বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যে জেলাগুলো আগে যমুনা ও দক্ষিণে পদ্মা দ্বারা পরিবেষ্টিত, সেই জেলাগুলোই উত্তরবঙ্গ হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছে। এ অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর বলে ঐতিহাসিকভাবে এখানে কৃষিজাত কাঁচামাল থেকে উৎপাদিত পণ্যের শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছিল। তার মধ্যে আখ, পাট, তুলা, তামাক, কাগজ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এ অঞ্চল ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা আবহাওয়া ও মাটি আখ চাষের জন্য উপযুক্ত হওয়ায় ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে ও তার আশপাশে আখ চাষ ও চিনি শিল্পের বিকাশ হয়েছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মার্কোপোলো এ দেশে চিনি শিল্পের অস্তিত্ব লক্ষ করেন। তারও অগে সপ্তম শতাব্দীতে এ অঞ্চল থেকে চিনি রফতানি হতো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে। উপমহাদেশের মাদ্রাজ, সুরাট ও সিন্ধু দেশেও এ অঞ্চলের চিনি রফতানি হতো বলে জানা যায়। শোনা যায়, চীনারা ওই সময় চিনি শিল্পের প্রযুক্তি শেখার জন্য এ অঞ্চলে এসেছিল। বাংলাদেশের চিনি শিল্প মূলত এ উত্তরবঙ্গ ও এর আশপাশ এলাকায় উৎপাদিত আখ চাষের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে মোট ১৫টি চিনিকল চালু রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি ব্রিটিশ আমলে, নয়টি তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে এবং তিনটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্থাপিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে পুরনো চিনিকল হলো নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল, যা ১৯৩৩ সালে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু নাটোর ও পাবনা অঞ্চলে যে আখ উতপাদন হতো, তা নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল থেকে অনেক দূরে হওয়ায় পরিবহনে অসুবিধা হতো এবং অনেক আখ নষ্ট হয়ে যেত বলে পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাটোর চিনিকলটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে এবং পাবনা চিনিকলটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এ চিনিকলগুলো তৈরির সময় কোনো কোনো জায়গায় জমির মালিকানা ছেড়ে দিয়ে কাউকে অন্যত্র চলে যেতে হয় আবার অনেক মানুষ অন্য অঞ্চল থেকে অভিবাসন করে এ এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলটি যখন তৈরি করা হয়, তখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক কৃষক ও শ্রমিক আখ চাষ করার জন্য ও শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য উত্তরবঙ্গে অভিবাসন করে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে। তাদের অনেকেই আর ফেরত যায়নি এবং তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম এখনো খামারে কাজ করছে। অন্যদিকে রংপুর (মহিমাগঞ্জ) চিনিকলটি নির্মিত হয় পাকিস্তান আমলে ১৯৫৫ সালে। সে সময় রংপুর চিনিকল নিজস্ব খামারের জন্য ১৯৫৪-৫৫ অর্থবছরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ৫ নং সাপমারা ইউনিয়নের সাপমারা, রামপুর, মাদারপুর, নরেঙ্গাবাদ ও চকরাহিমপুর মৌজার ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করেছিল। এলাকাটি এখন সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম নামে পরিচিত। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের সময় কোনো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। যদিও পূর্ব পাকিস্তান সরকারের খাতা-কলমে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ জমি অধিগ্রহণের সময় ১৫টি আদিবাসী ও পাঁচটি বাঙালি গ্রাম উচ্ছেদ করা হয়েছিল। উচ্ছেদ অভিযানে প্রায় ১ হাজার ২০০ ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের কৃষিজমিসহ আড়াই হাজার বসতভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। পরে ১৯৬২ সালে আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে রংপুর সুগার মিল উল্লিখিত জমিতে আখ চাষের অধিকার পায়।
বাংলাদেশের চিনিকলগুলোয় সরাসরি ১৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়। আর আখ চাষের ওপর নির্ভর করে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচ লাখ চাষীসহ প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা। কৃষিভিত্তিক চিনি শিল্পকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ এলাকায় রাস্তাঘাট, বিদ্যুেকন্দ্র, ব্যাংক, হাটবাজার, অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। চিনির উপজাত চিটা গুড়, আখের ছোবড়া ইত্যাদি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেও বিভিন্ন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে বহু কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। যেমন আখের ছোবড়া কাগজ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করায় এ অঞ্চলে পাকশীতে নর্থ বেঙ্গল কাগজকলটি তৈরি হয়েছিল। যদিও পরে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে কলটি বন্ধ করে দেয়া হয়। আখ থেকে চিটা গুড় উৎপাদন হয় বলে চিটা গুড় তৈরি করেও অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে।
বাংলাদেশের বর্তমান চাহিদার (১৪ লাখ টন) প্রায় ২০% উৎপাদন করে রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো এবং বাকি ৮০% চাহিদা মেটানোর জন্য নির্ভর করতে হয় আমদানি করা রিফাইন চিনির ওপর। বাংলাদেশের মোট জমির প্রায় ১.৫% জমি ব্যবহূত হয় আখ চাষের জন্য। ১৫টি মিলের প্রতি বছর ০.২১ মিলিয়ন টন চিনি উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও ০.১০ মিলিয়ন টন উৎপাদন হয়। অর্থাৎ সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন হয়। চিনি উৎপাদন কম হওয়ার অনেক কারণের মধ্যে রয়েছে আখের অভাব, আখের মান। আমাদের চিনিকলগুলো মাড়াই করার মতো পর্যাপ্ত আখ পায় না, যে কারণে বছরের একটা বড় সময়জুড়ে চিনিকলগুলো বন্ধ থাকে, যদিও বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন স্থির খরচ সারা বছরই বহন করতে হয় চিনিকলগুলোকে। অন্যদিকে মাড়াই করার জন্য যে আখ পাওয়া যায়, তা থেকে চিনি আহরণের পরিমাণ অনেক কম, যে কারণে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে যেমন ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিলের প্রতি টন আখ থেকে যে পরিমাণ চিনি আহরণ করা হয়, তার তুলনায় অনেক কম আহরণ করা হয় বাংলাদেশের চিনিকলগুলো থেকে। আখ চাষের জমি হ্রাস ও চিনিকলে আখ সরবরাহে কৃষকের অনীহার অনেক কারণের মধ্যে রয়েছে আখ লাগানোর পর পরিপক্ব হতে মোটামুটি এক বছর সময় লাগে। জমিতে শুধু আখ চাষের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ধান ও সবজি চাষ করলে চাষীর জন্য তা বেশি লাভজনক। ফলে দিন দিন জমিতে আখ চাষের পরিমাণ কমছে। চিনিকলের তুলনায় গুড় উৎপাদকের কাছে আখ বিক্রি লাভজনক হওয়ায় কৃষক প্রায় ক্ষেত্রে গুড় বিক্রেতার কাছে আখ বিক্রি করেন। চিনিকলের কাছ থেকে আখ চাষের জন্য ‘প্রয়োজনীয় সার/কীটনাশক/বীজ সংগ্রহ করতে হলে প্রায় ১১ শতাংশ সুদ প্রদান করতে হয়। এগুলো সময়মতো পর্যাপ্ত পাওয়া যায় না, বেশি দামে কিনতে হয় এবং অনেক সময় ওজনে কম দেয়া হয় বলে চাষীদের অভিযোগ রয়েছে (সর্বজনকথা, ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। এছাড়া সক্ষমতার চেয়ে কম চিনি উৎপাদনের কারণের মধ্যে রয়েছে একরপ্রতি আখের ফলন কম হওয়া, চিনি আহরণের অতি নিম্নহার, আখের জাত ও চাষাবাদের ব্যবস্থাপনাগত সংকট, আখ পরিবহনে সংকট, কারখানার ‘প্রসেস লস, কারখানার টেকনিক্যাল পারফরম্যান্সের সমস্যা। এসব কারণে চিনি উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। উৎপাদন খরচ বাড়ার আরো অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধের দায়, উপজাতের সর্বোচ্চ ব্যবহার না করা, দুর্নীতির কারণে বাড়তি খরচ, বিভিন্ন টেন্ডার ও কন্ট্রাক্ট প্রদানের বেলায় কমিশন নিয়ে কাজ প্রদান করা ইত্যাদি।
চিনি শিল্প বিকাশে স্থানীয় প্রতবিন্ধকতার বাইরেও বিশ্বায়নের এ পৃথিবীতে উদার র্অথনৈতিক নীতি গ্রহণও কিছু নতুন সংকটের সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চনিকিলগুলোর ওপর। ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত বিএসএফাইসি কর্তৃক এককভাবে চিনি উৎপাদন ও আমদানি করে দেশব্যাপী বিস্তৃত বিপণন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নির্ধারিত দরে সুষ্ঠু বিপণনের মাধ্যমে ভোক্তাসাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণ করে এসেছে সরকার। ২০০২ সালে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চিনি আমদানি অবাধ করা হয় (বিএসএফআইসি, ২০১৪)। বেসরকারি পর্যায়ে আমদানিকারকরা সাদা চিনি আমদানি করে বাজারজাত শুরু করে। পরে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধিত চিনি উৎপাদনের জন্য সরকারের নিবন্ধিত ছয়টি সুগার রিফাইনারি ২০০৪ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে আসে। এর মধ্যে চালু আছে পাঁচটি এবং এ পাঁচটি বেসরকারি রিফাইনারি প্রতি বছর উৎপাদন করতে পারে প্রায় ৩২ লাখ টন চিনি (বিএসএফআইসি, ২০১৪)। দেশের চাহিদার সঙ্গে স্থানীয় জোগানের পার্থক্য থাকলে আমদানি ছাড়া দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। চিনির স্থানীয় চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে সবসময়ই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। তবে এ আমদানি কখন কার দ্বারা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, তা ‘প্রভাবিত করেছে বর্তমান চিনিকলগুলোর সাফল্যের সম্ভাবনাকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ পুষ্টি কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী মাথাপিছু বার্ষিক চিনির চাহিদা ৮.৫ কেজি। সে হিসাবে বর্তমানে দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৪ লাখ টন বলে মনে করা হয় (বিএসএফআইসি, ২০১৪)। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চিনি উৎপাদন হয়েছে ৭৭ হাজার ৪৫০ টন। এবং ওই একই বছর চিনিকলগুলোয় চিনির প্রারম্ভিক মোট মজুদ ছিল ১.৮ লাখ টন (বিএসএফআইসি, ২০১৫)। অর্থাৎ স্থানীয় ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে মিলগুলো থেকে উৎপাদিত চিনির পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৬ লাখ টন। সাধারণভাবে হিসাব করলে দেশের চাহিদা মেটাতে আমদানি করার ‘প্রয়োজন ছিল ‘প্রায় ১১.৪ লাখ টন। অথচ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে র সুগার আমদানির পরিমাণ ছিল ১৯.৫ লাখ টন (বিএসএফআইসি, ২০১৫)। অর্থাৎ ১৫টি মিল দেশীয় চাহিদা পূরণ করার পর যা অতিরিক্ত প্রয়োজন তার ৭০ শতাংশ (৮.১ লাখ টন) বেশি র সুগার আমদানি করা হয়। যখন এ অতিরিক্ত চিনি আমদানি হয়, তখন আমরা দেখি, মিলের চিনি অবিক্রীত পড়ে আছে, কিছু কিছু মিলে শ্রমিকের বেতন সময়মতো পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এবং কৃষকরা আখ চাষে নিরুত্সাহ হচ্ছে। এ সংকটের পেছনে রয়েছে সরকারের উদারীকরণ নীতি।
২০০২ সালে বেসরকারি উদ্যোগে চিনি আমদানি অনুমোদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চিনি শিল্প উদারীকরণ। ২০০৪ সাল থেকে রিফাইনারিগুলো উৎপাদনে আসার আগে নিবন্ধনপত্রে শর্ত রয়েছে, উৎপাদিত পণ্যের ৫০ শতাংশ রফতানি করা হবে (বিএসএফআইসি, ২০১৪)। কিন্তু এ শর্ত প্রতিপালিত হচ্ছে না। উপরন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত র সুগার আমদানি করার সময় মূলত দুটি যুক্তি দেয়া হয়— ১. বেসরকারি রিফাইনারিগুলো বাড়তি র সুগার আমদানি করে দেশে রিফাইন করে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। ২. বেসরকারি রিফাইনারিগুলো এ বাড়তি মজুদ করা চিনি প্রয়োজনের সময় বাজারে ছেড়ে চিনির মূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু দেখা গেছে, এ প্রাইভেট রিফাইনারিগুলো বিদেশে তো রফতানি করছেই না, বরং স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেশের ১৫টি চিনিকলে উৎপাদিত চিনির বাজারের কাছে হুমকিস্বরূপ আবির্ভূত হচ্ছে এবং দেশী চিনিকলগুলোর অবিক্রীত চিনির মজুদ ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে (সর্বজনকথা, ফেব্রুয়ারি ২০১৬)।
উদারীকরণের ফলে আরো যে বিষয়টি দৃশ্যমান হচ্ছে তা হলো, দিন দিন আখ চাষে ব্যবহূত জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। প্রতি বছর লোকসানের শিকার হয়ে রাষ্ট্রীয় মিলগুলো কৃষকদের আখ চাষে উত্সাহিত করতে পারছে না। ২০০৩-০৪ অর্থবছরের আগে আখ চাষকৃত জমির পরিমাণ কিছুটা হলেও স্থির ছিল। কিন্তু ২০০৩-০৪-এর পর থেকে জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। এবং লক্ষ করলে দেখা যাবে, আখ চাষের আওতাধীন মিলের জমি ২০০৩-০৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৫-১৬তে এসে ‘প্রায় ৩৫% হ্রাস পেয়েছে (বিএসএফআইসি, ২০১৫)। বেসরকারি খাতে চিনি আমদানির ওপর নির্ভরতা যত বাড়ছে, দেশীয় চিনি বিদেশী চিনির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাজার হারাচ্ছ। দেশীয় মিলগুলোর পক্ষে কৃষকদের আখ চাষে উত্সাহিত করাও তত বেশি কঠিন হয়ে উঠছে। এছাড়া অন্যান্য ফসল উৎপাদন লাভজনক হওয়ায় আখ চাষে কৃষক যথষ্টে প্রণোদনা পাচ্ছে না।
উত্তরবঙ্গে শিল্পায়নের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে দুটি ইপিজেড রয়েছে। নীলফামারীতে উত্তরা ইপিজেড ও বঈশ্বরদীতে ঈশ্বরদী ইপিজেড। উত্তরা ইপিজেডে ২০১৬-১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী মোট ২৩ হাজার ৩১২ জন শ্রমিক কাজ করছে। ঈশ্বরদী ইপিজেডে ২০১৬-১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী ৮১৮৫ জন শ্রমিক কাজ করে। এছাড়া সরকার বিভিন্ন জায়গায় স্পেশাল ইকোনমিক জোন করার পরিকল্পনা করছে। এ ধরনের নতুন উদ্যোগ যত নেয়া হবে, তত আখ চাষের জমির ওপর চাপ পড়বে। এরই মধ্যে আখ চাষের জমি যে হারে হ্রাস পেয়েছে, তা চিনি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ইপিজেড বা স্পেশাল ইকোনমিক জোন করা হলে যে ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে বা উঠছে, তাতে শ্রমিকদের অনেক দূর থেকে এসে কাজ করতে হয় প্রতিদিন। কিন্তু চিনি শিল্পের বেলায় সে রকম নয়। আখচাষীরা নিজেদের এলাকায় থেকেই আখ উৎপাদন ছাড়াও আরো অন্যান্য কাজ করে যেতে পারে জীবিকা নির্বাহের জন্য। তাদের বছরে একটি নির্ধারিত মৌসুমে আখ পরিবহন করে মিলে নিয়ে যেতে হয়। এ কারণে মিলে সপ্তাহব্যাপী কাজ করার চেয়ে অনেক চাষী নিজস্ব আখক্ষেতে কাজে বেশি আগ্রহী। কাজেই শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আখ চাষের জমি ব্যবহার করে অন্যান্য শিল্প-কারখানা নির্মাণের আগে ভেবে দেখতে হবে, কৃষক কী চায়, কী ধরনের জীবিকা চায়। এরই মধ্যে রূপপুরে যে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে, তাতে আখের জমি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাই উত্তরবঙ্গ শিল্পায়নের পরিকল্পনার সময় মনে রাখতে হবে, যে চিনি শিল্পকে কেন্দ্র করে এ বিশাল অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, তা যেন কৃষকদের জীবিকা থেকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে বরং তাদের সুবিধার্থে শিল্পের বিকাশ ঘটে।
এ বছর অক্টোবরে উত্তরবঙ্গে গিয়েছিলাম। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, আখ চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও কৃষক প্রতি বছর আখ চাষ করে যাচ্ছে। চিনিকলের প্রতি দায় ও ভালোবাসার কারণে প্রতি বছরই এ অর্থনৈতিক ক্ষতি সত্ত্বেও তারা আখ চাষ করে যাচ্ছে। একদিকে চিনিকল কর্তৃপক্ষের যেমন দায় রয়েছে, কৃষকদের এ দায় ও আবেগের মূল্য দেয়া এবং এ আবেগকে জিম্মি করে বছরের পর বছর তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও আখ চাষে বাধ্য করা থেকে বিরত থাকা। অন্যদিকে পরিকল্পনাবিদদেরও দায় রয়েছে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চিনি শিল্পের ভূমিকাকে সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করে কৃষকের যেন ক্ষতি না হয়, সেদিকে মনোযোগ দিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা। ভারতের সীমান্তবেষ্টিত হওয়ায়, রেল যোগাযোগের সুবিধা থাকায়, তিনটি স্থলবন্দর থাকায় এবং শ্রমিকের সহজপ্রাপ্যতা থাকায় উত্তরবঙ্গে শিল্পায়নের অনেক সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে গিয়ে চিনি শিল্প যেন হুমকির মুখে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চিনিকলগুলো আখের বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। আখ উৎপাদন বাড়লে এবং চিনিকলগুলোর সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারলে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে এ অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা আংশিক হলেও মেটানো সম্ভব হতে পারে। এ বিষয়গুলোকে পরিকল্পনায় আনলে এ দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণকে কেন্দ্র করে অভিবাসন যেমন ঠেকানো যাবে, তেমনি শিল্পায়নের পরিকল্পনাও জনগণবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব হবে।
লেখক: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আলোকচিত্রী: কে কে নয়ন





