এক দশক আগেও বাংলাদেশে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে জড়িত ছিল যে শব্দটি, সেটি হলো মঙ্গা এবং তার অসহনীয় প্রকোপে ফুটে ওঠে সেখানকার মানুষের অসহায়ত্ব। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর বা আশ্বিন-কার্তিক, যা উত্তরাঞ্চলে মরা কার্তিক নামে পরিচিত) কাজের অভাব এতটাই প্রকট ছিল যে, উত্তরাঞ্চলের অনেক মানুষকে এ সময় অনাহার বা অর্ধাহারে থাকতে হতো, যা সর্বজনীনভাবে ‘মঙ্গা’ নামে পরিচিত। জাতীয় পর্যায়ে খুব কম প্রতিষ্ঠানই আছে, যারা বড় আকারে অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা ও এর ফলাফল নিয়ে বিস্তারিতভাবে কাজ করে এবং নীতিনির্ধারকদের কাছে তা তুলে ধরে আঞ্চলিক সমস্যাগুলো দূর করতে সচেষ্ট হয়। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিভিন্ন জাতীয় ও অঞ্চলভিত্তিক, বিশেষ করে যে বিষয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মূল ধারায় কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়ে থাকে, সেগুলোর ওপর দৃষ্টি প্রদান করে আসছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা পরিস্থিতির অন্তর্নিহিত কারণগুলো বিশ্লেষণ ও তা দূরীকরণের উপায় উদ্ভাবন অন্যতম প্রধান ছিল।

খাদ্যনিরাপত্তা ও উত্তরাঞ্চল

২০০৬ সালে আইএনএম কর্তৃক অতিদরিদ্রদের ওপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, মঙ্গাবহির্ভূত সময়ে এসব এলাকায় প্রায় ৪১ শতাংশ পরিবার তিনবেলা খেতে পারে, কিন্তু মঙ্গার সময় তিনবেলা খেতে পারে ,এ ধরনের পরিবারের সংখ্যা মাত্র ৪ শতাংশ। প্রায় ৪২ শতাংশ পরিবারকে মাঝে মাঝে না খেয়ে থাকতে হয় এবং ৪৮ শতাংশ পরিবার খাবারের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হয় মঙ্গার সময়। বাস্তবে ৩৫ শতাংশ পরিবার এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য কিছুই করতে পারে না। অন্যদিকে ৩৫ শতাংশ পরিবার, বিশেষ করে কাজের সন্ধানে অস্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যায়। সরকারি ও বেসরকারি অনুদানের ওপরও অনেক পরিবার নির্ভর করে এ মঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য। মাত্র ৬ শতাংশ পরিবার মঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ব্যাংক বা ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়, যা মূলত এ জনগোষ্ঠীর অপ্রতুল ঋণ প্রবেশ্যতার কারণেই ঘটে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আইএনএমের একটি গবেষণায় দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ৮৭ শতাংশ পরিবারই তিনবেলা খেতে পারে। না খেয়ে থাকতে হয়েছে, এমন পরিবারের সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম। মঙ্গার সময় না খেয়ে থাকতে বাধ্য হয়, এমন পরিবারের সংখ্যা পাওয়া যায় মাত্র ৩ শতাংশ। মঙ্গার সময়ও তিনবেলা খেতে পারে, এ ধরনের পরিবার ৬৪ শতাংশ। মাত্র আট বছরের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তার এ উন্নতি অনেকটাই দৃশ্যমান। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কীভাবে খাদ্যনিরাপত্তার এতটা উন্নতি সম্ভব হলো।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিঃসন্দেহে সরকারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেমন— কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা নগদ টাকা, ১০০ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচি, বিভিন্ন রকম বৃত্তি-উপবৃত্তি মঙ্গাপীড়িত এলাকার খাদ্যপ্রাপ্যতার অনেকটা উন্নতি করেছে। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে, যা সার্বিকভাবে ওইসব এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। সরকার ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থাও এ এলাকায় মঙ্গা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মঙ্গাপীড়িত এলাকায় খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ‘সংযোগ’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে মঙ্গাপীড়িত পরিবার, যাদের আগে আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ্যতা ছিল না, তাদের আর্থিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। পরবর্তীতে আইএনএম গবেষণার মাধ্যমে সংযোগ প্রকল্পের অভিঘাতও মূল্যায়ন করেছে। এ থেকে দেখা যায়, সংযোগ প্রকল্পের অধীনে মঙ্গাপীড়িত পরিবারগুলোকে যেসব আর্থিক সেবা দেয়া হয়েছে, তা আয়বর্ধক কাজে নিয়োজিত হতে সহায়তা করেছে। সংযোগ প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি মঙ্গা নিরসনে কোনো ত্রাণ বা অনুদানের ওপর নির্ভর করেনি, বরং এটি অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে ঋণ প্রদান করেছে এবং তাদের সঞ্চয় ব্যবহার করে কীভাবে আর্থিক উন্নতি করা যায়, তার ওপর বেশি জোর দিয়েছে। গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, সম্পদ সৃষ্টি ও একাধিক কাজের সুযোগ তৈরি করার মাধ্যমেই কেবল দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব। দান বা অনুদান সাধারণত স্বল্পমেয়াদি সমস্যা সমাধান করে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না।

