তুলনামূলক বিচারে পৃথিবীর প্রায় সব জাতিই সম্পদশালী। ক্রমবিকাশমান বুদ্ধিমত্তাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু এ বুদ্ধিমত্তাকে লাগাতার বস্তুগত রসদ জুগিয়ে গেছে মাটির ওপরের ও নিচের সম্পদ। আমরা জীবনের প্রত্যেক স্তরে প্রকৃতি থেকে আহরিত কোনো না কোনো সম্পদ ব্যবহার করে টিকে আছি। পূর্ব থেকে পশ্চিম সবখানেই মানুষ তার সৃষ্টিশীলতা, বুদ্ধি ও সম্পদ ব্যবহার করেছে উন্নত জীবনলাভের আকাঙ্ক্ষায়। প্রতিনিয়ত ছেড়ে গেছে তার পূর্বসূরিদের। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এ আলোচনা দেশের উত্তরাঞ্চলের মাটির নিচের সেসব সম্পদ নিয়ে, যা আমাদের রসদ জুগিয়েছে অবকাঠামো, বিদু্যুত্সহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রস্তুত করতে, যা আমাদের আমদানি কমিয়ে স্বনির্ভর করেছে। এনেছে ব্যক্তিগত সামাজিক জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য।

জন্মলগ্নের অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান চলছিল। এ দেশের উত্তরে মোট আয়তনের প্রায় ২০ ভাগ টারশিয়ারি যুগের (৬৬ মিলিয়ন বছর আগে থেকে ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন বছর আগ পর্যন্ত) পাললিক শিলা, প্লাইস্টোসিন যুগের (২ দশমিক ৬ মিলিয়ন বছর আগে থেকে ১১ হাজার ৭০০ বছর আগ পর্যন্ত) পলল ও বাকি ৮০ ভাগ হলোসিন (১১ হাজার ৭০০ বছর আগে থেকে এখন পর্যন্ত) যুগের অসংহত বালি, পলি, কাদার তৈরি। সুনির্দিষ্ট এ ভূপ্রাকৃতিক আয়তন ও বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত মাটির নিচের খনিজ সম্পদের তালিকাটি লম্বা নয়। তবে যা আছে তার যথাযথ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের আমদানিনির্ভরশীলতা অনেক কমবে এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা মেটানোর পর রফতানির মাধ্যমে আয় করা যাবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। যেমন কাচবালির কথাই ধরা যাক।

প্রাচীন পৃথিবীতে মানুষ খেয়াল করেছিল, বালির মধ্যে বজ্রপাতের ফলে প্রচণ্ড তাপে বালি গলে টিউব আকৃতির এক ধরনের কাচ তৈরি হয়। এর নাম ফুলগুরাইট। কিন্তু মানুষের কাচ তৈরি করার প্রথম নজির দেখা যায় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ায়। বস্তুত কাচ তৈরিতে ব্যবহার হয় বালি, চুনাপাথর ও সোডিয়াম কার্বোনেট। এসব ১ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলিয়ে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে কাচ তৈরি করা হয়। আমাদের দেশে যে কাচ তৈরি হচ্ছে, তা বেশ উন্নত মানের ও রফতানিও হয়। এসব কাচের মূল কাঁচামালের (কাচবালি) একটা বিরাট অংশ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেই সংগ্রহ করা হয়। আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় আছে প্রায় ১১ কোটি টন কাঁচবালির মজুদ।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, হবিগঞ্জের তেলিপাড়া ও শাহজিবাজার, সিলেটের লালখান ও লক্ষাছড়া, জামালপুরের বালিজুরি, দিনাজপুরের মধ্যপাড়া ও বড়পুকুরিয়ায় আছে প্রায় ১১ কোটি টন কাচবালি, যেখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলের কাচ তৈরির জন্য উপযুক্ত ৮০ দশমিক ৭০ থেকে ৯৪ দশমিক ১০ শতাংশ সিলিকন ডাই-অক্সাইড আছে। দৈনন্দিন জীবনে কাচসামগ্রী ব্যবহার খুবই পরিবেশবান্ধব এবং এটি শতভাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। এ প্রসঙ্গে বলা চলে, প্লাস্টিক আমাদের আধুনিক জীবন অনেক সহজলভ্য করে দিলেও প্লাস্টিকের কারণে পরিবেশদূষণ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। সে কারণে যেখানে সম্ভব প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচের সামগ্রী ব্যবহার উত্তম। এর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমে দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও বেকার সমস্যা অনেক কমে যাবে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বলা হতো, যে দেশ জ্বালানিতে যত স্বনির্ভর, সে দেশ তত উন্নত। কথাটি বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রযুক্তি, আমদানি, রফতানি, নৌপথ, রেলপথের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে। তথাপি নিজস্ব জ্বালানির মজুদ থাকা তথা জ্বালানি নিরাপত্তা একটা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানিতে আমাদের দেশ স্বনির্ভর, এ কথা বলা যাবে না। কিন্তু দেশের গ্যাসসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চল এখনো শিল্প, গার্হস্থ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সড়ক পরিবহনে বিরাট সহায়ক। পাশাপাশি দেশের উত্তরাঞ্চলে আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কয়লার মজুদ। ১৯৫৯-৯৭ সাল পর্যন্ত আবিষ্কৃত দেশের পাঁচটি কয়লা খনি যথাক্রমে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার খালাসপীর, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দীঘিপাড়ায় আছে প্রায় তিন বিলিয়ন টন কয়লা।

কয়লার পাশাপাশি আমাদের আছে পিট কয়লার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মজুদ। রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা এলাকায় চলনবিলে, মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওড়ের চাতলাবিল, মাদারীপুরের বাঘিয়া ও চান্দাবিল, খুলনার কোলা, কিশোরগঞ্জের নিকলী ও সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ৩৮ কোটি টন পিট কয়লা পাওয়া গেছে। সুদীর্ঘকাল আগে থেকে এসব অঞ্চলের মানুষ মাটির কয়েক ফুট গভীরে চাষাবাদ, পুকুর খনন করতে গিয়ে পিট কয়লা পেয়ে যেত। সংগ্রহের পর শুকিয়ে রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এর বাইরে ইটের ভাটায়, কল-কারখানায় বয়লারে তাপ উৎপাদনের জন্য পিটের ব্যবহার আছে। পিটের সুবিধা হলো এর প্রজ্বলনক্ষমতা বেশ ভালো ও সংরক্ষণ করা যায়। গবেষকদের মতে, স্থানীয় পিট কয়লার প্রতি কেজিতে ছয়-সাত হাজার বিটিইউ শক্তি পাওয়া যায়। কোনো কোনো গবেষকের মতে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের পরিবর্তে দেশীয় পিট কয়লা ব্যবহার করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে দেশের ক্রমহ্রাসমান গ্যাসসম্পদের সাশ্রয় করা সম্ভব।

আবিষ্কৃত পিট ও কয়লার ১০ ভাগও যদি পরিবেশ বাঁচিয়ে উত্তোলন করা যায় এবং কোনো ধরনের দূষণ তৈরি না করে ব্যবহার করা যায়, তাহলে আমদানি না করেও বাংলাদেশ ১৮-২০ বছর তার সব প্রয়োজন মেটাতে পারবে। টঘঋঈঈ ও ওচঈঈ-এর মতে, প্রতি মেগাজুল তাপ উৎপাদনে পিট ও কয়লার কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের পরিমাণ যথাক্রমে ১০৬ ও ৯৬ গ্রাম। অর্থাৎ পিট কয়লার চেয়ে বেশি কার্বন নির্গমন করে। তবে পিট উত্তোলন কয়লার মতো পরিবেশের জন্য অতটা ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কয়লার কোনো নিরাপদ উত্তোলন ও ব্যবহার পদ্ধতি নেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে কয়লা ছিল মানবজাতির বন্ধু। জেমস ওয়াটের কাছে মানবজাতি কৃতজ্ঞ। কারণ তার আবিষ্কৃত স্টিম ইঞ্জিন পরবর্তী ১৫০ বছরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এ স্টিম ইঞ্জিনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত জীবাশ্ম জ্বালানি যথা— কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পরিবহনে তেলের যথেচ্ছ ব্যবহারে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে পৃথিবীর বহু জায়গায় ঝড়, খরা, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, অতিবৃষ্টিপাত হচ্ছে। বেড়ে গেছে সমুদ্রের উচ্চতা ও পানির অম্লতা। সমুদ্র পৃথিবীতে মানুষের খাদ্য, বিশেষ করে আমিষের একটা বড় অংশের জোগান দেয়। সমুদ্রের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার ফলে এর নিজস্ব বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি অম্লতা বৃদ্ধির কারণে ধ্বংস হচ্ছে শামুক, ঝিনুক, কোরাল। সব মিলে কার্বনঘটিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অবকাঠামো, অর্থনীতি, খাদ্য উৎপাদন। বেড়েছে ক্যান্সারসহ বহু রোগ। ফলে কয়লা এ শতাব্দীতে এসে খনিজ সম্পদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ নিরাপদ ব্যবহারের প্রযুক্তি হাতে না আসা পর্যন্ত উত্তোলন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

&dquote;&dquote;

কোন রাষ্ট্রের মৌলিক অবকাঠামোর মধ্যে রাস্তা, সেতু, ভবন উল্লেখযোগ্য। এসব জাতীয় অবকাঠামো নির্মাণের প্রধান উপাদান সিমেন্ট, বালি, কঙ্কর ও ইস্পাত। সিমেন্ট ও ইস্পাত উৎপাদনে ব্যাপকভাবে চুনাপাথরের ব্যবহার আছে। দেশের সুনামগঞ্জ জেলার বাগলিবাজার, লালঘাট, টাকের হাটে প্রায় ৩১ মিলিয়ন ও জয়পুরহাটের পাহাড়পুরে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন টন চুনাপাথর পাওয়া গেছে। কয়েকবার চেষ্টার পর জয়পুরহাটের চুনাপাথর মাটির অধিক গভীরতায় (৪৯৫-৫১৭ মিটার) থাকায় উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয় না বিধায় খনিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার হলে এ চুনাপাথর দেশের সিমেন্ট শিল্পে কাঁচামাল আমদানি কমিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।

অবকাঠামো নির্মাণের আরেক উপাদান পাথর, নুড়ি, সুড়কির প্রয়োজন মেটানো যায় কঠিন শিলা ব্যবহার করে। দেশের উত্তরাঞ্চলে রয়েছে গ্রানোডায়োরাইট, কোয়ার্টজ ডায়োরাইট, নাইস, সিস্ট কঠিন শিলার বিশাল মজুদ। দিনাজপুর জেলার মধ্যপাড়ায় মাটির ১৩২-১৬০ মিটার গভীরতায় ১৭২ মিলিয়ন টন কঠিন শিলার মজুদ আছে, যার ৭২ মিলিয়ন টন উত্তোলনযোগ্য। আবার লালমনিরহাটের ডালিয়া, চাপানি, কালিগঞ্জ, পাটগ্রাম, দহগ্রাম, আঙ্গরপোতা, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া, ভজনপুর, বোয়ালমারী, সিলেট জেলার জৈন্তাপুর ও ভোলাগঞ্জে আছে এক কোটি ঘনমিটার নুড়িপাথরের বিশাল মজুদ, যা মূলত হিমালয় পর্বতমালার হিমবাহ প্রবাহিত বিপুল পরিমাণ জলরাশির সঙ্গে চলে আসা নুড়িপাথর ও নদীবাহিত বিভিন্ন উপাদান নদীর তলদেশে সঞ্চিত হয়ে সৃষ্টি করেছে। এর বাইরেও চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের টেকনাফের সমভূমি অঞ্চলের তিনটি জায়গায় ও উখিয়া উপজেলার ইনানিতে কঠিন শিলার মজুদ আছে। এসব অঞ্চলে অনেকেই এসব কঠিন শিলা নির্মাণকাজে ব্যবহার করছেন। তবে পার্বত্য অঞ্চলে অধিক হারে কঠিন শিলা উত্তোলনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা আছে।

