প্লেনের জানালা দিয়ে যখন আম্মান শহরটা প্রথমবারের মতো চোখে পড়ে, তখনই ভীষণ ভালো লাগে। কাউকেই চিনি না, কিছুই জানি না। তবু এতটুকু খারাপ লাগেনি এয়ারপোর্টে নেমে। সেই মুগ্ধতা নয়-দশ মাসেও শেষ হয়নি। একা একজন নারী হিসেবে থাকতে কখনই অস্বস্তি বোধ করিনি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপদ দেশ হিসেবে সুপরিচিত জর্ডানে।

চাকরিসূত্রে এখানে আসার আগে জর্ডান সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। জর্ডানের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে সৌদি আরব, উত্তর-পূর্বে ইরাক, উত্তরে সিরিয়া আর পশ্চিমে ইসরায়েল ও জর্ডান নদীর পশ্চিমে ওয়েস্ট ব্যাংক। দক্ষিণ-পূর্বের আকাবা শহরে লোহিত সাগর এবং সাগরের ওপারেই ইসরায়েল ও মিসর। ঐতিহাসিক নিদর্শন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত শান্তিময় দেশ জর্ডান। ছোটবেলায় সৌদি আরবে থাকার কারণে ধারণা ছিল, পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে জর্ডানও হবে সৌদি আরবের মতোই গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। কিন্তু এখানে সেই নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্তই আবহাওয়া ঠাণ্ডা থাকে। আরব কোনো দেশে এসে যে তুষারপাত দেখার সুযোগ হবে, তা কখনই ভাবিনি।

লেভান্ট ও ফার্টাইল ক্রিসেন্টের অংশ জর্ডান, যা আগে শাম দেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাম্রযুগ থেকেই এখানে মানববসতি। ক্রমে এ দেশ শাসন করেছেন আম্মোন, মোয়াব, এদোম, অ্যাসিরিয়, ব্যাবিলিয়ান, নাবাতিয়ান, পারসিয়ান, গ্রিক, রোমান, বাইজেন্টাইন, রাশেদীন, উমাইয়া, আব্বাসী, উসমানীয় ও হাশেমীয়রা। ১৯২১ সালে হাশেমীয়রা এখানে রাজত্ব কায়েম করলেও ছিলেন ব্রিটিশদের অধীন। এরপর ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে দেশটি। উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত বিখ্যাত জর্ডান নদী থেকে দেশটির নাম জর্ডান হয়, আরবিতে যা উর্দুন।

নভেম্বরে আসার পর থেকে অফিস আর স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টই ছিল আমার জগৎ। প্রচুর ঠাণ্ডায় কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না। আর এখানে শীত ও বৃষ্টিকে বোঝানো হয় একটি শব্দ ‘শিতা’ বলে। শিতা মানে বর্ষা আবার শীতও। তাই তীব্র ঠাণ্ডায় বিরামহীন বৃষ্টিপাত হয়। তুষার আর তীব্র শীত শেষে জর্ডানে শুরু হয় বসন্তকাল। অসংখ্য ফুলে-ফলে রঙিন হয়ে ওঠে পুরো দেশ। শত রকম চেরি, নাশপাতি, পিচ, তুঁত, ত্বিন, আঙুর, আপেলসহ নাম না জানা ফলে বাজার ভরে যায়। আর আম্মানকে মনে হয় গোলাপের শহর। সর্বত্র ফোটে গোলাপ, জেসমিন আর জারকান্ডা।

ঐতিহাসিক এ দেশে সারা বছরই থাকে বিদেশীদের ভিড়। তাই বিদেশীদের প্রতি এরা খুবই আন্তরিক। নারীদের প্রতি এরা খুবই শ্রদ্ধাশীল। এখানে নারী অধিকার বলে কোনো শব্দ শুনিনি। নারী পুরুষ পরস্পরের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল। দেশটিতে অ্যালকোহল বৈধ এবং ৭০ পার্সেন্ট নারী-পুরুষ ধূমপানে আসক্ত।