আরেকটি লক্ষণীয় ফলাফল হলো, খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়ন করতে হলে অতিদরিদ্রদের শুধু ঋণ দিলেই হবে না। আর্থিক সেবায় প্রবেশ্যতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অ-আর্থিক আরো কিছু সেবা দেয়া না গেলে ঋণ এককভাবে কমই কার্যকর হয়। আয়বর্ধক কাজের ওপর প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য কারিগরি সহযোগিতা অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে তাদের দক্ষতা সৃষ্টি এবং ঋণ বা নিয়মিত আয়ের যথার্থ ব্যবহারে সহায়তা করে। গবেষণা থেকে দেখা যায়, শুধু ঋণের ওপর নির্ভরশীল পরিবার থেকে ঋণ প্লাস কর্মসূচির (ক্ষুদ্র অর্থায়নের পাশাপাশি একই সঙ্গে পরিবারের সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বীমা, প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের সহায়তা প্রদান) আওতায় অন্তর্ভুক্ত পরিবারগুলো তুলনামূলক বেশ ভালো অবস্থানে যেতে পারে।

আয়ের উত্স তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি কমিয়ে আনাও জরুরি। অনেক সময় স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিগুলো অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য অনেক বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে বিষয়টিকে স্মরণে রেখে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের দুস্থ পরিবারগুলোকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার প্রচেষ্টা নিয়েছে। এর ফলাফলও বেশ ভালোভাবে সবার কাছে দৃশ্যমান। এ ধরনের বিবিধ আর্থিক ও অ-আর্থিক সেবাগুলো পাওয়ার কারণে পরিবারগুলো অন্যান্য পরিবারের তুলনায় অধিক আয় করতে সক্ষম হয়েছে, অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি করতে পেরেছে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন প্রকল্প সফল হলেও সবার জন্য তা একই রকম সফল হয়নি। যেসব পরিবার সম্পূর্ণভাবে দিনমজুরির ওপর নির্ভর করে এবং যেসব পরিবারের প্রধান বিধবা বা স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, তারা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে কম। এ ধরনের বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য আরো নিবিড় আর্থিক ও অ-আর্থিক সেবার প্রয়োজন; যে বিষয়টি বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নের সময় এখন এসেছে।

উত্তরাঞ্চল ও আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তীকরণ

এ বিষয়ে সম্ভবত দ্বিমত করার অবকাশ নেই যে, ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা জাতীয় অর্থনীতিতে অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে দরিদ্র ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী একসময় প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক সেবা প্রতিষ্ঠান যেমন— সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চাহিদার ধরনকে বিবেচনায় রেখে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা ও সঞ্চয়সেবা চালু করে। ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একাধিক ধরনের সঞ্চয় ও ঋণপণ্য বাজারজাত করে। এভাবে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক খাতে অংশগ্রহণের পরিমাণও বাড়ে।

বিগত কয়েক বছরে অর্থায়ন খাতে প্রযুক্তিগত অনেক পরিবর্তনও এসেছে। আর্থিক খাতের অনেক পরিষেবা এখন মোবাইল, ইন্টারনেট ইত্যাদির মাধ্যমেও পরিচালিত হচ্ছে। নতুন নতুন সেবা ও ধারণা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক খাতের ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করছে। মোবাইলের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা যেমন— সঞ্চয়, টাকা পাঠানো, বিভিন্ন বিল পরিশোধ ইত্যাদি সেবা পাওয়ার বিষয়টি খুব অল্প দিনেই সব শ্রেণীর জনগণের মাঝেই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। আইএনএমের জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ২৭ শতাংশ পরিবার মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নিয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলের জনগণ এ সেবা বেশি ব্যবহার করে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১৮ শতাংশ ও অদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ২৮ শতাংশ এ সেবা গ্রহণ করছে। অঞ্চলভেদেও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহারে ভিন্নতা দেখা যায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বরিশাল (৪৩%) ও রংপুর (৩৭%) বিভাগে, যা কিনা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। লক্ষণীয় ব্যপার হলো, অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা অনেক ফলপ্রসূ হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অভিবাসীরা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে তাদের আপনজনের কাছে সহজে ও নিরাপদে টাকা পাঠাতে পারে। অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের প্রায় অর্ধেক (৪৬%) এ সেবা ব্যবহার করে।

এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই যে, সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোও উত্তরাঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে অতিদরিদ্রদের জন্য শুধু ক্ষুদ্র ঋণ তুলনামূলক কম কার্যকর। আর্থিক সেবার পাশাপাশি অ-আর্থিক বিবিধ সেবা যেমন— প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদান তাদের উন্নয়নের স্থায়িত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শুধু অতিদরিদ্রদের জন্য লক্ষ্যকৃত কার্যক্রম অনেক সময় সফল নাও হতে পারে। উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য কিছু কিছু কার্যক্রম সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নেয়া প্রয়োজন। সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তীকরণের বিষয়টি উত্তরাঞ্চলে কম গুরুত্ব পেয়েছে, যেটি বাস্তবায়ন করতে পারলে উত্তরাঞ্চলকে দ্রুত উন্নয়নশীল ও স্বনির্ভর অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সহজতর হবে।

 

লেখকদ্বয় যথাক্রমে নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম) ও উপপরিচালক, আইএনএম