বিশ্বের মোট আয়তনের ৩ ভাগ জল এবং ১ ভাগ স্থল। এই ৩ ভাগ পানির পরিমাণ ১৩৮৬ মিলিয়ন ঘনমিটার। বিশাল এই জলরাশির ৯৭ শতাংশই লবণাক্ত এবং ৩ ভাগ মিঠা পানি। এই মিঠা পানির অধিকাংশই অর্থাৎ দুই মেরু অঞ্চলে জমাটবদ্ধ বরফ হিসেবে সংরক্ষিত এবং অবশিষ্ট ১ শতাংশ ব্যবহার-উপযোগী পানি। এই ১ শতাংশ মিষ্টি পানি ভূ-উপরিস্থ, ভূগর্ভস্থ ও বৃষ্টির পানি— এ রকম একটি পানি চক্রের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পানির স্তর পুনর্ভরণ করে চলেছে। এই পুনর্ভরণ প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

১.  সূর্যতাপে বাষ্পীভবন এবং পরবর্তীতে মেঘ হয়ে বৃষ্টি রূপে পৃথিবীতে নেমে আসা,

২. ভূ-উপরিস্থ পাহাড়-পর্বত, সমভূমি, খাল-বিল, নদী-নালা, সাগর, মহাসাগরে সে পানি ধারণ করা,

৩. ভূপৃষ্ঠের পানি চুইয়ে ভূগর্ভস্থ জলাধারে সঞ্চয়ন ও ভূগর্ভস্থ জলাধারে পানির স্তরের পুনর্ভরণ।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। তিনটি প্রধান নদী অববাহিকা যথা— গঙ্গা-পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও মেঘনা উেসর সঙ্গে প্রায় ২৩০টি বিভিন্ন আকার-আয়তনের নদনদী এবং অসংখ্য হাওড়-বাঁওড়-বিল-খাল-ঝরনা-ছড়া প্রভৃতিকে নিয়ে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থা গঠিত। এই ২৩০টি নদীর মধ্যে ৫৭টি নদীর প্রবাহ বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত, চীন, নেপাল, মিয়ানমার ও ভুটানকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অনেকের হিসাবে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবাহিত নদনদীর সংখ্যা ২৩০ নয়, সাত শতাধিক। এক সুন্দরবন অঞ্চলেই রয়েছে ১৭০টি খাল ও নদী।

চারটি অববাহিকা ও সংশ্লিষ্ট নদীজাল বাংলাদেশের সারা বছরে ভূ-উপরিস্থ পানি প্রবাহের আধার। এই ভূ-উপরিস্থ পানির উত্স মোট দুটি, যথা— উজানের উত্স থেকে প্রবাহ এবং দেশের ভেতরের ও বাইরের ধরতি (catchment) এলাকার বৃষ্টিপাত। জাতীয় পানি পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার একটি প্রাথমিক হিসাব মতে দেখা যায় যে, সীমান্তের অপর প্রান্ত থেকে ১০১০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার জল প্রবাহ বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। তার সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে বছরে ২৩০০ মিলিমিটার গড় বৃষ্টিপাতের ফলে প্রাপ্ত পানি থেকে আরও অতিরিক্ত ৩৪০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার যুক্ত হয়। এই ১৩৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটারের ১৯০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার বায়ুমণ্ডলে উড়ে গেলে বাকি ১১৬০ বিলিয়ন কিউবিক মিটারের অংশবিশেষ ব্যবহারের পর বাকি সমুদয় পানি বঙ্গোপসাগর অভিমুখে প্রবহমান থাকে। এই বিপুল প্রবাহের ৮০% জুন থেকে অক্টোবর— এই পাঁচ মাসের মধ্যেই প্রবহমান থাকে। ভারত, নেপাল, ভুটান, তিব্বত ও বাংলাদেশের যে মোট ধরতি এলাকা, তার মাত্র ৭.৫ ভাগ বাংলাদেশে অবস্থিত। এই বিশাল ৯২.৫ ভাগ ধরতি এলাকার প্রায় ৯৪% পানি ৭.৫ ভাগ ভূখণ্ড বাংলাদেশের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়।

ভূগর্ভস্থ পানি ভূপৃষ্ঠের নিচে সঞ্চিত পানি সম্পদ যা প্রধানত ভূপৃষ্ঠের সঞ্চয়িত পানি নিয়ে গঠিত। এই পানি মৃত্তিকা ও তার রন্ধ্রে সঞ্চিত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির উপরের স্তরকে বলে water table। পৃথিবীর স্বাদু পানি সম্পদের প্রায় ৩০% আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। তবে আহরণযোগ্য সাধু পানির প্রায় ৯৭% আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। নদী-জলাশয়ে এই পানির পরিমাণ ১ শতাংশেরও কম। বাদবাকি ৬৯% হিমবাহ আকারে সঞ্চিত হয়ে আছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে পানিচক্রের একটি অন্যতম উপাদান ভূগর্ভস্থ পানি, যা ভূগর্ভস্থ জলস্তর নামে পরিচিত শিলাস্তরে সঞ্চিত থাকে। বৃষ্টির পানি ও ভূপৃষ্ঠ জলরাশি ভূপৃষ্ঠে অনুপ্রবেশ করে যখন ভূজলপৃষ্ঠে পৌঁছায়, তখন ভূ-অভ্যন্তরে এই পানিরাশির এক দীর্ঘ ও মন্থর যাত্রা শুরু হয়, যার গতি দিনে মাত্র কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ভূজলপৃষ্ঠের উপরের তলভাগকে অপরিপৃক্ত অঞ্চল (unsaturated zone) ও নিচের তলভাগকে পরিপৃক্ত অঞ্চল (saturated zone) বলা হয়। অপরিপৃক্ত অঞ্চলের মৃত্তিকা ও শিলা-পানির প্রধান প্রধান অপদ্রব্য পরিশোধন করে। পরিপৃক্ত অঞ্চলের শিলা ও মৃত্তিকা তাকে আরো বেশি পরিমাণে পরিশ্রুত ও বিশুদ্ধ করে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় পানি জীবাণু ও দূষণমুক্ত হয়। ভূগর্ভস্থ পানি সাধারণত একদিকে যেমন বিশুদ্ধতার দিক থেকে খুবই উত্তম মানের, অন্যদিকে রাসায়নিকভাবে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন।

বাংলাদেশে কম গভীরতায় ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যায়। প্লাবনভূমি অঞ্চলে সাম্প্রতিক নদীবাহিত অবক্ষেপের মাঝে ভূগর্ভস্থ জলস্তর গঠিত হয়েছে। উচ্চতর সোপানসমূহে যেমন, বরেন্দ্র ও মধুপুর গড় অঞ্চলে প্লাইস্টোসিন যুগের ডুপিটিলা বালু ভূগর্ভস্থ জলস্তর হিসেবে কাজ করে। পাহাড় অঞ্চলে প্লায়োসিন টিপাম বালু জলস্তরের জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই ভূজলপৃষ্ঠ, ভূপৃষ্ঠের খুব কাছে অবস্থান করে এবং বার্ষিক আগমন ও নির্গমন ধারায় ওঠানামা করে। সাম্প্রতিককালে সেচের জন্য ব্যাপক হারে উত্তোলনের কারণে বার্ষিক ওঠানামার পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ জলস্তরে পুনঃসঞ্চরণ প্রধানত বৃষ্টি ও বন্যার পানির আনুভূমিক অনুস বনের মাধ্যমে ঘটে থাকে। নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয় কাছাকাছি ভূগর্ভস্থ জলস্তরসমূহে স্থানীয়ভাবে পানি সরবরাহ করে। জল নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নলকূপের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নেয়া। নিম্নতর অবক্রমের (lower gradient) দিকে প্রবাহের মাধ্যমেও কিছু পানি নিষ্ক্রান্ত হয়। বর্ষা মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভূপৃষ্ঠের খুব কাছে উঠে আসে। আবার এপ্রিল-মে মাসে তা সবচেয়ে গভীরে নেমে যায়। ঢাকা শহর ও বরেন্দ্র এলাকা ছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলেই এই প্রবণতা এক রকম। পানি সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে বাংলাদেশে শুকনা মৌসুমে পানির চাহিদা প্রধানত ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।

বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানি উন্নয়নে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভূগর্ভস্থ পানিতে ব্যাপক আর্সেনিক দূষণ। আর্সেনিক দূষণ আবিষ্কৃত হওয়ার আগে গ্রামের ৯৭% মানুষ পানের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে এই পরিমাণ কমে ৮০%-এ দাঁড়িয়েছে। আর্সেনিক ছাড়াও লোহার উচ্চহার, উপকূলীয় অঞ্চলে উচ্চলবণাক্ততা, ম্যাঙ্গানিজের অত্যধিক তীব্রতা ইত্যাদি পানির গুণ নষ্ট করছে। মলমূত্রের কলিফর্মও একটা বড় সমস্যা, বিশেষ করে অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির জন্য। সেচের জন্য ব্যাপক উত্তোলনের দরুন শুকনা মৌসুমে ভূজলপৃষ্ঠ নিচে নেমে যাওয়াও একটি বিশেষ সমস্যা। ভূজলপৃষ্ঠ ৬ মিটারের নিচে নেমে গেলে সাধারণভাবে প্রচলিত হস্তচালিত নলকূপে পানি ওঠে না। তখন ভিন্নতর প্রযুক্তির আশ্রয় নিতে হয়। ভূজলপৃষ্ঠের অব্যাহত অবনমন কূপ খননের খরচও বাড়িয়ে তোলে। ভূজলপৃষ্ঠ নেমে যাওয়ার আরেকটি ক্ষতিকর দিক হচ্ছে ভূমি দেবে যাওয়া। ঢাকা শহরে এ অবস্থার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য পূর্বাভাস সত্ত্বেও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে বাংলাদেশে ভূমি অবনমনের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি। কলকারখানা ও পৌর বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণেও ঢাকার মতো বড় বড় শহরে ভূগর্ভস্থ পানির মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণয়নও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির জন্য একটি ঝুঁকি। [কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ এবং মো. আলমগীর হোসেন]

এদিকে ভূগর্ভস্থ স্তর থেকে ক্রমশ পানি উত্তোলিত হলেও পুনর্ভরণের পথ সুগম না হওয়ায় বর্ষার পানি কেবল গড়িয়েই চলেছে, বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে পানির নিম্নগামিতায়। ভূপৃষ্ঠ হতে ভূ-অভ্যন্তরে পানি প্রবেশের চ্যানেলগুলো ক্রমশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় সংকট আরো প্রকট হচ্ছে। কেননা বর্ষণ মৌসুমের পানি ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশের প্রধান চ্যানেল হচ্ছে ভূপৃষ্ঠস্থ জলাশয়; যা ক্রমশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় ভূ-অভ্যন্তরে পানির অনুপ্রবেশ মুখও বন্ধ হয়ে গেছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনা দেশের ভূ-প্রকৃতিতে যেমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে, তেমনি ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিয়েও সংশয় তৈরি হচ্ছে। পাঁচ দশক আগে বাংলাদেশের মানুষের সুপেয় পানির প্রধান উত্স ছিল ভূপৃষ্ঠ অর্থাৎ পুকুর, নদী-খাল, বৃষ্টি ও জমিয়ে রাখা পানি।

রাজশাহীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নিচে নেমেছে। তাদের মতে, এটি রোধ করার জন্য ব্যবহারকারীদের পানির অপচয় ও দূষণ রোধ করতে হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, ক্রমাগত পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি দ্রুতগতিতে উত্তর দিকে প্রবেশ করে পানি লবণাক্ত করে দিতে পারে। ফলে আগামী এক থেকে দেড় দশকে রাজধানী ও তার আশপাশে সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এক সময় খাবার পানি পাওয়া দুষ্কর হবে। পানির স্তর আরো নিচে নেমে গেলে ভূমিধসসহ নানা বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এ আশঙ্কা দূর করতে বিশেষজ্ঞরা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে উপরিভাগের পানি ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২ থেকে ৩ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভের পানির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা না হলে আগামী পাঁচ বছর পর আরো আশঙ্কাজনক হারে পানির স্তর নিচে নেমে যাবে। পাশাপাশি বাড়বে আর্সেনিকের আগ্রাসনও। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইড বাংলাদেশের এক জরিপে জানা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ সুপেয় পানির উত্স থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়া পানিতে আর্সেনিক দূষণের জন্য প্রায় ৩ কোটি মানুষ ঝুঁকিতে আছে।

ভূগর্ভস্থ পানির উপরোক্ত সংকট মোকাবিলায় প্রণীত পানি নীতির আলোকে পানি সম্পদ উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় জড়িত প্রতিষ্ঠানসমূহকে সমন্বয়ের মাধ্যমে একযোগে কাজ করতে হবে। পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়া আশির দশক হতে ভূগর্ভস্থ পানি সম্পদের স্বল্প খরচে উত্তোলন, পরিমিত ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে গবেষণা পরিচালনার মাধ্যমে বেশ কিছু যুগোপযোগী টেকসই মডেল উন্নয়ন করেছে। মডেলসমূহ ধারাবাহিকভাবে নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।     

