বণিক বার্তা ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভেজাল ও দূষণরোধে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রকাশ হলো—

 

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার

আমাদের বাজারগুলোর পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ। খাদ্যে ভেজাল প্রবেশ করার মতোই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে খাদ্য দূষিত হচ্ছে। আমরা আজকের আলোচনা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়ে একমত হতে পারছি, তা হলো কিছুদিন আগেও আমাদের মাঝে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মানেই ধরো-মারো-শাস্তি দাও— এমন এক ধরনের মানসিকতা ছিল। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা থেকে আমরা সরে এসে কৃষক থেকে ভোক্তাপর্যায়ে সচেতনতা তৈরির কাজটি করার মাধ্যমে ভেজাল ও দূষণ রোধ করার উপায় বের করছি। এটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। মিডিয়ার ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যে ভেজাল ও দূষণরোধে সচেতনতা তৈরির চেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা বেশি তাত্পর্যপূর্ণ। না বোঝার কারণে ফরমালিনের উপস্থিতির দোহাই দিয়ে ট্রাকে ট্রাকে আম পিষ্ট করে নষ্ট করার বিষয়টি পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। মাঝখান থেকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং জনসাধারণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আপনাদের কার্যক্রম দৃশ্যমান করাটা অত্যন্ত জরুরি। আমি এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে একটি শক্ত অবস্থান তৈরির অনুরোধ করব। সুষ্ঠুভাবে কাজ করার জন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ক্ষমতায়নটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা প্রদান ও দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী করে তুলতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করা না হলে যতই সমস্যার কথা বলা হোক তা সমাধানের উপায় বাস্তবায়ন দুরূহ হয়ে পড়বে। খাদ্যে ভেজালের চেয়েও দূষণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় কাঁচাবাজারগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সচেষ্ট হতে হবে। এক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনকে নিয়মিত আলোচনা করে নিজ নিজ কর্মপরিধি তৈরি করতে হবে। পরিষ্কার বাজারের বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে সবাইকেই। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কারণ তারা খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করে ভোক্তার হাতে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলোয় শক্তিশালী ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ খাদ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠদান শুরু করা জরুরি। কর্তৃপক্ষকে নিরাপদ খাদ্য বাস্তবায়নে খাদ্যশিক্ষা ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রদান ও গবেষণা ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট একাডেমিয়ার সঙ্গে কার্যকর যোগসূত্র স্থাপন করতে হবে। এসডিজির সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পুষ্টি, শিক্ষাসহ বহুমাত্রিক বিষয় জড়িত। তাই নীতিনির্ধারকদের কাছে এ বিষয়গুলো উপস্থাপন করে শুধু ভেজাল প্রতিরোধই নয়, দূষণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়ার জন্য জোরালো অবস্থান তুলে ধরা যেতে পারে। অবৈজ্ঞানিক সচেতনতার মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্তিতে না ফেলে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ থেকে সাধারণ মানুষকে সচেতন রাখতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী ভূমিকা দেখতে চাই।

 

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ

সম্পাদক, বণিক বার্তা

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ মূলত নতুন একটি প্রতিষ্ঠান। একটা সময় ছিল, যখন আমাদের দেশে খাদ্য উত্পাদন সংখ্যাগত দিক থেকে বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। কিন্তু একপর্যায়ে গিয়ে সরকারের সব মহল অনুধাবন করল, এককভাবে উত্পাদনের পরিমাণ বাড়ালে চলবে না, এর গুণগত মান ও স্বাস্থ্যসম্মত দিকটিও গুরুত্ব দিতে হবে। এরই ফলোআপ হিসেবে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণীত হয়, যা ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কার্যকর করা হয়। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে। নতুন প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এর দায়িত্ব অনেক বড়। এ প্রতিষ্ঠানকে সফল করতে সবার সমন্বিত প্রয়াস জরুরি।

 

মোহাম্মদ মাহফুজুল হক

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। কিন্তু সেসব উদ্যোগের মাধ্যমে উত্পাদনের মাঠ থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত ভেজাল ও দূষণমুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স ১৯৫৯ রহিত করে ২০১৩ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যুগোপযোগী, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে এবং তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহে বাংলাদেশের আপামর জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে— বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা; খাদ্য উত্পাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, মজুদ বিপণন, পরিবহন ও বিক্রয়— পুরো যে খাদ্যশৃঙ্খল আছে, মাঠের উত্পাদন থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত সব শৃঙ্খল সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ ও কার্যকর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা। এরই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। মূলত এর পর থেকে আমাদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। বাংলাদেশে এখন প্রায় ১২টি মন্ত্রণালয় এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন দপ্তর, সংস্থা, অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকারের প্রায় ৪৮০টি প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এছাড়া আমাদের যেসব খাদ্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আছে, তাদের ১২০টিরও বেশি আইন, বিধি, প্রবিধি, নীতিমালা ইত্যাদি রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ খাদ্য ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ১৫ লাখ প্রত্যক্ষ ও বাকি ১০ লাখ পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। খাদ্য নিরাপদ রাখার বিষয়ে তাদের জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এরই মধ্যে ২৪২ জন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও কারিগরি খাদ্য পরিদর্শককে নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকের দায়িত্ব দেয়ার পাশাপাশি কিছু ল্যাবরেটরিকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত ও ছয়টি মেট্রোপলিটন সিটিতে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর মধ্যে নিরাপদ খাদ্য আইনে তফসিলভুক্ত করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে, নিরাপদ খাদ্যের জন্য আমাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেগুলো বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একার পক্ষে বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন। আমরা একদিকে নিরাপদ ও মানসম্পন্ন নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চাই, অন্যদিকে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিবেচনায় নিয়ে সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও  সুলভে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চাই।

অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন

সদস্য, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের উত্স, ঝুঁকিগুলো এবং আমাদের করণীয়— এটাই আমার আলোচ্য বিষয়। খুঁজে বের করব কোনগুলো সত্যিকার অর্থে ঝুঁকি      বা কোনগুলো অনুমানভিত্তিক। মূল খাদ্যদ্রব্য থেকে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু সরিয়ে নেয়া হয় কিংবা নতুন কিছু যোগ করা হয়, যা আমাদের মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা এর পুষ্টিমান কিংবা গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়, তাকে আমরা ভেজাল খাদ্য বলব। আর যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে খাদ্য দূষিত হয়ে যায়, তখন আমরা তাকে বলি দূষণ। সেটা হতে পারে অণুজৈবিক কিংবা রাসায়নিক দূষণ। যেমন— দুধে যদি পানি মেশানো হয়, তাকে আমরা ভেজাল খাদ্য বলব। তবে পানি যদি বিশুদ্ধ হয়, তাহলে দুধের গুণগত মান কমে গেল, কিন্তু এটা অনিরাপদ নয়। তরমুজে রঙ মেশানোর খবরে বেশ হইচই হয়েছে কয়েক দিন। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বাজার থেকে সংগৃহীত ৫০টি তরমুজের নমুনায় কৃত্রিম রঙের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অথচ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এসেছে, তরমুজে বিষাক্ত রঙ দিয়ে লাল করা হচ্ছে। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ইনজেক্ট করা হচ্ছে। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট হচ্ছে একটি অক্সিডাইজিং এজেন্ট বা জারক, যার ব্যবহারে তরমুজের রঙ লাল নয়, বরং কালো হয়ে যাবে। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে আমি বলব না যে ভেজাল নেই, ভেজাল অবশ্যই আছে। কিন্তু আমাদের নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর শুরুতেই বলা আছে, বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চার অনুশীলন করতে হবে। ফরমালিন দিয়ে ভেজাল খাবারে বাজার সয়লাব, কার্বাইড দিয়ে খাবার বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে— প্রতিনিয়ত এসব নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্নার মতো বিষয়গুলো সামনে আসছে না। অথচ এগুলো আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। খোলাবাজারে ফল কিংবা মাংস সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সাজিয়ে রাখা হচ্ছে, ব্যাকটেরিয়াসহ নানা জীবাণুর আক্রমণ হচ্ছে— এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা কম। যেকোনো খাদ্য রান্নার পর ৪ ঘণ্টা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে দিলে তাতে অনুজৈবিক দূষণ ঘটতে শুরু করে। কাঁচা ও রান্না করা খাবার এক জায়গায় রাখলেও দূষণের ঝুঁকি থাকে। কাঠ বা কয়লা দিয়ে মাছ বা মাংস গ্রিল করলে তা পলিঅ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন নামক রাসায়নিক দূষক দ্বারা দূষিত হয়, যা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। উত্পাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পৌঁছা পর্যন্ত খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন পর্যায়ে দূষণ নিরাপদ খাদ্যের জন্য অন্যতম হুমকি।

 

অধ্যাপক নাজমা শাহীন

পরিচালক, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

খাদ্যনিরাপত্তার তিনটি উপাদান— ফুড প্রডাকশন, অ্যাক্সেসেবিলিটি ও ইউটিলাইজেশন। খাদ্য উত্পাদনে আমরা অনেকটাই এগিয়ে গেছি। অনেক খাবার আমাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এসেছে। অথচ আমরা যেখানে হোঁচট খেলাম, সেই জায়গাটা হলো ইউটিলাইজেশন। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার এখনো পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালে ফুড কম্পোজিশন টেবিলের জন্য ফুড অ্যানালাইসিস করার সময় অনেক খাবারেই আমরা প্রচুর পরিমাণে হেভি মেটালস পাই। এছাড়া শিল্পবর্জ্য পোলট্রি ফিডে ব্যবহারের কারণে ডিম ও মুরগির মাংসে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতিও ধরা পড়ে। আমাদের গবেষক দল ও গণমাধ্যম কর্মীদের প্রচেষ্টায় সে সময় এর উত্স আবিষ্কার করতে সক্ষম হই। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি উদ্যোগে পোলট্রি ফিডে ট্যানারি ওয়েস্ট বন্ধ হয়। একটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, দুধে পানি মেশালে তা ভেজালের মধ্যে পড়ে। আর পানি যদি নিরাপদ হয়, তাহলে দুধ অনিরাপদ হয়ে যাবে না। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, এতে দুধের পুষ্টিগুণ কমে গেল।  নিরাপদ খাদ্য যদি নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে অবশ্যই পণ্যের গায়ে যাবতীয় তথ্য উল্লেখ করতে হবে। খাদ্যের পুষ্টিগুণ, কোন উপাদান কী পরিমাণে মেশানো হয়েছে, সবকিছুর উল্লেখ থাকতে হবে। গত ১৫ মার্চ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ একটি গেজেট প্রকাশ করেছে, যেখানে খাদ্যে কী কী ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে, সেগুলো বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ মুহূর্তে কাজ হলো, এগুলো ধরে তদারক করতে হবে। খাদ্য উত্পাদনে কৃষি কিংবা গবাদিপশু পালনে কৃষক পর্যায়ে যেমন কীটনাশক, গ্রোথ হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হচ্ছে, তেমনি যারা প্রক্রিয়াজাত করছে, তারা ফুড অ্যাডিটিভ, প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করছে। এসব প্রতিরোধে কৃষক পর্যায়ে গুড প্র্যাকটিস নিশ্চিত করতে হবে।

 

কৃষিবিদ চৈতন্য কুমার দাস

পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

(সরেজমিন উইং)

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (গ্যাপ) হাতে নিয়েছে, সেটা মূলত একটি সার্টিফিকেশন সিস্টেম। সিস্টেমটি কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের অনুমোদন। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের কাছে আমরা এ সার্টিফিকেশনের জন্য আবেদন জানিয়েছি। সত্যিকার অর্থে উদ্যোগটা দেশের ব্যবসায়ীদের নেয়ার কথা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ব্যবসায়ীরা এসবের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে চান না। এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে রুট লেভেলে যেসব কর্মী কাজ করবেন, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া ৩২০ জন কৃষকের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। উত্পাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত যে কার্যকলাপ, তা একটি সিস্টেমের মধ্যে অনুসরণ করানো এবং একটা ম্যানুয়াল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমাদের দেশে প্রায় ১২৭টি শস্য মাঠে হয়, এর প্রতিটির আলাদা ম্যানুয়াল তৈরি করে গ্যাপের যে তথ্য, তা লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। এছাড়া রফতানিকারকদের সুবিধার জন্য কনট্যাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে কৃষকের পণ্য সরবরাহ করে ইউরোপিয়ান বাজারে রফতানি করা হচ্ছে। একটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য, ইউরোপের বাজারে আমাদের যেসব পণ্য নন-কমপ্লায়েন্স হচ্ছে, তার পেছনে বিষক্রিয়া নয়, দায়ী পোকামাকড় ও মাইক্রো অর্গানিজম দ্বারা দূষণ।

 

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান

ন্যাশনাল ফুড সেফটি কনসালট্যান্ট (এফএও)

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নেয়া। এজন্য গ্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তাপর্যায়ে। এর কোনো বিকল্প নেই। এর মধ্যে অনেক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়, যেখানে গ্যাপ হলো অন্যতম। গ্যাপ অনুসরণ করার জন্য কৃষকের ওপর আমরা চাপ সৃষ্টি করতে পারব না। কিন্তু রফতানি কিংবা ভোক্তার হাতে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দিতে কিংবা এর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে এ মানদণ্ড অনুসরণ করতেই হবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় জাতীয় পর্যায়ে গ্যাপ অনুসরণ করা হয়। তবে সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ গ্যাপ’ বলে একটা স্ট্যান্ডার্ড অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শুনলে অবাক হবেন, বাংলাদেশে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান গ্যাপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার নাম এগ্রি কনসার্ন বাংলাদেশ। পুরো ফুড সাপ্লাই চেইনের জন্য ভেজাল ও দূষণ একটা বড় ধরনের হুমকি। তবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যেভাবে এগোচ্ছে, সে হুমকি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে— এটাই প্রত্যাশা। 

গোলাম রহমান

সভাপতি, কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

ধন্যবাদ মাননীয় সভাপতি। আজকের এ আলোচনা সভার মূল উপস্থাপনাটি আমাদের অনেক ভ্রান্ত ধারণা দূর করবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ১২টি মন্ত্রণালয় জড়িত। মন্ত্রণালয়গুলোর অনেক বিভাগ, উপবিভাগ, অধিদপ্তর রয়েছে, অনেক জনবল রয়েছে। আমি মনে করি, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষেরও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল থাকা দরকার। সরকার দুই বছরে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি, এটা খুবই দুঃখজনক। আমি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ আরো কয়েকটি নবগঠিত সংস্থাকে সক্রিয় করার জন্য ব্যবস্থা নিতে বেশ কয়েকবার মাননীয় অর্থমন্ত্রীকেও বলেছি। জানি না তিনি এ বাজেটে কোনো ব্যবস্থা রেখেছেন কিনা। আমরা আশা করব, সরকার শুধু প্রপাগান্ডার জন্য আইন করবে না। আইনের যেন সত্যিকারের বাস্তবায়ন হয়, সে দাবি জানাচ্ছি। জনসচেতনতার জন্য যা করা দরকার, সেক্ষেত্রে ক্যাব অবশ্যই আপনাদের সঙ্গে থাকবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জেলাপর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা গেলে এটা আরো জোরদার হবে। ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূরীকরণে গণমাধ্যমকে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।  তরমুজে রঙ দেয়া বা প্লাস্টিকের ডিমের মতো ভ্রান্ত ধারণাগুলো সামাজিক গণমাধ্যমে অপপ্রচারণার মাধ্যমে যারা সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তা না হলে তারা প্রশ্রয় পেয়ে যাবে এবং বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকবে।

 

শাহ মাহ্ফুজুর রহমান

ফুড সেফটি ইউনিটের প্রধান, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিরাপদ খাদ্য-সংক্রান্ত যত দিক রয়েছে, তার পুরো অংশকেই আবৃত করে। আমাদের মাঠপর্যায়ে ৬০০ মাঠকর্মী রয়েছে, যারা খাদ্য পরিদর্শনের পাশাপাশি লাইসেন্স প্রদান, প্রশিক্ষণ প্রদান প্রভৃতি কাজও করে থাকে। আমাদের ল্যাবরেটরি রয়েছে, যেখানে খাদ্য পরিদর্শকদের পাঠানো খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়। বিগত বছরে আমে ফরমালিনের উপস্থিতি-সংক্রান্ত যে ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানো হয়েছিল, তা আমাদের ল্যাবরেটরিতেই পরীক্ষার মাধ্যমে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মোট ছয়টি দপ্তর রয়েছে, একেকটি দপ্তর একেক অংশ নিয়ে কাজ করে থাকে। তিনটি ইনস্টিটিউট রয়েছে। আমরা সারা দেশে ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস ও টাইফয়েডের মতো খাদ্য থেকে উদ্ভূত রোগগুলো নজরদারিতে রেখেছি। আমাদের ভালো কৃষিজ চর্চা, গৃহপালিত পশুপালনসহ মত্স্য বা প্রাণিসম্পদ নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হতে হবে। যারা প্রাথমিক পর্যায়ে উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত, তাদের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, পণ্যের আদর্শগত মান নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন করতে হবে। মান নিয়ন্ত্রণে আরো ক্লোজ মনিটরিং দরকার। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা ল্যাবরেটরিগুলোর মাঝে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা দরকার। বিভিন্ন ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণে ফি হ্রাস করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

 

মীর এমদাদ আলী

পরিচালক ও উপস্থাপক, কৃষি খামার ও উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠান ‘সোনালী দিন’, এটিএন বাংলা

নিরাপদ খাদ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মিডিয়ার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত প্রদানের দায়িত্ব থাকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের, যারা এ বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের সে দায়িত্ব ও তথ্য প্রদান করলে আমরা তা প্রচার ও উপস্থাপনা করতে পারব। আজকের বিষয়ে আলোকপাত করলে আমাদের করণীয় আমরা দুভাগে ভাগ করতে পারি। একটি হচ্ছে, সরাসরি কৃষকের উত্পাদিত পণ্য ভোক্তার কাছে নিরাপদভাবে আনা এবং অন্যটি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য সরবরাহ করা। প্রথমটি নিয়ে বললে সরাসরি ভোক্তার কাছে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দেয়ার জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের একটা দৃশ্যমান টিম দরকার। সাধারণ জনগণ যদি পণ্য ক্রয়ের আগে বাজারপর্যায়ে সেই টিমের সদস্যদের দ্বারা নিশ্চিত হয়ে নিরাপদ পণ্য ক্রয় করতে পারে, তাহলে সেটা আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে যদি এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম সচেতনভাবে বেড়ে উঠবে। ভেজাল রোধে মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার ফলে কিন্তু সাধারণ মানুষের কিছুটা হলেও ভীতি দূর হয়। খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ চিহ্নিতকরণে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়, তা নিয়ে এসে মোবাইল টিমের হাতে দেয়া যায় কিনা, সে বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে। আমরা যেসব খাবার আমদানি করছি, সেগুলোর মান নিয়ন্ত্রণে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

ডা. খালেদা ইসলাম

পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (প্রাইমারি হেলথ কেয়ার)

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যে ৬০০ স্যানিটারি ইন্সপেক্টর রয়েছেন, তারা মাঠপর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের জন্য কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন, বাজার সমিতির সঙ্গে মিটিং করছেন। বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও কমিউনিটি ক্লিনিকে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত মিটিং করছেন। বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, বেকারি বা ফুড ভ্যানগুলোর অন্তত একজন কর্মচারীকে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন। তারা মোবাইল কোর্টকে খাদ্য পরিদর্শনে সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি নিজেরাও পরিদর্শন করছেন এবং নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠাচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে ইন্সপেক্টরদের কার্যক্রমের ফলোআপ করা হচ্ছে। ব্যাচ অনুসারে নিয়মিত তাদের দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। আমাদের খাদ্যে লবণ ও চিনির পরিমাণ নিয়ে ভবিষ্যতে সচেতন থাকতে হবে। কারণ ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ দুটোই এ লবণ ও চিনির ওপর অনেকটা নির্ভর করে।

 

