বিশ্বব্যাপী Non-navigational uses of International Watercourses বিষয়ে জাতিসংঘের International Law Commission প্রণীত চুক্তির খসড়া জাতিসংঘের ২১ মে ১৯৯৭ সাধারণ সভায় ১০৬ দেশের সম্মতি ও তিন দেশের আপত্তিতে গৃহীত হয়। বাংলাদেশ এতে সম্মতি দেয়, কিন্তু ভারত ও পাকিস্তান সরে থাকে (abstained), এবং চীন বিরোধিতা করে। কনভেনশনটির ৩৬ ধারা অনুযায়ী এটি একটি আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত করতে ৩৫টি দেশের ratification, acceptance, approval or accession প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশ সরকার এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে এ কনভেনশন স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু ভিয়েতনাম ২০১৪-এর ১৯ মেতে কনভেনশনটিতে accede করায় ৩৫টি দেশ হয়ে যায়, ফলে এর পরবর্তী ৯০তম দিনে ১৭ আগস্ট এটি আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদী তিস্তার উত্পত্তি ভারতের সিকিম রাজ্যের উত্তর প্রান্তে, হিমালয় পর্বতমালার পাহুনরি হিমবাহ থেকে। সিকিম রাজ্য দিয়ে প্রবাহের সময় এ নদী রাংপো ও রঞ্জিত নামের দুটি বড় উপনদীর সঙ্গে মিলিত হয়। তিস্তা নদী সমগ্র সিকিম উপত্যকার বৃষ্টি ও হিমবাহের পানি সংগ্রহ করে দার্জিলিং গ্যাংটক সড়কের ওপর নির্মিত এন্ডারসন সেতুর উজানে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। দার্জিলিং জেলার পাহাড়ি খাত ধরে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার চলার পর শিলিগুড়ি মালবাজার সড়কের করোনেশন সেতু ও রেল সেতু পার করে তিস্তা নদী সিভক শহরের কাছে সমতলে প্রবেশ করে। সিভক রেল সেতুর প্রায় ১৫ কিলোমিটার ভাটিতে গজলডোবার কাছে এর ওপর ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখান থেকে ১০ হাজার কিউসেক পানি বহনক্ষমতাসম্পন্ন খালের মাধ্যমে শিলিগুড়ি শহরের দক্ষিণ দিয়ে পশ্চিমে বিহারের দিকে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। গজলডোবা ব্যারেজের ২৫ কিলোমিটার ভাটিতে দোমোহনী রেল ও সড়ক সেতু অবস্থিত, যার ৪০ কিলোমিটার ভাটিতে তিস্তা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
তিস্তা নদীর অতীত নাম ত্রিস্রোতা ছিল বলে জানা যায়। রেনেলের ১৭৭৯ সালের ম্যাপে তিস্তার প্রথম স্রোতটি ধরলামুখী, দ্বিতীয়টি ঘাঘটমুখী এবং তৃতীয় ও মূল স্রোতটি দক্ষিণে বর্তমান আত্রাইমুখী পথে বইতে দেখা যায়। তবে অতীতে তিস্তা নদীর স্রোত মহানন্দা নদী ও করতোয়া নদীর পথেও যে প্রবাহিত হতো, তার প্রমাণ আছে। বর্তমানে মহানন্দা নদীর অববাহিকা তিস্তা নদী থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। পুনর্ভবা, আত্রাই ও করতোয়া নদীর অববাহিকা তিস্তার বন্যাপ্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির জোগান পায়। তিস্তা নদী দোমোহনী সেতুর উজানে এর বাম তীরে মূল ধরলা নদীর প্রবাহ গ্রহণ করে। দোমোহনী সেতুর ভাটিতে তিস্তার ডান তীরে জলপাইগুড়ি শহর অবস্থিত। জলপাইগুড়ি শহরের ভেতর দিয়ে আসা করলা নদীর প্রবাহ তিস্তা নদীর ডান তীরে পতিত হয়েছে। তিস্তা নদী নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার টেপা খড়িবাড়ীর কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে প্রবেশের আট কিলোমিটার ভাটিতে দোয়ানীর কাছে এর ওপর একটি ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ব্যারেজের মাধ্যমে তিস্তার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে সেচের জন্য প্রায় ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের উজানে বিভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার হয়ে যাওয়ার কারণে আমাদের নদীগুলো ক্রমে শুকিয়ে যাচ্ছে। ভারত তিস্তা নদীর ওপর গজলডোবার কাছে ১৯৮২ সালে ব্যারেজ নির্মাণ করে। এরপর তিস্তা থেকে মহানন্দা সংযোগ খাল ও মহানন্দা ডাহুক মেচি সংযোগ খালের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে তিস্তা নদীর সমুদয় তলানি প্রবাহ সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি করেছে, কিন্তু তিস্তা নদীর পানি ব্যবহার নিয়ে বিরোধ মীমাংসা এখনো হয়নি। তিস্তার প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ১৩০ কিলোমিটার বাংলাদেশে পড়ে। এর অববাহিকা সিকিমে সাত হাজার বর্গকিলোমিটার, পশ্চিমবঙ্গে তিন হাজার বর্গকিলোমিটার ও বাংলাদেশে ২১ হাজার বর্গকিলোমিটারের অধিক। সারা উত্তরবঙ্গের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে তিস্তা