অবকাঠামো নির্মাণের আরেক উপাদান নির্মাণ বালির বিরাট উত্স দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর তলদেশে জমে থাকা বালি, যা মাঝারি থেকে মোটা দানার কোয়ার্টজ সমন্বয়ে গঠিত। ভাটির দেশ হওয়ায় প্রতি বছর প্রায় দুই বিলিয়ন টন বালি, পলি পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, সুরমা, কুশিয়ারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এসব বালি-পলির একটা বিশাল অংশই নির্মাণকাজের উপযুক্ত উত্কৃষ্ট মানের বালি, যার মজুদ শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল চীনামাটি। এছাড়া কাগজ, রাবার, রঙ, প্রসাধনী তৈরিতে রয়েছে চীনামাটির ব্যবহার। চীনারা প্রথম মাটির পাত্র ও ঘরের বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরিতে এ মাটি ব্যবহার করত বলে এ মাটির নামকরণ হয় চীনামাটি। এর মধ্যে আছে ৪৬ ভাগ বালি, ৪০ ভাগ অ্যালুমিনা, ১৪ ভাগ পানি। উচ্চতাপে আগুনে পোড়ালে চীনামাটি সাদা রঙ ধারণ করে মসৃণ ও চকচকে হয়ে যায়। এ কারণে অতীতকাল থেকেই কাপ, প্লেট, গ্লাস তৈরিতে চীনামাটি ব্যবহার হয়ে আসছে। আমাদের দেশে দিনাজপুরের মধ্যপাড়া, বড়পুকুরিয়া, দীঘিপাড়া, নওগাঁ জেলার পত্নীতলা, নেত্রকোনা জেলার বিজয়পুর ও লালপুর, শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ীতে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন টন চীনামাটির সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের চীনামাটির বিশুদ্ধতা কম, আবার ভূপৃষ্ঠের গভীর থেকে উত্তোলন ব্যয়বহুল। ফলে মোটামুটি কম গভীরতার চীনামাটির সঙ্গে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত উচ্চমানের চীনামাটি মিশিয়ে দেশের সিরামিক শিল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে।

&dquote;&dquote;উল্লিখিত খনিজ সম্পদের বাইরে দেশের উত্তর-পশ্চিমে বিভিন্ন খনি অনুসন্ধানের সময় বিভিন্ন রকমের ধাতু— তামা, সিসা, লোহা ও দস্তার আকরিক যেমন চ্যালকোপারাইট, বোর্নাইট, চ্যালকোসাইট, কোভেলাইন, গ্যালেনা ও স্ফালারাইট পাওয়া গেছে; যা বিশোধন করা হলে উল্লিখিত অতিপ্রয়োজনীয় মৌলিক পদার্থগুলো পাওয়া যাবে।

খনিজ পদার্থের আরেকটি মজুদ অবহেলিত অবস্থায় আছে কক্সবাজারের নাজিরহাট থেকে টেকনাফ সমুদ্রসৈকতের বালিতে। ১৯৬০ সালে প্রথম কক্সবাজারে এ খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। তারপর আণবিক শক্তি কমিশন গবেষণা শুরু করে এবং সৈকতের বালিতে খনিজ আকরিক যেমন জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, রুটাইল পাওয়া যায়; যার পরিমাণ ৪৪ লাখ টন। বিশোধন করার পর এখান থেকে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন খনিজ আকরিক সংগ্রহ ও ব্যবহার করা সম্ভব। এমনকি এসব আকরিক রফতানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করাও সম্ভব। আণবিক শক্তি কমিশনের বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে আহরণযোগ্য সাড়ে ১৭ লাখ টন আকরিকের বর্তমান বাজারমূল্য ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

খনিজ সম্পদ কেবল থাকলেই হয় না। এর যথাযথ ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানা জরুরি। আমাদের দেশে এ-যাবত্কালে খনিজ সম্পদ আহরণ সম্পর্কিত যেসব উদ্যোগ দেখা গেছে, তার বেশির ভাগই বিদেশী কোম্পানির সাহায্যে। তাদের সম্পদের বেশির ভাগের মালিকানা দিয়ে সেসব চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের এসব মহামূল্যবান সম্পদ দেশের স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না। কিংবা করা গেলেও তার দাম পড়বে অনেক বেশি। ক্ষেত্রবিশেষে হবে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিন গুণ। ফলে দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে খনিজ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষে এ-বিষয়ক পড়াশোনা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও সচেতনতা বৃদ্ধি ভীষণ জরুরি। তার সঙ্গে জরুরি সেসব খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তিবিদ, প্রতিষ্ঠান ও যন্ত্রপাতি নির্মাণ কিংবা সংগ্রহ করা। নিয়মিত এসব কার্যক্রম পরিচালনা করে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তিবিদদের মাধ্যমে দেশের সম্পদ আহরণ করা হলে তখনই খনিজ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

লেখক: গবেষক