আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বৈচিত্র্যময় পণ্যের উৎপাদন ক্ষেত্র এখন বাংলাদেশ। এ সুযোগ করে দিয়েছে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত আটটি ইপিজেডে পণ্য উৎপাদন শেষে রফতানি হচ্ছে। স্থানীয় উত্সসহ ৩৫টির বেশি দেশের বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করেছে এ অঞ্চলগুলো। ফলে সাড়ে চারশরও বেশি শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এগুলোর উৎপাদন শ্রমে জড়িত আছেন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।

ইপিজেডের উদ্দেশ্যর মধ্যে রয়েছে— বিদেশী পুঁজি আকর্ষণ, দ্রুত শিল্পায়ন, স্থানীয় জনশক্তির জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ত্বরান্বিতকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন বৃদ্ধির জন্য রফতানি সম্প্রসারণ। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, উচ্চ বেকারত্ব, মূলধনের স্বল্পতা, অপর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবমোচনও ছিল ইপিজেড গঠনের লক্ষ্য।

বাংলাদেশে ১৯৮০ সালে সংসদ প্রণীত একটি আইনের ভিত্তিতে ১৯৮৩ সালে প্রথম ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়। দ্বিতীয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এর ১০ বছর পর ১৯৯৩ সালে ঢাকার সাভারে। এছাড়া মংলা, উত্তরা, ঈশ্বরদী, কুমিল্লা, কর্ণফুলী ও আদমজীতে আরো ছয়টি ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চট্টগ্রামে রয়েছে আরো একটি কোরিয়ান ইপিজেড।

বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ইপিজেড কর্তৃপক্ষের (বেপজার) ওপর ন্যস্ত। ইপিজেডে সরকারের কার্যাবলির মধ্যে আছে অবকাঠামো (ভবন, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ, গুদামঘর, রাস্তা ইত্যাদি) নির্মাণ, শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার আবেদনপত্রগুলো যাচাই-বাছাই ও বিবেচনা, জমি বা বিল্ডিং স্পেস বরাদ্দকরণ এবং দেশী বা বিদেশী ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি, ক্লিয়ারিং ও ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট, কুরিয়ার কোম্পানি, ডাকঘর ইত্যাদির জন্য জায়গা বরাদ্দকরণ। ইপিজেডে যারা বিনিয়োগ করেন, তাদের বিনিয়োগ ও ব্যবসায় যাতে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হতে পারে এবং যাতে মালিক-শ্রমিক বিরোধ দেখা না দেয় তা নিশ্চিত করতেও সরকার সচেষ্ট থাকে। এছাড়া ইপিজেডে বিনিয়োগকারীরা সরকারের কাছ থেকে ঋণ পেতে পারে এবং শিল্পসহায়ক সব ধরনের সমর্থন আশা করতে পারে। সরকার ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করে এবং তাতে শিল্প স্থাপনার উপযোগী নানা কাঠামো তৈরি করে ইপিজেডকে নিজের একটি বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে দেখে এবং স্থাপনা ও ভবন ভাড়া, ইজারা বা স্থায়ী বরাদ্দের মাধ্যমে মুনাফাসহ ব্যয় উসুলের চেষ্টা করে। তবে ইপিজেডে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের সিংহভাগই আসে ঋণ হিসেবে। দীর্ঘমেয়াদের জন্য লগ্নিকৃত পুঁজির একটি অংশের উত্স হচ্ছে ইপিজেডে সংস্থাপনকৃত বিনিয়োগ। ইপিজেডে সরকারের বিনিয়োগের প্রায় ৪০ শতাংশই এমন সব খাতে ব্যয় হয়, যেগুলো থেকে কোনো আয় আসে না। এখানে নির্মিত অবকাঠামোগত সুবিধাদির (জমি, ভবন, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ ইত্যাদির) জন্য সরকার যে হারে চার্জ আদায় করে, তা ঠিক ব্যয় মূল্য উসুলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। এগুলো প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের ইপিজেডে ধরা রেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধার্য করতে হয়।

৩৫টিরও অধিক দেশের মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউএসএ, ইউকে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, ইতালি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, ভারত ও পাকিস্তান বাংলাদেশের ইপিজেডে বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধিতে ইপিজেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইপিজেডের রফতানির মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের লেনদেন ভারসাম্যের ঘাটতি কমাতে সাহায্য করে। এই বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ দেশীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে তা দিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে ইপিজেডের জন্য বিভিন্ন পণ্য ও সেবা ক্রয় করা হয়।

পণ্য উৎপাদনে আমদানি থেকে শুরু করে মসৃণ রফতানি প্রক্রিয়া এবং নিশ্চিত মুনাফার স্বার্থে বিশেষ সুবিধা— এ দুই আকর্ষণেই ইপিজেডে বিনিয়োগে স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। শর্তসাপেক্ষে পাঁচ-সাত বছরের ট্যাক্স হলিডে পায় ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান। বেতনের ওপর স্বল্পমেয়াদি হ্রাসকৃত মূল্যে ট্যাক্স দেয়ার সুবিধা বিদেশী বিশেষজ্ঞ কর্মীদের। ডিভিডেন্ড ট্যাক্সেও আছে হ্রাসকৃত হার। গাড়ি আমদানি করা যায় বিনা শুল্কে। মুনাফার পুরোটাইসহ পুঁজি ও স্থাবরও প্রত্যাবাসনের সুযোগ আছে বিনিয়োগকারীদের। এগুলো সবই তাদের আর্থিক সহায়তা। এছাড়া আছে শতভাগ বিদেশী মালিকানায় কোনো সিলিং ছাড়াই বিনিয়োগের সুবিধা। ফরেন কারেন্সি হিসেবে সরাসরি অর্থ জমা দেয়ার সুবিধাসহ আছে ঋণ সুবিধা।

এসব সুযোগ-সুবিধা নিয়েই ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের ইপিজেড বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ ধরে রেখেছে কার্যক্রমের শুরু থেকেই। বিশ্বের যেসব ব্র্যান্ড বাংলাদেশের ইপিজেডে পণ্য উৎপাদন করে আমদানি করে, সেসব ব্র্যান্ডের মধ্যে আছে নাইকি, লাফুমা, সনি এরিকসন, নিশান, মিত্সুবিশি, হিনো, টয়োটা, কনিকা, ফুজি, গ্যাপ, ব্রুকস, জেসি পেনি, ওয়ালমার্ট, কে-মার্ট, ওসপিং, মাদার কেয়ার, এডিডাস, ফ্যালকনসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদনে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেপজা বিনিয়োগকারীদের জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগসহ মানসম্পন্ন কারখানার মতো অবকাঠামো সুবিধাও দিয়ে থাকে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের উদ্যোক্তাদের বহু আকাঙ্ক্ষার বিষয় ওয়ান স্টপ সার্ভিস। এর নিশ্চয়তাও দেয় ইপিজেড কর্তৃপক্ষ। বেপজার ভাষায়, ওয়ান উইন্ডো সেম ডে সার্ভিস দেয়া হয়। এর অর্থ দাঁড়ায়, একটি জানালায় একই দিনে সব ধরনের সেবার নিশ্চয়তা দেয় সংস্থাটি।

বিনিয়োগকারীদের এত সুবিধা নিশ্চিত করার পরিপ্রেক্ষিতে ইপিজেডে কর্মসংস্থান হয় প্রায় পাঁচ লাখ কর্মীর, যার দুই-তৃতীয়াংশই নারী। প্রশিক্ষিত এ কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিত করার দাবিও রাখে বেপজা। এ দাবির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পরিকল্পনাধীন আছে আবাসন ব্যবস্থার নির্মাণ। যদিও বাস্তবে এর প্রতিফলন এখনো সময়সাপেক্ষ। শ্রমিক অধিকার চর্চার সুযোগও আছে সরকার নির্ধারিত বেপজার নিজস্ব নিয়মে। ‘দি ইপিজেড ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস অ্যাক্ট ২০১০’ আইনের অধীনে নির্বাচিত শ্রমিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে অধিকার চর্চার সুযোগ পান শ্রমিকরা। ২০১০ ও ২০১৩ সালে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে ইপিজেডে। প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধিও পায় শ্রমিকের মজুরি।

শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে, এমন দাবি করা হলেও এ নিয়ে আছে মতভেদ। ইপিজেডে অগ্রাধিকার পায় বিদেশী বিনিয়োগ। আর এ উদ্যোক্তারা প্রচলিত শ্রমিক সংগঠনের উপস্থিতিও ইপিজেডে চান না, যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে শ্রম আইন থাকলেও ইপিজেডের জন্য তা ভিন্ন। এক্ষেত্রে ইপিজেড শ্রমিকদের অধিকার চর্চার সুযোগ কিছুটা দ্বৈত মতামত ও এর চাপের রোষানলে রয়েছে বলে মনে করেন দেশের শ্রমিক প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, স্থানীয়ভাবে একটি দেশের সব শ্রমিকের কল্যাণ নিশ্চিত হওয়ার কথা একটি আইনের মাধ্যমে। কিন্তু বিশেষ অঞ্চলের বিশেষ সুবিধা হিসেবে এর দ্বৈততা সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশে। ইপিজেডের মূল বিনিয়োগকারী বিদেশীরাই শ্রম অধিকার চর্চার কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা থেকে ভিন্নতর ব্যবস্থার প্রণয়ন চেয়েছেন ইপিজেডে। আবার স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে বিদেশী শ্রমিক সংগঠনগুলোই শ্রম অধিকার চর্চার অভিন্ন নিয়ম প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। এভাবে ইপিজেডে শ্রম অধিকারের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে এখনো অনেকখানি প্রশ্নবিদ্ধ।

দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ইপিজেড। বেপজার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট হার ৭ শতাংশ। প্রফিট মার্জিন ৪৪ শতাংশের বেশি। বেপজার সম্পদের পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। বেপজার নিট আয় ১৩৯ কোটি টাকার কিছু বেশি। দেশের মোট জাতীয় রফতানিতে বেপজার আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের অবদান ১৭ শতাংশ। রফতানি সাড়ে ৪০০ কোটি ডলারের কিছু বেশি। অর্থ সংখ্যার বিচারে এসব অর্জন ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করার পেছনেও বড় ভূমিকা রেখেছে ইপিজেডগুলো। যেসব অঞ্চলে এর প্রভাব দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে ঢাকার সাভার ও নারায়ণগঞ্জ। চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, ঈশ্বরদী। মূলত ইপিজেডগুলো যেসব স্থানে অবস্থিত, সেসব স্থানের মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন হয়েছে বলে দাবি করেন বেপজা-সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিতে বেপজা অধীন পরিচালিত উৎপাদনমুখী কর্মযজ্ঞের অবদান দৃশ্যমান। পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানেই এ দৃশ্য ফুটে ওঠে। বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ। এর মধ্যে প্রায় এক কোটি উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানায় প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর এ শ্রমশক্তির মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান ইপিজেডগুলোয়। আর মূলত এরাই এশিয়ার তথা বিশ্বের অন্যতম কম খরচের উৎপাদন ক্ষেত্রগুলোর সক্ষমতা ধরে রাখার চাবিকাঠি। কম খরচের উৎপাদন ক্ষেত্রের এ গুণ ধরে রাখা খুব সহজ না বলে জানিয়েছেন শ্রমিক প্রতিনিধিরা। কারণ শিক্ষার ঘাটতিতে ন্যূনতম প্রশিক্ষণ নিয়ে শ্রমিকরা নিম্ন আয়ের নিয়মিত উত্স কারখানাগুলোয় কাজ করছেন। আর নিম্ন আয়ের মাত্রাও ধরে রাখতে হচ্ছে তাদের। জীবনযাপনের ব্যয় বাড়লেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয় বাড়বে না। এ পরিস্থিতিতে সক্ষমতা ধরে রাখার দায় শ্রমিকদেরই। আবার অধিকার নিয়ে খুব সোচ্চার হওয়ার সুযোগও সীমিত। কারণ একই দেশের মধ্যে থেকেও ভিন্ন আইনে পরিচালিত হয় ইপিজেড।

দেশের ইপিজেডগুলোর প্রায় ৫৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগ। ১৫ শতাংশ যৌথ বিনিয়োগ। বাকি ২৮ শতাংশ পরিচালিত হচ্ছে দেশী বিনিয়োগে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রফিট মার্জিনও ভালো। মুনাফার পুরো অর্থই নিজ ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তাদের আছে। আবার নিয়ে যেতে পারেন পুঁজিও। কর ও শুল্ক রেয়াতি সুবিধাও কম খরচ ধরে রাখতে সহযোগিতা করে মালিকদের। কিন্তু কম খরচের যে ধারণা উদ্যোক্তাদের মধ্যে দেয়া হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে শ্রমমজুরি বাবদ ব্যয়। কারণ ইপিজেডের উদ্যোক্তারা অনেক সুবিধা পেলেও বাংলাদেশের শ্রমিকদের প্রাপ্য শুধুই মজুরি। তাদের সব ধরনের কল্যাণও সীমাবদ্ধ শুধু ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে। শ্রমিকের কম মজুরিই ইপিজেড অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার মূল কেন্দ্র।

প্রায় ক্ষেত্রেই ইপিজেডে বিদেশী বিনিয়োগের সঙ্গে থাকে উন্নততর বিদেশী প্রযুক্তি। ফলে স্থানীয় শ্রমিক, কারিগর, প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকরা প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুবিধা পায়, অর্জন করে উন্নততর কর্মকৌশল। দেশের যেসব এলাকায় ইপিজেড স্থাপিত হয়েছে, সেগুলো একেকটি প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রে রূপান্তর হয়েছে, সেগুলোয় গড়ে উঠেছে নতুন নতুন রাস্তা, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস লাইন, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, ফায়ার ব্রিগেড, ডাকঘর, ব্যাংক ইত্যাদি ভৌত ও পরিষেবা সুবিধা। ইপিজেডসংলগ্ন এলাকায় নানা ধরনের শপিং সেন্টার ও বাজার, পরিবহন, আবাসিক ব্যবস্থা, বিনোদন ইত্যাদি ব্যবসা বিকাশ লাভ করেছে এবং এসবের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়েছে সার্বিক অর্থনৈতিক তত্পরতা। নতুন সৃষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোর গুরুত্বপূর্ণ একটি হচ্ছে ইপিজেডের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মুখ বা পশ্চাৎ-অন্বয়ী শিল্পস্থাপনা। ইপিজেডের অনেক প্রতিষ্ঠানই এদের উৎপাদনকাজের অংশ সাবকন্ট্রাক্টে দেয়।

বেপজার প্রকাশনাগুলোয় দেখা যায়, বাংলাদেশের গর্ব ও সম্মানের অন্যতম কেন্দ্র হলো ইপিজেড। নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হচ্ছে, এমন বাস্তব প্রেক্ষাপটই এ গর্বের উত্স বলে বিশ্বাস করেন সংশ্লিষ্টরা। প্রবর্তনের শুরু থেকেই ইপিজেডগুলো দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করেছে। এর মূলে ছিল কম খরচ। তাই তো ইপিজেডকে বলা হয় ‘এশিয়ার কম খরুচে উৎপাদন ক্ষেত্র’। যারা ইপিজেডে পুঁজি ঢালছেন, তাদের মুনাফার শতভাগ নিশ্চয়তা, একই সঙ্গে মূল শ্রমশক্তির মজুরি বাবদ ব্যয়ের নিম্নহার— এ দুই নীতির সফল প্রণয়নই ইপিজেডের সফলতার মূল চাবিকাঠি। একই চিত্র ইপিজেডের বাইরে দেশের শিল্প-কারখানাগুলোয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা ‘ওয়ান স্টপ’ নয়, পান ‘ফুল স্টপ’ সেবা। আবার লগ্নিকৃত পুঁজির বিপরীতে মুনাফার নিশ্চয়তাও তারা পান না। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই শ্রমমজুরি বাবদ ব্যয়ই সফলতার মূল চাবিকাঠি। পোশাক শিল্পনির্ভর অর্থনীতিতে ইপিজেড বা ইপিজেডের বাইরে সব ক্ষেত্রেই শ্রমিকরাই মূলত গর্বের। গর্ব তাদের নিম্ন আয় ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়ে। গর্ব তাদের সচেতনতা প্রকাশের সুযোগের ঘাটতি নিয়ে। গর্ব এ রকম পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে দিন-রাত কাজ করার সামর্থ্য নিয়ে। আর অবশ্যই গর্ব এশিয়া’স লো-কস্ট প্রডাকশন বেজ বাংলাদেশ ইপিজেড নিয়ে।

 

লেখক: সাংবাদিক