নদী বার্ষিক পুনর্ভরণের কাজটি করে, ও বন্যার সময় তিস্তা নদী সারা উত্তরবঙ্গকে প্লাবিত করে। তিস্তা একটি বন্যাপ্রবণ নদী। এর প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ১৩০ কিলোমিটার বাংলাদেশে পড়ে। এর অববাহিকা সিকিমে সাত হাজার বর্গকিলোমিটার, পশ্চিমবঙ্গে তিন হাজার বর্গকিলোমিটার ও বাংলাদেশে ২১ হাজার বর্গকিলোমিটারের অধিক। সারা উত্তরবঙ্গের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে তিস্তা নদী বার্ষিক পুনর্ভরণের কাজটি করে ও বন্যার সময় তিস্তা নদী সারা উত্তরবঙ্গকে ভাসায়। লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম যাওয়ার পথে তিস্তা নদীর ওপর কাউনিয়ায় একটি রেল ও সড়ক সেতু আছে।
ভারত তিস্তার পানি সরিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষতি করছে, কিন্তু করে যেতে পারবে না। মমতা তিস্তার পানি সরিয়ে নিয়ে মহানন্দা অববাহিকায় নিতে পারবে না। ভারত আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ভঙ্গ করে তিস্তার পানি সরিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষতি করে চলছে। মমতা কাউকে তোয়াক্কা না করে তিস্তার পানি মহানন্দা অববাহিকায় নিয়ে যাচ্ছে। ফলে গজলডোবার ভাটিতে দুই দেশের জনগণ, মাছ ও পশুপাখি ক্রমবর্ধমান ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আমরা সুপ্রতিবেশী সুলভ মন নিয়ে অনেক বছর সহ্য করেছি। মমতা বলেন, তিস্তার জল দিতে পারব না; বাংলাদেশ জলঢাকা, তোরসা, কালজানি, রাইডাক নদের জল নিক। তাহলে ওই নদগুলোর অববাহিকার আলিপুর দুয়ার আর কুচবিহার জেলার মানুষ-পশুপাখির কী হবে? মোদি আর উমা ভারতী মানস সংকোশ নদের জল খাল কেটে রাজস্থানে নিয়ে যেতে চান। তাহলে ওই নদগুলোর অববাহিকার বনগাইগাঁও আর ধুবড়ী জেলার মানুষ-পশুপাখির কী হবে? আমরা এক অববাহিকার মানুষের সারা বছরব্যাপী নদীর প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল জীবন ও ঐতিহাসিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার পক্ষে মোটেই নই।
ভারত গঙ্গার ওপর ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করায় ভাটিতে বাংলাদেশের গঙ্গা নদী শুকিয়ে গেছে। কর্ণাটক কাবেরী নদীর ওপর ড্যাম নির্মাণ করে পানি আটকে রাখায় তামিলনাড়ুর সমভূমি অঞ্চলের মানুষ পানি পাচ্ছে না, তাই বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে যেসব নদী একাধিক দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে, সেসব নদীর উজানে ড্যাম বা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলে ভাটির দেশ থেকে জোর আপত্তি জানানো হচ্ছে। জাতিসংঘের এ কনভেনশন কোনো দেশের পানি ব্যবহারের ফলে ভাটির বা অন্য দেশের যাতে ক্ষতি না হয়, সে উদ্দেশ্যে এর ধারা ৭.১ বলছে, ‘1. Watercourse States shall, in utilizing an international water course in their territories, take all appropriate measures to prevent the causing of significant harm to other watercourse States.’ কনভেনশন এ ধারাটি নদীর ঐতিহাসিক প্রবাহের ওপর সমগ্র অববাহিকার নির্ভরশীল মানুষের ঐতিহাসিক অধিকার স্থাপন করেছে। উল্লেখ্য, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন আলোচনায় নদীকে রক্ষা করার জন্য এর ন্যূনতম প্রবাহ অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়। তিস্তা নদীর ২০ শতাংশ এ ন্যূনতম প্রবাহ বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মত দেন, যা আসলে নদীকে মেরে ফেলার পক্ষেই যায়।
প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত একটি নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তার ঋতুভিত্তিক প্রবাহের ৮০ শতাংশ প্রবাহ রাখতেই হবে। নদীর প্রবাহের ২০ শতাংশের বেশি উত্তোলন করলে নদীতে প্রাণীর জীবন ও প্রজনন ব্যাহত হবে, নদী ক্রমে বালির তলায় হারিয়ে যাবে। তাই আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ১৯৯৭ উজানের দেশের হস্তক্ষেপে নদীর প্রবাহ ও ভাটির দেশের ক্ষতি সম্পর্কে বলছে, ‘7.2. Where significant harm nevertheless is caused to another watercourse State, the States whose use causes such harm shall, in the absence of agreement to such use, take all appropriate measures, having due regard for the provisions of articles 5 and 6, in consultation with the affected State, to eliminate or mitigate such harm and, where appropriate, to discuss the question of compensation.’
ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করার মাধ্যমে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও বাংলাদেশের মোহনায় যে ক্ষতি হয়েছে ও হচ্ছে, বাংলাদেশের অধিকার রয়েছে তার ক্ষতিপূরণ চাওয়ার। সিকিমে নির্মিত তিস্তার ড্যামগুলো বাংলাদেশের ক্ষতি বাড়িয়ে চলছে। উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর শীতকালীন প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে ফসল উৎপাদন কমেছে, নদীতে মাছ নেই, সেচ খরচ বেড়েছে এবং মোহনায় ইলিশ, চিংড়ি ও অন্যান্য মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে বিপর্যয় এনেছে এবং ভূমিজ ও জলজ অনেক প্রাণীর বসবাস এলাকা উজাড় হয়েছে। এসব ক্ষতি অর্থের হিসাবে ধরে ভারত বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে আসা দরকার। ভারত সবসময় বলে আসছে, ‘বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি করা হবে না’, কিন্তু ক্ষতি করা চলছে। তাছাড়া তিস্তা নদীর পানি সরিয়ে নেয়ার সপক্ষে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কিছু দালাল বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে তিস্তার অববাহিকা কম করে দেখানোর ষড়যন্ত্র করে চলছে।
ভারত অভিন্ন নদীগুলোর ওপর ড্যাম ও ব্যারেজই নির্মাণই শুধু নয়, সে আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যার ৩০টি খালের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর অববাহিকা থেকে বিপুল পরিমাণ জলরাশি পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের নদীগুলোর অববাহিকায় নিয়ে যাওয়া হবে। প্রকল্পটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ, যা বঙ্গীয় সমতলে ধ্বংসযজ্ঞ বয়ে আনবে। এ প্রকল্পের অধীনেই নির্মিত গজলডোবা ব্যারেজ ও তিস্তা মহানন্দা সংযোগ খালের মাধ্যমে ভারত তিস্তার শীতকালীন সমুদয় জলরাশি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ১৯৯৭ অনুযায়ী, ভারতের এসব প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং ভয়ানকভাবে ক্ষতিকর প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার সুযোগ আছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি যৌথ নদী কমিশন আছে, কিন্তু ভারতের আধিপত্যবাদিতার কারণে এ কমিশন একেবারেই অকার্যকর হয়ে আছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর প্রবাহ নায্যতার সঙ্গে ব্যবহারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার যাতে জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ কনভেনশন ১৯৯৭ স্বাক্ষর করে, সে উদ্দেশ্যে আমরা আন্দোলন করে চলছি।
ভারত গজলডোবার কাছে ব্যারেজ দিয়ে ও সেখান থেকে সংযোগ খাল কেটে তিস্তা নদীর পানি মহানন্দা ও বিহারের মেচি নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের এ কাজ তাদের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার অংশ, যার মাধ্যমে তারা বাংলার সমতলকে মরুভূমি করতে আর রাজস্থানের মরুভূমিকে সুজলা-সুফলা করতে চায়। তিস্তার পানি সরিয়ে নেয়ায় গজলডোবার ভাটিতে নদীতে কোনো প্রবাহ নেই। ফলে ভারতের জলপাইগুড়ি এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া জেলার পরিবেশ, অর্থনীতি ও জনজীবনে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ভারত ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে বাংলাদেশে গঙ্গা নদীর প্রবাহ আটকে দেয়ায় বাংলাদেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে যে ব্যাপক ক্ষতি হতে থাকে, তার প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী ১৬ মে ১৯৭৭ ফারাক্কা লং মার্চ করেন। ওই মার্চের ফলে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানি ব্যবহার চুক্তি করতে বাধ্য হয়। আমরা চাই, ডিসেম্বর ২০১৭-এর মধ্যে তিস্তার পানি দুই দেশের জনগণের নায্যতার সঙ্গে ব্যবহারের চুক্তি হোক। অন্যথায় আমরা ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দুই দেশের জনগণকে নিয়ে গজলডোবা লং মার্চের পরিকল্পনা করছি। এ লং মার্চে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ওপার থেকে যোগ দেবেন জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কুচবিহারের ক্ষতিগ্রস্ত ও হুমকিগ্রস্ত জনগণ।
লেখক: প্রকৌশলী; সাবেক মহাপরিচালক
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা





