উড়োজাহাজ যখন আরব আমিরাতের আকাশসীমায় তখন ওপর থেকে গগনচুম্বী অট্টালিকা আর প্রশস্ত সড়ক দেখেই বোঝা যায় মরুর বুকে অত্যাধুনিক শহর গড়ে তোলা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন, বিলাসবহুল হোটেল, শপিং মল যেমন আছে, একই সঙ্গে বাণিজ্য নগরীতে পরিণত আরব আমিরাত। বিশেষ করে দুবাই পশ্চিম ও প্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্যের যোগসূত্র অবস্থানে আছে। বাণিজ্যের কারণে বহুজাতিক শহরে পরিণত হয়েছে দুবাই। শহরের মানুষের পদচারণ দেখে কখনো মনে হবে না আরবের কোনো মরুর দেশ।

আরব আমিরাতের গগনচুম্বী অট্টালিকা, চোখ ধাঁধানো চাকচিক্যের নেপথ্যে শ্রম দিয়েছেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা। এখনো দেশটিতে অনেক বাংলাদেশী বিভিন্ন ধরনের কাজ করছেন। প্রতিদিনই বাংলাদেশ থেকে অনেকেই আরব আমিরাতে যাচ্ছেন, কাজের সন্ধানে। কোনো খোঁজখবর না নিয়েই গ্রাম থেকে অনেকে যেমন শহরে আসেন কাজের সন্ধানে, কোনো না কোনো কাজ জুটবেই এ আত্মবিশ্বাসে। আরব আমিরাত নিয়ে বাংলাদেশী মানুষের ধারণাও এমন, গেলেই জুটে যাবে ভালো মজুরির কাজ।

সকালে সূর্যের প্রখরতা টের পাওয়া যাচ্ছে, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একটি ক্যাফেতে সকালের নাশতা করতে এলাম। একটি টেবিলে বসতেই একজন যুবক টেবিলটি পরিষ্কার করে গেলেন। চেহারার গড়নে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশী, আলাপে নিশ্চিত হলাম। এবার আরেকজন এলেন খাবারের অর্ডার নিতে, বেশ পরিষ্কার ইংরেজিতে কথা বলছেন। তাকেও বাংলাদেশী মনে হলেও জানলাম তিনি ভারতের কেরালার নাগরিক। নাশতা সেরে বিল দিতে কাউন্টারে গেলাম, সেখানে ফিলিপাইনের এক তরুণী।

এ কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে, যে যার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করছেন। ভাষাগত ও কাজের দক্ষতার কারণে ভারতীয়, ফিলিপাইনের নাগরিক একই সময়ে শ্রম দিয়ে যে অবস্থানে যে বেতনে কাজ করছেন, শুধু অদক্ষতার কারণে বাংলাদেশী নাগরিকের অবস্থান তাদের নিচে।

আরিব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ ভ্রমণের সময়গুলোয় প্রতিটি রেস্তোরাঁ, ক্যাফেগুলোয় অভিন্ন চিত্র। ভারত, ফিলিপাইন, আফ্রিকার কিছু দেশের নাগরিক নেতৃত্বস্থান দখল করেছে তাদের যোগ্যতায়। দীর্ঘ সময় আরব আমিরাতে থেকে দক্ষতা অর্জন করে কোনো কোনো বাংলাদেশীও আছেন ভালো অবস্থানে।

ইতিবাচক কথা হচ্ছে, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কাজের ভিসা দিচ্ছে না। তবু প্রতিদিনিই বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশটিতে কাজের খোঁজে ভ্রমণ ভিসায় যাচ্ছেন। কিন্তু আরব আমিরাতে বিলাসবহুল, চোখ ধাঁধানো রঙিন সাজসজ্জা, আকাশচুম্বী অট্টালিকার আড়ালে কেমন আছেন বাংলাদেশীরা। স্বল্প আয়ের এ শ্রমিকরা তাদের শ্রমে আমিরাতের অর্থনীতি যেমন সচল রাখছেন অন্যদিকে আয়ের অর্থ নিজের দেশে পাঠাচ্ছেন। তার পরও স্বল্প আয়ের এ শ্রমিকরা অবহেলিত। পদে পদে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেকেই।

বর্তমান সময়ে আমিরাতে প্রতিদিনিই ভ্রমণ ভিসায় আসছেন অনেকেই। যাদের অধিকাংশই কোনো কাজ জানেন না, ভাষাগত দক্ষতাও নেই। তিন মাসের ভ্রমণ ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তারা হয়ে পড়ছেন অবৈধ। চোখ ধাঁধানো এ দেশে আকাশচুম্বী পাঁচ তারকা হোটেলে লাখ টাকা বেতনের চাকরি পাওয়ার যে স্বপ্ন দালাল দিয়েছিল তা যে মিথ্যা এটা বুঝতে পারলেও তখন আর তাদের কিছু করার নেই।

আমিরাতে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা করছেন তাজুল ইসলাম। আলাপে আলাপে বললেন সুখ-দুঃখের নানা কথা। আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমান, রাস আল খাইমা, উম আল কুয়াইন, ফুজাইরা মিলে আরব আমিরাত। সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী থাকেন আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ, আজমানে। দেশটিতে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, নার্স, ইলেকট্রিশিয়ানসহ কারিগরি কাজ জানেন এমন কর্মীর চাহিদা ব্যাপক। তবে বাংলাদেশী পেশাজীবীদের ইউরোপ, আমেরিকায় স্থায়ী হওয়ার আগ্রহ বেশি থাকায় এখানে কেউ আসেন না। আর এ জায়গায় স্থান করে নিয়েছেন ইন্ডিয়া, ফিলিপাইন, আফ্রিকার নাগরকিরা। আবার যারা প্রতিদিন আসছেন, তাদের কোনো দক্ষতাই নেই। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে হাজির হলেও নিয়োগকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতে নিজেকে ঠিকমতো উপস্থাপন করতে পারছেন না।

দুবাইয়ের একটা পার্কের নাম মতিনা পার্ক। এক সন্ধ্যায় সেখানে গেলাম হাঁটতে। পার্কের বিভিন্ন জায়গায় নানা বয়সী মানুষ আড্ডা দিচ্ছেন। চেহারার গড়নে বোঝা যায় তারা বাংলাদেশী। কিন্তু একটি বিষয় চোখে লাগছে খুব, তারা বসে আড্ডা দিলেও সবার পাশেই ব্যাগ কিংবা পোঁটলা। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যাগ খুলে চাদর বিছিয়ে অনেকেই শুয়ে পড়ছেন। এখানে তারা ঘুমাবেন, কিন্তু কেন। কয়েকজনের সঙ্গেই কথা হলো। চোখ ধাঁধানো চাকচিক্যের আড়ালে তাদের জীবনের গল্প মুহূর্তেই সব বিষাদ মনে হয়।

পরিবারের হাল ধরতে জমি বেচে আসাদুল ইসলামকে বিদেশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন তার বাবা। বাড়ির পাশের একজনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় দুবাইতে যাবেন আসাদ। পাসপোর্ট রেডি আসাদের, এবার ভিসার প্রচেষ্টা। দুবাই এসে একটা তারকা মানের হোটেলে কাজ করবেন, শুরুতে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা বেতন পাবেন আসাদ। ফলে দুবাই আসতে তাকেও খরচ করতে হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। দুবাই আসার পর থেকে আসাদের জায়গা হয়েছে এই পার্কে। দুবাইয়ের ভিজিট ভিসা করতে খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। রাউন্ড ট্রিপ বিমান ভাড়া ৮০ হাজার টাকা ধরলেও সব মিলিয় ১ লাখ ১০ হাজার টাকার বেশি দুবাই আসতে খরচ হওয়ার কথা নয়। যদিও দালাল এখনো আসাদকে আশ্বাস দিচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যেই সে হোটেলে যোগদান করতে পারবে। আসাদ এখনো আশায় থাকলেও বাস্তাবতা যে ভিন্ন সেটা আর কিছুদিন পর সে হয়তো বুঝতে পারবে।

আসাদের মতো বাকিদের অবস্থা একই রকমের। উচ্চবেতনের কাজের আশা নিয়ে আসা মানুষের ঠাঁই হয়েছে এই পার্কে। দিনে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে কাজ খুঁজছেন তারা। আর রাত পার করছেন মতিনা পার্কে শুয়ে। তাদের দিন কাটে খেয়ে না খেয়ে। ডেরায় একটি হোটেল পরিচালনা করেন আমিনুল ইসলাম। বললেন, দিনে শত শত যুবক আসে কাজের খোঁজে, খাবারের জন্য। নিজের দেশের মানুষ, তাদের ফিরিয়ে দিতেও পারি না। আবার আমি যদি এভাবে শত শত মানুষকে বিনামূল্যে খাওয়াতে থাকি নিজেই দেউলিয়া হয়ে যাব। চেষ্টা করি, তাদের কম খরচে খাবার দিতে।

শুধু দুবাইয়ের মতিনা পার্ক নয়। দুবাইয়ের ইউনিয়ন মেট্রো-সংলগ্ন পার্ক, ক্রিক নদীর কাছে অনেকেই রাত কাটায় খোলা আকাশের নিচে। এর বাইরে শারজাহ, আজমানেও একই পরিস্থিতি। কাজ নেই, তাদের দিন কাটে নির্মম পরিস্থিতিতে। আসলে কাজ আছে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অদক্ষ শ্রমিক আমিরাতে চলে আসাই সংকটের মূল কারণ। ন্যূনতম ভাষাগত দক্ষতা থাকলেও এমন পরস্থিতির সৃষ্টি হতো না। অতীতে ভ্রমণ ভিসায় এসে দুবাইতে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন সব ধরনের ভিসা বন্ধ করেছিল আমিরাত। সম্প্রতি আবারো ভ্রমণ ভিসা দিচ্ছে দেশটি। আবারো অবস্থার অবনতি ঘটলে বিধিনিষেধ আসার শঙ্কা আছে।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনার কারণে তৈরি পোশাক মালিকদের বেশ কদর, সম্মান, দাপটও বেশ। তারা সরকারের নানা রকমের সুবিধা পাচ্ছেন। জুলাইয়ে ১৫ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স দেশে আসে। ২০৯ কোটি ৬৯ লাখ মার্কিন ডলার দেশে এসেছে। প্রতি মাসেই রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে শক্তি জোগাচ্ছে। অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও রেমিট্যান্সদাতারা দুর্বল, তাই তাদের নিয়ে কারো কোনো ভাবনা নেই, তাদের সমস্যা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথাও নেই।

কয়েকদিন আমিরাতে বাংলাদেশীদের অবস্থা দেখে, কথা বলে মনটা বিষণ্ন হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে প্রচুর জনবল আছে, তবে তাদের জনশক্তিতে রূপান্তর করার উদ্যোগ দুর্বল। খুব বেশি কিছু না, কয়েক মাসের ভাষা শিক্ষা কোর্স, রেস্তোরাঁ, হোটেল, ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটার পরিচালনার বেসিক বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া গেলে শ্রমবাজারে তাদের জন্য প্রতিযোগিতা করা সহজ হবে। শুধু আরব আমিরাত নয়, অন্য সব দেশের পরিস্থিতিও একই রকম। শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনা করে প্রশিক্ষণ দেয়া গেলে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে একই সঙ্গে বাড়বে রেমিট্যান্স।

 

চৌধুরী আকবর হোসেন: সাংবাদিক