তিস্তা-ধরলা-করতোয়ার কোল বেয়ে যেমন বয়ে যায় জল, তেমনি বয়ে যায় সময়। কিন্তু ভাগ্য বদলায় না রংপুর বিভাগের মানুষের। ভাগ্য ভালো হওয়ার বদলে নেমে আসে দুর্ভাগ্য। নাহলে দেশে সর্বত্র যখন উন্নয়নের হাতছানি, জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৬ শতাংশের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে বর্তমান অর্থবছরে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। জাতীয়ভাবে দারিদ্র্য হার উচ্চতর দারিদ্র্য রেখা অনুযায়ী ২০১০ সালের ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ হতে বর্তমানে ২০১৬ সালে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য, খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন, ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির হার, ৩২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলার—  সবই বর্তমান সরকারের অর্জন। মানব উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের সাফল্য অনুকরণীয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির ক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা ও নিট এনরোলমেন্ট ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল হয়েছে ৭০ দশমিক ৯ বছর। মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোলের অধিকাংশ অর্জন সম্ভব হয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, জনগণের জীবনমানের সার্বিক উন্নয়ন, ২০২১ সালের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক মধ্যম আয়ের দেশ গড়ে তোলা এবং কালপরিক্রমায় ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল হতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে, তার সুফল সব অঞ্চলের জনগণ পাবে বলে আশা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ অক্টোবর ২০১৭-এ প্রকাশিত Priliminary Report on Household Income and Expenditure Survey 2016 অনুসারে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য হার যেখানে উচ্চ দারিদ্র্য রেখা অনুসারে ২৪ হয়েছে ৩ শতাংশ, সেখানে সব বিভাগের মধ্যে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্য হার সবচেয়ে বেশি ৪৭ হয়েছে ২ শতাংশ।

উল্লেখ্য, Household  Income and Expenditure Survey 2010  অনুযায়ী রংপুর বিভাগে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪২ হয়েছে ৩ শতাংশ। সারা দেশে যখন দারিদ্র্যের হার কমছে, তখন রংপুর বিভাগে এটি বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক বিষয়। আবার জেলাভিত্তিক দারিদ্র্যের হার মাথা গণনা অনুপাত ও উচ্চদারিদ্র্য রেখা অনুযায়ী কুড়িগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি ৭০ হয়েছে ৮ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ৬৩ হয়েছে ৭ শতাংশ।

দারিদ্র্য ব্যবধান দেশের অন্যান্য বিভাগের চেয়ে রংপুর বিভাগে বেশি। জাতীয় দারিদ্র্য ব্যবধান যেখানে ৫, সেখানে রংপুরে দারিদ্র্য ব্যবধান হার ১১ দশমিক ৯ অর্থাৎ দারিদ্র্যরেখা হতে দরিদ্ররা অনেক বেশি নিচে অবস্থান করে। এই দারিদ্র্য  ব্যবধান ২০১০ সালে রংপুর বিভাগে ছিল ১০ দশমিক ১ শতাংশ। আবার  দারিদ্র্য ব্যবধান বর্গ জাতীয়ভাবে যখন ১ দশমিক ৫, তখন সব বিভাগের চেয়ে রংপুরে এ হার সবচেয়ে বেশি ৪ দশমিক ২। এই দারিদ্র্য ব্যবধান ২০১০ সালে রংপুর বিভাগে ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। রংপুরে যদিও দরিদ্রের হার বেশি কিন্তু সোস্যাল সেফটি নেটের আওতায় পরিবারের সংখ্যা বেশি বরিশাল বিভাগে ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ। সেখানে রংপুরে এ হার ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। আবার স্যোসাল সেফটি নেটের পরিবারপ্রতি বার্ষিক প্রাপ্য টাকা রংপুরে সবচেয়ে কম। ঢাকা বিভাগে পরিবারপ্রতি বার্ষিক প্রাপ্য টাকা যেখানে ৪ হাজার ২০৪ দশমিক ৩ টাকা, সেখানে রংপুর বিভাগে প্রাপ্য টাকা ২ হাজার ৩৯৪ দশমিক ৪ টাকা।

বাংলাদেশের Accelerating Growth, Empowering Citizens শীর্ষক  সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০১৬-২০২০) Addressing the Challenge of Lagging Regions অনুচ্ছেদ-এ  সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের যে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন হয়েছে, তা বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ হয়নি। ফলে দুটো ভিন্ন ধরনের অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে— পশ্চাদপদ অঞ্চল ও অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। এ অঞ্চলগুলোকে বঞ্চিত এলাকা এবং অবঞ্চিত এলাকা হিসেবেও দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের ১৫ হতে ২০টি জেলা পশ্চাদপদ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এ আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার কৌশল এবং নীতি হলো-‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলসমূহের উন্নয়নের জন্য নিয়মিত এডিপির অতিরিক্ত একটি নির্দিষ্ট শতাংশিক হারে গ্রহণযোগ্য এডিপির বরাদ্দ দেয়া’। তাই রংপুর অঞ্চলের জনগণ মনে করে রংপুর অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে এ বিভাগে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে বিনিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি উপযোগ অভিগম্যতা, সেবায় অভিগম্যতা বাড়াতে হবে। রংপুর বিভাগের প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন কয়লা সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে। বঞ্চিত এলাকায় বেশি পরিমাণ সরকারি ব্যয় করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো আদর্শ হওয়া উচিত। নিম্ন আয় ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য উৎপাদনশীল সম্পদের ওপর মালিকানা এবং আয়-বর্ধনমূলক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত।

