আয়ের বিচারেই সাধারণত দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়। কখনো বা স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরি কিংবা পুষ্টিমান ক্রয়ে প্রয়োজনীয় আয়কে ব্যবহার করা হয় দারিদ্র্য পরিমাপে। আবার খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় আয়কেও দারিদ্র্য পরিমাপে ব্যবহার করা হয়। আয়ভিত্তিক দারিদ্র্য পরিমাপ দারিদ্র্যের মৌলিক রূপটি তুলে ধরতে প্রাথমিকভাবে প্রধান উপায় হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আয়-দরিদ্র না হয়েও মানুষ যে দরিদ্র হতে পারে, বিশেষ করে প্রান্তিকতা যে কেবল আয়ের ওপরই নির্ভর করে না, সে ধারণাটি এখন বেশ স্পষ্ট। তাই অনেকেই দারিদ্র্যের বৃহত্তর সংজ্ঞা ব্যবহার করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনুসন্ধান করার পক্ষে মত দিচ্ছেন, যাতে দারিদ্র্য দূর করার নীতি ও কর্মপরিকল্পনা আরো বাস্তবসম্মত, ব্যাপক বিস্তৃত হয়। বর্তমান প্রবন্ধে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বিরাজমান এমন কিছু নাজুক বিষয়ের আলোচনা করা হবে, যা আয়-দরিদ্র মানুষের প্রান্তিকতা যেমন বাড়ায়, তেমনি আয়-দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থানরতদেরও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে পারে। বর্তমান প্রবন্ধটি রাজশাহীর ছয়টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচটি উপজেলা সরেজমিন পরিভ্রমণ করে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে।
আয় ছাড়াও যে বিষয়গুলো রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রান্তিকতার সৃষ্টি করছে সেগুলো হলো— দুর্গম এলাকায় বসবাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ধর্মীয় সংল্যালঘু, নিম্নবর্ণের (?) ধর্মীয় জনগোষ্ঠী (যেমন হরিজন শ্রেণী), নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ মনোযোগ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী (শারীরিক বা মানসিক সমস্যায় জর্জরিত) ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগণ। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী হিসেবেও নানা নাজুক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আবার প্রান্তিকতা কখনো মৌসুমি (অর্থাৎ বছরের বিশেষ কিছু মাসে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়)।
আয়-দারিদ্র্যের মাপকাঠিতে রাজশাহীর উপজেলা ভেদে ২৫ থেকে ৪০ ভাগ মানুষ দরিদ্র, যা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২৭ ভাগ। আর্থসামাজিক নানা কারণ ছাড়াও দুর্গম এলাকা (যেমন চরাঞ্চল কিংবা বর্ষাকালে দুর্গম গ্রামাঞ্চল) হওয়ার কারণে সেসব অঞ্চলের মানুষ নাজুক থাকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো গত কয়েক বছরে দারিদ্র্যের নানা মাত্রা অনুসন্ধান করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন বিষয়ে নাজুক পরিস্থিতির নানা রকম ম্যাপ তৈরি করেছে, যা থেকে দেখা যায়, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রভৃতি দারিদ্র্য পরিস্থিতির স্থায়িত্ব বাড়ায় এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
রাজশাহীর পবা, মোহনপুর, দুর্গাপুর, চারঘাট, গোদাগাড়ী, বাঘমারা আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, নাচোল, গোমস্তাপুর, শিবগঞ্জ আর ভোলাহাটের নানা স্থানে দরিদ্র মানুষের নাজুকতা বা প্রান্তিকতার বিভিন্ন মাত্রা দেখে মনে হয়েছে, আয়-দরিদ্র মানুষকে আরো বেশি অসহায় করে রেখেছে জীবন সম্পর্কে তাদের অনিশ্চয়তা। অর্থনৈতিক মুক্তির পথে সামাজিক ও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা নিজেদের জীবনমান উন্নয়নে হতাশ। কাজেই আয়-দারিদ্র্য দূরীকরণ সহজ হবে তখন, যখন এসব সামাজিক ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা দূরীভূত হবে।
অবাক হয়ে যেতে হয় যখন দেখি, এ যুগেও হরিজন, ঋষি কিংবা মুচিরা সামাজিকভাবে নিগৃহীত। এ মাঠ জরিপের একপর্যায়ে রাজশাহীর পবা উপজেলার এক চায়ের স্টলে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। সেখানে উপস্থিত হলো ১৭-১৮ বছর বয়সী তিনটি ছেলে। প্রত্যেকের হাতে নিজস্ব চায়ের কাপ। চা স্টলের বিক্রেতা ওই ছেলে তিনটির নিজস্ব কাপে চা ঢেলে দিল, দোকানের কাপে দিল না। কৌতূহলী হয়ে স্থানীয় একজনকে কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, ওই তিনজন হরিজন সম্প্রদায়ের বলে দোকানের কাপে তাদের চা দেয়া যাবে না। তাহলে অন্য ক্রেতারা এখানে চা খাবে না। কি আশ্চর্য! ওই ছেলেগুলোকে কলেজছাত্র বলে মনে হয়েছে। ভাবছিলাম, তাদের লেখাপড়ার সঙ্গে বাস্তবের এ বৈষম্য কত বেমানান। এরা আয়-দরিদ্র না হয়েও দরিদ্র, সামাজিক অপমানের শিকার। একই রকম অবস্থা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সুইপার পরিবারগুলোর, কিংবা ভোলাহাটের মুচি পেশার লোকজনের। তাদের অনেকেই আয়-দরিদ্র নয়, তদুপরি এমন সামাজিক অপমান তাদের দরিদ্র করেছে, অথবা দারিদ্র্যের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর গোমস্তাপুর ও নাচোলের সাঁওতাল, ওঁরাও, রাজবংশী, মুন্ডা ইত্যাদি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ও রাজশাহীর নানা স্থানে বসবাসকারী সাঁওতাল, মুন্ডা, তেলি, মালি প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের মাত্রা একটু ভিন্ন। আর দারিদ্র্য ও সামাজিক অপমান ছাড়াও এক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে এদের মধ্যে বিরাজমান নেশার প্রবণতা ও তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেগুলোর প্রভাব। প্রথাগতভাবে নেশা করার প্রবণতা থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই দারিদ্র্য বিমোচনে নেয়া নানা পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে আয়-দারিদ্র্য দূর করতে ততটা কার্যকর হয় না। মাঠ জরিপের একপর্যায়ে সাঁওতাল অধ্যুষিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি এলাকায় এক মিশনারি স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সেখানে মূলত সাঁওতাল শিশু-কিশোরদের শিক্ষা দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের স্কুলের আবাসনে থাকা বাধ্যতামূলক। ক্লাস নাইনে পড়ুয়া এক সাঁওতাল পরিবারের ছেলের সঙ্গে অনেকক্ষণ আলাপ হলে সে জানাল, আবাসিক ব্যবস্থা থাকার কারণেই তার লেখাপড়া হচ্ছে। নইলে তার চরম দরিদ্র পরিবার যে সামাজিক পরিমণ্ডলে বাস করে, সেখানে শুধু স্কুলের সুবিধা দিয়ে লেখাপড়া হতো না।
কোনো কোনো অঞ্চলে দারিদ্র্যের মাত্রা চরম আকার ধারণ করার কারণ হচ্ছে বিভিন্ন ট্র্যাডিশনাল পেশার বিলুপ্তি যেমন— রাজশাহীর পবা উপজেলার কোয়ালী কিংবা কামার-কুমার আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে বাঁশের সামগ্রী উৎপাদনকারীরা আয়-দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েছে। আবার এ থেকে সহসা উত্তরণের পথও পাচ্ছে না।
রাজশাহীর আশপাশে চর এলাকার দারিদ্র্যের চরম অবস্থার মূল কারণ দুর্গমতা, যার অর্থনৈতিক সুযোগ, বাজার ব্যবস্থায় অভিগমন সক্ষমতার অভাব রয়েছে। এমনকি বর্ষাকালে এসব দুর্গম এলাকায় সাধারণত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাও থাকে না। এমন বাস্তবতাই চোখে পড়ে চর নবীনগর, চর মাঝারদিয়ার, চর খিদিরপুর এলাকায়। আবার রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর ও নিমপাড়ার বড় সমস্যা নদীভাঙন, যা আয়-দরিদ্র কিংবা ধনী সবাইকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে।
ওপরের খণ্ড চিত্রগুলো থেকে স্পষ্ট যে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রান্তিকতা বা নাজুক পরিস্থিতির উত্স ও বৈশিষ্ট্যের নানা প্রকারভেদ আছে। তাই বিশেষ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণে দারিদ্র্যের উত্স ও বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। হরিজন, ঋষি, মুচি পেশার জনগোষ্ঠী যারা সামাজিক অপমানের শিকার, সেখানে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি এদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। বিশেষ করে এসব পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা-চাকরি ইত্যাদিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আবার চর এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে তাদের ঘরবাড়ির ভিটা উঁচু করা (যেখানে এখনো করা হয়নি), গবাদিপশু পালন, শাকসবজি চাষ এবং সেগুলো বাজারজাতে সহায়তা দরকার। সাঁওতালসহ অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষাদানের জন্য যেখানে সম্ভব আবাসিক স্কুলের ব্যবস্থা করা অথবা স্কুলের শিক্ষকদের বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া, তারা যেন এ ধরনের পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ার দিকে বিশেষ নজর দেন।
বাংলাদেশে দারিদ্র্যের প্রকট রূপ দিন দিন কমছে সত্য, কিন্তু আনাচে কানাচে নানা অঞ্চলে ভিন্নমাত্রার দারিদ্র্য স্থায়ী আসন গেড়ে আছে। তাই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের জন্য এসব ভিন্নমাত্রার প্রান্তিকতাকে সামলে ওঠার নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে হবে।
লেখক: সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বিআইবিএস





