কাতারে আরসিএসের (রিচমন্ড কনসালট্যান্টস অ্যান্ড সার্ভিসেস) কাজের পেছনে অবদান রয়েছে ইসরাত আরা ইউনুসের। তিনি এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। ব্যাংকিং খাতের ইসরাতের রয়েছে ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা। তিনি একজন ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে এএনজি গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক ও এইচএসবিসি ব্যাংকের মধ্যপ্রাচ্য শাখায় ম্যানেজমেন্ট ও সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। আরো কাজ করেছেন মডেল ইস্ট করপোরেট ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে।
তিনি বাংলাদেশের রেনাটা এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের সিইও ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম ইন্টিগ্রেটেড পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রি। তিনি লোকাল এন্টারপ্রাইজ ইনভেস্টমেন্ট সেন্টার নামে একটি উন্নয়নমূলক সংস্থার সেন্টার ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠানটি কানাডীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
ঝুঁকি মোকাবেলা, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, ডেবট রেসট্রাকটিং, ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্ট, প্রজেক্ট ফাইন্যান্স, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ফাইন্যান্স, কন্ট্র্যাক্ট ফাইন্যান্স, লোন সিন্ডিকেশন, ট্রেড ফাইন্যান্স, ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট, ইনফরমেশন মেমোরেন্ডাম, বিজনেস ভ্যালুয়েশন প্রভৃতি নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও এসএমই ডেভেলপমেন্টে একজন বিশেষজ্ঞ। কাতারেও তিনি সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। সেক্ষেত্রে তিনি ফাইন্যান্স প্রফেশনাল থেকে হয়েছেন একজন উদ্যোক্তা।
তবে কাজটা সহজ ছিল না। তিনি কাতার গিয়েছিলেন ২০০৮ সালে। তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার ছেড়ে সে সময় তিনি কাতারে পাড়ি জমান। যেমনটা আগে বলা হয়েছে, তিনি বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।
কাতারে গিয়ে তিনি প্রথমত তার ব্যস্ত কর্মজীবন থেকে সরে গিয়ে পরিবারকে সময় দিতে শুরু করেন। কিন্তু এরপর তিনি আবার প্রফেশনাল জীবনে ফেরেন। দ্য পেনিনসুলার সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘এক
বছরের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম যে চ্যালেঞ্জিং প্রফেশনাল জীবনের তুলনায় ঘরে বসে থাকা কঠিন।’
তিনি কাতারের একটি মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকে যোগদান করে বহু প্রচলিত ধারণা ভাঙতে শুরু করেন। তিনি ওই ব্যাংকের প্রথম নারী করপোরেট ব্যাংকিং রিলেশনশিপ ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। মনে করা হয় করপোরেট খাত ও ব্যাংকিং পুরোপুরিভাবেই পুরুষ নিয়ন্ত্রিত। সেখানে ইসরাত তার নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার বলে বহু চুক্তি সম্পাদনে সফলতা ও কুশলতা দেখিয়েছেন। তিনি এর আগে যেভাবে কাজ করেছেন তারপর নতুন কাজের ক্ষেত্রেও সে ধারা বজায় রেখেছেন।
ইসরাত নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। সে কারণেই তিনি যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে দ্বিধা করতেন না। প্রথমে তিনি যে ধরনের সফলতা পেয়েছেন তারপর সেখান থেকে সরে যাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু ইসরাত তা করেছেন এবং সেক্ষেত্রে তার কোনো দ্বিধা ছিল না। ইসরাতের ভাষাতেই আমরা পাই যে তিনি পরিবারকে সময় দিতেই চেয়েছিলেন। তার নিজের ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়ে এমন একটা কাজ করার জন্য সাহসের প্রয়োজন। ইসরাতের তা ছিল। তিন বুঝেশুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু যখন দেখলেন তার আসলে কাজের ক্ষেত্র রয়েছে ভিন্ন, তখন তিনি সেই জায়গাটিতে পুনরায় কাজ করলেন। সত্যিকারের যোগ্যরা কখনো সীমিত পরিসরে থেমে থাকেন না এবং কাজ করতে চান নিজের মতো। ইসরাতও তাই করেছিলেন। তিনি আবার ক্ষেত্র পরিবর্তন করলেন।
কাতারের বাংলাদেশ ফোরামে ইসরাত একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি কাতারে বাংলাদেশের অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করেন। অর্থাৎ ইসরাত কাজের কোনো ক্ষেত্রই অধরা রাখতে চাননি। তার কাজের পরিধি তিনি বাড়িয়ে চলেছেন এবং নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র নিরীক্ষা করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। ইসরাত বলেন, ‘আমার
অভিজ্ঞতা ছিল আর্থিক বিভিন্ন কাজে। আমার মনে হয়েছিল আমার এই কাজের অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে আমি উদ্যোক্তা হতে পারি। সে সময় উপস্থিত। আমার উচিত নিজের ফাইন্যান্সিয়া অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্সি ফার্ম শুরু করা। সে কাজের জন্য অনুমতি পেয়ে আমার ফার্মের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে।’
ইসরাত আরা ইউনুসের কাজের ক্ষেত্র ও পরিধি ঈর্ষাযোগ্য। বাংলাদেশে বিভিন্ন আর্থিক খাতে তার কাজের কথা তো বলাই হয়েছে। এছাড়া তিনি কাতারে তার কাজে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। তিনি ২০১৬ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আরসিএসে কর্মরত আছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথমে প্রতিষ্ঠানটি লিমিটেড লায়াবিলিটির ছিল। এরপর লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়। ২০২০ সাল থেকে ইসরাত আরা ইউনুস এ প্রতিষ্ঠানের সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদটি সামলাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি কিউএফসি লাইসেন্সপ্রাপ্ত। ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ ও প্রশাসন ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরামর্শক হিসেবে কাজ করে।
ইসরাতের এ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কাতারে সুপরিচিত ও এর রয়েছে সুনাম। এ প্রতিষ্ঠান কাতারের অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ দেয়ার কাজ করে। ইসরাত তার নিজের কাজের ক্ষেত্রতেই নিজের কাজটিকে আরো বিস্তৃত করেছেন। তবে একজন নারী হয়ে এ কাজ করার কারণে তার কিছু অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কাতারের মতো একটি দেশে এ কাজ করা তার জন্য সহজ হয়নি। বিশেষ করে তিনি সেখানে প্রবাসী। ইসরাত তার ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে অনেক পথ দেখতে পান। তিনি বলেন, ‘একজন
নারী ও প্রবাসী হওয়ার কারণে আমার পথে আরো কিছু বাধা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বরাবরই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। যেসব নারী উদ্যোক্তা হতে চান তাদের জন্য আমার পরামর্শ হচ্ছে অধ্যবসায়ের সঙ্গে কাজ করা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। এই দুটো কাজই আমার ক্যারিয়ারে সাহায্য করেছে।’
তার জীবন যথেষ্ট ব্যস্ত। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি নানা সামাজিক কাজেও যুক্ত হন। কাতারের বাংলাদেশ ফোরামে তিনি কাজ করেন। নিয়মিত সময় দেন সেসব কাজে। কিন্তু তার মূল মনোযোগ এখন তার কনসালট্যান্সি ফার্ম নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি
আমার এ প্রতিষ্ঠানকে এমন একটি অবস্থানে নিতে চাই যেন কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন হয় তাহলে প্রথমে আমার কনসালট্যান্সি ফার্মের নামই প্রথমে মাথায় আসে।’
ইসরাতের কথা থেকেই বোঝা যায় তিনি অধ্যবসায়ী এবং আত্মপ্রত্যয়ী। তার আত্মপ্রত্যয়ই তাকে সফল হওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। ইসরাত আরা ইউনুস সফল হয়েছেন এবং তার সঙ্গে খুলেছে নারী ও প্রবাসীদের জন্য অনেক সুযোগের দুয়ার।
আলী আমজাদ: সাংবাদিক





