বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, ছোট-বড় অনেক নদী এখানে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এর বুকে হাওড়সহ বিলের সংখ্যা কম নয়। এ দেশে চলনবিল, বিল ডাকাতিয়া, আড়িয়ল বিল, সিলেটের হাওড়সহ অনেক বিল-ঝিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় সর্বত্র। ভারতীয় উপমহাদেশে চলনবিল একটি সুপরিচিত নাম। চলনবিল ছিল বাংলাদেশের অন্যতম বিল, যা এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পলি জমে, সড়ক নির্মাণ, মানুষের দখল, উজানে বাঁধ নির্মাণ ইত্যাদি কারণে চলনবিল তার জৌলুস হারিয়েছে। বর্তমানে বিলটি মৃতপ্রায়। চলনবিলের এ পরিবর্তন এখানকার জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
অতি প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন সময় বঙ্গীয় ভূখণ্ডে ভূকম্পনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন চ্যুতি ও অতিবন্যার ফলে নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে হ্রদ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর অশ্বক্ষুরাকৃতির হ্রদ দেখতে পাওয়া যায়। এর অন্যতম উদাহরণ হলো বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্গত চলনবিল। চলনবিল মূলত বেশকিছু ছোট-বড় হ্রদসদৃশ বিলের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহৎ নিম্নভূমি, যার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলো পানি নিষ্কাশনের নালা হিসেবে কাজ করেছে এবং নদীবাহিত পলল দ্বারা এ অঞ্চলের ভূমি উর্বর হয়েছে। এ হ্রদগুলো প্রয়োজনীয় পানি ও জীবিকার জোগান দিতে সক্ষম হওয়ায় অনেক বসতি এসব জলাশয়ের কাছে গড়ে ওঠে। হ্রদের পাশাপাশি পরিত্যক্ত নদীর অববাহিকায় এমন বসতির নিদর্শন পাওয়া যায়। চলনবিল তথা এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এমন প্রাচীন বসতির নিদর্শন পাওয়া যায়। মহাস্থানগড় (চলনবিলের উপরাংশ) দুর্গের বাইরে নদী ও বিলের তীরে উয়ারী-বটেশ্বরের আদলে রৈখিক (Linear) বসতিবিন্যাস এবং নদী ও বিল থেকে একটু ছড়িয়ে থাকা ভূমিতে হালকা বসতিবিন্যাস গড়ে উঠতে দেখা যায়। মহাস্থানগড় অঞ্চলে আবিষ্কৃত ১৩৩টি প্রত্নস্থানের মধ্যে ৭২টি প্রত্নস্থান, যেগুলো করতোয়া নদী ও সামরাই বিলের তীরে অপেক্ষাকৃত উঁচু বন্যামুক্ত ভূমিতে অবস্থিত। মৌসুমি বন্যা এ এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করলেও উঁচু স্থানে অবস্থিত মানববসতির ক্ষতিসাধন করতে পারত না। পক্ষান্তরে নিচু ভূমি নদীবাহিত পলল সঞ্চিত হয়ে চাষাবাদের জন্য উপযোগী হয়ে উঠত। উঁচু বন্যামুক্ত ভূমি একদিকে যেমন মানববসতি টিকে থাকার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি নালাসদৃশ নিম্নভূমি বা হ্রদগুলো ছিল পানি নিষ্কাশনের সহায়ক। ফলে চলনবিলকে কেন্দ্র করে জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে এবং প্রাচীন সমাজের অবকাঠামো তৈরি করে।
আত্রাই, বড়াল, নন্দকুজা, গুমানী, বেশানী, নারদ, করতোয়াসহ বেশ কয়েকটি নদী চলনবিল এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। বিশাল এ জলাশয়কে কেন চলনবিল নামে ডাকা হয়, এর সঠিক তথ্য মেলেনি। চলনবিলের নামকরণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে বিখ্যাত ‘চলনবিল’ সাধারণ মানুষের মুখে ‘চললের বিল’ নামে অভিহিত হতো। ধারণা করা হয়, চলনবিল ইংরেজ আমলের ইংরেজ চ্যানেল শব্দ থেকে এসেছে। চলনবিলের যেখানে পশ্চিম থেকে এসে আত্রাইয়ের বিপুল জলধারা নির্গত হতো, সেই আত্রাই মুখই ইংরেজ আমলের চ্যানেল বা চলন, যাকে আজ আমরা চলন বলছি। কিন্তু বড়াইগ্রাম অঞ্চলের জনগণের মধ্যে প্রবাদ আছে, এ বিলে নবাবি আমলের রাজস্বের ‘চালান’ জলদস্যুদের দ্বারা অপহূত হতো বলে এ অপভ্রংশে ‘চলনবিল’ নামকরণ হয়েছে। অন্যমতে, চলনবিলের জলরাশি বদ্ধ বিলের মতো স্থির না হয়ে নদীর স্রোতের মতো চলন্ত বা গতিশীল ছিল বলেই হয়তো এর নামকরণ হয়েছে চলনবিল (চলন্ত বিল)। এর জলরাশি কোনো সময় এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকেনি, বরং চলতেই থাকত অবিরাম। তাই এটি চলনবিল হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে।
চলনবিল কোন সময়ে উত্পত্তি লাভ করে এবং প্রারম্ভিক পর্যায়ে তার আয়তন কত ছিল, তার কোনো সঠিক তথ্যাদি জানা যায়নি। এ অঞ্চলের প্রাচীন কোনো মানচিত্রও পাওয়া যায়নি। যতদূর জানা যায়, দুই হাজার বছর আগে চলনবিল নামে কোনো বিলের অস্তিত্ব ছিল না। তখন অঞ্চলটি ছিল সমুদ্রগর্ভে। কেননা তখন বগুড়ার মহাস্থানগড় পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের জলরাশি বিস্তৃত ছিল বলে মনে করা হয়। মহাভারতের বনপর্বের তীর্থযাত্রা প্রকরণের বিবরণে জানা যায়, বগুড়া জেলার দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত সাগর বিস্তৃত ছিল। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে টলেমি তার বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ্যা গ্রন্থে ভারতবর্ষ সম্পর্কে অনেক তথ্য পরিবেশন করেছেন। তত্কালে বঙ্গদেশের স্থলভাগ খুব কম ছিল। প্রাচীন মানচিত্রে উত্তরে মহাস্থানগড়, দক্ষিণ-পূর্বে বিক্রমপুর আর চট্টগ্রাম দেখা যায়। পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্রের মধ্যে আর কোনো স্থান দেখা যায় না। ভূমি গঠন প্রক্রিয়ার ফলে ধীরে ধীরে চলনবিলের উত্পত্তি হয়েছে এবং সমুদ্র দক্ষিণের দিকে সরে গেছে। একসময় চলনবিলকে ধারণ করত পদ্মা ও যমুনা নদী ( ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ-পশ্চিমগামী শাখা)। চীন দেশীয় পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ সপ্তম শতকের প্রথম ভাগে ভারতবর্ষে আগমন করে ১৪ বছর পর্যন্ত অবস্থান করেন। তার লিখিত বিবরণ থেকে অনুমান করা যায়, সপ্তম শতকে চলনবিল পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থলে অবস্থান করতো। কারণ তিনি পুন-না-দাতানা বা পুণ্ড্রবর্ধন থেকে বিরাট নদী অতিক্রম করে আসাম যান। তার তথ্যমতে, ‘From Pundrabardhan... Proceeded for 900 li or 150 miles to the east and crossing a great river Kalotu (Karatoya), entered Kio-mo-leupo, or Kamrup, which is the Sanskrit name of Asam.’ এসব উক্তি থেকে ধরে নেয়া যায়, কালের বিবর্তনে পলি জমে এ অঞ্চলের উত্পত্তি।
বখতিয়ার খলজি যখন বাংলায় অভিযান শুরু করেন, তখন করতোয়া নদী পদ্মার তিন গুণ ছিল। করতোয়া নদী সে সময় এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে আসছিল। ১৭৮৭ সালের আগে তিস্তা নদী কখনো আত্রাই কখনো করতোয়া নামে প্রবাহিত হয়। তারপর একসময় এদের সম্মিলিত জলধারা মহানন্দার সঙ্গে মিলিত হয়ে হুরাসাগার দিয়ে বর্তমান গোয়ালন্দের কাছে পদ্মায় পতিত হয়। প্রায় প্রতি বছরই এসব নদ-নদী বন্যায় প্লাবিত হওয়ার ফলে এগুলোর দুই পাশের প্রাকৃতিক বাঁধও অনেকটাই উঁচু হয়ে ওঠে। ১৭৮৭ সালে তিস্তা নদী প্রবল বন্যার কবলে পতিত হওয়ার পর এর গতিপথ পরিবর্তন হয়। প্রথমত. পূর্ব দিকের একটি পরিত্যক্ত গতিপথ দিয়ে শুরু হয় এর প্রবাহ এবং পরে একসময় মিলিত হয় ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে। এ মিলনের পর থেকে পদ্মার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয় তিস্তার। ফলে করতোয়া, আত্রাই ও পুনর্ভবা শীর্ণ স্রোতধারায় পরিণত হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব নদ-নদী প্রাকৃতিক বাঁধের মধ্যবর্তী অবনমন হিসেবে চলনবিল উত্পত্তি লাভ করে। চলনবিলের সৃষ্টি আত্রাই ও বড়াল নদীর সঙ্গেও জড়িত। আত্রাই এ বিলের প্রধান পানি সরবরাহকারী নদী। অন্যদিকে বড়াল নদী দ্বারা এর পানি সরাসরি যমুনায় নিষ্কাশিত হতো।
এককালে চলনবিল ছিল তত্কালীন নাটোর মহকুমার তিন-চতুর্থাংশ, নওগাঁ মহকুমার রানীনগর ও আত্রাই থানা, পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমা ও পাবনা সদর মহকুমার চাটমোহর, ফরিদপুর ও বেড়া থানাজুড়ে বিস্তৃত। বগুড়া জেলার দক্ষিণ প্রান্তে আদমদীঘি ও নন্দীগ্রাম থানা চলনবিলের মধ্যে ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে বিলের উত্তরাঞ্চল উঁচু হওয়ার চলনবিল ক্রমেই দক্ষিণে সরে গেছে। চলনবিল অঞ্চলের বড়াইগ্রামের জোয়াড়ী গ্রামের খ্যাতনামা সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী বলেন, ‘অনুমান করিলে অন্যায় হইবে না যে চারশত বত্সর পূর্বে এই বিলটি রাজশাহী, পাবনা, বগুড়ার অধিকাংশ স্থান জুড়িয়া বিরাজ করিত। ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা সঙ্গমস্থলের পশ্চিমোত্তর অংশে চলনবিল বিরাজিত; অবস্থান, আকৃতি, প্রকৃতি দেখিয়া চলনবিলকে উত্তর বাংলার নদ-নদী স্নায়ুজালের নাভীকেন্দ্র বলিলে অত্যুক্তি হইবে না।’ চলনবিল অঞ্চলের খ্যাতনামা সাহিত্যিক শফিউদ্দিন সরদার চলনবিল সম্পর্কে বলেন, বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়া— এ তিন জেলার একেকটা বিশাল অংশজুড়ে তত্কালীন এ চলনবিলের বিস্তৃতি। রৌদ্রদগ্ধ নিদাঘের নিদারুণ মৌসুমেও মাইলের পার মাইল থৈ থৈ করে চলনবিলের পানি। তলহীন, অন্তহীন। এককালে তিন জেলার এ সুবিশাল এলাকাটা গোটা খরা-বর্ষা সবসময় জলমগ্ন থাকত। যুক্ত ছিল বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। এখানে এসে পদ্মা-যমুনা এক হয়ে ঢেলে পড়ত সাগরে। অধ্যক্ষ এমএ হামিদের মতে, রাজশাহী (বর্তমান নাটোর) জেলা অংশের বিলের ক্ষেত্রফল ২১০ বর্গমাইল ও পাবনা জেলা অংশের বিলের ক্ষেত্রফল ৩৪০ বর্গমাইল। বিল অংশের মোট ক্ষেত্রফল হচ্ছে ৫৫০ বর্গমাইল। এর সঙ্গে স্থলভাগের গ্রামগুলোর আয়তন প্রায় ২৫০ বর্গমাইল যোগ করলে চলনবিল অঞ্চলের মোট আয়তন হয় প্রায় ৮০০ বর্গমাইল।
১৯০৯ সালে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট দ্বারা পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, এর আসল আয়তন প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯-১৩ সাল পর্যন্ত পরীক্ষা চলার পর যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তার মূল বক্তব্য এমন: ১৯০৯ সালে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট দ্বারা পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, এটির আসল আয়তন ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার শুকিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে। বাকি অংশ হয় বসতি স্থাপনের কারণে অথবা কৃষিকাজের জন্য সংকুচিত হয়ে গেছে। কিন্তু এ অবস্থায়ও প্রায় ৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা বছরের সবসময় জলমগ্ন থাকে। জরিপে আরো দেখা গেছে, পানি সরবরাহকারী নদী দ্বারা বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয় আর দেড় মিলিয়ন ঘনফুট পলি বিভিন্ন নদী বা চ্যানেল দিয়ে বের হয়ে যায়। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয় এ বিলে। এ পলি যদি ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সমভাবে বিস্তৃত করে দেয়া হয়, তাহলে প্রতি বছর এটির উচ্চতা প্রায় ১ দশমিক ২৭ সেন্টিমিটার করে বাড়ে। বিলের শুষ্ক মৌসুমের অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ১৯১০ সালে আরেকটি জরিপ পরিচালিত হয় এবং সেখানেও দেখা যায়, বিলের আয়তন কমছে। ১৯১৩ সালে পরিচালিত তৃতীয় জরিপে দেখা যায়, ৩১-৩৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা বছরের সবসময় পানির নিচে থাকে। এখন শুষ্ক মৌসুমে বিলের কোনো স্থানই পানিতে জলমগ্ন থাকে না বললেই চলে।
১৯১৪ সালে সারা (বর্তমান পাবনা জেলাধীন ঈশ্বরদীর পাকশি)-সিরাজগঞ্জ ও ঈশ্বরদী-সান্তাহার রেললাইন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উভয় রেললাইনের মধ্যবর্তী নিম্নাঞ্চল চলনবিল নামে পরিচিত হয়। সারা-সিরাজগঞ্জ রেললাইন উল্লাপাড়া উপজেলা বিভক্ত করে প্রবাহিত হওয়ায় এ রেললাইনের পশ্চিম পাশের উল্লাপাড়া উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের ছয়টি ইউনিয়ন চলনবিলের মধ্যে পড়েছে। বর্তমানে উল্লাপাড়া ও রায়গঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নকে নিয়ে সলঙ্গা থানার ঘোষণা হয়েছে। উল্লাপাড়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন বাদে অবশিষ্ট ইউনিয়ন, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার উপজেলা, সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ, তাড়াশ উপজেলা বাদে অবশিষ্ট এলাকা এবং পাবনা জেলার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া বাদে অবশিষ্ট এলাকা চলনবিলের মধ্যে গণ্য করা হয় না। বর্তমানে নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা তিন জেলার আটটি থানাব্যাপী চলনবিলের অবস্থান। নাটোর জেলার সিংড়া, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া (আংশিক) এবং পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহর থানা এলাকাকে বর্তমানে চলনবিল অঞ্চল নামে অভিহিত করা হয়। ২০০১ সালে চলনবিলের বুক চিরে দীর্ঘ ৫৫ কিলোমিটার হাটিকুমরুল-বনপাড়া সড়ক নির্মিত হয়, যা চলনবিলকে আবার উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।
প্রাচীন শিলালিপি ও সাহিত্য থেকে জানা যায়, এখনকার বগুড়া, রাজশাহী ও দিনাজপুর জেলার অংশবিশেষ পুণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত ছিল। পুণ্ড্রবর্ধনের সীমা নির্দেশ করতে গিয়ে সন্ধ্যাকর নন্দী বলেছেন, গঙ্গা ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী স্থান পুণ্ড্রবর্ধন। চলনবিলের অবস্থানও ঠিক একই অঞ্চলে। চলনবিল অঞ্চলের অতীত থেকে জানা গেছে, পলির স্তর পড়ে চলনবিলের এখানে সেখানে জেগে উঠতে থাকে চর এবং চরাঞ্চল থাকত পতিত ও জঙ্গলাকীর্ণ। গুপ্ত, পাল ও সেন শাসনামলে যেসব ভূমি দান করা হতো, তার প্রধান শর্ত থাকত, দানগ্রহীতারা ওইসব স্থানে জনবসতি স্থাপন করবে এবং সংলগ্ন অঞ্চলের উন্নতি বিধান ও চাষাবাদে সাহায্য করবে। অতীতে নাটোর অঞ্চলে বহু জনপদের সৃষ্টি হয়েছে এভাবে। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে চলনবিলের কোনো কোনো অংশে পলি পড়ে চর জেগে ওঠায় লোকবসতি শুরু হয়। চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত রাজাদের রাজত্বকালের নিদর্শন চলনবিল অঞ্চলে পাওয়া গেছে। বড়াইগ্রাম উপজেলার ধানাইদহ গ্রামে ৪৩২ খ্রিস্টাব্দে কুমার গুপ্ত প্রদত্ত তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, চলনবিলের দক্ষিণাংশ বড়াইগ্রাম ও চাটমোহর উপজেলায় অনেক আগে থেকে মানুষের বসতি ছিল। রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও উল্লাপাড়া উপজেলার উত্তরাংশে সেন রাজত্বকালে অনেক গ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়। তাড়াশ উপজেলার মাধাই নগর গ্রামে লক্ষ্মণসেন দেবের একখানা তাম্রশাসন লিপি আবিষ্কৃত হয়। চলনবিলের উত্তরাঞ্চলের এক বিরাট অংশ সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত পদ্মা ও যমুনার সঙ্গে মিশে সবসময় জলমগ্ন থাকত। অবশ্য তার মাঝে মাঝে চর জেগে ওঠায় দ্বীপসদৃশ অনেক গ্রাম গড়ে উঠতে থাকে। রামপালের রাজত্বকালে কৈবর্তনায়ক ভীম চলনবিলের উত্তর সীমান্তে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া জেলার শেরপুর পর্যন্ত একটি মৃত্তিকা প্রাকার নির্মাণ করেন, যা এখনো ভীমের জাঙাল নামে অভিহিত। সেন রাজাদের রাজত্বকালে অনেক নিদর্শন যেমন— জয়সাগর, উদয়দীঘি, প্রতাপদীঘি, ভদ্রাবতী খাল প্রভৃতি আজো চলনবিল অঞ্চলে বিদ্যমান রয়েছে। পাঠান ও মোগল আমলে চলনবিল ভাতুরিয়া পরগনা ও সুবা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ সুজা-উদ-দৌলার সময়ে চলনবিল রাজশাহী জমিদারির পরগনা ভাতুরিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। গুরুদাসপুর উপজেলার দক্ষিণের অংশে চাপিলা ইউনিয়নের অন্তর্গত চাপিলা গ্রামে মোগল শাসনামলে মোগল কাচারি প্রতিষ্ঠিত ছিল। জানা যায়, রাজশাহী জেলার পূর্বাংশ তরফে চাপিলার রাজধানী চাপিলা কাচারির অধীন ছিল। এখানে অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার জন্য অন্ধকূপ, জেল, ফাঁস, শূল প্রভৃতির ব্যবস্থা ছিল। এখানকার কেল্লায় মোগল সৈন্যদের ঘাঁটি ছিল। চাপিলা পশ্চিম পাড়ায় মোগল আমলের একটি সুপ্রাচীন মসজিদ এখনো বর্তমান। বর্তমানে এলাকার স্থায়ী বাসিন্দারা মসজিদটি সংস্কার করে ব্যবহার করছে। এ গ্রামে তিন শতাধিক পুকুর ও অসংখ্য দালানকোঠার প্রাচীন ইট দেখে বোঝা যায়, এটি এককালে সমৃদ্ধ নগর ছিল। মোগল শাসনামলে কিছুকাল চাপিলা, রাজশাহী জেলা সদর ও চাপিলা পরগনার কেন্দ্রস্থল ছিল।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলার লক্ষণাবতী বিজয়ের পর মুসলিম শাসনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে নরকুটি বা নাটোরে একটি ইকতা বা প্রশাসনিক ইউনিট গড়ে ওঠে। বাংলায় মুসলিম শাসনামলে নাটোরের পূর্বাংশ, বগুড়ার দক্ষিণাংশ এবং পাবনার উত্তরাংশ মিলে ক্ষিত্তা সিমলাবাদ নামক একটি প্রশাসন গড়ে ওঠে, যার কেন্দ্র ছিল নাটোর। নাটোর থেকে পরিচালিত হতো সমগ্র রাজশাহী জেলার শাসন। শুধু রাজশাহী নয়, বর্তমান পাবনা, দিনাজপুর, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ ইত্যাদি জেলাব্যাপী বিস্তৃতি ছিল নাটোর রাজার জমিদারি। ১৮৭২ সালে ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে মেজর) রেনেলের মানচিত্র অনুসারে রানী ভবানীর জমিদারির আয়তন ছিল ১২ হাজার ৯৯৯ বর্গমাইল। ফলে রানী ভবানীকে অর্ধবঙ্গেশ্বরীর পাশাপাশি চলনবিলের রানী বলা হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে ম্যালেরিয়ার আধিক্যহেতু চাপিলা থেকে রাজশাহী জেলা সদর নাটোরে স্থানান্তর হয়। প্রায় ৩০ বছর পর নাটোর অস্বাস্থ্যকর বিবেচনায় ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী জেলা সদর রামপুর বোয়ালিয়ায় (বর্তমান রাজশাহী) স্থানান্তর হয়। প্রাচীন চলনবিল অঞ্চলের জল ও স্থলভাগের বিপুল ঐতিহ্য, ঐশ্বর্যের রত্নভাণ্ডার, নৃতত্ত্ব, পুরাকীর্তি ও জাগরণের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। কালের আবর্তে তলদেশে পলি জমে মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে চলনবিল এবং এখানকার প্রত্নতত্ত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ইতিহাস। চলনবিল অনেক জ্ঞানী-গুণীজনের জন্মস্থান। দেশের অর্ধেক জমিদারি ছিল এ অঞ্চলের। এছাড়া এ অঞ্চলে ছিল বেশকিছু মোগল ও পাঠান স্থাপত্য। যেমন তাড়াশের সম্রাট আকবরের মাসুম খাঁর মসজিদ ও চাপিলার মোগল নগরী। এখানে রয়েছে প্রখ্যাত লেখক প্রমথ চৌধুরী ও ভারতের সাবেক সেনাবাহিনীপ্রধান জিএন চৌধুরীর জ্ঞাতি পুরুষদের বাড়ি, বিখ্যাত লেখক প্রমথনাথ বিশীর আদি জমিদারবাড়ি, নাটোর রাজবাড়ি, মীর জাফরের সহচর জগেশঠের বাংলো ছাড়াও অনেক প্রাচীন নিদর্শন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৬ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২২ হাজার কিলোমিটার নদীপথ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। চলনবিলের মধ্য দিয়ে নদী ও খাল প্রবহমান থাকার ফলে চলনবিল এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নদীভিত্তিক, গড়ে উঠেছিল নদীকেন্দ্রিক নগর, শহর ও বন্দর যেমন— সিংড়া, নলডাঙ্গা, আত্রাই, খাজুরা, শেরকোল, অষ্টমণিষা মির্জাপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, চাঁচকৈড়, কলম, আহম্মেদপুর, তাড়াশ, হাণ্ডিয়াল প্রভৃতি। কালের আবর্তনে এসব স্থান হারিয়েছে তার নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও জৌলুস।
