বাংলাদেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। সবজি উৎপাদনে চতুর্থ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৭.১১। জিডিপিতে কৃষির ভূমিকা অনস্বীকার্য (শতকরা ১৪.৭৫) এবং এখনো বিশেষ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। যদিও ক্রমাগত নগরায়ণ ও শিল্পায়নে কৃষিজমির পরিমাণ শতকরা ০.৭৩ হারে কমছে। কৃষি শ্রমিক দিন দিন শহরমুখী হচ্ছে। প্রয়োজনের সময় কৃষির বিশেষ কাজে শ্রমিক পাওয়া একদিকে যেমন দুষ্কর হয়ে পড়ে, অন্যদিকে শ্রমিকস্বল্পতায় কৃষককে এক মণ ধানের দামেরও অধিক শ্রমিকপ্রতি মজুরির টাকা গুনতে হয়। এর পরও কৃষি উৎপাদন, বৃদ্ধি ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন অনেকের কাছে আশ্চর্যজনকই বটে। কৃষিবান্ধব সরকারের সময় উপযোগী নীতি, ফসলের উন্নত জাত এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে এবং রেখে যাচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ১৯৭৩ সালের তথ্যমতে, বাংলাদেশকে ২.৫ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয় ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালের প্রকট খাদ্য ঘাটতি মিটিয়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণের জন্য। এ সমস্যায় যাতে আর না পড়তে হয়, সেজন্য তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কৃষি, বীজ, সার ও সেচে বিশেষ ভর্তুকির ব্যবস্থা করেন এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ সবুজ চত্বরে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দিয়ে বলেন আধুনিক কৃষির প্রচলন করতে এবং গ্রামে কাজ করতে।

উচ্চফলনশীল ধানের জাত ষাটের দশকে বাংলাদেশে প্রচলন করা হয় এবং সত্তরের দশকের দিকে শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধিতে ও সঠিক সময় কাজগুলো করার জন্য কৃষিতে জমি চাষ, সেচ, পোকামাকড় দমন ও ধান কাটার পরবর্তী কাজগুলো যন্ত্রের মাধ্যমে করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যদিও সে সময় দক্ষ চালক, মেরামত ও বিক্রয়-পরবর্তী সেবার প্রচুর অভাব ছিল। দেশে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটে, যার ফলে চাষাবাদে ব্যবহূত শক্তির ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। সরকার তখন কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানি সহজতর করে, যা মান নিয়ন্ত্রণ কমিটি দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো। সরকার যন্ত্র আমদানির ওপর ধার্যকৃত শুল্ক এবং মান নিয়ন্ত্রণ বিধিনিষেধ উঠিয়ে দেয়, যার ফলে প্রচুর পাওয়ার টিলার, ডিজেল ইঞ্জিন ও মোটর আমদানি ঘটে। ১৯৯০-এর দশকে এ নীতিমালা পরিবর্তনের কারণে কৃষি যন্ত্রপাতি (সেচ পাম্প, ইঞ্জিন, পাওয়ার টিলার, স্প্রেয়ার, প্যাডেল ও ইঞ্জিনচালিত ধান, গম ও ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, ধান ভাঙানোর যন্ত্র, মুরগি ও গরু পালনের) ভিন্ন মাত্রা পায়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বিভিন্ন সেচ যন্ত্রের মাধ্যমে সেচ দিয়ে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে, যেখানে বাংলাদেশের শতকরা ৭০ ভাগ চাষযোগ্য জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের শতকরা ৯৭ ভাগ কৃষিজমির সেচ দেয়া হয় যন্ত্রের মাধ্যমে। বাংলাদেশে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প, পল্লি উন্নয়ন একাডেমি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কৃষি প্রকৌশলীরা কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে খাদ্যোৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তায় বিশেষ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

কৃষি যন্ত্রায়ণে বড় প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ ঘটে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে। ৪ এপ্রিল ২০১০ থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ির অধীনে ২৫% ভর্তুকিতে দক্ষ কৃষি প্রকৌশলীদের দ্বারা পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, শক্তিচালিত ধান মাড়াই ও ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, গুটি ইউরিয়া অ্যাপ্লিকেটর ও কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রের জনপ্রিয়করণ প্রকল্প চালু করা হয়। পরে ১৩ আগস্ট ২০১৩ সালে প্রকল্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ৩০% ভর্তুকিতে শ্রমিকের ঘাটতি পূরণের জন্য ধান রোপণ যন্ত্র (ট্রান্সপ্লান্টার), পাওয়ার টিলারচালিত বীজ বপন যন্ত্র, ধান কাটার রিপার ও মাড়াই যন্ত্র ও কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্র জনপ্রিয়করণের কাজ জোরদার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভর্তুকির পরিমাণ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সাল থেকে হাওড় ও নিচু এলাকার জন্য ৭০% এবং বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার জন্য ৫০% বৃদ্ধি করে উল্লিখিত যন্ত্রগুলোর জনপ্রিয় করণের কাজ চলছে। বর্তমান প্রকল্পটি জুন ২০১৯ সাল পর্যন্ত চলমান থাকবে। এ কৃষি যন্ত্রায়ণের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করছে মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা এবং সেই সঙ্গে বর্তমান কৃষিমন্ত্রীর শক্ত পদক্ষেপ।

