পানি নিষ্কাশনের দিক থেকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ নদী যমুনার ওপর প্রতিষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু (পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হওয়ার পূর্বে) বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম, দক্ষিণ এশিয়ার পঞ্চম এবং বিশ্বের ৯২তম দীর্ঘতম সেতু। এ সেতু বাংলাদেশের ভূরাজনীতি ও আর্থসামাজিক খাতে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সূচনা করেছে। গত সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু নির্মাণ এমন একটি মাইলফলক, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে গঠনমূলক প্রত্যয় ও প্রতীতি দানে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক শক্তি নির্মাণে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু একটি বলিষ্ঠ বিনিয়োগ। এটি এমন একটি স্থাপনা, যা বৃহত্তর নদী দ্বারা বিভক্ত দেশের দুই প্রধান অংশের (উভয় অংশের জনসংখ্যা প্রায় সমান) যোগসূত্র স্থাপনের অন্যতম দ্যোতক। জাতীয় আর্থসামাজিক রাজনীতিতে, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভীপ্সায়, সমৃদ্ধি সৌভাগ্যের বণ্টন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বহুদিন থেকে ছিল উপেক্ষিত, বঞ্চিত। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোয় দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চল উন্নয়ন উপেক্ষার শিকার হয়ে, সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ও ব্যবধান বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে একপর্যায়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন (mass movement against duress disparity) পরিণতির আশঙ্কা পরিব্যাপ্ত হয়ে উঠছিল। এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত এ উত্তরাঞ্চলেই স্বল্পমেয়াদি ‘মঙ্গা’ দারিদ্র্যের দীর্ঘস্থায়ী দুষ্টক্ষত হিসেবে বিরাজমান ছিল। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিপুল সংখ্যক কর্মহীন মানুষের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ত উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি। সমগ্র উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিজাত অর্থকরী ফল-ফসল (যেমন— পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরের চাল ও লিচু, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থকরী ফসল হিসেবে, পাবনা-বগুড়ার সবজি ও মাছ, এমনকি শাহজাদপুর-বাঘাবাড়ী অঞ্চলের দুগ্ধজাত পণ্য) দেশের অন্য অংশে ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের জন্য ছিল না উপযুক্ত অবকাঠামো, ছিল না যোগ্য যোগাযোগ ও পরিবহনের ব্যবস্থা বা সুযোগ। উত্তরাঞ্চলের শিল্পকেন্দ্র ও নদী বন্দরগুলোয় শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও গ্যাস বা বিদ্যুতের অবর্তমানে প্রযুক্তির অপ্রতুলতায় সেখানকার শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার সুযোগগুলো মাঠে মারা যেত। এ প্রেক্ষাপটে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে যোগসূত্র অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি, প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা ছিল বহুদিনের। সুবিশাল যমুনা, পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দেয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। ছিল অনেক সময় নিয়ে দীর্ঘ রেলপথ ঘুরে বড় স্টিমার দিয়ে জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের সঙ্গে বাহাদুরাবাদ ঘাটের সংযোগ সাধনের মাধ্যমে। এসব নদীপথ পাড়ি দিতে লক্ষ কোটি মানুষের, হাজার হাজার ট্রাকের ঘণ্টার পর ঘণ্টা (ক্ষেত্র বিশেষে ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত) অপেক্ষায় ব্যয় করতে হতো। পদ্মা নদীর ওপর হার্ডিঞ্জ রেলওয়ে ব্রিজের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল তথা পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ব-দ্বীপরূপী উত্তরাঞ্চলের সংযোগ স্থাপনের একমাত্র উপায় বা সুযোগ ছিল।
ভারত বিভাগের পর সদ্য সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের কাছে ১৯৪৯ সালে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬) যমুনার ওপর সেতু নির্মাণের প্রথম দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে ২১ দফা দাবির মধ্যে একটি ছিল প্রমত্তা যমুনার ওপর সেতু নির্মাণ। ১৯৬৪ সালের ৬ জানুয়ারি রংপুর অঞ্চল থেকে নির্বাচিত পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ সাইফুর রহমান সংসদে সরকারের কাছে জানতে চান, যমুনার ওপর সেতু নির্মাণের সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা? এর পর ১৯৬৬ সালের ১১ জুলাই রংপুর অঞ্চলের আরেক সংসদ সদস্য শামছুল হক একই সংসদে যমুনা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব আনেন এবং তা সংসদে সর্বসমর্থনে গৃহীত হয়। এর ভিত্তিতেই ১৯৬৯ সালে যুক্তরাজ্যের ‘ফ্রি ম্যান ফক্স অ্যান্ড পার্টনার’ একটি প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে। তারা ১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীর ওপর রেলসহ সড়ক সেতু নির্মাণের সুপারিশ করেন। এটি ছিল অতি প্রাথমিক পর্যায়ের প্রাক্কলন।
১৯৭০ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তত্কালীন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-৭৫) তাঁর নির্বাচনী বক্তৃতায় যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণকে তাঁর দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটে বরাদ্দ রাখেন। ১৯৭২ সালে জাপানি জননেতা তাকেশি হায়াকাওয়ার নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রথম যে জাপানি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসে, বঙ্গবন্ধু তাঁদের কাছেই যমুনায় সেতু নির্মাণে জাপানি সহায়তার অনুরোধ রাখে। সে পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে জাইকা যমুনার ওপর সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করে ১৯৭৩ সালে। ১৯৭৬ সালে এ সমীক্ষা শেষ হয়। তারা রেলসহ সড়ক সেতু নির্মাণে ৬৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব করে এবং সেক্ষেত্রে ইকোনমিক রেট অব রিটার্ন দাঁড়াবে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। তাদের প্রস্তাব প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কিনা, তা পরীক্ষা-পর্যালোচনা চলতে থাকে।
১৯৮২ সালে সরকার যমুনায় সেতু নির্মাণের চিন্তাভাবনা আবার জোরেশোরে শুরু করে। এ সময় যমুনার ওপারে পশ্চিমাঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্যও একটি সমীক্ষা দল নিয়োগ করা হয়। সেই সমীক্ষার উপসংহারে বলা হয়, শুধু গ্যাস সংযোগ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না। বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টারা একটি সড়ক-কাম-গ্যাস পরিবাহী সেতুর প্রকৌশলগত সম্ভাব্যতা ও এর ব্যয় নির্ধারণে মনোনিবেশ করেন। এভাবেই যমুনায় বহুমুখী সেতু নির্মাণের প্রাথমিক ধারণার উত্পত্তি হয়। প্রথম পর্যায়ে তিন লেনবিশিষ্ট ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মন্ত্রিসভা এ রিপোর্ট অনুমোদন করে এবং প্রকল্পটির অনুকূলে তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৯৮৫ সালের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশবলে যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু সেতু সারচার্জ ও লেভি আদায়ের জন্য আরেকটি অধ্যাদেশ জারি হয়। অধ্যাদেশটি বিলুপ্তি পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় ৫.০৮ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে এ সেতু নির্মাণে সমগ্র জাতির অংশগ্রহণমূলক অনুভূতির জন্ম হয়। ১৯৮৬ সালে এই সেতুর জন্য স্থান নির্বাচনসহ প্রথম পর্যায়ের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। এ সময় সিরাজগঞ্জ ও ভূঞাপুরের (টাঙ্গাইল) মধ্যবর্তী স্থানকে সেতুর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৮৭ সালের মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, একটি সড়ক-কাম-রেল-কাম-বিদ্যুৎ লাইন পরিবাহী সেতু অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উভয় দিক থেকেই লাভজনক হবে। ১৯৯২ সালে আইডিএ (বিশ্বব্যাংক), এডিবি ও জাপানের ওইসিএফ সেতুর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নে সম্মত হয়। নির্মাণচুক্তির জন্য ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক বিডিংয়ের মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেতু নির্মাণ, নদী শাসনের কাজ এবং দুটি সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজের চুক্তি ১৯৯৪ সালের মার্চে সম্পাদিত হয়। ১৯৯৪ সালের ১০ এপ্রিল সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ১৯৯৪ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকল্পের ভৌত নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং গ্যাস সঞ্চালন লাইন ব্যতীত সব কাজ ১৯৯৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ হয়। ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন সেতুটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সেতুটি সম্ভাব্য দ্রুত নির্মাণ সাফল্যের ক্ষেত্রেও এটি একটি রেকর্ড। যদিও নির্ধারিত সময়ের মাত্র ছয় মাস পর ১৯৯৮ সালের জুনে ভৌত নির্মাণকাজ শেষ হয়, প্রকৃত প্রস্তাবে পুরো প্রকল্প শেষ হওয়ার নির্ধারিত তারিখের এক বছর আগেই প্রকল্পটি শেষ হয়। এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির পরিমাণ প্রাথমিক বাজেট প্রাক্কলনের চেয়ে মাত্র ১৬ ভাগ বেশি। তত্কালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠা ও সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কার্যকরী প্রকল্পের সন্তোষজনক সমাপ্তিতে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। যমুনায় সেতু নির্মাণের সাফল্য শুধু কোনো একটি বিশেষ পর্যায়ের নয়, এ সেতু নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ থেকে শুরু করে এর সব প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ, অর্থায়ন সংগ্রহ, নির্মাণ চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় সবার।
‘বঙ্গবন্ধু সেতু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের সংযোগ স্থাপন করে দেশের দুই অংশকে একত্রিত করেছে’— বিশ্বব্যাংকের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সারাত্সার এটি। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর অধিবাসীর সঙ্গে অন্যান্য অংশের সংযোগ সাধনের মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশাল প্রভাব রাখছে এ সেতু। এর আগে সড়কপথে ও ফেরির মাধ্যমে ঢাকা থেকে বগুড়া যেতে যেখানে ১২ ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে সময় লাগে মাত্র ৬ ঘণ্টা। সেতুর ওপর দিয়ে রেলওয়ে ট্রাফিকও পরিবহন করা হয়। এর মাধ্যমে কম খরচে টেলিকমিউনিকেশন যোগাযোগ, জাতীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস গ্রিডও পরিপূর্ণতা পেয়েছে। ২৩০ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইন, ইলেকট্রিক্যাল ইন্টার কানেক্টর, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টেলিকমিউনিকেশন কেবল, ৭৫০ ডায়া মিলিমিটার গ্যাস পাইপলাইন প্রযুক্তি ও উপযোগিতা বিতরণের জন্য এই সেতুর সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে। কোরিয়ার হুন্দাই কোম্পানি মূল সেতুর নির্মাতা কন্ট্রাক্টর, সান ফ্রান্সিসকোর টিওয়াইলিন হুন্দাইয়ের পক্ষে সেতুর ডিজাইন নির্মাণ করে। কোরিয়ার স্যামহোয়ান কোম্পানি উভয় পাড়ে অ্যাপ্রোচ রোড তৈরি করে। এখন প্রায় তিন কোটি মানুষ জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজ সুফল ভোগ করছে। মধ্যাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গ থেকে লাখ লাখ টন পরিমাণ পণ্য পরিবাহিত হচ্ছে। পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। সেতু দিয়ে পারাপারের জন্য যে টোল রাজস্ব আদায় হচ্ছে, তার পরিমাণ বছরে প্রায় ৩ কোটি ডলার, এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেতু নির্মাণের খরচ উঠে আসবে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অবদান বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর।
