দীর্ঘদিন ধরেই ওমান বাংলাদেশী শ্রমিকদের অন্যতম গন্তব্য। অভিবাসী আগ্রহের দিক থেকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পরেই ওমানের স্থান। সেই শ্রমজীবী পুরুষদের মিছিলে ক্রমে যুক্ত হয়েছে নারী। অবশ্য সবার প্রেক্ষাপট এক রকম না। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৯ সালে ওমানে অভিবাসী হওয়া মোট বাংলাদেশীর ৬ দশমিক ৩ শতাংশই নারী। ২০১৩ সাল থেকে এই প্রবণতার সূচক ওপরের দিকেই উঠছে। কেবল ২০১৯ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, ওমানে বসবাস করা বাংলাদেশী নারীর সংখ্যা ১৭ হাজার ৬৫৪ জন। প্রথম দিকে কর্মীদের স্ত্রী অথবা সন্তান হিসেবে নারীরা ওমান গেলেও পরবর্তী সময়ে নিজেরাই স্বাধীন কর্মী হিসেবে গমন শুরু করে। স্ত্রী হিসেবে যারা আসে তারা ওমানের সমাজ ব্যবস্থার রক্ষণশীলতাতেই খাপ খাইয়ে নেয়। কর্মী হয়ে এলেও তফাৎ বেশি না। বাঙালি কালচারে ‘মেয়েরা ঘরের জিনিস’ বলে একটা কথা আছে। ওমানের মাটিতেও কর্মী পরিচয়ে তারা মূলত গৃহকাজই সামাল দেয়।
ওমানে অভিবাসী হওয়া নারীদের নিয়ে সম্প্রতি গবেষণা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। গবেষক থেরেসা ব্ল্যানচেট মুখোমুখি হয়েছিলেন ৩৫ জন নারীর। সেখানে ৭ জনের বয়স ২৫-এর নিচে। ছয়জন গৃহকর্মী এবং একজন বার ড্যান্সার। ৪৫ বছরের বেশি দুজন নারীই মূলত পারিবারিক ভিসা নিয়ে ওমানে অবস্থান করছেন। তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা নারীর সংখ্যা ১৯ আর বিপরীতে বিবাহিত নারী ১৪ জন। অর্থাৎ বিবাহিত নারীদের চেয়ে তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা নারীর সংখ্যার হার বেশি। অধিকাংশ নারীর পড়াশোনাই দশম শ্রেণীর নিচে। গৃহকর্মীর বাইরে খুব একটা পেশা দৃষ্টিগ্রাহ্য না হলেও স্বামীর সাহায্যকারী হিসেবে কাপড় ও বোরকার ব্যবসায় সহযোগিতা করে কেউ কেউ। দেখা যায় স্বাধীন কাজেও। উদাহরণ হিসেবে রয়েছেন সালালাহতে হোটেল পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাবেয়া। ১৩ বছর ধরে ওমানের খামারে কাজ করছেন রাবেয়ার স্বামী। কয়েক বছর পর নিয়ে যায় রাবেয়াকেও। স্বামীর আয় পর্যাপ্ত না হওয়ার দরুন নিজেও কাজে নেমেছেন রাবেয়া। এদিকে সালালাহতে অবস্থিত সুলতান কাবুস হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এক বাংলাদেশী পেশাজীবী নারীও রয়েছেন। বাংলাদেশী ও মুসলিম হওয়ার পরও বোরকা বা হিজাব পরিধান করেন না। আধুনিক সময়ে অন্যান্য অভিবাসীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ক্রমে বাংলাদেশী উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছেন। ৩৭ বছর বয়সী নাহিমা রুস্তাকে বিউটি পার্লার স্থাপন করে তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র নজির। ওমানে নিয়ে এসেছেন নিজের বোন ও বোনের ছেলেকে। পেশার দিক থেকেও ওমানে বসবাসরত বাংলাদেশী নারীদের কিছুটা বৈচিত্র্য দৃষ্টিগোচর হয়। গবেষণায় ৩৫ জন নারীর তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে ২৪ জন গৃহকর্মী, দুজন হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা কর্মী, একজন স্কুলের পরিচ্ছন্নতা কর্মী, একজন মুদি দোকানের সহকারী ম্যানেজার, একজন দর্জির দোকানি, একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, একজন উদ্যোক্তা, একজন বার ড্যান্সার, দুজন যৌনকর্মী ও একজন দালাল।
গবেষণায় প্রাপ্ত ৩৫ জন নারী এসেছেন বাংলাদেশের ১৮টি ভিন্ন জেলা থেকে। চট্টগ্রামের কোনো নারীই তালিকায় নেই, তার মানে চট্টগ্রাম থেকে ওমানে নারী অভিবাসনের ঝোঁক কম। ঢাকা থেকে ছয়জন, শরীয়তপুরের চারজন, পটুয়াখালীর চারজন, হবিগঞ্জের তিনজন, গাজীপুর, পাবনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালীর দুজন করে এবং ফেনী, কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরের রয়েছে একজন করে।
ওমানে সাধারণত চার প্রকারের ভিসার অধীনে নারীরা অভিবাসী হয়। পেশাজীবী, কোম্পানি, গৃহস্থালি ও পরিবার ভিসায়। এই তালিকায় ট্যুরিস্ট ভিসা যুক্ত করা গেলেও গবেষণার কেউই এই ভিসায় ওমানে আসেনি। ভিসা অনুসারে তারতম্য হয় নিয়োগ ব্যবস্থারও। প্রফেশনাল ভিসায় অভিবাসী নারীর সংখ্যা খুবই কম। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো ওমান সরকার বাংলাদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তার নেয়। অন্যদিকে কোম্পানি ভিসায় যাওয়া অধিকাংশ বাংলাদেশী মূলত পুরুষ। বিভিন্ন হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করে তারা। হাসপাতালের নারী ওয়ার্ডগুলোতে সাধারণত নারী পরিচ্ছন্নতা কর্মীরই প্রয়োজন হয়। সেই সুবাদে নারীও বেশ দেখা যায়। ৩৫ জন নারীকে নিয়ে চলা গবেষণায় দুজনকে কোম্পানি ভিসায় আসতে দেখা গেছে। রিক্রুটিং এজেন্সিকে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা দিয়ে তারা ওমানে আসা। নারী পুরুষ উভয়ের বেতনই মাসে এখানে ৯০ রিয়াল (বাংলাদেশী ১৯ হাজার ৮০০ টাকা) করে। তবে হাসপাতালে রোগীদের অভিভাবকদের থেকে টিপস পাওয়ার সুবিধা থাকে, সঙ্গে থাকে পার্ট টাইম কাজের সুবিধাও। নারীদের জন্য কোম্পানি ভিসা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। সাধারণত গৃহস্থালি কাজকর্মের ভিসাতেই অধিকাংশ বাংলাদেশী নারী ওমানে গমন করেন। আর এই অভিবাসন একটা চেইনের মতো। একজন ওমান গেলে তিনি তার আত্মীয় ও পরিচিতজনদের জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগকর্তা হিসেবে কাজ করেন। অনেক পুরুষ কর্মীই তাদের স্ত্রীকে এই ভিসাতে ওমান নিয়ে আসেন। উদাহরণস্বরূপ ৩৮ বছর বয়সী পটুয়াখালীর আমেনার কথা তুলে ধরা যায়। তার স্বামী ওমান থাকা অবস্থায় তাকে সেখানে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেন। তবে আমেনা সেখানে যাওয়ার পর নিজের বোন, বোনের মেয়ে ও অন্যান্য স্বজনদেরও সেখানে নিয়েছেন। বিউটি পার্লার উদ্যোক্তার গ্রামের বাড়ি গাজীপুর। গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত নারীদের বাসা ভাড়া দেয় তার পরিবার। পরোক্ষভাবে সেখানে ওমানের টিকিট ধরিয়ে দেয়ার সুযোগ থাকে। এভাবে প্রার্থী খুঁজে বের করা অসম্ভব না।
সালালাহতে কাজ করা নারীদের জীবনযাপনের ধরন বেশ কাছাকাছি। গৃহকর্মী হিসেবে রাবেয়ার প্রতিদিন বিরাট একটা কক্ষ পরিষ্কার করতে হয়, প্রস্তুত করতে হয় ২২ জনের খাবার। একই চিত্র দেখা যায় গৃহস্থালি ভিসায় আসা প্রায় সবার ক্ষেত্রে। পরিবারে বৃদ্ধদের সেবা ও নিয়মিত কাজের বাইরে কিছু করার জন্য কোনো কোনো পরিবার থেকে টিপস দেয়া হয়। অন্যদিকে কম বেতন দেয়া মালিকও রয়েছে। সাধারণত প্রতি শুক্রবার সাদিকা পার্ক ও নেপালি পার্কে অভিবাসীদের জমায়েতে মুখরিত থাকে। বাংলাদেশীদেরও সেখানে দেখা যায়। একসময় ফ্যামিলি ভিসা বেশ সহজ ছিল। অনেক বাংলাদেশী এই সুযোগের অপব্যবহার করলে ওমানি সরকার সে ব্যাপারে শক্ত পদক্ষেপ নেয়। গবেষণায় ফ্যামিলি ভিসায় পাঁচজন নারীর সাক্ষাত্কার নেয়া হয়। তাদের মধ্যে দুজনই স্বামীর সঙ্গে অবস্থান করে পর্দা অনুসরণ করে, একজন পার্ট টাইম গৃহকর্মী এবং বাকি দুজন খুব সম্ভবত যৌনকর্মী। অভিবাসী নারীদের মধ্যে আরবিতে যাদের দক্ষতা রয়েছে, তারা বেশ প্রভাব তৈরি করতে পারে। যাদের পরিচিতি তৈরি হয়েছে, এমন অন্তত দুজন দালালি অর্থাৎ দেশ থেকে অভিবাসী ওমানে আনার পেশায় জড়িত।
উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো অভিবাসী নারীরা তাদের ছোট ছেলেদের ওমানে আনা শুরু করেছে। সন্তানদের ওমান আনার খরচ দেয়া না শুধু, চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়ারও একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে নারীদের মধ্যেই। ছেলেরা ওমান গিয়ে কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্টে ১০০-১২০ রিয়ালে কাজ করছে। মায়েদের চাপকে লঘু করে তুলছে। মূলত মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের অভিবাসী করানোর প্রবণতার পেছনেও এটাই প্রধান নিয়ামক। মেয়েদের জন্য আলাদা সংসারে প্রবেশের তাড়া থাকে। অনেক কিছু গুছিয়ে উঠতে হয় বিয়ের পর। সামাজিক দিক থেকেও মেয়েদের জন্য অভিবাসন এখনো অতটা স্বাভাবিক বিবেচিত হয় না। দেশে ছেলেদের অসৎ সঙ্গে নষ্ট হওয়ার চেয়ে ওমানে গিয়ে কাজে জড়িত হওয়া উত্তম মায়েদের চোখে।
তবে সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়ে ওমানে স্যালারি বেশ কম। যেহেতু মেয়েদের অভিবাসনের প্রধান কারণটাই অর্থনৈতিক, ফলে এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও ওমান সরকারের মধ্যে সর্বনিম্ন ৯০ রিয়াল মাসিক বেতনের চুক্তি হয়েছে। তা কার্যকর করা ও সবাইকে সে ব্যাপারে সচেতন করার ব্যাপারে বড় একটা ঘাটতি রয়ে গেছে। ঘাটতির সুযোগটা গ্রহণ করছে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ও দালালরা। তারা মিথ্যা আশ্বাসের মাধ্যমে অভিবাসীদের নিয়ে গেলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না অভিবাসীরা। নারীদের ক্ষেত্রে এই শোষণ আরো বেশি প্রকট। গৃহকর্মীদের কোনো ছুটি থাকে না। অথচ বন্ধের দিনগুলোতে তাকে নিজ খরচে চলতে হয়। এই বিধান খোদ ওমানের ২০১১ সালের প্রণীত আইনের বিরুদ্ধ। উপরন্তু আইন মতে প্রতি দুই বছরে ৩০ দিনের ছুটি দেয়ার নিয়ম গৃহকর্তার। ছয় সাত বছর পর বেতন দ্বিগুণ হওয়ার কথা। কম বেতনের সঙ্গে রয়েছে বিলম্ব বেতন কিংবা না পাওয়া বেতনের বিড়ম্বনা। এ ধরনের কর্মকাণ্ড জবরদস্তিমূলক শ্রমের আওতায় পড়ে। ১৯৭০ সালে ওমান থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাসত্ব বিলোপ করা হলেও এ সমস্যা দূরীকরণে যথাযথ পদক্ষেপে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। তবে ওমানের বাংলাদেশী দূতাবাসে প্রবাসী নারীদের প্রতি যৌন হেনস্থার অভিযোগ সৌদি আরবের চেয়ে কম। অসহায়, অবলা তকমা পাওয়া এই বাংলাদেশী নারীরাই রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠছে। ঊর্ধ্বতন মহল থেকেই তাদের নিরাপত্তা, সুস্থ কর্মপরিবেশ এবং প্রাপ্য বেতনের কথা মাথায় রাখা উচিত। তাদের স্বার্থে এরই মধ্যে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তাহলেই ওমানে বাংলাদেশী নারীরা দেশের জন্য আরো সম্ভাবনাময় চিত্র উপহার দিতে সক্ষম হবে।
সূত্র
The invisible workers :
Bangladeshi women in Oman, Therese Blanchet, ILO, 2021
আহমেদ দীন রুমি: লেখক





