাহী গাড়ি মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ব্রডগেজ ১.৮০ ইউনিট এবং মিটারগেজ ১.২০ ইউনিট। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ৩ ইউনিট (১টি যাত্রীবাহী গাড়ি = ২ ইউনিট)। অথচ পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাব এবং বাজেট স্বল্পতার কারণে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে গত ২ বছরে দৈনিক যাত্রীবাহী গাড়ি মেরামতের হার ছিল ব্রডগেজ ১.৪৮ ইউনিট এবং মিটারগেজ ০.৬৯ ইউনিট।

মালামাল ক্রয় খাতে বাজেট চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দকৃত অর্থের চিত্র (লক্ষ টাকা)

&dquote;&dquote;

(সূত্র: সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, ২০১৭)

সারণি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৪-১৫ সালে মালামাল ক্রয় খাতে ২২৪২ লক্ষ টাকা বাজেট বরাদ্দ থাকলেও এর পরবর্তীতে বছর ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ সালের দিকে এসে ক্রয়সংক্রান্ত বাজেট কমিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ সেই সময় রেলওয়ের বহরে অনেক নতুন কোচ যুক্ত হয়েছিল।

আধুনিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতা : যে কোনো কারখানার উৎপাদনশীলতা কর্মী ও মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। মেশিন ঠিকমতো কাজ না করলে উৎপাদনশীলতায় গতি আনয়ন করা সম্ভব হয় না। ফলে কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় রয়েছে ৭৮৭টি বিভিন্ন ধরনের মেশিন। আর এসব মেশিনপত্রের বয়স ৫০ বছরের উপরে। ১৪০ বছরের পুরনো ক্যারেজ শপ, কালার শপ ও ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন মেশিন শপে এসব কোচ মেরামতের কাজ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। আধুনিক মেশিনপত্র না থাকায় শ্রমিকদের প্রতিমুহূর্তেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

কারখানার প্ল্যান্টস অ্যান্ড মেশিনারি

&dquote;&dquote;

(সূত্র: সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, ২০১৭)

অপর্যাপ্ত বাজেট : যেসব প্রতিবন্ধকতার কারণে কারখানার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না, তার মধ্যে বাজেট ঘাটতি অন্যতম। সৈয়দপুর রেল কারখানায় যাত্রীবাহী গাড়ি মেরামত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনের অনুযায়ী বাজেট না পাওয়ায় মেরামত কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। এছাড়া বাজেটের স্বল্পতার কারণে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তৈরি ও আমদানির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন, মেরামত এবং সর্বোপরি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বছরভিত্তিক প্রাপ্ত বাজেট

&dquote;&dquote;

(সূত্র: সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, ২০১৭)

পশ্চিমাঞ্চলে যাত্রীবাহী বগি (ক্যারেজ) রয়েছে মোট ৬৯৩টি। এর মধ্যে ব্রডগেজ (বিজি) ৪৭৫ ও মিটারগেজ (এমজি) ২১৮টি। নিয়মানুযায়ী প্রতিটি আন্তঃনগর ও নগর ট্রেন ৪ বছর পর ও মেইল এক্সপ্রেস ৬ বছর অন্তর পিওএইচ (পিরিওডিক্যাল ওভারহোলিং) ও ১২ বছর অন্তর প্রতিটি ট্রেন জিওএইচ (জেনারেল ওভারহোলিং) করার নিয়ম রয়েছে। বর্তমানে সচল ব্রডগেজ (বিজি) কোচের ২৩৪টি এবং মিটারগেজ (এমজি) কোচের ২১৮টির আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বর্তমানে অনেক যাত্রীবাহী গাড়ির পিওএইচ ও জিওএইচ মেরামত করার বাকি আছে। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, কাঁচামাল ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কোচ ও ওয়াগন তৈরি করা সম্ভব। পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করা গেলে প্রতি কর্মদিবসে ৩ ইউনিট যাত্রীবাহী কোচ মেরামত করা সম্ভব। এছাড়া শতভাগ ওভারটাইম এবং চুক্তিভিত্তিক (Contract Basis) প্রকল্প ধারাবাহিকভাবে চালু রেখে পিছিয়ে পড়া শিডিউল হালনাগাদ করা সম্ভব। এতে করে অনেক কম খরচে প্রায় নতুনের মতো গাড়ি পাওয়া যাবে। ফলে সাশ্রয় হবে কোটি কোটি টাকা। অন্যথায় গাড়িগুলো পূর্বের ন্যায় পরিত্যক্ত ঘোষিত হবে।

বাজেট প্রাপ্তিতে যেমন ঘাটতি রয়েছে তেমনি মালামাল ক্রয়ের দরপত্র প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে কারখানায় সময়মতো প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সরবরাহও মিলছে না। পাশাপাশি নিম্নমানের মালামাল সরবরাহের ফলে কাজের মানও রক্ষা করা যাচ্ছে না। ওইসব নিম্নমানের মালামাল ব্যবহারে অতিরিক্ত জনবল, শ্রমঘণ্টা ও বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। এক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার মালামাল সরবরাহ সহজ ও নিশ্চিত  করার লক্ষ্যে বর্তমান ক্রয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে কারখানায় অতীব প্রয়োজনীয় মালামাল উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় ক্রয়ের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। ক্রয়নীতিমালা সংশোধন করে অপ্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয় বন্ধ করে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মালামাল ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে টেন্ডার ও ক্রয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে করে অনিয়ম, অপচয় রোধ করে বাংলাদেশ রেলওয়েকে উৎপাদন বৃদ্ধি ও গতিশীল করা সম্ভব।

কারখানার মেশিনারিজ রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা:  কারখানার প্রতিটি মেশিন ক্যারেজ ও ওয়াগনগুলোকে এলই, জিওএইচ এবং পিওএইচ করার কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবহূত হয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই মেশিনগুলো ব্যবহার করা হলেও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে মেশিনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। মেশিনগুলোর জন্য টুলস ও স্পেয়ার পার্টস কেনা সম্ভব হচ্ছে না। সঠিক সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে মেশিনগুলো কিছুদিন পর পর বিকল হয়ে পড়ে। এতে করে কারখানার কার্যক্রমের গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।  

উৎপাদনশীলতায় কর্মীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রভাব: কর্মীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে উৎপাদনশীলতার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কর্মীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হলে উৎপাদন বাড়ে। কর্মীদের কোয়ার্টারগুলো ব্রিটিশ আমলের। ফলে কোয়ার্টারগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে ড্রেনের ময়লা মিলিত হয়ে পুরো কলোনি দূষিত করে তোলে। কর্মীদের কোয়ার্টারগুলো নির্দিষ্ট সময়ে মেরামত করা হয় না। এছাড়া কারখানায় কর্মরত কর্মীরা দীর্ঘদিন তাদের পদবির নাম পরিবর্তন করার কথা বললেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তা কর্ণপাত করছেন না। যেমন, খালাসির পরিবর্তে হেলপার, মিস্ত্রির পরিবর্তে টেকনিক্যাল সুপারভাইজার, এসএমের পরিবর্তে এসএম টেকনিক্যাল। এতে করে কর্মীদের কাজের গতিশীলতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিকল্পিত আধুনিকায়নের অভাব: সৈয়দপুর রেল কারখানা প্রতিষ্ঠার পর ১৪৬ বছর অতিবাহিত হলেও পরিকল্পিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। গত বছর ১৫৬ কোটি টাকায় ২৮টি শপের আধুনিকায়ন কাজ করা হয়। তিন মাস না যেতেই রেলওয়ের সর্ববৃহৎ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা এখন আসমানি কবিতার রূপক দরিদ্র আসমানির আবাসস্থলে রূপ নিয়েছে। কারখানার অভ্যন্তরের শপগুলোর টিনের ছাদ ফুটো হয়ে পানি পড়ে। পানি পড়ে হাজার কোটি টাকার মেশিনপত্র নষ্ট ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাণহানির হুমকিতে থেকে কাজ করতে হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় কারখানায় প্রায় ৪৫টির মতো নতুন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু লোকবল সংকটের কারণে মেশিনগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। যে মেশিন প্রতিদিন ব্যবহার করার কথা সেটি সপ্তাহে বা মাসে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এছাড়া সৈয়দপুরের কারখানার পাশে পতিত জমিতে কোচ ও ওয়াগন তৈরির জন্য নতুন কারখানা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৯৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। নতুন কারখানা হলে বছরে ৬০টি কোচ তৈরি করা যাবে। বছরে ৬০টি কোচ তৈরি করে রেলওয়ে কতটা লাভবান হতে পারবে এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বছরে এত অল্পসংখ্যক কোচ তৈরি করা হলে উৎপাদন ব্যয় আমদানি ব্যয়ের চেয়ে বেশি হতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারখানাটি উন্নত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে যাত্রীবাহী কোচ তৈরি করা কোনো ব্যাপারই ছিল না। যার প্রমাণ কারখানার শ্রমিকগণ দিয়েছেন। রেলওয়ের ২১১৬ নম্বর রেল কোচটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে। সে কারণে এটিকে ইয়ার্ডে ফেলে রাখা হয়। তবে কোচটির অনেক সরঞ্জাম ভালো দেখতে পেয়ে সচল করার কাজ শুরু করেন কারখানার শ্রমিকরা। মাত্র ৫০ কার্যদিবসে শ্রমিকরা কোচটিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক রেল কোচে রূপ দেয়। শুধু তাই নয়, পূর্বে কোচটিতে আসনবিন্যাসে সমস্যা থাকায় রেলপথে ভারসাম্যহীনভাবে চলাচল করেছে। এক অংশে চাপ (লোড) বেশি পড়ায় দ্রুত এর স্প্রিং বিকল হয়ে যেত। নতুন করে নির্মাণের সময় কোচটিতে এ সমস্যাগুলো সমাধান করা হয় এবং প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য চারটি বিশেষ আসনের ব্যবস্থাসহ টয়লেট স্থাপন করা হয়।

নতুন নকশায় কোচ রূপান্তর কারখানায় নতুন নয়। এমন কাজের অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। শুধুমাত্র প্রয়োজন কারখানাকে যুগোপযোগী আধুনিকায়ন করা। বর্তমানে রেলপথের সম্প্রসারণ ও রোলিং স্টক বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন রেলগাড়ি চালু হতে যাচ্ছে। যাত্রী ও মালবাহী কোচের চলাচলকে স্বাভাবিক রাখতে হলে লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও নির্মাণ করতে রেলওয়ে কারখানাকে পুরোপুরি আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। রেলের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের জন্য রেলওয়ে কারখানাগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। আমদানি করতে হবে আধুনিক মানসম্পন্ন যন্ত্রাংশ এবং মেশিন আর সেই সঙ্গে নিয়োগ দিতে হবে শ্রমিক-কর্মচারীদের। এতে গণমানুষের এ ব্যবস্থাটিতে পুনরায় প্রাণের সঞ্চার ঘটানো সম্ভব হবে।

 

লেখক: রেলওয়ে বিষয়ে গবেষণারত