পশ্চাত্পদ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির জন্য মূল হলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন। এর জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে রংপুর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। যোগাযোগ ও যাতায়াতের জন্য সময়ের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে।

রংপুর অঞ্চলে শিল্পায়নে বাধার অন্যতম কারণ হলো জ্বালানি সমস্যা। এখানে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উত্তরা ইপিজেডে বিদেশী বিনিয়োগকারী না আসার কারণ হলো গ্যাস সরবরাহ না থাকা। গ্যাস সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত ফার্নেস অয়েল ও বিদ্যুতে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।

রংপুর অঞ্চলে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত স্থাপন করা। এ অঞ্চলে বেসরকারি খাত বিনিয়োগে উত্সাহিত না হলে প্রথম দিকে সরকারি সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধাসহ ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা সুবিধা পান। রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা ও এডিপিতে বাজেট বরাদ্দ রাখা। রংপুর ওয়াসা গঠন করা ও এডিপিতে বাজেট বরাদ্দ রাখা।

পশ্চাত্পদতা দূরীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। এ অঞ্চলের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস করতে গুণগত শিক্ষার সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।

এক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন ও মেয়েদের  শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশল হিসেবে পশ্চাত্পদ অঞ্চলে টারশিয়ারি পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে উত্সাহিত করতে হবে। অধিকন্তু এ অঞ্চলে শিক্ষক ও চিকিত্সক প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। টারশিয়ারি পর্যায়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে রংপুর  বিভাগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র দুটি, নেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষার জন্য নেই মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেসব চরাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, সেখানে বিদ্যালয় স্থাপন করা প্রয়োজন

রংপুর বিভাগে আইটি পার্ক স্থাপন করতে হবে। আইটি পার্ক, আইসিটি সহায়তা, ইনকিউবেশন সেন্টার হলে শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অর্জন করতে পারবে বৈদেশিক মুদ্রা।

রংপুর অঞ্চলের শিল্পের বিকাশে শিল্প স্থাপনসংক্রান্ত ব্যাংক ঋণ সহজসাধ্য করা। ‘ইকুইটি’ ও ‘কোল্যাটারাল সিকিউরিটি’র পরিবর্তে আবেদনকারীর সামাজিক ব্যাকগ্রাউন্ড বা পটভূমি এবং প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই কিনা, তা বিবেচনায় ঋণ প্রদান করা।

প্রকল্প ও চলতি মূলধনের জন্য সুদের হার এক ডিজিট করা প্রয়োজনীয়। দ্রুত ঋণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া এবং অর্থ ছাড় করা। টিআইএন ও ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা এবং তা বাস্তবায়ন করা। ভ্যাটের পরিধি বিস্তৃত করা। এ অঞ্চলে বিনিয়োগ সহায়তা দিতে আলাদা শিল্পনীতি, করনীতি, ভ্যাট নীতি, শুল্কনীতি ও ঋণনীতি ঘোষণা করতে হবে। রংপুর অঞ্চলের শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ ও আইসিটির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ অঞ্চলের শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের জন্য শিল্প সংরক্ষণ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ওপর কাস্টমস শুল্ক কম ধরা। শিল্পের প্রাথমিক উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার। রংপুর অঞ্চলের শিল্পের ট্যাক্স হলিডের মেয়াদ ১০ বছর করা। শিল্পের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। এজন্য বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট সৃষ্টি করতে হবে। দুর্নীতি দূর করা। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পণ্যের উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, মান উন্নয়ন, মার্কেটিং পলিসি নির্ধারণ, বিজ্ঞাপন ও প্রচার ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। ট্রেডিংয়ে বিনিয়োগের পাশাপাশি শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

সময়ের সঙ্গে জিডিপিতে কৃষির অবদান সংকুচিত হচ্ছে, তথাপি কৃষি এখনো গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। পশ্চাত্পদ অঞ্চলে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, অকৃষি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। রংপুর অঞ্চলে অকৃষিমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানসমূহ/ এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, যেমন ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সরকারের গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি  সফল হয়। দরিদ্র উপজেলার কৃষকদের কৃষি ভর্তুকির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দরিদ্র উপজেলায় নিম্ন সুদের হারে বেশি পরিমাণে কৃষি ঋণ দেয়া প্রয়োজন। পশ্চাত্পদ অঞ্চলে বিআর-৩৩ এবং কাসাবা চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বাজারে ভ্যালু চেইনের মাধ্যমে ন্যায্য দাম পেতে তাদের মাছ ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য স্টোরেজ সুবিধার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

দেখা যায়, পশ্চাত্পদ অঞ্চলে রেমিট্যান্স প্রবাহ খুব কম। এজন্য এসব অঞ্চল থেকে শ্রমিক অভিবাসনের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। রেমিট্যান্সকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উত্সাহিত করতে হবে। রংপুর বিভাগ হতে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বেশিসংখ্যক লোক পাঠাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য গ্রহণ করতে হবে বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি ও ঋণ সহায়তা কর্মসূচি। আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষতা চাহিদা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পশ্চাত্পদ অঞ্চলে বিশেষ প্রযুক্তি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পশ্চাত্পদ অঞ্চলের সম্ভাব্য মাইগ্রেন্টদের সহায়তার জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা স্কিম পরিচালনা করতে হবে। পশ্চাত্পদ অঞ্চল হতে বেশি সংখ্যায় মাইগ্রেন্ট পাঠাতে বিশেষ নজর দিতে হবে। এসব অঞ্চলে বেসরকারি সহায়তা নিয়ে ফরেন ইমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য মাইগ্রেন্টদের লজিস্টিক সহায়তা ও কারিগরি পরামর্শ দেয়া যায়।

এ অঞ্চলের পরিবর্তনের লক্ষ্যে ডিজিটাল সুবিধা প্রাপ্তির জন্য ইন্টারনেট, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মডেম, রাউটার ইত্যাদির ভ্যাট কমানো প্রয়োজন। প্রাইভেট সফটওয়্যার পার্কের ট্যাক্স হলিডে ২০ বছর করা প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প তৈরিতে করহার শূন্য করা প্রয়োজন। ই-কমার্সের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার এবং যেসব সফটওয়্যার বাংলাদেশে তৈরি হয়, তা আমদানিতে ২৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ প্রয়োজন।

রংপুরবাসীর উন্নয়ন আন্দোলন দীর্ঘদিনের। বেসরকারি সংস্থা আরডিআরএস ২০১০ ও ২০১১ সালে ‘রংপুর বিভাগের জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ চাই’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে। ২৫ এপ্রিল ২০১২ সালে ঢাকার প্রেস ক্লাবে ‘বাজেটে রংপুর বিভাগের জন্য আলাদা বরাদ্দ চাই’ শীর্ষক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রধান অতিথি ছিলেন, সেসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, রংপুর  অঞ্চলের পাঁচজন মন্ত্রী ও ১৩ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন। অর্থমন্ত্রী বর্তমান বৈষম্য মেনে নিয়ে তা দূরীকরণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণের কথা বলেন এবং রংপুরে এসে বাজেট নিয়ে মতবিনিময়ের কথা বলেন। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য স্বাধীনতার ৪৬ বছরের মধ্যে কোনো অর্থমন্ত্রী উন্নয়ন বিষয়ে রংপুর বিভাগের জনপ্রতিনিধি, চেম্বারের নেতা, মিডিয়া, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য একবারও রংপুরে আসেননি। (শুধু অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংক, রংপুরের উদ্বোধন ও গত বছরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নীলফামারীতে শাইখ সিরাজের চ্যানেল আইয়ের একটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ ছাড়া)।  ২৪ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে রংপুর চেম্বার ভবনে  বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ‘বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন ও উত্তর পশ্চিম অঞ্চল’ শীর্ষক সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আঞ্চলিক দারিদ্র্যে রংপুর বিভাগের নাম নেই বলে তথ্য দেন। তিনি স্পষ্টত বলেন, বাংলাদেশের বিভাগগুলোর মধ্যে রংপুর বিভাগ সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। এত সব সেমিনার, আলোচনার পরও উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। বাজেটের মাধ্যমেই ‘বিশেষ বরাদ্দ’ হতে পারে এ উন্নয়ন পদক্ষেপের চালিকাশক্তি। বাংলাদেশে সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট গোল অর্জনে প্রয়োজন দ্রুত প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উন্নয়ন বৈষম্য হ্রাস, আয়বৈষম্য হ্রাস ও দারিদ্র্য দূরীকরণ। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উন্নয়ন বৈষম্যের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে রংপুর বিভাগের উন্নয়নে কোনো বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়নি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম ও দ্বিতীয় আর্থিক বছরের বাজেটে (২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮) রংপুর বিভাগের উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ছিল রংপুরবাসীর দাবী। কিন্তু সে দাবি পূরণ হয়নি।

রংপুরবাসীর উন্নয়নে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ।সংসদ সদস্যরা বিচ্ছিন্নভাবে তাদের নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রংপুর বিভাগের জন্য উন্নয়নের কোনো রোড ম্যাপ তৈরি করা হয়নি। তাই রংপুর বিভাগের জন্য প্রয়োজন জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন কর্মী, পেশাজীবী ও অন্যদের সমন্বয়ে একটি প্রেসার গ্রুপ তৈরি করা, যারা সম্মিলতভাবে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী ও নীতিনির্ধারণী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, প্রয়োজনে চাপ সৃষ্টি করে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার রংপুর বিভাগে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন পদক্ষেপ নিতে সরকারকে বাধ্য করবে।

 

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর