গ্রীষ্মমণ্ডলীয় মৌসুমি এলাকায় বরেন্দ্র অঞ্চলের অবস্থান। এখানকার জলবায়ু প্রধানত উষ্ণ ও মোটামুটি আর্দ্র। তবে কয়েক দশক ধরে স্বল্প বৃষ্টিপাত, ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। একদিকে এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার পরিমাণ। এ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর বেশির ভাগই বর্ষা শেষ হওয়ার আগে শুকিয়ে যাচ্ছে। অনাবৃষ্টি, খরা, বৃক্ষনিধন, পানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বরেন্দ্রের প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ নষ্টের পথে। এ অবস্থার জন্য যেমন প্রকৃতিকে দায়ী করা যায়, তেমনি মানুষও কম দায়ী নয়। কালের বৈরিতা আর মানুষের সীমাহীন অপরিণামদর্শিতা আজ এ অঞ্চলকে ঠেলে দিয়েছে চরম বিপর্যয়ের মুখে।
রাজশাহী অঞ্চলের সবচেয়ে শীতলতম মাস ডিসেম্বর। এ সময় গড় তাপমাত্রা থাকে ১৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে সবচেয়ে উষ্ণ মাস হলো এপ্রিল। এ মাসে গড়ে ২৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে। ১৯৬৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ের আবহাওয়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের বার্ষিক গড় আর্দ্রতা উত্তর-পশ্চিমে শতকরা ৭৪ ভাগ থেকে উত্তর-পূর্বে শতকরা ৭৭ ভাগ থাকে। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৮০ ভাগের বেশি থাকে— যদিও ওই সময়ে অঞ্চলটিতে একাধিক তীব্র তাপদাহ প্রবাহিত হয়।
এখন পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে যত প্রাকৃতিক সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া। ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হ্রাসের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, উক্ত সময়ে অঞ্চলটির দক্ষিণে (বগুড়া, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ দক্ষিণ অংশ) বৃষ্টিপাত কমেছে লক্ষণীয় হারে। অন্যদিকে উত্তরে (চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী ও জয়পুরহাট উত্তর অংশ) কিছুটা বেড়েছে। ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বরেন্দ্রের দক্ষিণে বার্ষিক বৃষ্টিপাত কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ থেকে ৬ মিলিমিটার হারে। অন্যদিকে একই সময়ে উত্তরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে বার্ষিক ২ দশমিক ৪ মিলিমিটার হারে।
বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হ্রাস পেয়েছে গত দশকে। ১৯৯৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে বছরে গড়ে ১ হাজার ৫৩০ থেকে ১ হাজার ৭৮০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতো। আর ২০০০ সালের পর থেকে এ অঞ্চলে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে এসেছে ১ হাজার ৩৬৬ থেকে ১ হাজার ৭২২ মিলিমিটারের মধ্যে, যা এর আগের দশকের (১৯৯০-৯৯) তুলনায় ৩ থেকে ১৪ ভাগ পর্যন্ত কম।
আগেই বলা হয়েছে, বরেন্দ্রের দক্ষিণে বৃষ্টিপাত কমছে। অন্যদিকে বাড়ছে উত্তরে। এ অঞ্চলের বৃষ্টিপাত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বরেন্দ্রের দক্ষিণ অংশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এর বিপরীতে উত্তরে বাড়তে পারে ১১ শতাংশ।
বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি হয় গ্রীষ্মে। এ অঞ্চলে বর্তমানে যে আবহাওয়া বিরাজ করছে, তাতে ২০২০, ২০৩০, ২০৪০ ও ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রতি দশকেই বরেন্দ্রের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশে বৃষ্টিপাত হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে উত্তর অংশে প্রতি বছর বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও সেটির পরিমাণ দক্ষিণের হ্রাসের তুলনায় অনেক কম।
শুধু গ্রীষ্ম নয়, বরেন্দ্রের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশে বৃষ্টিপাত কমছে বর্ষাতেও। এটিই মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছে। ১৯৬৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত বর্ষাকালে বরেন্দ্রের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশে বৃষ্টিপাত কমেছে বছরে ৩ দশমিক ১০ থেকে ৫ দশমিক ১১ মিলিমিটার হারে।
অন্যদিকে গ্রীষ্মের মতো বর্ষাতেও উত্তর অংশে বেড়েছে বৃষ্টিপাত। বছরে বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ১ মিলিমিটার। আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিদরা বলছেন, বরেন্দ্রের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত ভবিষ্যতেও কমতির দিকে থাকবে। বৃষ্টিপাত হ্রাসের প্রভাবে অঞ্চলটিতে তীব্র আকার ধারণ করবে খরা। এবং এই খরার পুনরাবৃত্তি ঘটবে ঘন ঘন।
বরেন্দ্র অঞ্চলে কমছে বৃষ্টিপাত, বাড়ছে তাপমাত্রা। প্রকৃতির এই দুই অনুষঙ্গের বিপরীতমুখী অবস্থানে বসবাসযোগ্যতা হারাচ্ছে মানুষ ও প্রাণী। বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। ১৯৬৪ সালের পর থেকে প্রতি বছরই এ অঞ্চলের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা দশমিক শূন্য ১ থেকে দশমিক শূন্য ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। এ অঞ্চলে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে ২০২০ সাল নাগাদ বার্ষিক তাপমাত্রা বাড়বে আরো দশমিক ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ২০৫০ সাল নাগাদ বার্ষিক গড় তাপমাত্রা বর্তমান সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাবে। গত ৫০ বছরের তাপমাত্রা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জানুয়ারি ছাড়া বাকি ১১ মাসেই তাপমাত্রা বেড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চলে।
১৯৬৪ সালে রাজশাহী অঞ্চলের গড় বার্ষিক তাপমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১০ সালে তা বেড়ে ২৫ দশমিক ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়ায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ এ অঞ্চলের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা হবে ২৫ দশমিক ৬৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০৫০ সাল নাগাদ ২৬ দশমিক ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত হবে।
বৃষ্টিপাত কমছে। বাড়ছে তাপমাত্রা। সঙ্গে বাড়ছে বাতাসের আর্দ্রতাও। ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে বাতাসের আর্দ্রতার পরিমাণ বছরে দশমিক শূন্য ১ থেকে দশমিক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ২০৫০ সাল নাগাদ অঞ্চলটিতে আর্দ্রতার পরিমাণ গড় ভিত্তি স্তরের তুলনায় ৬ থেকে ১১ ভাগ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।
বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমছে। বাড়ছে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা। এসব বিষয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। ১৯৭৫ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ দশমিক ৮৬ থেকে ১৭ দশমিক শূন্য ৯ মিটার উপরে ছিল। গত দশকে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ ২২ দশমিক ৩৭ মিটার উপরে ছিল। গত দশকে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি বছরই তা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দশমিক শূন্য ১ থেকে দশমিক শূন্য ৩ মিটার পর্যন্ত হ্রাস পাচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ১৯৬৪-২০১০ সময়ে বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে গড় বার্ষিক ভূগর্ভস্থ পানি পুনঃসঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল গড়ে ২৪২ মিলিমিটার। আর যদি শুধু গত দশকের হিসাব বের করা হয়, তাহলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩০ মিলিমিটার। অর্থাৎ ১৯৬৪ থেকে ২০০০ সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি সঞ্চয় হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সময়ে তার পরিমাণ শতকরা ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
খরার সময় কৃষি উৎপাদনে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে। এমনিতেই ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমছে। এ অবস্থায় সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করায় বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূর্গভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয়ের চিত্রটিকে সংকটময় অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের আবহাওয়া পরিস্থিতি দক্ষিণের তুলনায় উত্তর অংশে মোটামুটি ভালো। এ কারণে দক্ষিণ অংশে যখন ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ দিন দিন কমছে, তেমনি বাড়ছে উত্তর অংশে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ বরেন্দ্রের দক্ষিণ অংশে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ ১০ ভাগ পর্যন্ত কমে যাবে। অন্যদিকে উত্তর অংশে তা ৪ ভাগ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইভাবে পশ্চিম অংশে কমছে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ, বাড়ছে পূর্ব অংশে। ভূগর্ভস্থ পানির এ বৈপরীত্যের কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে উঁচু মাত্রার ভূগর্ভস্থ পানি বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে বরেন্দ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলবে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, যার সঙ্গে খরা পরিস্থিতি ও এর পুনরাবৃত্তি এবং চাষাবাদের জন্য পানির অপ্রতুলতার সম্পর্ক রয়েছে। এ অঞ্চলের খাদ্যশস্য উৎপাদন মৌসুম তিনভাগে বিভক্ত। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে রবি, মার্চ থেকে জুনে খরিপ ১ এবং জুলাই থেকে অক্টোবরে খরিপ ২ মৌসুমের খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে রবি মৌসুমের কৃষি উৎপাদন। এ মৌসুমে সাধারণভাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে ও তাপমাত্রা বেড়েছে। এর ফলে সম্ভাব্য বাষ্প নির্গমন ২০৫০ সাল নাগাদ বর্তমানের গড় ভিত্তিস্তরের তুলনায় ১৩ থেকে ১৮ ভাগ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ডিসেম্বর মাসের শেষ নাগাদ উচ্চফলনশীল জাতের ধান গাছ ও অন্যান্য শস্য এবং শাকসবজি উৎপাদনে বেশি পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানির প্রয়োজনীতা দেখা দেবে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচের দিকে নামতে থাকায় খাদ্যশস্য ও শাকসবজি উৎপাদনে নেতিবাচব প্রভাব ফেলবে।
মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে বরেন্দ্রের দক্ষিণাংশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে আসে। এখানে গত দশকে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ভিত্তিস্তরের তুলনায় শতকরা ১১ ভাগ কমেছে। অন্যদিকে তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক শূন্য ৪৩ থেকে দশমিক শূন্য ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরো চরম আকার ধারণ করবে। গত দশকে বরেন্দ্রের দক্ষিণাংশে গড় বাষ্প নির্গমন ২ থেকে ৭ ভাগ পর্যন্ত বেড়েছে। ২০৫০ সাল নাগাদ বাষ্প নির্গমন শতকরা ১০ থেকে ২৩ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে কার্যকর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে শতকরা ৩ থেকে ৩৬ ভাগ, যা ২০৫০ সাল নাগাদ আরো হ্রাস পেয়ে শতকরা ২০ থেকে ৭০ ভাগে চলে যেতে পারে। এর ফলে খরিপ ১ মৌসুমের কৃষি উৎপাদন খরাজনিত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। অন্যদিকে বরেন্দ্রের উত্তর অংশে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক বাড়লেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সেখানে বাড়ছে বাষ্প নির্গমনের পরিমাণ। এ কারণে বরেন্দ্রের উত্তর অংশেও অধিক হারে সম্পূরক সেচের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।
জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারা দেশেই প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে বর্ষার এ মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রতি বছরই কমে যাচ্ছে। এর বিপরীতে বাড়ছে তাপমাত্রা। গবেষকরা বলছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ বরেন্দ্র অঞ্চলে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ভিত্তিস্তরের চেয়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে বাষ্প নির্গমনের হার বাড়বে ১৮ থেকে ২৬ শতাংশ। এসব কারণে খরিপ ২ মৌসুমে সম্পূরক সেচের পরিমাণ বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে কৃষি উৎপাদন তথা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সেচ ব্যবস্থাপনা অধিক হারে ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর হয়ে পড়বে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের নিত্যসঙ্গী খরা। দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে বৃষ্টিপাত কম। ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির পরিমাণও কম। বরেন্দ্র অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত ছোট নদীগুলো বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই শুকিয়ে যেতে শুরু করে। বৃষ্টিপাতের স্বল্পতা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, বৃক্ষসম্পদ উজাড় হয়ে যাওয়া, পানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে স্পষ্টতই এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, রাজশাহীসহ সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সার্বিকভাবে কমেছে। কিন্তু তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানি সেচকাজে অধিকহারে ব্যবহারের ফলে এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। ২০০০ সালের আগ পর্যন্ত বর্ষাকালে এ অঞ্চলে পানির স্তর আগের অবস্থায় ফিরে যেত। বর্তমানে আর এমনটি হচ্ছে না। ভূগর্ভস্থ পানির আধারে পুনঃসঞ্চয়ে ক্রমাগত ঘাটতির সঙ্গে সঙ্গে সেচের পানির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাবে অঞ্চলটির খরা পরিস্থিতি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বিপর্যস্ত হচ্ছে জীবনযাত্রা। খরা পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরো তীব্র আকার ধারণ করবে। পরিস্থিতি আরো তীব্র আকার ধারণ করলে কৃষিকাজের জন্য আরো বেশি ভূগর্ভস্থ পানির প্রয়োজন হবে, যা শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলের শস্যভাণ্ডার, কৃষি ও জীবনযাত্রায় মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
কালের বৈরিতা আর মানুষের সীমাহীন অপরিণামদর্শিতার কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ের হাত থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলকে বাঁচাতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন সম্পর্কে আমাদের ভাবতে হবে। সেচকাজে পানি সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহারের জন্য সর্বোত্তম সেচ ব্যবস্থাপনার নীতি আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ অঞ্চলে খরার ভয়ানক প্রভাব মোকাবেলায় পানি সরবরাহ বৃদ্ধি, জুতসই পানি ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতা ও জ্ঞান বৃদ্ধি করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জলসম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা, ভূ-উপরিস্থ ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রম ভীষণভাবে জরুরি। সে লক্ষ্যে বিদ্যমান বন্যা, সামুদ্রিক বন্যা ও খরাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
লেখক: সাবেক উপ-উপাচার্য ও অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়