প্রায় ২২টি নদী, বেশকিছু খাল ও ছোটবড় প্রায় ২৫টি বিলজুড়ে বিস্তৃত চলনবিল। এ অঞ্চলের ভূমি নদীবাহিত পলল দ্বারা গঠিত হওয়ায় এর মাটি অত্যন্ত উর্বর। এ অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে প্রচুর পরিমাণ ধান, পাট, সরিষা, গম, পেঁয়াজ, রসুন জন্মে। বর্তমানে এ অঞ্চলের বার্ষিক সরিষার মধুর উৎপাদন সুন্দরবনে উৎপাদনের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রসুন উৎপাদন হয় চলনবিল অঞ্চলে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বিধানে তথা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
চলনবিল ছিল মিঠা পানির নানা প্রজাতির মাছের আধার, কিন্তু যেখানে সেখানে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াও বছরের বেশির ভাগ সময়ই পানিশূন্য থাকার কারণে মাছের সেই প্রাচুর্য আর নেই। চলনবিলের খাল-বিল, নদী-নালা প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে মাছ ও মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্প যেমন— নৌকা তৈরি, জাল বোনা, মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ আর আগের পেশায় আকর্ষণ বোধ করছে না। ধীবর, কৈবর্ত, নিকারি, জালিক, ঝালো, জেলে সম্প্রদায় বাপ-দাদার মাছ ধরা ও বিক্রি পেশা পরিবর্তন করছে আর যারা এ পেশা আঁকড়ে আছে, তারা মানবেতর দিন অতিবাহিত করছে।
বিভিন্ন সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড চলনবিল এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ফসল রক্ষার কথা বলে বিলের উত্সমুখে স্লুইসগেট, রাবার ড্যাম নির্মাণ করেছে। বড়াল, আত্রাইসহ বিলের সংযুক্ত নদীতে দেয়া হয়েছে ক্রস বাঁধ, যা চলনবিলের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। এছাড়া কানেক্টিভিটি বাড়ানোর কথা বলে চলনবিলের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অপরিকল্পিত মহাসড়ক তৈরি করে চলনবিলের ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক, চাটমোহর-মান্নাননগর মহাসড়কসহ এ রকম অসংখ্য সড়ক ও মহাসড়ক। চলনবিলে কখনই কোনো পরিবেশগত সমীক্ষা করে কোনো উন্নয়ন করা হয়নি। পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হয়তো চলনবিলের দুর্গম এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় গতি এনেছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ডেকে এনেছে চলনবিলের প্রাণ-প্রকৃতি ও বিলনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকায়।
চলনবিল বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল। সময়ের চলমান গতিতে বিলের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে এ এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার। চলনবিল নানাবিধ কারণে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, ছোট হয়ে আসছে চলনবিল অঞ্চলের বিল অংশের আয়তন। চলনবিলকে নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ও বিস্মৃত বিষয়াবলি তুলে ধরা হলে এবং চলনবিলের সীমানা নির্ধারণসহ খাল, বিল, নদী দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করার উদ্যোগ নিলে চলনবিলাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমেও পানি এবং এর ঐতিহ্যকে ধরে রাখা সম্ভব। চলনবিলের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হলে জানতে হবে এর প্রকৃত ইতিহাস এবং তা সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ বিলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের এমফিল ফেলো





