বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের জন্ম ১৯৮৯ সালের ৩ এপ্রিল। স্বাধীনতার পূর্বে এ অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৪ সালে ওজিডিসি অব পাকিস্তান নামে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমে ওজিডিসি (বাংলাদেশ) ও ‘তৈল সন্ধানী’-এর অধীনে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর পর ১৯৭৪ সাল থেকে বাপেক্স প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত অনুসন্ধান চলে পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান পরিদপ্তরের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাপেক্স তার পূর্বসূরি পেট্রোবাংলার প্রেষণে নিযুক্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও ক্ষতির দায়ভার নিয়ে যাত্রা শুরু করে (সূত্র: বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০১৫, বাপেক্স, পৃ: ১৭)। তাছাড়া শুরু থেকেই এর আর্থিক দিকগুলো, যেমন— তার আয়, স্থায়ী খরচ, অনুসন্ধান ও খনন খরচ সবকিছুই দারুণ অনিশ্চয়তার মাঝে পড়ে। একেকটি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ লম্বা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার কারণে বাপেক্সের কাজ হয়ে পড়ে দারুণ মন্থর। বছরের শুরুতে ঘোষিত বরাদ্দটুকু যে কত দিনে আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, অসংখ্যবার সংশোধিত বাজেট হয়ে সেটি বাপেক্সের হাতে আসে অনেক খর্বিত আকারে, কখনো কখনো আসে অর্থবছরের একদম শেষ সময়ে— খুব অল্প সময়ে সেই বরাদ্দটুকু খরচ করে ফেলার একটি তাগিদ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির সুযোগসহকারে। আর এসবের মাঝে পড়ে সে সময় থেকেই শুরু হয় বাপেক্সের দক্ষ লোকদের বাইরে চলে যাওয়া। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়, যখন নব্বইয়ের দশকজুড়ে দেশের স্থল ভাগের সম্ভাবনাময় গ্যাস ব্লকগুলো পিএসসির মাধ্যমে একের পর এক বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া হয়। এ রকম একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বাপেক্স যতটুকু সুযোগ পেয়েছে, দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। বর্তমানে এসব কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বাপেক্স ভূতাত্ত্বিক এবং ভূপদার্থিক উপাত্ত সংগ্রহ ও মূল্যায়ন, বেসিন পর্যালোচনা, ভূরাসায়নিক বিশ্লেষণ, কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার, কূপ সেবা, পূর্ত উন্নয়ন ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। অথচ দেশের গ্যাস ব্লক বিদেশী কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার যুক্তি হিসেবে প্রায়ই বাপেক্সের অযোগ্যতা/অদক্ষতার অজুহাত দেখানো হয়। তেল-গ্যাস-কয়লা উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় খাতের দুর্বলতা সম্পর্কে প্রচলিত (অপ) প্রচার-প্রচারণার আড়াল সরিয়ে এখানে বাপেক্সের অর্জিত সক্ষমতা, বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিষয়ে বিচার-বিশ্লেষণের চেষ্টা করা যাক।

বাপেক্সের সক্ষমতা:

ক) সাফল্যের হার

পিএসসির আওতায় বিদেশী কোম্পানিগুলো ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ২৭টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে ছয়টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। অন্যদিকে বাপেক্স ১৯৮৯ সালে গঠিত হওয়ার পর থেকে আটটি অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে, যার মধ্যে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। (সূত্র: বার্ষিক প্রতিবেদন, পেট্রোবাংলা, ২০১৫, পৃ: ৩২, ৩৫) অর্থাৎ কূপ খনন ও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানির সাফল্যের অনুপাতের তুলনায় (৪.৫:১) বাপেক্সের সাফল্যের অনুপাত (১.৬:১) অনেক ভালো। এছাড়া বাপেক্স এ সময়ে ৩০টি উত্তোলন কূপ খনন করেছে এবং ২৭টি কূপে সফলতার সঙ্গে ওয়ার্কওভার বা সংস্কারকাজ সম্পন্ন করেছে। (সূত্র: বার্ষিক প্রতিবেদন, বাপেক্স, ২০১৫, পৃ: ১৯) দেখা যাচ্ছে, যে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতাহীনতার কথা বলে বহুজাতিক কোম্পানি ডেকে আনা হয়, সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের হার বাংলাদেশে কর্মরত ওইসব বিদেশী কোম্পানির সাফল্যের হারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি!

খ) নির্ভরযোগ্যতা

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য মুনাফা। ফলে মুনাফার জন্য বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, জাতীয় সম্পদ কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য ইত্যাদি বিসর্জন দেয়া এসব তথাকথিত দক্ষ ও অভিজ্ঞ বহুজাতিকের জন্য কোনো ব্যাপার-ই নয়। ফলে অক্সিডেন্টাল ও নাইকোর মতো ‘উন্নত প্রযুক্তি’ওয়ালা কোম্পানিগুলোর হাতে মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার মতো পরিবেশ ও সম্পদবিনাশী দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। অথচ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সীমিত সম্পদ ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করলেও বাপেক্সের হাতে এ ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেনি। একইভাবে সাঙ্গু গ্যাস ফিল্ডের মতো তড়িঘড়ি করে ক্যাপাসিটির বেশি গ্যাস উত্তোলন করতে গিয়ে রিকভারেবল গ্যাস উত্তোলনের অনেক আগেই গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট করার ঘটনাও বাপেক্সের নেই।

গ) বহুজাতিকের সাবকন্ট্রাক্টর হিসেবে কার্যক্রম

দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার অজুহাতে বারবার বিদেশী কোম্পানিকে ডেকে আনা হলেও বাপেক্স তার সীমিত প্রযুক্তি দিয়েই স্থলভাগের গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ করতে সক্ষম। শুধু তা-ই নয়, নিজের জন্য ছাড়াও সার্ভিস কন্ট্রাক্টের আওতায় বাপেক্স বহুজাতিক কোম্পানিকেও অনেক কাজ করে দিয়েছে। যেমন— বাপেক্স ফেনী-২-এ নাইকোর একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে দেয়, তাল্লোর হয়ে লালমাই ও বাঙ্গোরায় সিসমিক সার্ভের কাজ করে, চাঁদপুরে একটি কন্ট্রোল পয়েন্ট স্থাপন করে দেয় এবং বাঙ্গোরায় তাল্লোর একটি কূপও (ওয়ার্কওভার) খনন করে দেয়।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাঙ্গোরায় তাল্লোর ওয়ার্কওভার কূপটি খননের জন্য বাপেক্স নেয় ১০ লাখ ডলার, যদিও বাপেক্সের খরচ হয় মাত্র ৫৩ লাখ টাকা। সাবকন্ট্রাক্টর হিসেবে বহুজাতিকের কাছ থেকে এত লাভ বাগিয়ে নিতে দেখে খুশি হওয়ার কিছু নেই। কারণ ওই ১০ লাখ ডলার কিন্তু ঠিকই তাল্লো তার রিকভারি কস্টের মধ্যে দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকেই আদায় করে নিয়েছে! আমরা কেবল আফসোস করতে পারি— আহা! ওই গ্যাসক্ষেত্র যদি বাপেক্সের হাতে থাকত, তাহলে তো ১০ লাখ ডলারের বদলে স্রেফ ৫৩ লাখ টাকায় কাজটি করে ফেলতে পারতাম আমরা।

ঘ) কম খরচ

পিএসসির মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করা হলে উত্তোলিত গ্যাসের একটা বড় অংশের মালিকানা বিদেশী কোম্পানির হাতে চলে যায় এবং নিজেদের গ্যাস বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে হয়। অথচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলন করা হলে একদিকে গ্যাসের মালিকানা যেমন জনগণের হাতে থাকত, অন্যদিকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের খরচও কম হতো। শুধু পিএসসিই নয়, এমনকি বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে সাবকন্ট্রাক্টিংয়ের কাজ করানো হলেও বাপেক্সের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি খরচ পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, শ্রীকাইল-৪ কূপ খননের জন্য বাপেক্সের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৬৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অথচ একই কূপ খননে রাশিয়ার গ্যাজপ্রম ব্যয় দেখিয়েছে ২৫০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, অর্থাৎ বাপেক্সের প্রায় চার গুণ। এর আগে তথাকথিত ফাস্ট ট্র্যাক প্রোগ্রামের আওতায় গ্যাজপ্রমকে দিয়ে যে ১০টি কূপ খনন করানো হয়, সেখানে কূপপ্রতি ব্যয় ছিল ১৯ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১৫৪ কোটি ৮ লাখ টাকা, অর্থাৎ বাপেক্সের ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতি লাইন কিলোমিটার সিসমিক সার্ভের জন্য বিদেশী কোম্পানিকে গড়ে ৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা করে খরচ দিতে হয়, সেখানে বাপেক্সের গড়ে খরচ হয় ১ লাখ টাকা করে।

বাপেক্সের সংকট:

ক) অপর্যাপ্ত, বিলম্বিত ও আংশিক বরাদ্দ

১৯৯৮ সালে বাপেক্স একটি নতুন রিগ কেনার জন্য ‘অপারেশন ক্যাপাবিলিটি স্ট্রেনদেনিং’ নামের একটি প্রকল্প তৈরি করে এবং বাপেক্স বোর্ড কর্তৃক সেটি অনুমোদিতও হয়। তার পরে ১৯৯৯ সালে পেট্রোবাংলা বোর্ডও এটি অনুমোদন করে, একই বছরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগও অনুমোদন করে। কিন্তু সেটি একনেকে পাস হতে হতে পার হয়ে যায় আরো চার বছর অর্থাৎ ২০০৩ সাল। এখানেই কাহিনীর শেষ নয়, বলা যায় শুরু। একনেকে ৮১ কোটি টাকা অনুমোদিত হলেও দেখা গেল তত দিনে রিগের আন্তর্জাতিক বাজারদর অনেক বেড়েছে এবং দরপত্রে অংশ নেয়া সর্বনিম্ন দাম ৩১ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ ১০৬ কোটি টাকা। ফলে টেন্ডার বাতিল হয়ে যায় এবং আবার তার দাম পুনর্মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হয়। প্রথম সংশোধিত বাজেট (১৪২ কোটি টাকা) আবার একনেকে অনুমোদিত হতে হতে পার হয়ে যায় ২০০৬ সাল, এবং যথারীতি এবারেও টেন্ডার মিস। এভাবে আরো কয়েকবার দরপত্র আহ্বান করে ও বাতিল করে অবশেষে পঞ্চমবারে ২৫৬ কোটি টাকা সংশোধিত বাজেটসহ ২০০৮ সালের নভেম্বরে দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে একটি চাইনিজ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদিত হয়। রিগটি দেশে এসে অপারেশনে গেছে ২০১১ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ-৪ কূপ খননের মধ্য দিয়ে।

মোবারকপুর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্পটি ২০০১ সালে বাপেক্সের বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত হলেও একনেকে প্রথমবার অনুমোদন হয় ২০০৬ সালে এবং সংশোধিত বাজেট অনুমোদিত হয় ২০১০ সালে। বাপেক্সের ২০১৫ সালের মার্চের মাসিক অগ্রগতির প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, তখনো প্রকল্পটির অগ্রগতির হার ছিল ৫৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

বাপেক্সের প্রায় প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রেই এ রকম অপর্যাপ্ত, বিলম্বিত ও আংশিক বরাদ্দ দেয়া হয়, যার ফলে সময়মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।

খ) বিদেশী কোম্পানির তুলনায় কম অগ্রাধিকার

বাপেক্সের অবস্থা অনেকটা সেই কৃষকের মতো, যে সারা বছর জমি চাষ করে, বীজ বুনে, নিড়ানি দেয় আর ফসল তোলার সময় এলে মহাজনের লোক এসে সে ফসল কেটে নিয়ে যায়। বাপেক্সের কাজ হলো গ্যাস অনুসন্ধান করে দেয়া, উত্তোলন করে বিক্রি করার অধিকার তো কেবল বহুজাতিকের! নইলে বাপেক্স গঠনের পর থেকে হাজার হাজার লাইন কিলোমিটার সার্ভে করলেও এবং অসংখ্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র আবিষ্কার করলেও অনুসন্ধান কূপ খনন করার অধিকার পায় মাত্র আটটিতে। অথচ আইওসিগুলো সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রগুলোয় অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে ২৭টি।

রাষ্ট্রের কাছে বাপেক্সের গুরুত্বের (!) সাম্প্রতিক একটি নমুনা দেয়া যাক। বাপেক্স সম্প্রতি ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্যে ১০৮টি কূপ খননের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১০৮টি কূপের মধ্যে ৫৩টি অনুসন্ধান কূপ, ৩৫টি উন্নয়ন কূপ এবং ২০টি ওয়ার্কওভার কূপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাপেক্সের এই প্রশংসনীয় বিশেষ উদ্যোগে সহযোগিতা করার বদলে উল্টো বাপেক্সের পরিকল্পিত কূপ খননকাজের উল্লেখযোগ্য অংশ অধিক অর্থ ব্যয়কারী ও কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ কাজসম্পন্নকারী বলে কুখ্যাত রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রমের হাতে তুলে দিয়েছে! শুধু তা-ই নয়, বাপেক্সের কাজ গ্যাজপ্রমের হাতে তুলে দেয়ার বিরোধিতা করায় বাপেক্সের এমডি মো. আতিকুজ্জামানকে বাপেক্স থেকে সরিয়ে দেয়ার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে! (সূত্র: বণিক বার্তা, ২০ নভেম্বর, ২০১৬)

গ) সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করার নীতি

কৌশলটা নতুন নয়, দীর্ঘ ব্যবহারের ফলে এটি এখন আর কৌশল নয়, বিরাষ্ট্রীয়করণের রাষ্ট্রীয় নীতিতেই পরিণত হয়েছে— সময় থাকতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে সংকট তৈরি করা হয় এবং পরে সেই সংকটের অজুহাতে বিদেশী বহুজাতিকের হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ তুলে দেয়া হয়। নইলে প্রতি বছর গ্যাসের চাহিদা যে বাড়ছে, সেটি তো অজানা নয়, তাহলে সেই বাড়তি চাহিদা মেটানোর জন্য বাপেক্সের জন্য বাড়তি যন্ত্রপাতি ও মানবসম্পদ তৈরি করার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হবে না কেন?

শুধু স্থলভাগই নয়, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় যে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এজন্য তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করতে হবে— এটি তো নতুন কথা নয়। তাহলে সমুদ্রের ২৮টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সের সার্বিক দক্ষতা অর্জনের উদ্যোগ এত দিনেও নেয়া হলো না কেন, কেন এখন বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের যেহেতু সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দক্ষতা নেই, তাই গ্যাসের বেশির ভাগ মালিকানা ও রফতানির সুযোগ দিয়ে বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই? উল্লেখ্য, এ রকম যুক্তি দিয়ে দেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যেই সম্প্রতি কোরীয় কোম্পানি দাইয়ুর সঙ্গে গভীর সমুদ্রের ১২ নম্বর গ্যাস ব্লক থেকে রফতানির বিধান রেখে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পিএসসি অনুস্বাক্ষর করেছে পেট্রোবাংলা।

এসব চুক্তি জায়েজ করার জন্য তেল-গ্যাস উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টাকে উড়োজাহাজ তৈরির প্রচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়: ‘সমুদ্রে অনুসন্ধানের অর্থ, প্রযুক্তি, লোকবল কোনোটিই তাদের নেই এবং সেটি করতে যাওয়া বাংলাদেশের পক্ষে উড়োজাহাজ তৈরির চেষ্টা করার মতো হঠকারিতা হবে; যাতে বিনা কারণে অজস্র অর্থ ও সময় ব্যয় হবে।’ এখানে খেয়াল করা দরকার, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা অর্জনের জন্য সেমি-সাবমার্জিবল রিগ, সাপোর্ট ভেসেল ইত্যাদি বাংলাদেশে তৈরির প্রয়োজন নেই, এগুলো ভাড়া করে বা কিনে তেল-গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যবহার করেও সক্ষমতা অর্জনের কাজটি শুরু করা যায়। তাহলে উড়োজাহাজ তৈরির উদাহরণটা আসছে কেন? তুলনা করতে গেলে তো উড়োজাহাজ চালনার উদাহরণটা দেয়া দরকার! উড়োজাহাজ চালানোর মতো জটিল কাজও তো বাংলাদেশের পাইলটদের শিখতে হয়েছে, তাহলে সেমি-সাবমার্জিবল রিগ কিংবা সাপোর্ট ভেসেল ভাড়া করে এনে সেগুলো কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে পরিচালনা করাটা অসম্ভব কিংবা হঠকারিতা হতে যাবে কেন? বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কি তেল-গ্যাস উত্তোলনে ব্যবহূত সেমি-সাবমার্জিবল রিগ, সাপোর্ট ভেসেল ইত্যাদি নিজেরা বানিয়ে বা নিজেরা চালায়? আসলে সত্তর-আশির দশকের সময় থেকেই কোম্পানিগুলো তাদের নিজেদের অনেক কাজ আউটসোর্সিং করতে শুরু করেছে। টেকনোলজি ডেভেলপ করার বদলে টেকনোলজি বিভিন্ন সার্ভিস কোম্পানি, যেমন— Schlumberger, Halliburton, Baker Hughes, Oceaneering, Transocean ইত্যাদির কাছ থেকে সুবিধামতো ভাড়া করে তেল-গ্যাস উত্তোলনের কাজটি চালাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বিপির কথা বলা যায়। বিপি মেক্সিকো উপসাগরের যে মাকান্দো কূপে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, সে কূপে কাজ করছিল মূলত ট্রান্সওশান, হেলিবার্টন, স্লামবার্গার ইত্যাদি কোম্পানির যন্ত্রপাতি ও সার্ভিস ভাড়া নিয়ে। ডিপ ওয়াটার হরাইজন নামের সেমি-সাবমার্জিবল রিগটি বিপি ভাড়া নিয়েছে ট্রান্সওশানের কাছ থেকে, রিগটি থেকে ড্রিলিংয়ের কাজটি ট্রান্সওশানের কর্মীরাই করছিলেন, কূপ সিমেন্টিংয়ের কাজটি করছিল হেলিবার্টন এবং সিমেন্টিংয়ের পর তার কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য ভাড়া করা হয়েছিল স্লামবার্গার কোম্পানিটিকে; বিপির কাজ ছিল কেবল এদের কাজ ঠিকঠাক মতো হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করা।

প্রযুক্তির অভাবের কথা বলে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যেসব বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে পিএসসি করা হয়েছে, তারাও একইভাবে বিদেশী কন্ট্রাক্টর ভাড়া করেই কাজ করেছে এবং করছে। যেমন— অগভীর সমুদ্রের ১৬ নং গ্যাস ব্লকে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক বহুজাতিক সান্তোস নিজস্ব রিগ দিয়ে খনন কাজ করেনি, তারা নেদারল্যান্ডসের কোম্পানি সি-ড্রিলের কাছ থেকে Offshore Resolute নামের একটি রিগ ভাড়া করে এনেই অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজটি করেছে। যে কনোকোফিলিপসের হাতে সাগরের ১০ ও ১১ নং ব্লক তুলে দেয়া হয়েছিল, সে কনোকোফিলিপসও কিন্তু রিগ ভাড়া করে কাজ করে। বিশ্বের মোট ১৮টি জায়গায় তারা গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকাজ পরিচালনা (অপারেটর হিসেবে) করছে, যার ১২টিতেই কাজ করছে China Oilfield Services Ltd, ENSCO, Essar Oilfields Services Ltd, Maersk Drilling, Nabors Offshore, Rowan, Seawell, Transocean Ltd. ইত্যাদি বিভিন্ন সাবকন্ট্রাক্টর কোম্পানির রিগ ভাড়া করে এবং এই রিগগুলো পরিচালনা করে কূপ খননের কাজও করছে এই কোম্পানিগুলোই। বাংলাদেশের ১০ ও ১১ নং ব্লকে দ্বিমাত্রিক সিসমিক সার্ভেও কনোকোফিলিপস করিয়েছে চাইনিজ কন্ট্রাক্টর বিজিপি’কে দিয়ে। কাজেই বাপেক্সের পক্ষে স্থলভাগে গ্যাস উত্তোলনের দক্ষতাকে ব্যবহার করে, প্রয়োজনীয় সার্ভিস এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে রিগ ও যন্ত্রপাতি ভাড়া করে, গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বিষয়ে যথাযথ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে এ ধরনের তদারকির কাজ করাটা অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

সম্ভাবনা ও প্রস্তাবনা:

দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা ইত্যাদি শুরু থেকেই কোনো দেশের থাকে না, এগুলো আকাশ থেকেও পড়ে না, সুনির্দিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমেই এগুলো অর্জন করতে হয়। আজকে স্থলভাগে বাপেক্সের যতটুকু দক্ষতা, সেটি যেমন ধীরে ধীরে অর্জিত হয়েছে, তেমনি স্থলভাগে যতটুকু সংকট ও সীমাবদ্ধতা এবং সমুদ্রভাগের যে অক্ষমতা, সেটিও শাসক শ্রেণীর পরিকল্পনা কিংবা পরিকল্পনাহীনতারই ফল। একসময় মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস কিংবা ভেনিজুয়েলার পিডিভিএসএ এদের কারোরই গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কোনো দক্ষতা ছিল না কিন্তু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় উপযুক্ত প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি আমদানি ও ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তারা সেটি অর্জন করেছে। তাহলে বাংলাদেশের সেটি না পারার তো কোনো কারণ দেখছি না!

আমরা মনে করি, অন্য সব ক্ষেত্রের মতো জ্বালানি ক্ষেত্রেও জাতীয় সক্ষমতার কোনো বিকল্প নেই এবং এর জন্য দরকার হলো, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় বাপেক্স ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আপগ্রেড করা। এ লক্ষ্যে করণীয়গুলো হচ্ছে:

১। দেশের অভ্যন্তরে এবং উপকূলে অবস্থিত গ্যাস ব্লকগুলোর অনুসন্ধান ও উৎপাদনকাজ শুধু বাপেক্সের ওপর ন্যস্ত করতে হবে।

২। বাপেক্সকে আরো দক্ষ ও শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে স্থলভাগের মতো গভীর সমুদ্রেও দেশীয় কোম্পানিগুলো নিজেরাই তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকাজ চালাতে পারে। মধ্যবর্তী সময়টুকুতে একটি বা দুটি ব্লক থেকে কাজ চালানোর মতো গ্যাস উত্তোলনের জন্য বাপেক্সের কর্তৃত্বাধীনে দেশী-বিদেশী কন্ট্রাক্টর ও যন্ত্রপাতি ভাড়া করা যেতে পারে।

৩। বাপেক্সের জন্য প্রয়োজনীয় রিগ ও অন্যান্য সরঞ্জাম অবিলম্বে সরবরাহ করতে হবে।

৪। বাপেক্সের কারিগরি জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধির নিমিত্তে দেশ-বিদেশে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করতে হবে। কারিগরি জনবলকে উপযুক্ত মর্যাদা ও গুরুত্ব দিতে হবে।

৫। বাজেটে বাপেক্সের জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। এ বরাদ্দ একনেকে অনুমোদন ও বাপেক্সকে প্রদানে অহেতুক সময়ক্ষেপণ বন্ধ করতে হবে। বাপেক্স ও পেট্রোবাংলা তথা পেট্রোবাংলার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আয় সরাসরি বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পে সরাসরি বরাদ্দ করার সুযোগ দিতে হবে।

৬। মূল সংস্থা পেট্রোবাংলাকে দক্ষ ও শক্তিশালী করতে হবে।

৭। গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন নিয়ে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকতে হবে। বাপেক্সের অধীনে সারা দেশে জিওলজিক্যাল সার্ভেকাজ সম্পন্ন করার একটি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে, বাপেক্সকে দিয়ে বছরে কতটি অনুসন্ধান কূপ খনন করানো হবে, তারও একটি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে। এবং এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য সময়মতো প্রয়োজনীয় রিগ, যন্ত্রপাতি কিনতে হবে, অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে, লোকবল নিয়োগ ও তাদের দক্ষতা বাড়িয়ে তুলতে হবে।