তুরস্ক নামটির সঙ্গে অনেক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল ইতিহাস জড়িত। প্রাচীনকাল থেকে বহু বিচিত্র জাতি ও সংস্কৃতির লোক এ অঞ্চলে এসেছে এবং এটিকে দখল করে শাসন করছে। ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে সর্বপ্রথম হিটাইটদের বসবাসের মাধ্যমে শুরু হয় এ অঞ্চলের ইতিহাস। এরপর একে একে ফ্রিজীয়, গ্রিক, পারসিক, রোমান ও আরবদের আগমন ঘটে। একাদশ শতকে এসে মধ্য এশিয়ার যাযাবর তুর্কি জাতির লোকেরা এ অঞ্চল দখল করে সেলচুক রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। তের শতকে এসে মোঙ্গলদের আক্রমণে সেলজুক রাজবংশেরও পতন ঘটে। তের শতকের শেষ দিকে এখানে উসমানী খিলাফতের সূচনা হয়, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার এক বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে। সর্বশেষ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তত্কালীন তুরস্কের রাষ্ট্রপতি মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক এর প্রজাতন্ত্র ঘোষণার মাধ্যমে প্রায় ৬০০ বছরের এক শাসনামলের সমাপ্তি ঘটে এবং বর্তমানে সেই প্রজাতন্ত্রের ধারা অব্যাহত।
ইউরোশিয়া খ্যাত ঐতিহাসিক এ দেশের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের বিশেষ টান সেই অটোমান শাসনামল থেকেই। তুরস্কের অবস্থান বাংলাদেশ থেকে প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার দূরে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কালচারের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও দুই দেশের ভ্রাতৃত্ববোধে কখনো কমতি নজরে আসেনি। এ কারণেই বাংলাদেশ সরকারের তুরস্কের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় সুবিধা হয়। যেমন ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ভার্চুয়াল কনফারেন্সে আঙ্কারা ও ঢাকার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্কের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ১৯৭৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়। তবে আমাদের সম্পর্কের শুরু ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি জেনারেল ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয়ের মধ্য দিয়ে। পারস্পরিক আস্থার ইতিহাস, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের সম্পর্কের শেকড় অনেক গভীরে।
সরকারের সঙ্গে এই সুসম্পর্কের সুবাদে প্রতি বছর বিভিন্ন পেশার শত শত বাংলাদেশী নাগরিক তুরস্কে আসেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি সংখ্যা আসেন তুরস্কের বিভিন্ন নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য। তুরস্কে তিন ধরনের স্কলারশিপ দেয়া হয়। কলেজ লেভেল থেকে পিএইচডি লেভেলের এই স্কলারশিপগুলোর অধীনে প্রতি বছর বিভিন্ন পর্যায়ে ১০০-এর উপরে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করতে আসেন। এছাড়া নিজ খরচে পড়াশোনার জন্যও অনেক ছাত্রছাত্রী নিয়মিত আসছেন। আমিও তুরস্কের সরকারি স্কলারশিপ ‘Türkiye Burslar1’-এর অধীনে ২০১৭ সালে তুরস্কে আসি, তবে বর্তমানে ইরাসমুস এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ লাটভিয়ার University of Latvia তে অধ্যয়নরত আছি। শুধু যে স্কলারশিপ নিয়ে আসেন সবাই তা বললে ভুল হবে। কারণ এখানকার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিউশন ফি বাংলাদেশের তুলনায় কম হওয়ার পাশাপাশি র্যাংকিংয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এবং জীবনযাত্রার মান বাংলাদেশের তুলনায় অনেক উন্নত হওয়ায় অনেক বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী নিজ খরচে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতি বছর আসছেন। যদিও ইউরোপ আমেরিকার মতো অ্যাভেইলেবল পার্ট টাইম জব পাওয়া যায় না এবং পড়াশোনার চাপ বেশি হওয়ায় জব করে পড়াশোনা কঠিন হয়ে যায়, তবু বাংলাদেশীদের তেমন সমস্যা হতে দেখিনি।
তুরস্কে পড়াশোনা করে বাংলাদেশীদের অনেকেই ক্যারিয়ারের অনেক ভালো ভালো অবস্থানে আছেন। সাধারণত তুরস্কে আসার পর বাংলাদেশে ফেরত যাওয়ার সংখ্যা গতানুগতিকভাবেই কম। অনেকেই ব্যাচেলর বা মাস্টার্স শেষ করে ইউরোপ আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন। এছাড়া যারা তুরস্কে আছেন তাদের মধ্যে ইলদিজ টেকনিক, গেলিশিম, ইলদিরিম বেয়াজিত, সাবাহাত্তিন জাইম, আঙ্কারা ও গাজী ওসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়সহ নামিদামি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশীরা যে শুধু তুরস্কেই শিক্ষকতা করছেন তা নয়। এখানে পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশে ফেরত গিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় নিয়োজিত হওয়া অথবা বাংলাদেশ কিংবা তুরস্ক ছাড়া অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হওয়া বাংলাদেশীদের সংখ্যাও কম নয়। শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি জার্নালিস্ট হিসেবে টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আনাদোলু এজেন্সিসহ তুরস্কের প্রথম শ্রেণীর মিডিয়াগুলোয় কাজ করছেন অনেক বাংলাদেশী। এছাড়া তুরস্কে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সফল ব্যবসায়ী হওয়া বাংলাদেশীদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। এরই মধ্যে তাদের অনেকেই তুরস্কের নাগরিকত্ব পেয়ে গিয়েছেন। নন-একাডেমিক লাইনেও তুরস্ক থেকে পাস করা বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ারদের অবস্থান অনেক উপরে। ডি-এইটের সদর দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন তুরস্ক থেকে গ্র্যাজুয়েট হওয়া বাংলাদেশীরা। অনেকে আবার ইস্তানবুলের বিভিন্ন বিদেশী প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত আছেন। তাছাড়া তুরস্ক থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করে দেশে গিয়ে সফটওয়্যার কোম্পানির মালিক হয়েছেন এমন উদাহরণও রয়েছে। তুরস্কে মেডিকেল ডিপার্টমেন্টে পড়ে এখানকার স্বাস্থ্য সেক্টরে অনেকেই সফলতার সঙ্গে নিয়োজিত আছেন। খোদ ইস্তানবুল শহরেই ১৫ জনের অধিক বাংলাদেশী ডাক্তার আছেন।
উপরোক্ত পেশা ছাড়া Turkish
Airlines, Tika, Diyanat, iHH-এর মতো বড় বড় কোম্পানি ও অর্গানাইজেশনগুলোয় বাংলাদেশীদের বড় একটি অংশ কাজ করছে। বলা যায়, তুরস্কে যারাই পড়তে আসেন, সবার জন্য সারা বিশ্বে সফলতার দরজাগুলো খুলে যায়। যার প্রমাণ প্রতিনিয়ত বাংলাদেশীরা দিয়েই চলছেন। এখানে আসার পর ব্যর্থতার গল্প কাউকে বলতে শোনা যায় না। এসব গল্পের বাইরে আরো একটি গল্প রয়েছে। তুর্কি মেয়েদের ধরা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের কাতারে। তুর্কি মেয়েদের চোখের জাদু যেকোনো শক্ত মনের অধিকারী পুরুষকে বশ করে ফেলতে সক্ষম। আর সেই জাদুতে মজে গিয়ে অনেক বাংলাদেশী ভাই তুরস্কের সুন্দরী রমণীদের সঙ্গে বিবাহের সম্পর্কে জড়িয়ে দুটি দেশের মধ্যে আত্মীয়তার সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন। তুরস্কে বিভিন্ন শহরে নানা পেশার হাজার হাজার বাংলাদেশীর বসবাস। ঈদ, বৈশাখ, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের মতো জাতীয় দিবসগুলোয় প্রতি বছর তুরস্কস্থ বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের উপস্থিতিতে সব বাংলাদেশীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে Bangladesh
Student’s Association in Turkey (BASAT)
বিভিন্ন আলোচনা, দোয়া ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ দিবসগুলোর আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এবং যার পুরস্কার মাননীয় রাষ্ট্রদূত নিজেই ঘোষণা করেন।
বশির উল্লাহ: ধর্মতত্ত্ব বিভাগ। ট্রাবজোন বিশ্ববিদ্যালয়। ট্রাবজোন, তুরস্ক।