পানি সম্পদ উন্নয়নে আরডিএর অভিজ্ঞতা

১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়া সুনামের সঙ্গে প্রায় তিন দশক ধরে পল্লীর দরিদ্র, নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের আর্থ-সামাজিক ও জীবন-জীবিকা উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের কৃষি উন্নয়নে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নিরন্তর গবেষণা করে পরিচালনা করে যাচ্ছে। এরই ফলে দেশের কৃষি তথা সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা কর্মকাণ্ড মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণের নিমিত্ত পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়ার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (CIWM) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলাদেশে পানি সম্পদ উন্নয়নের ওপর বিভিন্ন মডেল উদ্ভাবন করেছে; মডেলসমূহ নিম্নরূপ :

ভূগর্ভস্থ সেচ নালা       

কৃষিকাজে সেচ ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেচের সঠিক প্রয়োগের ওপর কৃষি উৎপাদন নির্ভরশীল। সেই লক্ষ্যে আশির দশকের পূর্বে সরকার গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ কার্য পদ্ধতি চালু করে। বাংলাদেশে  আশির দশকের পূর্বে স্থাপনকৃত একটি ২ কিউসেক (২ লাখ লিটার প্রতি ঘণ্টা) ক্ষমতাসম্পন্ন গভীর নলকূপের মাধ্যমে যেখানে মাত্র ৪০ একর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব ছিল। গভীর নলকূপের মাধ্যমে যাতে আরো অধিক সেচ এলাকা বৃদ্ধি করা যায়, সেই লক্ষ্যে ১৯৮০-৮৩ সময়কালে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়া FAO/UNDP অর্থায়নে Tubewell Command Area Development (TCAD) শীর্ষক একটি প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা করে। সেই গবেষণার ফসল ভূগর্ভস্থ সেচনালা পদ্ধতি প্রচলন শুরু হয়। সেখানে আরডিএ উদ্ভাবিত ভূগর্ভস্থ সেচ নালার মাধ্যমে বোরো মৌসুমে একই ক্ষমতাসম্পন্ন গভীর নলকূপ দ্বারা ১৬৬ একর জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এ প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে পানির অপচয় ৬০% থেকে ৫%-এ আনা সম্ভব হয়েছে, পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে।

কম খরচে গভীর নলকূপ ও বহুমুখী ব্যবহার  

দেশে প্রচলিত প্রযুক্তিতে ঘণ্টায় ২ লাখ লিটার পানি উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন নলকূপ স্থাপন করতে গভীরতা অনুযায়ী ব্যয় হয় ১৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। গভীর নলকূপ স্থাপনার ব্যয় কমানো সম্ভব না হলে গ্রামীণ জনসাধারণের জন্য গভীর নলকূপ কোনো সুফল বয়ে আনতে পারবে না। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে গভীর নলকূপ বসানোর খরচ কমানোর জন্য বর্তমানে একাডেমি নিজস্ব প্রযুক্তি এবং দেশীয় মালামাল ব্যবহার করে গভীরতা ও পানি উত্তোলন ক্ষমতা অনুযায়ী ০.৬০ লাখ থেকে ৫.২৫ লাখ টাকায় একটি গভীর নলকূপ বসাতে সক্ষম হয়েছে।

আমাদের দেশে সেচ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে শুধুমাত্র তিন মাস গভীর নলকূপ ব্যবহার হয়ে থাকে। একাডেমি এ গভীর নলকূপগুলোকে লাভজনক করার লক্ষ্যে এর বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে বছরব্যাপী ব্যবহার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। গভীর নলকূপের ব্যবহার কেবলমাত্র সেচের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পাশাপশি ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণ করে পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করে আসছে। এছাড়াও পানি বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের মাধ্যমে গভীর নলকূপগুলোর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে পানি সম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের অধিকতর সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একদিকে অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অপরদিকে তাদের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে।

পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট উদ্ভাবন : আর্থ-সামাজিক ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে আর্সেনিক ও আয়রনমুক্ত নিরাপদ পানি সরবরাহ মডেল

বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতির কারণে ভয়াবহ সমস্যার উদ্ভব হয়। এ সমস্যা মোকাবেলায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমির গবেষকবৃন্দ ১৯৯৮ সাল থেকে আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি সরবরাহের ওপর বিভিন্ন প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা করে দুটি পন্থা উদ্ভাবন করেছে : (১) ভূগর্ভস্থ পানি পরীক্ষাকরণের মাধ্যমে আর্সেনিকমুক্ত স্তর প্রাপ্তিসাপেক্ষে গভীর নলকূপ স্থাপন করে আর্সেনিকমুক্ত পানি উত্তোলন এবং (২) যেসব এলাকায় মাটির নিচে কোনো

আর্সেনিকমুক্ত পানির লেয়ারের সন্ধান পাওয়া যায় না, সেসব এলাকার জন্য স্বল্প ব্যয়ে পানি ফিল্ট্রেশন প্লান্ট স্থাপন করে আর্সেনিক ও আয়রনমুক্ত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। পানীয় জলের সমস্যা কবলিত এসব এলাকায় নিরাপদ পানি পাওয়ায় গ্রামের মানুষ শহরের ন্যায় সুবিধা ভোগ করার সুযোগ পেয়েছে এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বহুলাংশে লোপ পেয়েছে ফলে গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।

আরডিএ, বগুড়া  ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব এবং পশ্চিম তীরে এবং সেতুর উভয় পাশের  পুনর্বাসন গ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর জন্য আরডিএ, বগুড়া সাতটি গভীর নলকূপসহ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করে সেতু কর্তৃপক্ষ এবং পুনর্বাসন গ্রামে বাংলাদেশ তথা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানে পানি সরবরাহের শুভ সূচনা করে।

চাষাবাদে সেচের পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি সম্প্রসারণ

একাডেমি জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় চাষাবাদে সেচের পানি ও উৎপাদন উপকরণ সাশ্রয়ী AWD, RB ও SRI প্রযুক্তির প্রচলন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ভূগর্ভস্থ পানির নিম্নগামিতা রোধ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সর্বোপরি দারিদ্র্য বিমোচন সহায়ক ‘পানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বিস্তার এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা করে যাচ্ছে। এ প্রযুক্তি দেশের ৪০টি জেলার ২০০টি এলাকায় সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

কৃত্রিম উপায়ে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণে পুনঃসঞ্চয়ী কূপ পদ্ধতি

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর থেকে যে পরিমাণ পানি সংগ্রহ করা হয়, স্বাভাবিক উপায়ে সেটা পূরণ বা পুনঃসঞ্চিত হয় না। ফলে পানির স্তর নিচে নেমে বিভিন্ন রকম অসুবিধার সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হলো, ভূগর্ভে কৃত্রিম উপায়ে পানি সঞ্চিত করা। তাছাড়া শহরাঞ্চল, যেখানে মেটালিক এলাকা বেশি এবং ভূগর্ভে পানি প্রবেশের সুযোগ কম, সেসব এলাকায় বৃষ্টির পানি ছাদ হতে সংগ্রহ ও পরিশোধনপূর্বক ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে প্রবেশ করানো  প্রয়োজন। যেসব এলাকায় ভূগর্ভের পানির স্তর এবং ভূপৃষ্ঠের মাঝে একটি পুরু অপ্রবেশ্য স্তর থাকে, সেসব এলাকার জন্য এবং যেসব এলাকায় জলাশয় তৈরির মতো যথেষ্ট জায়গা নেই, সেসব এলাকায় ভূগর্ভে পানি সঞ্চয়ের জন্য পুনঃসঞ্চয়ী কূপ পদ্ধতিটি সবচেয়ে লাগসই উপায়। এই পদ্ধতিটি নলকূপ দিয়ে পানি তোলার পদ্ধতির মতোই। শুধুমাত্র নলকূপ দিয়ে পানি তোলার পরিবর্তে পানি ভূগর্ভে প্রবেশ করানো হবে। একাডেমি তার সুবৃহৎ অবকাঠামোসমূহের ছাদের পানি স্লো-স্যান্ড ফিল্টারের মাধ্যমে পরিশোধনপূর্বক কৃত্রিম উপায়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে পুনর্ভরণের গবেষণা পরিচালনা করছে। গবেষণায় প্রতীয়মান হয়, বৃষ্টিকালীন সময়ে গবেষণা পরিচালিত স্থানের পর্যবেক্ষণ কূপের পানির স্তর ১ কিমি দূরে স্থাপিত পর্যবেক্ষণ কূপের তুলনায় ১ মিটার ঊর্ধ্বগামিত হচ্ছে। ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের জলাবদ্ধতা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের নিম্নগামিতা নিরসনে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মডেলটি সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

শিল্পকারখানায় পানি সরবরাহের একাডেমি মডেল

যমুনা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতার কারণে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে ইউরিয়া সার উৎপাদন ব্যাহত হতো। সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন সার উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখার স্বার্থে আরডিএ, বগুড়ার মাধ্যমে তত্কালীন সরকার অর্থাৎ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সাতটি গভীর নলকূপসহ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের (অটোমেটিক) মাধ্যমে ঘণ্টায় ৭২০ মে. টন পানি পরিশোধনপূর্বক ইউরিয়া সার উৎপাদন ও খাবার পানির গ্রহণযোগ্য মানে সরবরাহের মাধ্যমে সারা বছর ইউরিয়া সার উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। উক্ত কাজ বিদেশীদের মাধ্যমে ৭২ কোটি টাকায় করার কথা থাকলেও আরডিএ, বগুড়া দেশীয় প্রযুক্তিতে মাত্র ৩.২৫ কোটি টাকায় সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে।

কর্ণফুলী ইপিজেড, চট্টগ্রামে শিল্পকারখানাসমূহের পানির তীব্র সংকট নিরসনে সরকার বৈদেশিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীর পানি পরিশোধনপূর্বক ইপিজেড এলাকায় সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আরডিএ, বগুড়া মাত্র ১৯.৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে Reverse Osmosis প্রক্রিয়ায় কর্ণফুলীর লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে দৈনিক ২০ লাখ গ্যালন খাবার ও কারখানায় ব্যবহার উপযোগী মানে ২০০৮ সাল হতে কর্ণফুলী ইপিজেড, চট্টগ্রাম এলাকায় সরবরাহ করে যাচ্ছে। প্রকল্পটি বর্তমানে সাফল্যজনকভাবে চলমান রয়েছে।

সাভার, ঢাকায় দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী হিসেবে স্থানান্তরের ব্যবস্থা গৃহীত হয়। উক্ত ট্যানারি শিল্পনগরীতে পানি সরবরাহের (ট্যানারি ও খাবার পানি গুণগত মানে) দায়িত্ব আরডিএ, বগুড়াকে  প্রদান করা হয়। আরডিএ, বগুড়া উক্ত ট্যানারি শিল্পনগরীতে ধলেশ্বরী নদী/ভূগর্ভস্থ পানি Pressurized পদ্ধতিতে (দেশে সর্বপ্রথম Overhead Tank ছাড়া) ঘণ্টায় ১ লাখ লিটার পানি (ট্যানারি ও খাবার পানি গুণগত মানে) সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্প আরডিএর প্রকৌশলীদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করায় প্রাক্কলিত ব্যয়ের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ব্যয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।

এছাড়াও আরডিএ, বগুড়া HYSAWA-Fund-এর অর্থায়নে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার ৮১টি ইউনিয়নে আরডিএ উদ্ভাবিত গ্রামীণ নিরাপদ পানি সরবরাহ মডেল সম্প্রসারণের কাজ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। অপরদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) অনুরোধে আরডিএ বড়পুকুরিয়া কয়লানির্ভর তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আশপাশের ছয়টি গ্রামে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে সেচ ও নিরাপদ পানি সরবরাহ করে যাচ্ছে।

সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আরডিএ মডেল

আরডিএ উদ্ভাবিত স্বল্প ব্যয়ের গভীর নলকূপ এবং ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন— বঙ্গবন্ধু সেতু, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ এনজিও (ব্র্যাক, প্রশিকা) ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ২৪৫টি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে প্রযুক্তি হস্তান্তর-সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

পানি সম্পদ উন্নয়নে স্বীকৃতি

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের স্বীকৃতি স্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়াকে স্বাধীনতা পদক ২০০৪-এ ভূষিত করে। এছাড়াও অতি সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন বিষয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার ১৪১৫ (স্বর্ণপদক) ও বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার ১৪১৭ (রৌপ্যপদক) অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে Afro-Asia Rural Development Organization (AARDO) কর্তৃক পল্লী উন্নয়ন ও কৃষি উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে বাংলাদেশে প্রথম AARDO পল্লী উন্নয়ন পদক অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

লেখক: মহাপরিচালক, আরডিএ, বগুড়া