দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাস হিসেবে বেছে নেয়ার জন্য বাংলাদেশীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যের নাম ওমান। ১৯৭৬-২০১৯ সালের তথ্য বলছে, দেশটি বাংলাদেশীদের শীর্ষ গন্তব্যের তৃতীয় স্থান ধরে রেখেছে। গন্তব্য হিসেবে প্রথম দুটি অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু ওমানে অভিবাসীদের তালিকায় বাংলাদেশীর অবস্থান শীর্ষে। দেশটির ন্যাশনাল সেন্টার ফর স্ট্যাটিসটিকস অ্যান্ড ইনফরমেশনের তথ্য বলছে, বর্তমানে ৬ লাখের বেশি বাংলাদেশী ওমানে বসবাস করছেন, আর তারা কাজ করছেন নানা ধরনের খাতে। সংখ্যার দিক থেকে এটা সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতীয় অভিবাসীরা। তাদের সংখ্যা ৪ লাখ ৯০ হাজার। ২ লাখ ৬ হাজার অভিবাসী নিয়ে ওমানে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তানিরা।

যদিও ওমানে অভিবাসী আগমনের এ ধারা বেশির ভাগ সময়ই অসম থেকেছে। ১৯৯৬-২০০৪ সাল পর্যন্ত দেশটিতে শুধু পুরুষদের কৃষিকাজের জন্য ভিসা দেয়া হতো। যদিও এমন কৃষি ভিসা নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা বেশির ভাগ সময়ই ফার্মে থাকতেন না। বরং সেখানে গিয়েই তারা শহরে কাজ করতে চলে যেতেন। পরবর্তী সময়ে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন আসে ২০০৮ সালে। সে সময়ে উচ্চাভিলাষী নানা নির্মাণ পরিকল্পনায় শ্রমিকের প্রয়োজন পড়ায় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। এ সময়েই মূলত বাংলাদেশ থেকে নিয়োগটা সেই ঐতিহ্য মেনে চলে আসা পুরুষ অভিবাসীদের পেরিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যায়।

রাজধানী মাসকটে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২১ সালে দেশটিতে ৭ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশী বসবাস করতেন। তার মধ্যে কিছু অবৈধ কর্মীও ছিলেন। এসব কর্মীর বেশির ভাগই কম দক্ষতা ও মাঝারি দক্ষতাসম্পন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন। ফলে তাদের কাজগুলো ঠিকঠাক ওমানাইজড হয়নি। ওমানের কাজের ক্ষেত্রটা মূলত পুরুষভিত্তিক হয়ে দাঁড়ায় সে সময়ে। কারণ খুব কম পুরুষই তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের এখানে নিয়ে আসে। 

বাংলাদেশের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯১-২০১৯ সালে ওমানে যাওয়া মোট কর্মীদের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক। ২০১৩ সালের পরে সংখ্যাটি বেড়েছে। চিত্রটায় বদল দেখা যায় ২০১৯ সালে। তথ্য বলছে, সেবার ১৭ হাজার ৬৫৪ জন নারী শ্রমিক ওমানে প্রবেশ করে, যেটা মোট অভিবাসী শ্রমিকের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ দূতাবাস কর্মকর্তাদের মতে, মোট বাংলাদেশী অভিবাসীদের ১০ শতাংশেরও কম নারী। দেরিতে হলেও পরিবারের বোঝা হিসেবে নয় বরং নিজেদের অধিকার নিয়ে ‘শ্রমিক’ হিসেবে বাংলাদেশী নারীদের ওমানে আগমন, জর্ডান বা লেবাননের মতো অন্য দেশের তুলনায় বেশ পার্থক্য তৈরি করে। পরে পুরুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় নারীরা। এমনকি তাদের প্রথম থেকেই শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করার পরিস্থিতিও তৈরি হয়।

তবে ওমানে নারীদের বাইরে কাজ করার প্রবণতা কম, সে কারণে সেখানে রাস্তাঘাট বা দোকানে যে খুব বেশি নারী দেখা যায়, তা নয়। যা-ও বা কিছু দেখা যায়, তাদের প্রায় সবাই কালো বোরকা পরে থাকে, কখনো কখনো তাদের মুখ পুরোপুরি ঢাকা থাকে। ফলে আলাদা করে বাংলাদেশী নারীদের সেখানে চেনা খুব কঠিন। তাই সেখানে গৃহকর্মে যুক্ত থাকার প্রবণতা বেশি। এমনও দেখা গিয়েছে, কেউ কেউ আগে পোশাক কারখানায় কাজ করলেও পরে তারা আবার গৃহকর্মে ফেরত যায়।

বর্তমানে ওমানে যে পরিমাণ বাংলাদেশী রয়েছে, তা অন্যান্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। এর আগে ওমানে ভারতীয়র সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ওমানে বাংলাদেশীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে পুলিশের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও একসময় ভারতীয়দের ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশীরা। প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ওমান। দেশটি এমনই উজ্জ্বল থাকবে চলতি বছরেও, কারণ দেশটিতে এখন বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। আর সেখানে অনেক বেশি শ্রমিক প্রয়োজন হবে।

ওমান দূতাবাসের ডেপুটি হেড মৌসুমী রহমান বলেন, বছরজুড়েই দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় অংশ নেয়ার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের আহ্বান জানানো হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশীদের জন্য এখানে সুযোগ থাকবে অবারিত।

উপসাগরীয় দেশটি এখন আবার মূলধারায় ফিরছে। তাই ২০২২ সাল জুড়ে বাংলাদেশীদের জন্য ওমানের বাজার খুবই আকর্ষণীয় ছিল। প্রবাসী বাংলাদেশীরা নিজেদের আন্তরিকতা, বিনয় ও কঠোর পরিশ্রম দিয়েই সেখানে নিজেদের ভালো অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। সেই সঙ্গে সহজে আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা যেকোনো চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রটা বাংলাদেশীদের জন্য আরো সহজ করে তুলেছে, বিশেষ করে ওমানিয়ানদের মধ্যে।

সালতানাতের প্রান্তিক পর্যায়ে বাংলাদেশী শ্রমিকদের নিয়োগ দেয়ার জন্য বিভিন্ন প্রচারণাও চালানো হয়েছে সেখানে। কভিড-১৯ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত বছর ওমানে বাংলাদেশী শ্রমিকদের নিয়োগ বেশ ভালোই হয়েছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ওমানে গিয়েছে ৬০ হাজার শ্রমিক, ২০২২ সালের শেষে মোট সংখ্যা এর তিন গুণ হতে পারে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

 

রেশমা জাহান: সাংবাদিক