বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (পিডিবি) বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি এখন পাঁচটি। এর মধ্যে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এবং ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) রাজধানীতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুেসবা নিশ্চিত করে যাচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় পিডিবি বিদ্যুেসবা দিয়ে থাকে। এছাড়া খুলনা ও বরিশালের কিছু অংশ ছাড়া ৫৬ হাজার বর্গমাইলের গ্রামগঞ্জ ও পাড়া-মহল্লাকে আলোকিত করার কাজে নিয়োজিত বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)।
স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করেও ৪৪ বছর ধরে পরাধীন ছিটমহলের ১১ হাজার ৩২টি পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে আরইবি। গত বছরের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকত্ব সমস্যা নিষ্পত্তির পর এসব অধিকারবঞ্চিত মানুষকে বিদ্যুতের সেবা দিতে ৬৪ কিলোমিটার লাইনও নির্মাণ করেছে তারা। আরো ৩০০ কিলোমিটার লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। ৮ হাজার ৪৭১টি পরিবারকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। পিছিয়ে থাকা অধুনা বিলুপ্ত ছিটমহলবাসী এখন বিদ্যুতের আলোয় উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখছে।
১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে সেবা দিয়ে চলছে পল্লী বিদ্যুৎ। ২০১৩ সালে ‘রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন বোর্ড অধ্যাদেশ ১৯৭৭’ সংশোধন করে বর্তমান ‘বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড’ নামকরণ করা হয়। সরকার, দাতা সংস্থা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের সহযোগিতায় নিরন্তর এগিয়ে চলছে সেবা কার্যক্রম। গ্রামীণ কৃষিপণ্য ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মসূচি এখন প্রধান মাধ্যম।
বিদ্যুেসবা নিশ্চিতের ফলে গ্রামীণ বাংলাদেশে বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। ২০০২ সালে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (এইচডিআরসি) নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় এমন চিত্র দেখা যায়। সংস্থাটি ২৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৭০টি গ্রামের নারী-পুরুষের ওপর ওই গবেষণা চালিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। বিদ্যুৎ সংযোগের আগে এবং পরে এসব মানুষের জীবনমান, উপার্জন এবং শিক্ষার হারের মধ্যে বড় ধরনের তফাত দেখা যায়।
পিডিবি, ডিপিডিসি ও ডেসকোর কার্যক্রম শহরকেন্দ্রিক। যেখানে রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো অনেক উন্নত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকার কারণে নতুন সংযোগ ও নতুন লাইন নির্মাণে খুব ব্যয় করতে হয় না তাদের। ফলে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুেসবা পৌঁছে দেয়াও তাদের জন্য সহজ এবং সাশ্রয়ী।
কিন্তু আরইবির কার্যক্রম এদের চেয়ে অনেক দুষ্কর। অনগ্রসর পল্লী অঞ্চলকে আলোকিত করার ইশতেহার নেয়ার কারণে হাওড় বাঁওড় আর নদ-নদী মাড়িয়ে কাজ করতে হচ্ছে আরইবিকে। আরইবির পথচলা অন্য দু-চারটি বিতরণ কোম্পানির মতো সুখকর নয়। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে দেশের জনগণের বিদ্যুেসবা নিশ্চিত করতে হয় এ কোম্পানিকে।
২০২১ সালের মধ্যে সরকার দেশের সব আবাসিক বাড়িতে শতভাগ বিদ্যুেসবা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশ ৬৮ শতাংশ মানুষ বিদ্যুেসবার আওতায় এসেছে। এখনো প্রায় ৩২ শতাংশ মানুষ হারিকেন, কুপি আর মোমবাতির আলো ব্যবহার করে। এসব প্রান্তিক ও প্রান্তজনের জীবনে অন্ধকার হটিয়ে বিদ্যুতের আলোধারা বইয়ে দিতে একমাত্র দিশারি আরইবি।
এই তো কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। যে ইতিহাস গড়ার পেছনে জাদুকরী ভূমিকা রেখেছেন তরুণ ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজ। দেশ ও দেশের বাইরের কোটি কোটি মানুষ মিরাজের সেই দারুণ বোলিং উপভোগ করেছে, বাহবা দিয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় দেশের হয়ে নাতির কৃতিত্ব টেলিভিশনে দেখতে পারেননি মিরাজের দাদি জবেদা বিবি।
তার দাদাবাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামে। প্রান্তিক অঞ্চল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় এত দিন সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছায়নি। কিন্তু গণমাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সরকারের নির্দেশে সেখানে ৭ নভেম্বর বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে আরইবি।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে সাউথ এশিয়ান গেমসে সাঁতারে স্বর্ণ জয় করে আরেকটি ইতিহাস সৃষ্টি করেন মাহফুজা আক্তার শিলা। যশোরের নওয়াপাড়ায় বেড়ে ওঠেন এ স্বর্ণজয়ী কন্যা। এ অর্জনের আগ পর্যন্ত তাকে কুপি আর হারিকেনের আলোয় রাতের অন্ধকার দূর করতে হয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি তার বাড়িতেও বিদ্যুেসবা পৌঁছে দিয়েছে আরইবি।
২০১৩ ও ২০১৪ সালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। ২০১৫ সালের এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) কাপে নেপালকে ১-০ গোল, ভুটানকে ১৬-০, ইরানকে ২-০ গোলে হারিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। এএফসি কাপে এ অদম্য ছাত্রীরা অসামান্য অবদান রাখলেও তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকায় খেলা উপভোগ করতে পারেননি তাদের স্বজনসহ ওই গ্রামের দর্শকরা। বিষয়টি সরকারের নজরে আসার পরই এ গ্রামে বিদ্যুৎ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
দেশের হয়ে গৌরব বয়ে আনা মেয়েদের সম্মান দেখিয়ে গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর গ্রামে ওই ১৯ কিশোরীর পরিবারসহ কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয় আরইবি। উপজেলার কলসিন্দুর, গামারীতলা, পশ্চিম গামারীতলা, পঞ্চনন্দপুর, দক্ষিণ রানীপুর, মুক্তাগাছা, রামসিংহপুর, গৌরীপুর ও সোহাগীপাড়া গ্রামে মোট ১৪ হাজার ৮২৯ কিলোমিটার লাইন স্থাপন করা হয়েছে। এজন্য ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা খরচ হয়।
এর আগে জাতীয় দলের ক্রিকেট খেলোয়াড় সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার মহিষের ডাঙ্গা গ্রামের সৌম্য সরকার এবং একই জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বয়রা গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়।
‘ব্রেক ইভেন’ তথা লাভও নয়, লোকসানও নয়; এই নীতিতে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। যদিও অনুন্নত এবং আবাসিক ও অনুৎপাদিত খাতে বিদ্যুেসবা দেয়ার কারণে কয়েক বছর ধরে লোকসান গুনছে পল্লী বিদ্যুৎ। বর্তমানে আরইবির মোট গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটি ৫৬ লাখ। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৭৪ লাখ। গত সাত বছরে নতুন ৮২ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে এসেছে এ কোম্পানি।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাও বেড়েছে। তাই আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক সব খাতেই নতুন সংযোগ দেয়া হচ্ছে যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৩০ লাখ নতুন সংযোগ দেয়া হয়েছে। এ বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের গ্রাম এলাকায় আরইবি ৩ লাখ ২৫ হাজার পরিবারকে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে।
সরকারের এজেন্ডা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যে ৯০ ভাগ পরিবারকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্যে আরইবির ৭৮টি সমিতি কাজ করছে। শতভাগ বিদ্যুতায়ন ত্বরান্বিত করতে উপজেলা ধরে ধরে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১৩ আগস্ট দেশের ছয়টি উপজেলার শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় এসেছে। এর মাধ্যমে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, নারায়ণগঞ্জের বন্দর, কুমিল্লার আদর্শ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট, নরসিংদীর পলাশ ও চট্টগ্রামের বোয়ালখালীসহ মোট ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫০ জন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরো সাতটি উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হয়।
নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের পাশাপাশি প্রতি মাসেই নতুন লাইনও সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে পল্লী বিদ্যুৎ। সাত বছরে আগের ২ লাখ ১৭ হাজার কিলোমিটার লাইনের সঙ্গে নতুন করে ৯৮ হাজার কিলোমিটার লাইন নির্মাণ করা হয়েছে।
বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহারের বিষয়ে সোচ্চার পল্লী বিদ্যুৎ। গ্রিড বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে ইজিবাইকে সৌরশক্তির ব্যবহার প্রকল্প নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও কুমিল্লায় চারটি ২০-২২ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হবে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) আর্থিক অনুদানে আরইবির অধীন বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এসব স্টেশন স্থাপন করবে।
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম দুটি লক্ষ্য ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ এবং সাশ্রয়ী আধুনিক জ্বালানি ব্যবহার। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এমন একটি দেশে পরিণত করতে হলে দেশের আনাচে-কানাচে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সেবার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। আর এজন্য আরইবির এই কর্মসূচি আরো জোরালো করতে হবে। এজন্য সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা এবং সমর্থন উত্তরোত্তর বাড়াতে হবে।
তবে নতুন সংযোগ দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করলেই হবে না। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়লেও রাজধানীসহ সারা দেশে লোডশেডিং দেখা যাচ্ছে। শহরে লোডশেডিং কিছুটা কম হলেও গ্রামে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ভয়াবহ। এখনো দিনে ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। এটি বন্ধ করার জন্য গ্রিড সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অন্যান্য কর্মসূচি নিতে হবে।
আগামী দিনে এসব সমস্যা গুছিয়ে এশিয়া তথা বিশ্বের বৃহৎ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে আরইবি— এমন প্রত্যাশা সবার। আলোর গতির মতোই বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়বে পল্লী বিদ্যুতের আলো।
লেখক: সাংবাদিক