একেএম নুরুল আফসার

ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএফএসবি, এফএও

আমি মনে করি, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণরোধে একটি ত্রিমাত্রিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, যার উপরের দিকে থাকবে খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা। দ্বিতীয় কোণে থাকবে খাদ্য উত্পাদক। এবং সর্বশেষ কোণে থাকবে ভোক্তা। খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল কাজ হবে স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দেয়া। কীটনাশক বা ফল পাকানোর মেডিসিনের সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়া এবং সঠিক প্রয়োগ বাস্তবায়ন করা, যারা খাদ্য উত্পাদনে জড়িত, তারাও আইনের আওতাভুক্ত— এ বিষয়টি তাদের যত দ্রুত জানিয়ে দেয়া যাবে, ততই তারাও সাবধান হয়ে যাবে। কারণ খাদ্য উত্পাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত তারাই জড়িত। তৃতীয়ত, ভোক্তা যদি সচেতন থাকে, তাহলে ভেজাল খাদ্য গ্রহণ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যাবে। সর্বশেষ বলব, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আরো আধুনিক ও উন্নত একটি সংস্থায় রূপ দেয়া হলে দেশের মানুষের নিরাপদ খাদ্যগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

শাহনূর রহমান

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, টিআইবি

নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে ২০১৩ সালে আমরা ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করি। এখানে সুশাসনের চারটি নির্দেশক অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, সেবার মান এবং দুর্নীতি। এ গবেষণায় আমরা ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করি। এগুলো হলো: পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কাস্টম হাউজ, মোবাইল কোর্ট। আমরা চারটি পরীক্ষাগারকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম— পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি, পাবলিক হেলথ ফুড ল্যাবরেটরি, বিএসটিআই ও কাস্টম হাউজগুলোর ল্যাবরেটরি। গবেষণায় আমরা দেখেছিলাম, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নিরাপদ খাদ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তদারকি প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তর ও অধিদপ্তরের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে।

 

ডা. শেখ শাহিনূর ইসলাম

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর

প্রাণীর খাবারে দূষণ রয়েছে কিনা, সেটা মাঠপর্যায়ে অভিযানের মাধ্যমে চিহ্নিতকরণ ও নিয়ন্ত্রণে আমরা সজাগ। বিভিন্ন সময়ে ভেজাল পোলট্রি ফিড চিহ্নিত করে তা বাজেয়াপ্ত এবং জরিমানা আদায় করা হয়। কয়েক বছর আগেও ট্যানারি বর্জ্য দ্বারা পোলট্রি ফিড দূষিত হলেও বর্তমান সময়ে নানা পদক্ষেপের কারণে সে অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছি। আমরা ৪৫টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে খামারির সংখ্যা ছিল ৫০০। এখন এর দ্বিতীয় পর্যায় চলছে, যেখানে খামারির সংখ্যা এক হাজার। আমরা তাদের ব্যবহারিক ধাঁচ পরিবর্তনের জন্য কাজ করছি। তারা যেন ভালো মুরগির বাচ্চা পালন, বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার, অ্যান্টিবায়োটিক কম ব্যবহার এবং ভালো খাদ্য ব্যবহার করে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছি। সারা দেশে গরুর খামারিরা যেন রমজান ও ঈদ সামনে রেখে স্টেরয়েড ব্যবহার না করেন, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রেখেছিলাম। আমাদের দেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত কসাইখানার সংকট রয়েছে বিধায় ভালো মানের পশু জবাই করার পরও সেটা নানা কারণে দূষণের মুখে পড়ছে।

 

কৃষিবিদ মো. কুদরত-ই-গণী

পরিচালক, হর্টিকালচার উইং

আমাদের হর্টিকালচারের মধ্যে ফলমূল ও শাকসবজি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আমরা এগুলোর দূষণ প্রতিরোধে যথেষ্ট সোচ্চার। যতটা দূষণের কথা বলা হয়ে থাকে, প্রকৃতপক্ষে চিত্রটা তত ভয়াবহ নয়। আমরা বর্তমান সময়ে কীটনাশক প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে নতুন কিছু প্রযুক্তির  ব্যবহার শুরু করেছি। কৃষকপর্যায়ে এটি ভালো সাড়া ফেলেছে। ফলে তারা শাকসবজি ও ফলমূলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে এনেছেন। কীটনাশকের আমদানি কমেছে। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কীটগুলোর মধ্যে এক ধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে। ফলে এ বিষয়েও আমরা তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের কীটনাশক আমদানি ও প্রয়োগের জন্য পরামর্শ প্রদান করছি।

 

শ্রুতিলিখন: মাহবুবুল হাসান ও সানজীদা হাসান

আলোকচিত্র: কে কে নয়ন