এক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, কৃষিতে যন্ত্রায়ন ও কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় শতকরা ১৫ ভাগ, শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি পায় শতকরা প্রায় ২০ ভাগ, সার ও বীজের সাশ্রয় ঘটায় শতকরা প্রায় ২০ ভাগ এবং সময় ও শ্রম বাঁচায় শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ। বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ জমি এখন পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর দ্বারা চাষ করা হয়। আগাছা নিধন, কীটনাশক প্রয়োগ ও মাড়াই কার্যক্রম যথাক্রমে শতকরা ৬৫, ৮০ ও ৭০ ভাগ বিভিন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি যন্ত্রপাতি এবং এর খুচরা যন্ত্রাংশের একটি বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে, যার পরিমাণ যথাক্রমে ৯০৭ মিলিয়ন ও ৩০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ধান উৎপাদনে চারা রোপণ ও ধান কাটায় কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখনো উল্লেখযোগ্য হারে হয়নি, যা শতকরা ১ ভাগেরও কম। আমি আগেই লিখেছি, কৃষি শ্রমিকের পরিমাণ দিন দিন কমছে। বিশেষ করে ধানের চারা রোপণ ও ধান কাটার সময় মারাত্মক শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। সঠিক সময় ধান কাটতে না পারলে প্রচুর ধান অপচয়ের সম্ভাবনা থাকে। সঠিক সময়ে চারা লাগানো ও ফসলের অপচয় রোধে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চারা রোপণ ও ধান কাটা যন্ত্রের জনপ্রিয়করণের কাজ করে যাচ্ছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে শতকরা ৫০-৭০ ভাগ ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে যে সংখ্যায় যন্ত্রের ওপর এ ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি ও দাতা প্রতিষ্ঠানও কৃষি যন্ত্রায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। ইউএসএআইডির অর্থায়নে বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অ্যাপ্রোপ্রিয়েট স্কেল মেকানাইজেশন ইনোভেশন হাব কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্রের মাধ্যমে যদি ধানের চারা রোপণ করা হয়, তাহলে কৃষকের শতকরা ৫০ ভাগ চারা রোপণ খরচ বাঁচায়। রিপার ও কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্র দিয়ে ধান কাটা হলে সনাতন পদ্ধতির চেয়ে যথাক্রমে ৩৬ ও ৫৩ ভাগ খরচ বাঁচায়। সনাতন পদ্ধতিতে ধান কাটা হলে ধানের অপচয় হয় শতকরা ৬.৩৬ ভাগ। কিন্তু যন্ত্রের মাধ্যমে ধান কাটা হলে ধানের অপচয় হয় মাত্র শতকরা ১.২৭ ভাগেরও কম। তাছাড়া ধান কাটা-পরবর্তী ধান মাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি বা প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে ব্যবহূত না হওয়ায় শতকরা ১৪ ভাগের ওপরে ধানের অপচয় হচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধান শুকানো ও সংরক্ষণ করলে ধানের এ অপচয় ৮ ভাগে নামিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।

যেভাবে একদিকে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমছে, অন্যদিকে কৃষি শ্রমিক শহরমুখী হচ্ছে, সেক্ষেত্রে শুধু উন্নত জাত ও সার ব্যবহার করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। সেজন্য ফসল উৎপাদন, ধান কাটা ও কর্তন-পরবর্তী কাজগুলোয় সঠিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে অপচয় রোধ করে বাংলাদেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি যন্ত্রায়ণের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে, যা বর্তমান সরকারের অগ্রগণ্য বিষয়ও বটে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে সবজি উৎপাদন, মত্স্য চাষ ও পশুপালনেও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়া দরকার। সেটা করতে হলে অবশ্যই প্রতিটি উপজেলায় দক্ষ কৃষি প্রকৌশলী এবং সেই সঙ্গে দক্ষ মেকানিকের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারের ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি জনপ্রিয়করণ প্রকল্প চলমান রেখে সেখানে ধান শুকানোর যন্ত্র ও ধান সংরক্ষণে উন্নত পদ্ধতির ব্যবহার এবং অন্যান্য ক্ষেত্র যেমন— সবজি উৎপাদন, মত্স্য চাষ ও পশুপালনে উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও অপচয় রোধ করে বাংলাদেশের জনগণের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে আমার ধারণা।

 

লেখক : অধ্যাপক, কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগ এবং

সহযোগী পরিচালক, অ্যাপ্রোপ্রিয়েট স্কেল মেকানাইজেশন ইনোভেশন হাব

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