চুয়াডাঙ্গার বেগুনচাষী, নোয়াখালীর তরমুজ ক্ষেতের মালিক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের বেপারি, বগুড়ার আলুর আড়তদার অথবা ময়মনসিংহের মাছ ব্যবসায়ী সবারই দৃষ্টি দেশের বড় বড় শহরের বাজারের চাহিদার ওপর; বিশেষ করে মেগাসিটি ঢাকাতে। এসব বাজারে চাহিদা বাড়লে ভালো দাম পাওয়া যায়। রাস্তাঘাট হওয়ায় চাহিদামতো সরবরাহও করা যায়। চাহিদা বৃদ্ধি, পরিবহন সুবিধা এবং ভালো দাম পাওয়ায় দেশের বেশকিছু প্রত্যন্ত গ্রামে কৃষি উৎপাদনে লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। গ্রামের মানুষের এখন চাহিদা শুধু জমিই নয়; তাদের অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সামাজিক সেবার প্রয়োজন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
গ্রামে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখে। কৃষি উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অনেক আগে থেকেই, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সেচ উন্নয়নে বিনিয়োগ শুরু করে। চীন, ভারত ও পাকিস্তান সেচ উন্নয়ন করে লাভবান হতে থাকে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার চার-পঞ্চমাংশের বেশির বসবাস গ্রামে। এখন পর্যন্ত দেশের মোট পরিবারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কৃষি উৎপাদনে জড়িত। গ্রামীণ অবকাঠামো কৃষি উৎপাদন, পরিবহনের সুবিধা, শিল্পের প্রসার ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির চাবিকাঠি। এ দেশে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু অনেক আগে থেকেই। প্রথম দিকে গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য রাস্তা ও কালভার্টই ছিল গ্রামীণ অবকাঠামোর মুখ্য উপাদান। বিগত শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে আধুনিক ধ্যানধারণা ও পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু হয়। গ্রামীণ উন্নয়নে কৌশল প্রণয়ন হয় আশির দশকে। রাস্তা ও কালভার্টসহ গ্রামীণ অবকাঠামোর উপাদানগুলোর সঙ্গে যোগ হয় সেতু, গ্রোথ সেন্টার, বাঁধ, বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ কাঠামো, বিদ্যুৎ সংযোগ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও সেচ ব্যবস্থা, বিদ্যালয় ভবন, ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, সাইক্লোন সেন্টার ও স্যানিটেশন। এসব অবকাঠামো গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে। নগর ও গ্রামের জীবনযাত্রার মানের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনে।
স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নে ব্যয় বৃদ্ধি পেতে থাকে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। সারা দেশে প্রায় ১১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বাঁধ নির্মাণে নিচু এলাকায় মানুষের জীবন ও বাসস্থল নিরাপদ হয়েছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াতে সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ১৪ হাজার ৬০০টি সেচ বন্যা ব্যবস্থাপনা, নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে দেশের মোট আবাদি জমির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বন্যা ও জলাবদ্ধতামুক্ত হয়েছে। সেচাধীন এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট ৫ হাজার ৩২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সেচনালা নির্মাণ এবং সেচপাম্প বসানোয় ফসল উৎপাদনে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার বেড়ে গেছে। এতে কৃষি খাত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ধানি জমির পরিমাণ সত্তরের দশকের শেষের তুলনায় বর্তমানে ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও চালের উৎপাদন একই সময়ে প্রায় তিন গুণ হয়ে বার্ষিক উৎপাদন ৩ কোটি ৫০ লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সাধারণ হিসাবে বছরে মাথাপিছু উৎপাদন ২০০ কিলোগ্রামের উপরে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মাথাপিছু ১৭০ কিলোগ্রামের নিচে। বন্যামুক্ত এলাকায় অধিক ফলনশীল নতুন জাতের আবাদি এলাকা সম্প্রসারণ হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় কৃষি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পক্ষে কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়া সহজ হয়েছে। সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নে শীত মৌসুমে বোরো ধানের আবাদি জমি পাঁচ গুণের বেশি বেড়েছে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিতেও দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এগিয়ে গেছে। সেচ উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশে শীতকালের মাঝামাঝি রোপণ ও শেষে ফসল কর্তনে শ্রমিকদের চাহিদা বেড়েছে। আগে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান আমন মৌসুমে বর্ষাকালে চারা রোপণ ও শীতকালের শুরুতে ফসল কর্তন এবং মাড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বন্যা ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন ও সেচ সুবিধা পাওয়ায় একই জমিতে বছরে দু-তিনটি ফসল ফলানো যাচ্ছে। এতে সারা বছর কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যামুক্ত ও সেচাধীন এলাকায় অধিক ফলনশীল নতুন জাতের আবাদ সম্প্রসারণ হয়েছে। এ জাতের ফসল আবাদে শ্রমিক চাহিদা বেড়ে গেছে। কৃষি পরিবারের সদস্যদের নিজ জমিতে বেশি দিন শ্রম বিনিয়োগ করার সুযোগ হয়েছে। পারিবারিক উপার্জন বৃদ্ধি পেয়েছে।
সারা দেশে গ্রামীণ সড়কের সংখ্যা কম নয়। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার কিলোমিটার। এ পর্যন্ত গ্রামীণ রাস্তার এক-পঞ্চমাংশের কাছাকাছি পাকা করা হয়েছে। সড়কের ওপর প্রয়োজনীয় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। পাকা রাস্তা পাশের গ্রাম ও উপজেলা-জেলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ করেছে। সারা বছর যাতায়াত ও পরিবহন সম্ভব হয়। হাটবাজার, গ্রোথ সেন্টার এবং পাইকারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার এ উন্নয়ন কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও পণ্য বাজারজাত সহজ করেছে। গ্রামের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষকদের সরাসরি কৃষি উপকরণ ক্রয় ও বাজারে পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা করে দিয়েছে। ফসল উৎপাদনে মুনাফা বেড়ে যাওয়ায় গ্রামের মানুষ কৃষি কর্মকাণ্ডে অধিক উত্সাহিত হয়েছে। ফসল উৎপাদনে পরিবর্তন এসেছে। উদাহরণ হিসেবে চার দশক আগের তুলনায় আমের উৎপাদন তিন গুণ বেড়েছে। বছরপ্রতি আলু উৎপাদন ৮ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৯০ লাখ টন পার হয়েছে। নতুন নতুন মৎস্য খামার তৈরি হয়ে মাছের উৎপাদন চার গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে বার্ষিক উৎপাদন ৩৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে। শুধু মৎস্য খামারগুলোয় উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ টন। গ্রামে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন শুরু হয়েছে। হাঁস-মুরগি ও গাভীর খামার বাড়ছে।
গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হার বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ ও যোগাযোগ ব্যতিরেকে খামার উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থেকে কৃষি উন্নয়ন এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব নয়। পরিবহনের উন্নতিতে বাজারে ক্রয় ও বিক্রয়ে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়ে স্থানীয় মহাজন ও ফড়িয়াদের একচেটিয়া আধিপত্য কমে যায়। গ্রামে অধিকতর মানুষের কর্মসংস্থান হতে থাকে। এ দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। এর মধ্যে ৫৭ শতাংশ দেশের মোট শ্রমশক্তির অন্তর্গত। মোট শ্রমশক্তির ৪৩ শতাংশ গ্রামে কৃষিকাজে নিয়োজিত। এদের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন স্থানীয় শ্রমিকদের মজুরিহার বৃদ্ধি করে। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের সংখ্যা এখন ৮০ লাখ।
অধিকতর লাভজনক কৃষি উৎপাদন ও নতুন শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের জন্য টেকসই গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে প্রয়োজন এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দ। জনসংখ্যা বাড়তির সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামোর গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়বে। বন্যা, খরা, সাইক্লোনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। গ্রামীণ সড়কের ৮০ শতাংশের উপরে এখন কাঁচা বা মাটির। ফলে দেশের অধিকাংশ গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা মৌসুমি। কৃষি উপকরণ ও পণ্য পরিবহন শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা সহজতর হলেও বছরের বাকি সময় কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় প্রক্রিয়া ও গুদামজাতও সম্ভব হয় না। এসব এলাকায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য রাস্তাঘাটের উন্নয়ন অপরিহার্য। একই সঙ্গে প্রয়োজন গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি। এতে সেচ এলাকা আরো বাড়বে। সেচ খরচ কমবে। সারা দেশে প্রায় ১৭ লাখ ৫৪ হাজার সেচযন্ত্রের মধ্যে ২০ শতাংশেরও নিচে বিদ্যুৎ চালিত। অবশিষ্ট ৮১ শতাংশের উপরে ডিজেল ব্যবহার হয়। এতে ফসল উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় কৃষি পরিবারের উপার্জন কমে যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ ফসল প্রক্রিয়া ও গুদামজাত, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু খামার স্থাপন এবং মাছ চাষে বিনিয়োগে উত্সাহিত করবে। স্থানীয়ভাবে হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও মাছের খাদ্য তৈরি সম্ভব হবে। বহুমুখী খামার উৎপাদনে শ্রমিক চাহিদা আরো বেড়ে যাবে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এর সুবিধা গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত আছে— গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি; বন্যার পানি ব্যবস্থাপনা, নিষ্কাশন ও সেচ এলাকা সম্প্রসারণে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএডিসি ফসলের উচ্চফলনশীল জাতের বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করছে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়। মৎস্য উৎপাদনে মৎস্য অধিদপ্তর এবং হাঁস-মুরগির খামার ও গবাদিপশু উন্নয়নে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কার্যপরিধি ব্যাপকতর হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামে সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করেছে। বিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরো বেড়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে তুলতে সহায়ক হবে।
এলজিইডি সরকারি ও বৈদেশিক অর্থায়নে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে। একই অধিদপ্তরে এত বিদেশী দাতা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা সচরাচর দেখা যায় না। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশী-বিদেশী পরামর্শকদের কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পারস্পরিক সহযোগিতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডির মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এলজিইডির কার্যক্রমে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, এনজিও, স্থানীয় জনগণ, উপকারভোগী এবং স্বার্থসংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে ওঠে। কোনো ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দেয়া হতে থাকে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের উপযোগী ও গ্রহণযোগ্য প্রশমন ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি করে এলজিইডি। ভৌত অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সংশ্লিষ্ট করা হতে থাকে, যাতে এর ব্যবহার দীর্ঘস্থায়ী হয়। অবকাঠামো নির্মাণে স্থানীয় দরিদ্র জনগণও যেন অংশীদার হতে পারে, সে লক্ষ্যে সব মাটির কাজে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক দল নিয়োজিত করা হতে থাকে। এই শ্রমিক দল গঠনে নিঃস্ব ও হতদরিদ্র নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। পরিচয়পত্র প্রদান, হাজিরা বই তৈরি ও অর্থ পরিশোধের তথ্য রেকর্ডভুক্ত করে শ্রমিকদের যথাযথ মজুরিপ্রাপ্তিতে স্বচ্ছতার বিধান রাখা হয়। দেশব্যাপী এলজিইডি সুপরিচিত হয়ে পড়ে।
সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গ্রামীণ উন্নয়নে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যে গ্রাম থেকে শহরে অভিপ্রয়াণ ও সম্পদ স্থানান্তরের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামীণ উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা সমাধান, কৃষি কার্যক্রম গ্রহণ করে দারিদ্র্য হ্রাসে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। গ্রামীণ উন্নয়ন কৌশলে কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধন কার্যক্রমের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামের সমস্যা প্রশমনে গৃহীত কার্যক্রম এখনো অপর্যাপ্ত। খাতভিত্তিক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বরাদ্দে দেখা যায় কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান এবং পানিসম্পদ খাতগুলোয় চলতি দশকের শুরুর তুলনায় বরাদ্দ কমে গেছে। যদিওবা টাকার অংকে এ তিন খাতেই বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি ও প্রয়োজনের তুলনায় এ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। এদিকে পরিবহন খাতে উল্লেখযোগ্য অংকে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে অবশ্য পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত আছে। পরিবহন খাতে এ বর্ধিত বরাদ্দের সর্বাধিক সুবিধা পেতে হলে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন জোরদারেরও প্রয়োজন রয়েছে।
বিগত অভিজ্ঞতা থেকে গ্রামের মানুষের সার্বিক কল্যাণে অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্ব সহজেই প্রতীয়মান। স্থানীয়, জাতীয় ও খাতভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকসই, সুষম ও বহুমুখী গ্রামীণ উন্নয়নে প্রয়োজন অবকাঠামো নির্মাণে সমন্বিত উদ্যোগ ও পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন। উন্নয়নের সুবিধা থেকে গ্রামের মানুষ বঞ্চিত থাকলে দারিদ্র্য দূরীকরণ কঠিন হয়ে পড়ে। দেশের নীতিনির্ধারণে গ্রামের উন্নয়নকে অধিকতর অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। গ্রামের অবকাঠামো উন্নয়ন হলে বেসরকারি বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে। সরকারি বিনিয়োগের ওপর গ্রামের মানুষের নির্ভরশীলতা কমে আসবে। নিজেরাই স্বাবলম্বী হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক: উন্নয়ন গবেষক






