১৯৯৮ সালে প্রণয়ন করা হয় জাতীয় টেলিযোগাযোগ নীতি। এর ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে টেলিযোগাযোগ আইন করা হয়। এ আইনে খাতটি নিয়ন্ত্রণে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়। এর ভিত্তিতে ২০০২ সালের ৩১ জানুয়ারিতে গঠন হয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি ১৪ বছর পূর্ণ করেছে। এ দীর্ঘ সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে যেমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে বিটিআরসির, তেমনি রয়েছে কিছু ব্যর্থতাও।

স্বাধীন কমিশন হিসেবে কাজ শুরু করলেও ২০১০ সালে সংশোধন করা আইনে লাইসেন্স প্রদান ও ট্যারিফ নির্ধারণসহ আরো কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা আছে। ফলে বর্তমানে শুধু রাজস্ব আদায়, কারণ দর্শানোর নোটিস প্রদান ও লাইসেন্স ইস্যু করাই দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক এ সংস্থার মূল দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্সও দেয়া হয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ভিত্তিতে। এছাড়া অপারেটরদের ট্যারিফের অনুমোদনও দেয়া হয় মন্ত্রণালয়ের সম্মতিসাপেক্ষেই। খাতের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে এসব বিষয় আগে কমিশনের এখতিয়ারের আওতাভুক্ত রাখা হয়েছিল।

সেলফোন গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিতে গত বছর বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। মূলত ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের উদ্যোগে এ কার্যক্রম শুরু করে বিটিআরসি। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পদ্ধতি চালু করা হয়। শুরুতেই নানা বিতর্কের মুখে পড়লেও পরবর্তীতে সাফল্যের সঙ্গে বিদ্যমান গ্রাহকদের এ পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। আর নতুন গ্রাহকদের জন্যও এ পদ্ধতিতে নিবন্ধন চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধনে ত্রুটির হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। তবে সিম নিবন্ধনের এ পদ্ধতি সফলতার সঙ্গে চালু করতে পারলেও, একই সঙ্গে কিছুটা ব্যর্থতার দায়ও বর্তায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির ওপর। কারণ গত প্রায় দেড় দশকে একাধিকবার নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে গ্রাহকদের। বিড়ম্বনা সত্ত্বেও তা মেনে নিয়েছিলেন তারা। অথচ বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আগে অপারেটরদের মাধ্যমে দফায় দফায় সংগৃহীত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। সর্বশেষ বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে অপারেটরদের। অথচ আগেই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিতের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে অপারেটরদের সে অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা দিতে পারত বিটিআরসি।

অপারেটরদের সেবার মান নিশ্চিত করতে ২০০৭-১২ সাল পর্যন্ত সাতটি ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তবে জারি করা এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন না করার অভিযোগ রয়েছে অপারেটরদের বিরুদ্ধে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব নির্দেশনা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার অভিযোগও রয়েছে। ফলে অপারেটরদের নানা সেবা নিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছে গ্রাহকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর অপারেটরদের সেবা ও মূল্য-বিষয়ক নির্দেশিকা জারি করে বিটিআরসি।

ডিরেক্টিভস অন সার্ভিস অ্যান্ড ট্যারিফ ২০১৫ শীর্ষক এ নির্দেশিকায় সেলফোন অপারেটরদের দেয়া সেবা, বিভিন্ন ধরনের সেবার মূল্য, বিপণন কার্যক্রম ও প্রচারণামূলক সেবার বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অপারেটরদের যেকোনো সেবা ন্যূনতম এক বছরের জন্য চালু করতে হবে। গ্রাহক চাইলে যেকোনো সময় এসব সেবার ব্যবহার বন্ধ করতে পারবেন। আর প্রচারণামূলক কোনো সেবা তিন থেকে সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত চালু রাখতে পারবে অপারেটর। এর বেশি সময় ধরে কোনো প্রচারণামূলক সেবা চালু থাকলে তা ওই অপারেটরের নিয়মিত সেবা বলে গণ্য হবে। আর দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বিবেচনায় নিয়ে প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে অপারেটরদের।

এছাড়া কোনো প্যাকেজের আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অব্যবহূত ডাটা পরবর্তীতে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন গ্রাহক। এক্ষেত্রে অব্যবহূত ডাটা আগে ব্যবহার হবে। আর প্যাকেজের আওতায় নির্দিষ্ট ডাটা ব্যবহার হবে অব্যবহূত ডাটা শেষ হওয়ার পর। গ্রাহকের অব্যবহূত এ ডাটা পরবর্তী ছয়বার পর্যন্ত যোগ হবে।

২০১২ সালের আগস্টে সেলফোন অপারেটরদের ভয়েস কলে প্যাকেজ নির্বিশেষে ১০ সেকেন্ড পালস চালু করেছে বিটিআরসি। ওই বছরের ১১ আগস্ট দেশের ছয় সেলফোন অপারেটরকে ১০ সেকেন্ড পালস চালুর নির্দেশনা দেয় বিটিআরসি। নির্দেশনায় ১৫ আগস্টের মধ্যেই এটি বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত সেলফোন অপারেটর টেলিটক ছাড়া আর কেউই এটি বাস্তবায়ন করেনি। তবে ওই বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্য সব সেলফোন অপারেটর এটি চালু করে।

এরই মধ্যে দেশে থ্রিজি প্রযুক্তির সেবা চালু হয়েছে। প্রস্তুতি চলছে ফোরজিরও। ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এক নিলামের মাধ্যমে থ্রিজির তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া হয়। চার অপারেটর গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল থ্রিজির বাণিজ্যিক সেবাদানের লাইসেন্স পায়। প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স নেয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে থ্রিজি নেটওয়ার্ক চালু করে। পরবর্তীতে গত ৭ অক্টোবর গ্রামীণফোন, ২১ অক্টোবর বাংলালিংক, ৩০ অক্টোবর রবি ও ৭ নভেম্বর এয়ারটেল বাণিজ্যিকভাবে এ সেবা চালু করে।

ভয়েস কলের ট্যারিফ ব্যাপক হারে কমানোর পাশাপাশি হ্যান্ডসেটের দাম কমে আসায় টুজি প্রযুক্তির সেবা ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সফলতা পেয়েছে সেলফোন অপারেটররা। এর মধ্যে সিংহভাগই ভয়েস কলভিত্তিক সেবার গ্রাহক। থ্রিজি চালুর আগে সেলফোন অপারেটরদের জিপিআরএস বা ইডিজিইভিত্তিক ডাটাসেবার গ্রাহক ছিল ৩ কোটি ৪৭ লাখ।

অন্যদিকে বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে এরই মধ্যে এলটিই প্রযুক্তির সেবা চালু হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এলটিই চালু হয় ২০১২ সালের এপ্রিলে। ভারতী এয়ারটেল দেশটিতে প্রথম এ সেবা চালু করে। ফলে এর পর দেশে থ্রিজি প্রযুক্তি চালু ও তাতে বিনিয়োগে দূরদর্শিতার অভাবও দেখছেন অনেকেই। সেলফোন অপারেটররাও বলছে, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ সেবাদানের অনুমতি দেয়ার সুযোগ থাকলেও তা না করে উল্টো প্রযুক্তি নির্দিষ্ট করে তরঙ্গের নিলাম আয়োজন করা হয়। এতে বাধ্য হয়েই থ্রিজিতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। লাইসেন্স নিতে ব্যয়ের পাশাপাশি থ্রিজি নেটওয়ার্ক উন্নয়নেও এরই মধ্যে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। আর থ্রিজিতে বিনিয়োগ করা অর্থ উঠে আসতে আগামী এক দশকেরও বেশি সময় লাগবে বলে মনে করছে অপারেটররা।

থ্রিজির ধারাবাহিকতায়ই ফোরজি প্রযুক্তি হিসেবে পরিচিত এলটিই সেবা চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। লাইসেন্সিং নীতিমালা অনুযায়ী থ্রিজি লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এলটিই সেবা দিতে পারবে। তবে এজন্য কমিশনের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে তাদের। এলটিই সেবা চালু হলে আরো উচ্চগতির তারবিহীন ইন্টারনেটসেবা পাবেন ব্যবহারকারীরা।

দেশে ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে টুজি ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে থ্রিজিসেবা দিচ্ছে সেলফোন অপারেটররা। এরই মধ্যে অপারেটরদের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে ১২ কোটির বেশি সংযোগ। সেলফোন অপারেটররা বলছে, বিদ্যমান ব্যান্ডে এলটিই সেবা চালুতে আগ্রহী অপারেটররা। কারণ এরই মধ্যে এসব ব্যান্ডে হ্যান্ডসেট সহজলভ্য হয়েছে। পাশাপাশি অপারেটররা এসব ব্যান্ডে সেবা দেয়ায় টুজি কিংবা থ্রিজি থেকে ফোরজিতে রূপান্তর তুলনামূলক সুবিধাজনক হবে। এজন্য প্রযুক্তি নিরপেক্ষতার দাবি জানিয়ে আসছে অপারেটররা।

গত দেড় দশকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়েছে টেলিযোগাযোগ সেবা। বর্তমানে শুধু সেলফোন সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ১১ কোটিরও বেশি। পাশাপাশি রয়েছে ইন্টারনেটসহ অন্যান্য সেবার গ্রাহক। বিপুল এ গ্রাহকের সেবাসংশ্লিষ্ট নানা অভিযোগও রয়েছে। গ্রাহকের নানা জিজ্ঞাসা ও অভিযোগ নিরসনে দেশব্যাপী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকসেবা কেন্দ্র রয়েছে সব অপারেটরেরই। এর বাইরে কল সেন্টারের মাধ্যমেও গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছে তারা। তবে গ্রাহক সংখ্যার বিবেচনায় অধিকাংশ অপারেটরের গ্রাহকসেবা কেন্দ্রের অপর্যাপ্ততা ও বাণিজ্যিকীকরণের ফলে প্রয়োজনীয় সেবা না পাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে টেলিযোগাযোগ সেবাসংশ্লিষ্ট অভিযোগ গ্রহণ ও বিভিন্ন তথ্য জানাতে সম্প্রতি একটি কল সেন্টার চালু করেছে বিটিআরসি। ২৮৭২ নম্বরে ফোন করে সংশ্লিষ্ট সেবা পাবেন গ্রাহক। তৃতীয় পক্ষের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ সেবাটি দিচ্ছে বিটিআরসি। সেবা নিতে প্রতিদিনই কল সেন্টার নম্বরটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহক ফোন করছেন বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সূত্রে জানা গেছে। এর আগে সংস্থাটির ই-মেইল, নিজস্ব ওয়েবসাইটের ওয়েববক্সের মাধ্যমে অভিযোগ প্রদানের সুবিধা চালু ছিল। এর বাইরে বিটিআরসির কার্যালয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ জানানো যায়।

এদিকে ২০১২ সালে নতুন করে আরো আইজিডব্লিউ, আইসিএক্স ও আইআইজি লাইসেন্স দেয়া হয়। এতে আইজিডব্লিউ লাইসেন্সের সংখ্যা ২৯, আইসিএক্সের ২৬ ও আইআইজি লাইসেন্সের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭। আইজিডব্লিউগুলো আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া গ্রাহক পর্যায়ে সেবাদানকারী অপারেটরদের মধ্যে আন্তঃসংযোগ প্রদানকারী হিসেবে লাইসেন্স পেয়েছে আইসিএক্সগুলো। আর আইআইজিগুলো ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করে।

অবৈধ পথে আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদান বন্ধের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে ভিওআইপি সার্ভিস প্রোভাইডার (ভিএসপি) লাইসেন্স দিয়েছে বিটিআরসি। পর্যায়ক্রমে ৮৮১টি প্রতিষ্ঠানকে এ লাইসেন্স দেয়া হয়। মূলত আইজিডব্লিউর মাধ্যমে ভিএসপিগুলোর আন্তর্জাতিক কল আদান-প্রদান করার কথা। তবে লাইসেন্স পেলেও টেলিযোগাযোগ-কাঠামোয় ভিএসপির অবস্থান নির্দিষ্ট না করায় এবং আইজিডব্লিউর সঙ্গে আয়ের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় ভিএসপিগুলো শুরুতেই বিপাকে পড়ে। পরবর্তীতে প্রতিটি আইজিডব্লিউর বিপরীতে ভিএসপির সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয় বিটিআরসি।

অবৈধ ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল (ভিওআইপি) প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কল কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বিটিআরসি। এটি শনাক্তে সিমবক্স ডিটেকশন সিস্টেম, সেলফ রেগুলেশন প্রসেস, সিগোস সিস্টেম ছাড়াও সম্প্রতি নতুন করে চালু হয়েছে থ্রিভিআই সিস্টেম। এছাড়া নিয়মিত পরিদর্শন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি জব্দ ও ব্যবসায়ীদের আটক করা হচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় অবৈধ ভিওআইপি কমেছে বলে দাবি বিটিআরসির।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন দেশে আসা আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ গড়ে সাড়ে সাত কোটি মিনিট। গত বছরের আগস্টে কল টার্মিনেশন রেট দেড় সেন্ট থেকে বাড়িয়ে দুই সেন্ট করার পর কলের পরিমাণ কমে আসে। আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন রেট বাড়ানোর আগে বৈধ পথে গড়ে দিনে ১২ কোটি মিনিট ইনকামিং কল দেশে আসত। প্রতিদিন আসা আন্তর্জাতিক ইনকামিং কলের গড় এ পরিমাণ গত কয়েক বছরের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। ২০১১ সালে এটি ছিল গড়ে ৪ কোটি ৬১ লাখ, ২০১২ সালে সাড়ে তিন কোটি, ২০১৩ সালে ৪ কোটি ৬৫ লাখ ও ২০১৪ সালে ৭ কোটি মিনিট।

আইএসপি ছাড়াও দেশে ব্রডব্যান্ড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস (বিডব্লিউএ) লাইসেন্সের আওতায় ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে তিনটি। এছাড়া ছয় সেলফোন অপারেটরও টুজি ও থ্রিজি প্রযুক্তির ইন্টারনেটসেবা দিচ্ছে।

বর্তমানে একমাত্র সাবমেরিন কেবল সংযোগ হিসেবে সাউথ ইস্ট এশিয়া-মিডলইস্ট-ওয়েস্টার্ন ইউরোপ-ফোরের (সিমিউই-৪) সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ। কেবলের বাংলাদেশ অংশটির ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে বিএসসিসিএল। আগামী বছরের শুরুতেই দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল সংযোগ হিসেবে সিমিউই-৫ এর সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। ফলে আরো ১ হাজার ৪০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ সরবরাহের সক্ষমতা যুক্ত হবে।

দেশের সাবমেরিন কেবলের অব্যবহূত ব্যান্ডউইডথ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় রফতানি শুরু করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)। চলতি বছর ভারতে ব্যান্ডউইডথ রফতানির এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর আওতায় ভারতকে ১০ গিগাবিটস পার সেকেন্ড (জিবিপিএস) ব্যান্ডউইডথ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লিজে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে বছরে বৈদেশিক মুদ্রায় ৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা (১২ লাখ ডলার) আয় করবে বাংলাদেশ।

গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে ব্যান্ডউইডথের চাহিদা বেড়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে এ চাহিদা দাঁড়ায় ২৩৩ জিবিপিএস (গিগাবিটস পার সেকেন্ড)। এ চাহিদার সিংহভাগ ব্যান্ডউইডথই সরবরাহ করছে বেসরকারি খাতের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ছয় ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) প্রতিষ্ঠান। তবে এ সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) ব্যান্ডউইডথ সরবরাহের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার যুবশক্তির কারণে কল সেন্টার ও বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। খাতটি এগিয়ে নিতে এরই মধ্যে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে শুধু নিবন্ধনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হলেই এ সেবা দিতে পারে যেকোনো প্রতিষ্ঠান। এ খাতে উন্নত কর্মপরিবেশের সুযোগ দিতে ২০১১ সালে কল সেন্টার পল্লী গড়ে তোলার বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠায় বিটিআরসি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি মন্ত্রণালয়।

সরকারের পক্ষে টেলিযোগাযোগ খাতের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব বিটিআরসির ওপর। প্রতিষ্ঠার পর গত প্রায় দেড় দশকে সংস্থাটির মাধ্যমে এ খাত থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। অপারেটরদের আয়ের ভাগাভাগির অংশ (রেভিনিউ শেয়ারিং), লাইসেন্স ফি ছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা মেয়াদি আমানতের লভ্যাংশও বিটিআরসির আয়ের অন্যতম উত্স।

বিটিআরসির দায়িত্বের অন্যতম তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা। ২০০৮ সালে ‘স্ট্রেনদেনিং দ্য রেগুলেটরি ক্যাপাসিটি অব বিটিআরসি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের টিসিআই ইন্টারন্যাশনাল ইনকরপোরেশনের কাছ থেকে তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি ব্যবস্থার আওতায় কাজ করা এসব যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তরঙ্গের দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেয়া তরঙ্গের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং পর্যবেক্ষণ করছে কমিশন। তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রাজধানীতে বিটিআরসির প্রধান কার্যালয়ে স্থাপন করা হয় কেন্দ্রীয় স্টেশনটি। এর বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রংপুর ও বগুড়ায় রয়েছে আরো পাঁচটি স্থায়ী পর্যবেক্ষণ স্টেশন। এছাড়া কমিশনের তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ পর্যবেক্ষণ স্টেশন, দুটি পিকআপ, একটি স্থানান্তরযোগ্য পর্যবেক্ষণ স্টেশন ও তিনটি পর্যবেক্ষণ স্পেকট্রাম অ্যানালাইজার রয়েছে।

এ কার্যক্রমের আওতায় ২০১২ সালে জিএসএম ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে তরঙ্গ পুনর্বিন্যাস করে বিটিআরসি। সে সময় ব্যান্ডটিতে বিছিন্নভাবে থাকা সেলফোন অপারেটরদের তরঙ্গ পুনর্বিন্যাস করা হয়। ফলে ওই ব্যান্ডে অবিচ্ছিন্নভাবে ১৫ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ আলাদা করা সম্ভব হয়। এছাড়া পর্যবেক্ষণের এ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামীণফোনের তরঙ্গ প্রতিবন্ধকতা-বিষয়ক সমস্যা, পুলিশের জন্য নির্ধারিত ব্যান্ডে র্যাবের ও এয়ারটেলকে বরাদ্দ দেয়া তরঙ্গে সিটিসেলের তরঙ্গের কারণে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা সমস্যার সমাধান করা হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবেশী দেশের সেলফোন অপারেটদের সিগনাল, রাজশাহীতে এয়ারটেলের অননুমোদিত তরঙ্গ ব্যবহার ও এফএম রেডিও স্টেশনগুলোর অতিরিক্ত তরঙ্গ ব্যবহার বিটিআরসির তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিটিআরসির রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত তরঙ্গ ফি।

প্রতি কলড্রপে ১ মিনিট ক্ষতিপূরণ দিতে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি অপারেটরদের নির্দেশনা দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানায় সেলফোন অপারেটররা। পরবর্তীতে এ নিয়ে অপারেটরদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করে সংস্থাটি। এতে ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়।

দ্রুতগতির ডাটা আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন ও এর মাধ্যমে সেবাদান করছে। দেশব্যাপী অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক পরিকল্পনামাফিক স্থাপন ও নিয়মিত এ নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে ভৌগোলিক অবস্থানের তথ্য সন্নিবেশিত ইন্টারঅ্যাক্টিভ ম্যাপ তৈরি করেছে বিটিআরসি। চলতি বছরই আনুষ্ঠানিকভাবে এ ম্যাপ চালু করা হয়। এর ফলে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনের বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আগামী বছর নাগাদ মহাশূন্যের পথে পাড়ি দেবে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। এটির নির্মাণ, উেক্ষপণ ও পরিচালনার সামগ্রিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিটিআরসিকে।

ডিপিপি অনুযায়ী, স্যাটেলাইট নির্মাণ ও উেক্ষপণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। বাকি ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে বিদেশী উত্স থেকে। স্যাটেলাইট উক্ষেপণের পাঁচ বছরের মধ্যে এ প্রকল্পের ব্যয় উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বছরের নভেম্বরে স্যাটেলাইট সিস্টেম কিনতে ফ্রান্সের থেলিস অ্যালেনিয়া স্পেসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে বিটিআরসি। প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছর মেয়াদি এ চুক্তির আওতায় স্যাটেলাইট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে থেলিস।

২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্যাটেলাইটটি উেক্ষপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে স্যাটেলাইট নির্মাণকাজের অর্ধেক শেষ হয়েছে।

দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও রেডিও বর্তমানে বিদেশী স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রতি বছর বৈদেশিক মুদ্রায় বিপুল অংকের ভাড়া পরিশোধ করছে তারা। নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকলে এ অর্থ দেশেই রাখা সম্ভব হবে। অন্যদিকে স্যাটেলাইটের অব্যবহূত তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। এছাড়া দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে এ স্যাটেলাইট।

২০১৮ সালের মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধু-১-এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।