মধ্যপ্রাচ্যের একটি ক্ষুদ্র আরব দেশ লেবানন। একসময় দেশটির রাজধানী বৈরুত ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সুন্দরতম এবং এতদঞ্চলের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। মিসর, ইসরায়েল, ফিলিস্তিনের মতোই লেবাননও বিশ্বের প্রাচীনতম মানবসভ্যতার জন্মভূমি। পাঁচ বছর আগেও লেবানন ছিল বাংলাদেশী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য। প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ হাজার বাংলাদেশী কর্মী দেশটিতে অভিবাসন নিয়ে যেত। কেবল ২০১১ সালেই লেবাননে পাড়ি দিয়েছিলেন ১ লাখ ১৯ হাজার ১৬৯ জন বাংলাদেশী কর্মী। তবে সে সব এখন অতীত। এখনো যেসব বাংলাদেশী আছেন তারা লেবানন ছাড়তে মরিয়া। গত কয়েক বছরে ফিরে এসেছেন অনেকেই। যাদের ফেরা সম্ভব হয়নি তাদের মধ্যে অনেকে  বিরূপ পরিস্থিতিতে টিকতে না পেরে সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপের পথ ধরছেন। অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলে ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে সে দেশের অর্থনীতি। সে সময় মুদ্রাস্ফীতি ও পরবর্তী সময়ে বৈরুত বন্দরে বিস্ফোরণের পর নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। এমন অবস্থায় সেখানে থাকা প্রবাসীরা পড়েন নানা সংকটে। লেবানিজ মুদ্রায় আগের মতো বেতন হলেও সেই অর্থ দিয়ে জীবনযাপন করতে পারছেন না তারা। লেবাননে যেসব বাংলাদেশী রয়েছেন তাদের বেশির ভাগই পুরুষ। তারা দেশটিতে পরিচ্ছন্নতা ও নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। আর নারীরা কাজ করেন গৃহকর্মী হিসেবে। পরিস্থিতির কারণে এসব পেশার কর্মীরা এখন আর দেশে পরিবারের কাছে কোনো অর্থ পাঠাতে পারছেন না। উল্টো তাদের নিজেদের জীবন ধারণই অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিকভাবে খারাপ সময় পার করছেন লেবাননে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা। সেখানে থাকা প্রায় দেড় লাখ প্রবাসীর মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার আছেন যাদের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। এ অবস্থায় ২০২০ সালের শেষের দিকে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে ইচ্ছুকদের জন্য রেজিস্ট্রেশনের উদ্যোগ নেয় বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাস।

২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, লেবাননে বসবাসকারী বৈধ কাগজপত্রবিহীন প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মীদের স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য নাম নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দূতাবাস। আগ্রহীদের ২৫ থেকে ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন করতে হবে। তবে এজন্য ফি অথবা জরিমানা বাবদ ১ লাখ ৪০ হাজার লেবানিজ লিরা এবং উড়োজাহাজের টিকিট বাবদ ৪০০ মার্কিন ডলার জমা করতে হবে। সব মিলিয়ে এ অর্থের পরিমাণ একজন পূর্ণবয়স্কের জন্য প্রায় ৪২ হাজার টাকা। তবে যেসব প্রবাসীর নামে ফৌজদারি বা অন্য কোনো জটিল মামলা কিংবা কোর্টের গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে, তারা কেবল কোর্টের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর দেশে ফিরে যেতে পারবেন।

২০১৯ সালের শেষের দিক থেকেই মূলত লেবাননে অর্থসংকট চলছে। এর পর থেকেই দেশটিতে অবস্থান করা প্রবাসী বাংলাদেশীদের অর্ধেকেরই কোনো কাজ নেই। যাদের কাজ আছে, তাদেরও বেতন কমে গেছে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। পাশাপাশি বেড়ে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যও। ফলে সেখানে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ খাদ্য সংকটে ভুগছেন। এসব কারণেই বৈধভাবে অবস্থান করা কর্মীরাও দেশে ফিরতে চান।

বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ৭ হাজার ৭৪৫ জন বাংলাদেশী নাম নিবন্ধন করেন। এ নিবন্ধন প্রক্রিয়ার আওতায় সে সময় প্রথম ধাপে ৪৫০ বাংলাদেশী দেশে ফেরেন। পরে বিশ্বব্যাপী নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সালের ২ আগস্ট কাগজপত্রবিহীন প্রবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ২ আগস্ট দেশটির ডিটেনশন সেন্টারে আটকে থাকা ৬৪ জন বাংলাদেশী কাতার এয়ারওয়েজে দেশে ফেরেন। এরপর ৪ আগস্ট আরো একটি ফ্লাইটের মাধ্যমে ৬২ বাংলাদেশী দেশে ফেরেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বলছে, আউট পাস ছাড়াও বৈধভাবে থাকা প্রবাসীরা লেবানন থেকে দেশে ফিরছেন।

জনশক্তি রফতানি ও কর্মসংস্থান উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, লেবাননে ১৯৯১ থেকে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৬৮ হাজার ২৪২ জন বাংলাদেশী কর্মী গিয়েছেন। দেশটিতে ২০১৭ সালে ৮ হাজার ৩২৭ জন, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৯৯১ ও ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৮৬৩ জন, ২০২০ সালে ৪৮৮ এবং ২০২১ সালে ২৫৯ বাংলাদেশী গিয়েছেন।

বর্তমানে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের একসময়ের সমৃদ্ধিশালী দেশ লেবানন। গত তিন বছর চলমান আর্থিক মন্দায় দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকও। যার ধারাবাহিকতায় কাজ হারিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছেন হাজারো বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মী। অবস্থা বেগতিক হওয়ায় বিশেষ প্রত্যাবর্তন প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত বিরতিতে দেশে ফিরছেন অনিবন্ধিত কর্মীরা। আর যারা এখনো দেশে ফিরে আসতে পারছেন না তাদের মধ্যে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এ বিষয়ে লেবাননে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সতর্ক করে নোটিস জারি করেছে বৈরুতে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস।

সম্প্রতি এক সতর্কবার্তায় বৈরুতে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস জানায়, লেবাননে বসবাসরত কতিপয় বাংলাদেশীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকাসহ গণ-উপদ্রব সৃষ্টির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। হাইছিলুম, আশরাফিয়ে, মুকাল্লেস, মনসুরিয়ে ও কর্মজয়তুন এলাকায় কতিপয় প্রবাসী জুয়ার আসরের আয়োজন করছেন এমন অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দাওড়াতে প্রবাসীদের মধ্যে মারামারির অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। কতিপয় প্রবাসীর বিরুদ্ধে নাইট ক্লাবে গিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ড করারও অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। কিছুদিন আগে একটি অপহরণের অভিযোগও পাওয়া গিয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের সতর্ক করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দীর্ঘ কয়েক বছর লেবাননে অবস্থান করছেন এমন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মী বণিক বার্তাকে জানান, বর্তমানে তারা চরম অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছেন। তারা বলছেন, দেশে থাকা পরিবারের জন্য টাকা পাঠানো তো দূরের কথা, নিজেদের মাসিক খরচ পর্যন্ত জোগানো সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় হতাশগ্রস্ত হয়ে অনেকেই নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে অনিবন্ধিত কর্মীদের পরিস্থিতি আরো করুণ। কারণ তাদের বেতন অপেক্ষাকৃত কম। অভিবাসী কর্মীরা জানান, অনিবন্ধিত কর্মীসহ আরো অনেকেই এখন দেশে ফিরে আসার কথা ভাবছেন।

বৈরুতে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাসের সূত্র বলছে, দেশটিতে বর্তমানে এক লাখের বেশি অভিবাসী বাংলাদেশী রয়েছেন। যাদের মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি রয়েছেন অনিবন্ধিত কর্মী হিসেবে। অনিবন্ধিত কর্মীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ২০১৯ সালে বিশেষ প্রত্যাবর্তন প্রকল্প শুরু করে বাংলাদেশ দূতাবাস। যার আওতায় এরই মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন ১৫ হাজারের বেশি অনিবন্ধিত অভিবাসী কর্মী।

গত ১১ বছর লেবাননের হাইছিলুম এলাকায় একটি কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করা মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে যে আয় হচ্ছে সেটি দিয়ে নিজের ভরণপোষণই করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও চরম দুর্দশাগ্রস্ত। অনেকে দেশ থেকে টাকা এনে বিমানভাড়া দিয়ে ফিরছেন। জানা গিয়েছে, লেবাননে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে অধিকাংশই পুরুষ। তারা দেশটিতে পরিচ্ছন্নতা ও নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। আর নারীরা কাজ করেন গৃহকর্মী হিসেবে। পরিস্থিতির কারণে এসব পেশার কর্মীরা এখন আর দেশে পরিবারের কাছে কোনো অর্থ পাঠাতে পারছেন না। উল্টো তাদের নিজেদের জীবনধারণই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসতে চান তারা।

লেবাননে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানায়, বিরূপ পরিস্থিতিতে টিকতে না পেরে প্রবাসীরা নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। বাংলাদেশীরাও এ পরিস্থিতির শিকার। দেশটিতে বাংলাদেশী কর্মীরা যান মূলত শ্রমিক ভিসা নিয়ে। সেখানে কাজ করে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দেশে পরিবারের কাছে টাকা পাঠানোর জন্য বা মূলত সচ্ছলতার জন্যই তাদের এ লেবানন যাত্রা। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় দেশে ফিরতে চান তারা। এরই মধ্যে অনেকে দূতাবাসে নাম নিবন্ধন করে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরেছেন। যাদের বেশির ভাগই ফিরেছেন কাজের অনুকূল পরিবেশ না পাওয়ায়। আবার অনেক শ্রমিক যারা অবৈধভাবে সেখানে বাস করছিলেন, তারা ফিরছেন সরকার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায়।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বৈধভাবে লেবাননে গিয়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৯ জন বাংলাদেশী। মূলত ২০০৯ সাল থেকে অধিক হারে দেশটিতে বাংলাদেশী শ্রমিকরা যাওয়া শুরু করেন। তবে সব থেকে বেশি শ্রমিক যান ২০১১ সালে। ওই বছর বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে লেবাননে যান ১ লাখ ১৯ হাজার ১৬৯ জন বাংলাদেশী। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির অর্থনৈতিক মন্দা ও করোনা পরিস্থিতিতে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় তেমন কেউ যাননি। চলতি বছর লেবাননে গিয়েছেন ২৯৮ জন। আর ২০২১ সালে ২৩৫ জন এবং ২০২০ সালে ৪৮৮ জন বাংলাদেশী দেশটিতে গিয়েছেন।

 

মনজুরুল ইসলাম: সাংবাদিক