এই সেতু নির্মাণের ফলে উত্তরাঞ্চলে বহুভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে এবং এটি আন্তঃআঞ্চলিক ব্যবসায় ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সড়ক ও রেলপথে দ্রুত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ছাড়াও এই সেতু বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালন এবং সমন্বিত করার সুযোগ করে দিয়েছে। টাঙ্গাইল থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সেতু এশীয় মহাসড়ক ও আন্তঃএশীয় রেলপথের ওপর অবস্থিত। এ দুই সংযোগপথের কাজ সম্পন্ন হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক সড়ক ও রেলসংযোগ স্থাপিত হবে।
বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে মোট খরচ হয় ৯৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আইডিএ, এডিবি, জাপানের ওইসিএফ প্রত্যেকে ২২ শতাংশ তহবিল সরবরাহ করে এবং বাকি ৩৪ শতাংশ ব্যয় বহন করে বাংলাদেশ। সেতুটি নির্মাণে মোট যে ব্যয় হয়, মিলিয়ন ডলারে তার বিভাজন হচ্ছে:
সেতু এবং তার উপরে তৈরি পথগুলো ২৬৯, নদী শাসন ৩২৩, রাস্তা ও বাঁধ ৭১, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ সংরক্ষণ ৬৭, উপদেষ্টা ৩৩, সংস্থাপন ১৩ এবং অন্যান্য ১৮৬।
সেতুটির দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১৮ দশমিক ৫ মিটার। যমুনা নদীর প্রধান চ্যানেলের প্রস্থ ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটারের বেশি নয়। বিষয়টি মাথায় রেখে এবং বন্যাজনিত কারণের জন্য আরো কিছুটা প্রশস্ততা বাড়িয়ে পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু যথেষ্ট বলে বিবেচনা করা হয়। ভৌত অবকাঠামোর কাজ শুরু করার এক বছর পর ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে সেতুটির মূল অংশ ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ধরে চূড়ান্ত প্রকল্প অনুমোদিত হয়।
যদিও বর্ষা মৌসুমে নদী ১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে থাকে, সার্বিক প্রকল্প ব্যয় অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক রাখার জন্য ওই সংকোচন অত্যাবশ্যক বিবেচনা করা হয়। এজন্য অবশ্য নদীর প্রবাহ সেতুর নিচ দিয়ে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যে নদী শাসনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
সম্ভাব্য দুর্যোগ ও ভূমিকম্প যাতে সহ্য করতে পারে, সেজন্য সেতুটিকে ৮০-৮৫ মিটার লম্বা এবং ২ দশমিক ৫ ও ৩ দশমিক ১৫ মিটার ব্যাসের ১২১টি ইস্পাতের খুঁটির ওপর বসানো হয়েছে। এ খুঁটিগুলো খুবই শক্তিশালী (২৪০ টন) হাইড্রোলিক হাতুড়ি দ্বারা বসানো হয়। সেতুটিতে স্প্যানের সংখ্যা ৪৯ এবং ডেক খণ্ডের সংখ্যা ১ হাজার ২৬৩। সেতুটির ওপর দিয়ে চার লেনের সড়ক এবং দুটি রেলট্র্যাক বসানো হয়েছে। সেতুটির উপরিকাঠামো ঢালাই করা খণ্ডাংশ দিয়ে তৈরি এবং এগুলো সুস্থিত খিলান পদ্ধতিতে বসানো হয়েছে। সেতুর বয়সসীমা ১০০ বছর ধরে ডিটেইলড ডিজাইন ও নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পারে সংযোগ সড়ক মিশিয়ে দেয়ার জন্য উভয় তীরে দুটি বৃহৎ ভায়া ডাক্ট তৈরি করা হয়েছে। সেতুর দুই ধারে, দুই পাড়ে ২ দশমিক দুই কিলোমিটার করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ও প্রসারিত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অন্যত্র বসবাসের জন্য উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে সবুজ বৃক্ষবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। জনবসতি ও স্থানীয় বিভিন্ন জীবজন্তু সংরক্ষণের জন্য বিশেষ জাদুঘর ও বিশ্রামালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান






