গঠনশৈলী ও বিন্যস্ততার দিক থেকে বাংলাদেশ বিস্ময়কর। এখানে নদী সমভূমি, চরভূমি, গড়, টিলা, পাহাড় যেমন আছে, তেমনি আছে বরেন্দ্রভূমি। এই বরেন্দ্র এমন এক প্রাচীন ভূগোল, যেখানে দুনিয়ার আদিবসতি ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। চলতি লেখাটি বরেন্দ্র জনপদের আদিবাসী জনগণের ভূমি যন্ত্রণা ও অর্থনীতির টুকরো ইশারা নিয়ে। কারণ তীব্র ভূমি যন্ত্রণায় এ অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের অর্থনীতির বিকাশ কিংবা জাতীয় অর্থনীতিতে বরেন্দ্রর আদিবাসীদের অবদান বারবার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আছে। এ কথা কোনোভাবে অস্বীকার করার উপায় নেই, বরেন্দ্রভূমির আদিবাসী জনগণের মূল সংকট ভূমি। অথচ এখানকার অর্থনীতির নাভিমূলই হচ্ছে জমিন। ভূমিহীনতার গবেষণা নথি
অভিজিৎ রায় ও অন্যরা (২০০৭) বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের ওপর পরিচালিত শিক্ষা ও ভূমিবিষয়ক বেশকিছু প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, সমতল এলাকার আদিবাসীরা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে সমতল এলাকার বিভিন্ন জেলায় বসবাস, সংখ্যালঘিষ্ঠতা এবং নানা শোষণ ও নির্যাতনের জাতাকলে পিষ্ট হয়ে এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছেন। নিজের জমির রেকর্ড রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রভাবশালীদের নজরে পড়ে ওই জমি জবরদস্তি দখল হচ্ছে এবং অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে জালিয়াতি করে অনেকে তাদের জমি দখল করেছে। আর এভাবে জমির মালিকানা থেকে দিন দিন আদিবাসীদের নাম মুছে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় আখতার (২০০৪) জানিয়েছেন, বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহালী, পাহান, রবিদাস, পাহাড়ি, সিং, রাজোয়ার আদিবাসীরা ক্রমান্বয়ে ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাঁওতাল, রাজবংশী, মাহালী, কোচ আদিবাসীদের ভেতর পরিচালিত এক সমীক্ষায় কামাল (২০০০) জানিয়েছেন, অধিকাংশ আদিবাসীই নিজস্ব ভূমি হারিয়েছে। প্রায় ৪২ শতাংশের কোনো জমি ও বসতভিটা নেই। কামাল (২০০১) রাজশাহী অঞ্চলের আদিবাসীদের ভেতর আরেক সমীক্ষায় দেখিয়েছেন, প্রায় ৪২ দশমিক ৭ ভাগ আদিবাসী ভূমিহীন ও ৫৩ দশমিক ৬ ভাগ ক্ষেতমজুর।
উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের প্রতিনিয়ত নিজস্ব ভূমির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা প্রসঙ্গে মানিক (১৯৯৮) লিখেছেন, এটা ধারণা করা অসঙ্গত হবে না যে, বাংলাদেশের আদিবাসীরাই বিশ্বের সর্বাধিক নিপীড়িত সম্প্রদায়। আদিবাসীদের মধ্যে ভূমিহীনের সংখ্যা শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ। কোনো আদিবাসীকে সাহাজি বলে সম্বোধন করলে সে খুব খুশি হয়। সাহাজি বলতে স্থানীয়ভাবে ধনবান ব্যক্তি বোঝায়। তারপর একসময় তার সহায়-সম্পদ কেড়ে নেয়। আদিবাসীরা তা টের পায় না। আদিবাসীদের জমি বিনা রেজিস্ট্রিতে একশ্রেণীর দখলদার মানুষ জবরদখল করে ভোগ করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক এসে উত্তরাঞ্চলের আদিবাসীদের জমিজমা সব দখল করে নিয়েছে। তাদের হাতে আদিবাসীরা প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। দেশের কৃষক ও স্বাধীনতা আন্দোলনসহ সব জনগণতান্ত্রিক আন্দোলনে আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি ও বিবেচনা করা হয় না কখনই। এমনকি উত্তরবঙ্গের আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোও আজ ভূমি ও স্বীকৃতিহীন এক দুঃসময় পাড়ি দিচ্ছে। পার্থ ও হোসেন (২০০৯) একটি বইয়ে উত্তরবঙ্গের ৬৯ জন আদিবাসী পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার বিবরণ দিয়েছেন, যেখানে গরিষ্ঠভাগই উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের প্রধান সমস্যা হিসেবে ভূমি সমস্যাকে দেখিয়েছেন।
আলম (২০০৬) উত্তরবঙ্গের সাঁওতালদের ভূমিহীনতা প্রসঙ্গে বলেছেন, ৯০ শতাংশ সাঁওতালের আগে নিজেদের কৃষিজমি ছিল এবং তারা নিজের জমিতেই কৃষিকাজ করত। তাদের মধ্যে বর্তমানে ৮৫ শতাংশ লোকের কোনো জমি নেই। সাঁওতালদের ভূমিহীনতা প্রসঙ্গে জাহান (২০০৮) জানিয়েছেন, বাঙালি কর্তৃক সাঁওতালদের জমি জোরপূর্বক দখল, জাল দলিল তৈরি, জমি হারানো, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, সন্ত্রাস ইত্যাদি বিষয় বাঙালি-সাঁওতাল সম্পর্কের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করেছে। দ্রং (১৯৯৭) তার দিনাজপুর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, দিনাজপুর জেলার মহেশপুরে এসে এখানকার আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলেও জানতে পারলাম, এখানের আদিবাসীদেরও প্রধান সমস্যা জমি। সাঁওতালি ভাষায় দুই অর্থ ১২। সাঁওতাল হয়তো ১২ একর বা দুই একর জমি বিক্রি করেছে। কিন্তু কথার মারপ্যাঁচে সে জমির পরিমাণ হয়ে গেছে ১২ একর। এভাবে দুই একর বা ১২ একর জমি ১২ একর হয়ে যায় বাংলায়। এ থেকে সুযোগ নেয় কিছু টাউট-বাটপার ও খারাপ লোক। তারা আদিবাসী নয়। কামাল ও অন্যরা (২০০৩) জানিয়েছেন, সাঁওতাল সমাজে ভূমিই হলো প্রদান সম্পদ। ১৯৮০ দশকের শুরুতে বাংলাদেশ বন বিভাগ দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে প্রায় দেড় হাজার একর ভূমি দখল করে, যে ভূমির প্রায় ৯০ শতাংশ মালিকানা সাঁওতাল ও ১০ শতাংশ বাঙালিদের। সাঁওতালদের ভূমি দখলের জন্য বাঙালি ও বন বিভাগকে দায়ী করে কামাল ও বানু (২০০৩) জানান, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালি ও বন বিভাগের মাধ্যমেই আদিবাসী সাঁওতালদের অধিকাংশ ভূমি দখল হয়ে থাকে। উত্তরবঙ্গের সব আদিবাসীর জীবনই আজ ভূমিবিরোধ ও ভূসম্পদকেন্দ্রিক চূড়ান্ত সংঘর্ষের প্রান্তসীমায় টলছে। বিশ্বাস (২০০৫) রাজবংশী আদিবাসীদের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে বলেছেন, বাংলাদেশের রাজবংশীরা অধিকাংশই ভূমিহীন কৃষক ও অল্প জমির মালিক। গোমেজ (১৯৮৮) এক সমীক্ষায় দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চািঞ্চলের পাহাড়িয়া আদিবাসীদের প্রায় ৬২ শতাংশ ভূমিহীন। আলাপের এ পর্যায়ে আমরা সমসাময়িককালের কয়েকটি রক্তমাখা ভূমি আন্দোলনের প্রসঙ্গ টানছি।
রক্তে রাঙা কুশদহ
২০০৮ সালে বাংলাদেশের দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ৯ নং কুশদহ ইউনিয়নের খালিফপুর (ঝিমালী) গ্রামের সরকার টুডু (৫৯) ও জাতভবানীপুর-পাটুপপাড়া গ্রামের সোম হাঁসদা (৫৬)— এ দুজন নিরীহ সাঁওতাল কৃষককে হত্যা করে স্থানীয় প্রভাবশালী বাঙালিরা খালের পানিতে মরদেহ ডুবিয়ে রেখেছিল। পানিতে ডোবা পচা মরদেহ ভেসে ওঠার পর যখন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ বিষয়টি সবার নজরে আনে, তখনো এ অধিপতি রাষ্ট্রকে বলতে শোনা গেল, ...মদ-হাঁড়িয়া খেয়ে টাল সামলাতে না পেরে রাতের অন্ধকারে পানিতে ডুবে মরেছে...। অধিপতি কাঠামোর এ বক্তব্য আমাদের কাছে নতুন কোনো কিছু নয়। কারণ প্রায় ৫০০ বছর ধরে তা আমরা শুনে আসছি। হত্যার কারণও সেই একই। আদিবাসী সাঁওতালদের জন্মমাটি দখল করে সাঁওতালদের ভূমি উদ্বাস্তু করা। জানা যায়, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার রহিমাপুর গ্রামের আবুল হোসেন, নজরুল মিয়া মেম্বার, কচুয়া গ্রামের মো. সেকেল মিয়া ও মারসৈনিক গ্রামের একরামুল হক দীর্ঘদিন থেকেই স্থানীয় আদিবাসীদের কৃষিজমি ও বসতভূমি জবরদখল করার জন্য বলপ্রয়োগ করে আসছে। সরকার টুডুদের ১৯ একর ৪ শতক নিজস্ব জমি জোরপূর্বক দখলের প্রক্রিয়া হিসেবেই সরকার টুডু ও সোম হাঁসদাকে হত্যা করেছে ২০০৮ সনের জুনে প্রভাবশালী বাঙালিরা।
বিচিত্রা তির্কির ভূমিসংগ্রাম
সমতলের আদিবাসী জনগণের অধিকার আদায়ে সংগ্রামরত জাতীয় আদিবাসী পরিষদ তাদের ২০১৪ সালের ১৪ আগস্ট প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ...৪ আগস্ট ২০১৪ নিজ জমিতে আমন চারা রোপণের সময় বিচিত্রা তির্কিকে গোমস্তাপুর থানার জিনারপুর গ্রামের ভূমিদস্যু সন্ত্রাসী আফজাল হোসেন, মনিরুল ইসলাম, জেন্টু, বাদশা, মোজাম্মেল হক, আব্দুল হামিদ, হাজি আব্দুস সাত্তার, আবুল কালাম, মো. সালাম, রেজাউল করিম, শরিফ, আকবর আলী, শফিকুল আলম, এনায়েতপুর গ্রামের জিয়াউল করিম ও পার্শ্ববর্তী নিয়ামতপুর থানার চোরাসমেসপুর গ্রামের মো. আ. রাজ্জাক, আক্তার হোসেন, আবুল কাশেম, নবিউদ্দিনসহ আরো ১৫-২০ জন দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল বাহিনী আক্রমণ চালায় এবং বিচিত্রা তির্কিকে পিটিয়ে জখম করে এবং তার ওপর যৌন নির্যাতন চালায়। হামলার পর ভূমিদস্যুরা একজোড়া মহিষ, একটি পাওয়ার টিলার ও একটি শ্যালো মেশিন লুট করে। তিনি এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন। ঘটনার বহুদিন পেরিয়ে গেলেও মূল হোতাদের পুলিশ এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি। এখনো বিচিত্রার পরিবারকে ভূমিদস্যুরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ফলে তার পরিবার ও এলাকার আদিবাসীরা নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
আদিবাসী ভূমি যন্ত্রণার দহনে অর্থনীতি
দেশের উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী জনগণ সম্পূর্ণ কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। ভূমিহীন ও প্রান্তিক এ অঞ্চলের আদিবাসী নারী-পুরুষ বাঙালি মহাজনের জমিতে বর্গাচাষী ও কৃষিমজুর হিসেবে কাজ করে। দিনাজপুর দেশের এক উল্লেখযোগ্য ধান উৎপাদন এলাকা। দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, ঠাকুরগাও, নওগাঁ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, নাটোর, পাবনা, গাইবান্ধা জেলার কৃষি উৎপাদনে আদিবাসী নারী-পুরুষের অবদান অনস্বীকার্য। বরেন্দ্র অঞ্চলের আদিবাসী জনগণের ভূমি সংকট দূর না হলে জাতীয় অর্থনীতি বিকাশ বারবার রুদ্ধ হতে বাধ্য। কারণ ভূমিকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রথম শর্ত নিরাপদ মুক্ত ভূমির অধিকার।
বরেন্দ্রভূমির বিশেষ ঢেউ খেলানো জমিনের বৈশিষ্ট্যকে আদিকাল থেকে আদিবাসীরা আগলে থাকলেও বরেন্দ্রর বাইরে থেকে আসা বাঙালি জনগোষ্ঠী আজ নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে জোর করে এ চিরচেনা রূপ বদলে দিচ্ছে। প্রতিদিন বরেন্দ্রর ঢেউ খেলানো ধাপ ধাপ জমিন কেটে চুরমার করে সমান করে দেয়া হচ্ছে। সমানে তৈরি হচ্ছে বাণিজ্যিক মত্স্য খামার। বরেন্দ্রর প্রতিবেশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এখানকার প্রাকৃতিক খাঁড়ি-খালগুলো, বহমান নদীগুলো। এছাড়া বিশাল দীঘি ও পুকুর-জলাশয়। খাঁড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য সমানে বিনাশ হচ্ছে। খাঁড়ির ধারের কাশ, চিরু ও ঘাস-বন আজ বাণিজ্যিক পান চাষের বরজে ব্যবহার হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রতিবেশগত বৈশিষ্ট্যকে জোর করে বদলে ফেলার কারণেই এ অঞ্চলে দীর্ঘ খরা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। যন্ত্র দিয়ে টেনে মাটির তলার সব পানি বাণিজ্যিক ধান চাষে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে এ এলাকার অনেক গ্রাম আজ তীব্র পানি সংকটে ভুগছে। বিশেষত রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউনিয়ন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পোরশা, আড্ডা এসব অঞ্চল আজ দুঃসহ পানিহীন সময় পাড়ি দিচ্ছে। কেবল পানিহীনতার কারণে অনেক জমি অনাবাদি থাকছে, মানুষ জন্মমাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ বরেন্দ্রর আদিবাসীরা এ অঞ্চলেই একটা সময় কম পানিনির্ভর নানা শস্যদানা ফলিয়েছে। রাঁধুনীপাগল, জিরাশাইলের মতো খরারোধী ধান বুনেছে। ধান বাদেও আদিবাসীরা গম, ভুট্টা, কাউন, কোদা— এ রকম কত কিছু একসময় বুনেছে ঢেউ খেলানো জমিনে। ছিল নানা কাঁটাঝোপ, বুনোআলু আর কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যভাণ্ডার। কিন্তু তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের ধাক্কায় বরেন্দ্রর প্রতিবেশনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি চুরমার হয়ে যায়। মাটির তলার সব পানি টেনে তুলে বোরো মৌসুমে ধান আবাদের জন্য শুরু হয় এক নতুন কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প। তৈরি হয় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। গ্রামে গ্রামে তৈরি হয় বহুজাতিক সিনজেনটা, মনসান্টো আর বায়ার ক্রপ সায়েন্সের বিষ ও কৃষিপণ্য বিক্রির দোকান। কিন্তু কেউ বরেন্দ্রর প্রতিবেশনির্ভর আদিবাসী উৎপাদন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়নি। আদিবাসী গ্রামগুলোয় এখনো প্রবীণ তেঁতুল, বট আর সজিনা গাছ দেখতে পাওয়া যায়। কেবল মানুষ নয়, বরেন্দ্রর বুনোপ্রাণের টিকে থাকা ও সামগ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের জন্যই এমনতর বৈচিত্র্য সুরক্ষা জরুরি। কিন্তু চারধারের ভূমি দখলের গুণ্ডামি থেকে আদিবাসীরা বরেন্দ্রর নিজস্ব ভৌগোলিক অর্থনীতির বিকাশ মজবুত করতে পারেনি। বারবার লড়াই করেছে।
তেভাগা থেকে শুরু করে সিনজেনটাবিরোধী আন্দোলন অবধি এ বরেন্দ্র অঞ্চলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের বরেন্দ্রর কৃষিজমি ঘিরে উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার এক অনন্যসংগ্রাম শুরু হয়েছিল। তেভাগার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল দেশজুড়ে। জমিন থেকে জমিনে। সেই উত্তাপ এখনো আছে। ২০১০ সালে বহুজাতিক সিনজেনটা কোম্পানির হাইব্রিড সবল জাতের টমেটো বীজ কিনে প্রতারিত হওয়া বরেন্দ্রর কৃষকরা গড়ে তোলেন এক ন্যায্য আন্দোলন। বহুজাতিক বিনাশী বীজের কবল থেকে বরেন্দ্রর মাটিকে মুক্ত রাখার সংগ্রাম। বরেন্দ্রর আদিবাসী জনগণ ইতিহাস থেকে ইতিহাসে সবসময় বরেন্দ্রর মাটি, জল ও প্রতিবেশ সুরক্ষায় জান দিয়ে লড়েছে। আদিবাসী সংগ্রামে বরেন্দ্রর মেহনতি বাঙালি নিম্নবর্গও শামিল থেকেছে সমসময়। বরেন্দ্রর কৃষি অর্থনীতি বিকাশে এখানকার আদি ভৌগোলিক অর্থনীতির ধারাকে বুঝতে হবে। একে স্বীকৃতি ও গুরুত্ব দিতে হবে। আর বরেন্দ্রর আদিবাসী জনগণের জমিজলার অধিকার সুরক্ষা করেই কেবল এ বিকাশ দুনিয়ার বুকে এক দীপ্ত উদাহরণ তৈরি করতে পারে। আম, লিচু, পেয়ারা, রেশম, লাক্ষা কেবল নয়, বরেন্দ্রর আদিবাসী জনগণের কৃষি অর্থনীতির বৈচিত্র্যময় ধারাকে যুক্ত করেই বরেন্দ্রর ভৌগোলিক অর্থনীতির পরিকল্পনা করতে হবে। শোনা যাচ্ছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাবুডাইংয়ে উন্নয়ন প্রকল্প হবে। এখানেই আদিবাসী কোলদের আদি বসবাস, কোল জনগণ পরম মমতায় এখনো এই একটুকরো বরেন্দ্রর আদি পরিবেশ ধরে রেখেছে। কোলদের উচ্ছেদ করে বা বরেন্দ্রর প্রতিবেশের সঙ্গে সাংর্ঘষিক কোনো উন্নয়ন মারদাঙ্গায় এই অনন্যবাস্তুসংস্থানকে বাংলাদেশ হারাতে চায় না। কোলদের পরামর্শ ও অংশগ্রহণেই বাবুডাইং বরেন্দ্রর এক অনন্যনজির হয়ে ওঠুক। রাষ্ট্রকে স্থানীয় প্রতিবেশ ও জনগণের এ ভৌগোলিক অর্থনীতির সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েই দেশের জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ চিন্তা করতে হবে।
লেখক: গবেষক