রমজানে অন্য আরব দেশের মতো এখানেও প্রায় সারা রাতই সবকিছু খোলা থাকে। তাই দিনের বেলা সব বন্ধ থাকলেও রাত হয়ে ওঠে দিনের মতো ঝলমলে। জর্ডানি কলিগ রেহাম ও ওয়াফার কল্যাণে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন খাবারের স্বাদ নিয়েছিলাম ইফতারে। মানসাফ, ফালাফিল, শর্মা. মাকলুবে, কুনাফা, মুসাখখান, হুমমুস, ফাত্তেহ, ফাত্তুশ, কাবাব, মুতাব্বাল, লাবানেহ, ওরাক ইনাব, ইয়ালেনজি, কুসা, কোফতা, তাব্বুলেহ, ফুল, মানাকিশ, কা’ক স্যান্ডউইচ, আরাইস, কুব্বাহ, তাহিনিসহ আরো অসংখ্য খাবার। ফিলিস্তিনি, মিসরীয়, সিরীয়, লেবাননি ও তুর্কি খাবার মিশ্রিত হয়েছে জর্ডানের খাদ্যাভ্যাসে।

রমজানের চাঁদ দেখার সঙ্গে জর্ডানে উৎসব শুরু হয়। লাইটিং করা হয় প্রায় রাস্তা ও বাড়িতে। আর এ উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে সারা মাস। ঈদের নামাজের পরে তাই ক্লান্ত জর্ডানবাসী ঘুমায়। ঈদ মানেই মা’মুল নামে এক ধরনের পিঠা এবং আরবি কফি খাওয়া, যেখানে বাংলাদেশে ঈদ মানেই এলাহি খাবারের আয়োজন। ঈদের নামাজে মায়েদের সঙ্গে ছোট ছোট বাচ্চা ঝুড়ি ভরে চকোলেট বা খেলনা নিয়ে আসে সবার জন্য। তবে এত অতি সাধারণ ঈদ আয়োজন দেখে আমি হতভম্ব। কুরবানি ঈদেও কোনো উৎসব চোখে পড়েনি। ভীষণ ঘরোয়া সবকিছু।

জর্ডানের জনপ্রিয় কফি হলো তুর্কি কফি। একটু পর পরই এই তুর্কি কফি শপ। আর প্রতিটা শপের সামনে ট্রে হাতে একজন দাঁড়িয়ে থাকে দ্রুত সেবা দেয়ার জন্য, যেন মানুষ গাড়িতে বসেই কফি অর্ডার করতে পারে।

মে থেকে শীত সহনীয় পর্যায়ে আসে, তাই তখন বেড়াতে বের হই। প্রথমে ফেসবুকে সার্চ দিয়ে বিভিন্ন ট্যুরিস্ট গ্রুপের সঙ্গে শুরু হয় আমার জর্ডান ভ্রমণ। সম্পূর্ণ অপরিচিত সব আরবের সঙ্গে বেড়াতে কোনো অসুবিধা হয়নি, শুধু তাদের আন্তরিক মনোভাবের জন্য।

জর্ডানের একমাত্র সমুদ্রসৈকত রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় ৩৩৩ কিলোমিটার দূরের আকাবা শহরে। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদযাপনসহ অন্যান্য জরুরি কাজে আকাবা যেতে হয়। আকাবা শহর সুউচ্চ দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা। প্রথমবার আকাবায় পা রেখে আমি ভীষণভাবে শৈশবে হারিয়ে যাই। পাহাড় আর খেজুর গাছের সারি দেখে মনে হচ্ছিল আমি যেন জেদ্দা শহরে আছি, বাতাসেও কেমন যেন সৌদি আরবের গন্ধ। লোহিত সাগরের পানি ছুঁয়েও মনে হচ্ছিল, এই পানি জেদ্দা থেকেই আসছে। বারবার মনে হচ্ছিল আব্বা, আম্মা, ভাইয়া আর মাহফুয যেন এবারো আমার সঙ্গেই এই লোহিত সাগর তীরে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। জর্ডানের সর্বদক্ষিণের এ শহর থেকে কয়েক মাইল দূরেই ইসরায়েলের আইলাত শহর। রাতের বেলা চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য চোখে পড়ে আইলাতের, দেখলে মনে হয় ওপারের সৈকতেই যেন সব সৌন্দর্য। ডাইভিংয়ের জন্য আকাবা বন্দর বিখ্যাত। অত্যন্ত মনোরম এখানে সাগরের তলদেশ ও নিরাপদও। তাই সারা বিশ্ব থেকেই অভিযাত্রীরা ছুটে আসেন আকাবায়।

১২টি মুহাফাযা বা জেলা রয়েছে জর্ডানে। সব জায়গায়ই ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন সব স্থাপত্য। আম্মানের আল বাল বালাদে রয়েছে রোমান থিয়েটার, যেখানে এখনো সংগীতসন্ধ্যা বা বইমেলার আয়োজন হয়। একাধিক মন্দির, থিয়েটার, হারদিয়ান তোরণ, নিম্ফায়াম নিয়ে এখনো জেরাশ এক অপূর্ব শহর। প্রাচীনকালে অত্যন্ত উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী ছিল জেরাশ শহর। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০০ সাল থেকে এখানে জনবসতি ছিল। দ্বিতীয় শতাব্দীতে এটি গ্রিকদের অধীনে যায়। রোমান ও বাইজেন্টাইন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ এখানে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। রাজধানী আম্মানের ত্রিশ মাইল উত্তরে এই ঐতিহাসিক শহরটি অবস্থিত। জর্ডানে পেত্রা নগরের পরে জেরাশেই সর্বোচ্চ পর্যটকের আগমন ঘটে। অত্যন্ত উর্বর এই শহরে যায়তুন বা অলিভ, ত্বিন, গম, খেজুর, সিডার, ইউক্যালিপটাসসহ অসংখ্য প্রজাতির গাছপালায় সবুজ এই শহর। গত চার মাসে প্রতি সপ্তাহেই ঘুরে বেড়িয়েছি জর্ডানের প্রতিটি বিখ্যাত স্থানে। আজলুন আর আল কারাক সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ক্রুসেডের স্মৃতিমণ্ডিত। ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শনের সময় মনে হচ্ছিল হেঁটে বেড়াচ্ছি ইতিহাসের পাতায় পাতায়। কারাক দুর্গে যাওয়ার আগেই বেশ কয়েকবার স্বপ্ন দেখেছিলাম দুর্গটি, তাই এখানে যাওয়ার জন্য অস্থির ছিলাম। সত্যিই ঢাকার জ্যামের মতো ইতিহাস এখানে ভিড় করে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই দুর্গ ছিল ব্রিটিশদের প্রশাসনিক অফিস। দুর্গের পাশেই একটি ছোট কিন্তু তথ্যবহুল জাদুঘর এবং সারায়া ক্যাসেল রেস্টুরেন্ট। কারাক দুর্গে বাইজেন্টাইন, ইউরোপিয়ান আরব ও তুর্কিদের সভ্যতা সংমিশ্রিত হয়েছে। একসময় আকাবা থেকে তুরস্ক যাওয়ার পথ ছিল কারাক। ২২০ বর্গমিটার দীর্ঘ এবং ১২৩ বর্গমিটার প্রশস্ত এই দুর্গের উপরিভাগ। ২০১৬ সালে আইএস এই দুর্গেই একজন কানাডীয় পর্যটকসহ নয়জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করে।

‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না ও দেখে না তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল? পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক এবং শক্তিতে ও কীর্তিতে অধিক প্রবল। তারা যা করত তা তাদের কোনো কাজে আসেনি।’ (সুরা-৪০ মুমিন, আয়াত: ৮২)

আম্মান থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে ডেড সি। কেউ বলেন ডেড সি বা মৃত সাগর, আবার কেউ বলেন লুত সাগর। আসলে জায়গাটি নাম ভিন্ন হলেও প্রকৃতপক্ষে একই জায়গার দুটি ভিন্ন নাম। ডেড সি হলো পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্ববৃহৎ গর্ত, যা দেখতে অনেকটা সাগরের মতো বলেই এ জায়গাকে সাগর বলা হয়। কী হয়েছিল পৃথিবীর এ অংশে, কেনই বা এ রকম গর্ত বা সাগর এই এলাকায় সৃষ্টি হলো, যার অনুরূপ দ্বিতীয় কোনো নজির পৃথিবীর বুকে আর কোথাও পাওয়া যায় না। এ রকম অনেক প্রশ্ন বহু বছর ধরেই জ্ঞানবান মানুষ হতে শুরু করে ভূবিজ্ঞানীদেরও তাড়া করে ফিরছে। আল-কোরআনের বর্ণনা মোতাবেক ডেড সি (লুত সাগর) হলো একটি অভিশপ্ত জায়গা, যেখানে হাজার হাজার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত এক মহাঅপরাধী সম্প্রদায়কে এক মুহূর্তের মধ্যে জীবন্ত সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

পেত্রা জর্দানের দক্ষিণ-পশ্চিমের গ্রাম ওয়াদি মুসার হুর পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি গোলাপি শহর। ৪০০-২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ছিল নাবাতাইন রাজ্যের রাজধানী। পেত্রা নগরী মূলত একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ। এর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভগুলোর জন্য বিখ্যাত। ১৮১২ সালে প্রাচীন শহরটিকে বিশ্বের কাছে উন্মোচন করেন সুইস পরিব্রাজক জোহান লুডিগ বুর্খার্দত। গুহার মধ্যে তৈরি শহরটির কোথাও কোথাও মাত্র ১২ ফুট চওড়া, মাথার ওপরে পাথরের দেয়াল। এছাড়া রয়েছে অর্ধগোলাকৃতির একটি নাট্যশালা, যেখানে প্রায় ৩০০০ দর্শক একসঙ্গে বসতে পারে। গুহার পাশেই রয়েছে কঠিন পাথরের দেয়ালের গায়ে গ্রথিত সেই প্রাচীন দালানগুলো, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো খাজনা ফিরাউন নামের মন্দিরটি। আছে বিভিন্ন ভবনের ভগ্নাংশ, যা কবরস্থান হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বৈশ্বিক ঐতিহ্যবাহী স্থান ঘোষণা করে।

নবী হযরত নূহ, আইয়ুব, মুসা ইউশা বিন নুন, শুয়াইব আ. সহ অনেক নবী এবং সাহাবি আবু উবায়দা, দিরার বিন আল আজওয়ারসহ আরো মাজার। ঐতিহাসিক মুতা প্রান্তর জর্দানের কারাক শহরে অবস্থিত। মুসলিম সেনাপতি যায়েদ ইবনে হারেসা, জাফর ইবনে আবু তালিব ও আবু আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা-এর মাজার জর্ডানের মুতার যুদ্ধপ্রান্তরে অবস্থিত। রাসুলুল্লাহ সা.-কে ছায়া দানকারী সিরিয়া যাওয়ার পথের বৃক্ষ এবং আসহাবে কাহাফ সবই জর্ডানে অবস্থিত।

প্রাচীন মাদাবা, আম্মানের দক্ষিণ-পশ্চিমের খ্রিস্টান অধ্যুষিত শহর। অসংখ্য গির্জার শহর, সুপ্রাচীন গির্জার মেঝেগুলো মোজাইক করা। মোজাইক সভ্যতা এখানে অত্যন্ত উন্নতমানের। মোজাইকের মাধ্যমেই লিপিবদ্ধ হয়েছে লোকগাথা, দেবতাদের উপকথা। তাই এটা মোজাইক শহর নামে সুপরিচিত।

সিরিয়া থেকে জর্ডান হয়ে মদিনা পর্যন্ত হেজায রেললাইন নির্মাণ করেছিল উসমানীয়রা। সেই রেললাইন আজও জর্ডানে বিদ্যমান, তবে কোনো রেল যোগাযোগ এখানে নেই। শুধু স্বর্ণালী ইতিহাসের সাক্ষী দিতে এখনো সংরক্ষিত এ রেল লাইন।

আরবি ভাষা অতি সমৃদ্ধ ও সুমিষ্ট, তাই জর্ডানিরা কথা বলে সুন্দরভাবে। সবসময় দোয়ামূলক বাক্য বলা তাদের সংস্কৃতি। যেন সর্বক্ষণই তারা অন্যের কল্যাণ কামনা করছে। প্রতিটি মুহূর্তের জন্য চমত্কার সব বাক্য প্রচলিত। উদাহরণস্বরূপ, অফিস আদালত বা কেউ কারো কাছে কোনো কারণে গেলে বলবে, ই’য়াতিকাল আফিয়া বা আল্লাহ আপনাকে সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ দিন। উত্তরে বলবে আল্লাহ ইয়াফিক। আবার কেউ গোসল বা চুল কাটালে তাকে বলা হয় ‘নাঈমান’ বা আল্লাহ তোমাকে আরো নিয়ামত দিন। উত্তরে বলা হয়, আল্লাহু ইয়েনএম আলাইকা। এভাবে প্রতিটি অবস্থায়ই অসংখ্য দোয়ামূলক বাক্য এবং এসবের উত্তরে আরো চমত্কার উত্তর দেয়ার নিয়ম আছে। প্রতিনিয়ত এমন সুন্দর বাক্য বিনিময় মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে।

বিয়েতে কনে পরে সাদা গাউন। খুব হালকা গহনা। নারী ও পুরুষের হলরুম ভিন্ন। শুধু মেয়েরা বিয়ে উপলক্ষে কনেসহ নাচ-গান করে একান্তে, যেখানে ছেলেদের প্রবেশাধিকার নেই। আর থাকে ছেলেদের গোলাকার হয়ে দাবকা নাচ। নাচে পাত্র-পাত্রীর মা, শাশুড়ি সবাই অংশগ্রহণ করে। এদের বিয়ের উৎসবে পরিবেশন করা হয় শুধু কেক, কফি আর পানীয়। তাই চিরাচরিত বিয়ের খানা বলতে কিছু না থাকায়, এত নাচ-গানে পরিপূর্ণ উৎসবও মলিন মনে হয়েছিল। কারণ বিয়ে মানেই পোলাও বিরিয়ানির আয়োজন দেখে অভ্যস্ত আমরা। বিয়ের দিন থেকেই আলাদা বাসায় থাকেন নতুন দম্পতি। বাবা-মায়ের প্রতি ছেলেরা খুবই দায়িত্বশীল হলেও বিয়ের পর বাবা-মায়ের সংসারে থাকার রীতি নেই। তাই কাছাকাছি ভিন্ন বাসায় থেকেই তারা বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেন।

এখানে কেউ ইন্তিকাল করলে তিনদিনের শোক পালন করা হয়। তাঁবু বানানো হয় পুরুষদের জন্য, যেখানে সবাই শোকাহত পরিবারকে শোক জানাতে আসে। নারীরা থাকেন বাড়িতে। আগত মেহমানদের কফি ও খেজুর দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। কেউ কেউ মানসাফও রাখেন অতিথিদের জন্য।

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও নিরাপদ দেশ জর্ডান ১৯৪৮ সাল থেকেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। বর্তমানে ফিলিস্তিনি নাগরিকের সংখ্যা দেশটির ৭০ শতাংশ। এছাড়া যুদ্ধের পর অসংখ্য সিরীয়, ইরাকি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন এখানে। দারোয়ান, কেয়ারটেকার, ড্রাইভার বা শ্রমিক হিসেবেই কাজ করেন, জর্ডানে বসবাস করেন বহুসংখ্যক মিসরীয়।

রাসুলুল্লাহ সা. প্রপিতামহ হাশেম থেকে হাশেমীয় বংশের সূচনা হয়। জর্ডানের বর্তমান বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ রাসুলুল্লাহ সা.-এর ৪৩তম বংশধর। এ হাশেমীয়রা হেজাযের শরিফ বা গভর্নর ছিলেন দশম শতাব্দী থেকে। জর্ডানের বর্তমান হাশেমীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শরিফ হোসাইন বিন আলীকে উসমানীয় খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ মক্কার শরিফ হিসেবে মনোনীত করেন ১৯০৮ সালে। কিন্তু প্রথম যুদ্ধে শরিফ ব্রিটিশদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে খিলাফত বিরোধী আরব বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন এবং আকাবা প্রান্তরে ব্রিটিশদের সঙ্গে উসমানীয়দের যুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষাবলম্বন করেন। উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর হোসাইনের পুত্র আব্দুল্লাহ ১৯২১ সালে জর্ডানের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন এবং ১৯৫১ সালে আল আকসা মসজিদ প্রান্তরে একজন ফিলিস্তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর মাসখানেকের জন্য বাদশাহ হন পুত্র তালাল এবং পরে নাতি হোসাইন। ১৯৫১-৯৯ পর্যন্ত বাদশা ছিলেন হোসাইন। বর্তমানে তার পুত্র দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ জর্ডানের বাদশাহ। জর্ডানের বাদশাহ ও রানী রানিয়া দেশের জনগণের কাছে জনপ্রিয়।

জর্ডানের জনগণ গোত্রভিত্তিক, তাই সবাই কোনো না কোনো বংশ বা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। নামের সঙ্গে বংশীয় নাম থাকে সবার। দেশটির দক্ষিণ ও পূর্বের লোকেরা বেদুইন আরব বলে পরিচিত। মরু অঞ্চলে বসবাসের কারণে তারা অপেক্ষাকৃত গাঢ় গাত্রবর্ণের।

জর্ডানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ফিলিস্তিনি। জর্ডান ফিলিস্তিন থেকে শরণার্থী হিসেবে আগতদের নাগরিকত্ব প্রদান করে, তাই দেশটির ৭০ শতাংশের বেশি ফিলিস্তিনি-জর্ডানি, যারা এখনো তাদের ফিলিস্তিনি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে। নিজেদের ঐতিহ্যও ধরে রেখেছে যুগ যুগ ধরে। এরা জর্ডানের উন্নয়নে অনেক অবদানও রেখেছে।

জর্ডানের অনারব জনগণ হলো ককেশাস অঞ্চলের সারকাসীয় ও চেচেনরা। উনিশ শতকে রাশিয়ার জারের শাসনামলে লাখ লাখ মুসলিম নাগরিকদের জোরপূর্বক দেশছাড়া করা হয় যুদ্ধের মাধ্যমে। ককেশাসের বিতাড়িত এ মুসলিমরা আশ্রয় পান তত্কালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যে। জর্ডান অঞ্চল তখন অনুন্নত অঞ্চল, কিন্তু আবহাওয়াগত কারণে সিরিয়া ও জর্ডান অঞ্চলেই তারা বসবাস শুরু করেন ১৮৭৮ সাল থেকে। আম্মান, ওয়াদি সির, নাউর, জেরাশ, যারকা, আযরাক, সোওয়াইলেহতে বসবাস করেন এই চেচেন ককেশাসের জনগণ। উসমানীয় খলিফারা তাদের নিযুক্ত করেছিলেন, এ অঞ্চলের সৈন্য বিভাগে তাই এখনো আর্মি ও পুলিশ প্রশাসনে সারকাসীয়দের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন আরবে বসবাস করলেও তারা খুবই সচেতন নিজেদের স্বকীয়তা নিয়ে, তাই বিয়ে করেন নিজেদের জাতির মধ্যেই। আশ্চর্যজনকভাবে তাদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও ভাষা অবিকৃত আছে শত শত বছরেও। বাইরে সবাই আরবিতে কথা বললেও নিজেদের মধ্যে এখনো তারা নিজস্ব ভাষায়ই কথা বলেন। মুসলিম হিসেবেও তারা অনেক রক্ষণশীল। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বাদশাহর প্রাসাদে নিযুক্ত রাজকীয় পুলিশ হিসেবে একমাত্র সারকাসীয়রাই নিয়োজিত আছে। আধুনিক জর্ডান গঠনের পেছনে উল্লেখযোগ্য অবদান এ সারকাসীয়দের। অত্যন্ত সৎ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত এদের জন্য সংসদেও আসন সংরক্ষিত।

মুসলিম খ্রিস্টানের অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান জর্ডান। পূর্বে অনেক খ্রিস্টান থাকলেও বর্তমানে ৪ শতাংশ খ্রিস্টানের বসবাস জর্ডানে। এখানে অনেক প্রাচীন গির্জা আছে ও তীর্থভূমি আছে, তাই এটি খ্রিস্টানদের জন্যও পুণ্যভূমি। জর্ডান নদীর তীরে যিশুকে ব্যাপ্টাইজ করেছিলেন জন, তাই খ্রিস্টানরা এ নদীর পানি স্পর্শ করতে আসে সারা দুনিয়া থেকে। এছাড়া সিরিয়া সীমান্ত অঞ্চল ও আযরাকে সামান্য সংখ্যক দ্রুজ ধর্মাবলম্বী বাস করেন।

এ দেশের জনগণ সুন্নি মুসলিম, যারা হানাফি ও শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী। মেয়েরা মসজিদে নিয়মিত নামাজে অংশগ্রহণ করে থাকে। জর্ডানের জনগণ সহনশীল ও শান্তিপ্রিয়। মোটামুটি সবাই শিক্ষিত। জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় এখানে অনেকেই একাধিক পেশায় জড়িত থাকেন। খুব অল্প বয়স থেকেই উচ্চশিক্ষার চেয়ে কর্মমুখী হওয়ার প্রবণতাই বেশি পুরুষদের মধ্যে। পশ্চিমা বিশ্বের মতোই এখানে কোনো কাজ বা পেশাকে ছোট করে দেখা হয় না।

জর্ডানের নারীরা মাথায় স্কার্ফ পরেন। ওয়েস্টার্ন স্টাইলের শালীন পোশাকের পাশাপাশি পরে থাকেন আরব ঐতিহ্যবাহী লম্বা পোশাক। অন্য আরব দেশের তুলনায় এখানকার নারীরা অনেক সুশিক্ষিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। নারীরা এ দেশে সব পেশায়ই আছেন সাফল্যের সঙ্গে। প্রায় মসজিদেই নারীদের জন্য নামাজের বিশেষ পোশাকসহ সুব্যবস্থা রয়েছে। তুর্কি শাসকদের অধীনে থাকার কারণে অনেক তুর্কি শব্দ ও সংস্কৃতি জর্ডানের ভাষা-সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত আছে। বর্তমান প্রজন্ম পশ্চিমা প্রভাবিত হলেও ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধের প্রতিও তারা যত্নশীল। পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জর্ডানিদের জীবনে। প্রায় শুক্রবারেই সব আত্মীয়স্বজন একত্র হয়। কখনো পুরো গোত্রের সবাই কোনো হলরুমে বা তাঁবুতে পারিবারিক ভোজসভার আয়োজন করে।

আমাদের দেশে আরবি একটি মাদ্রাসায় পড়া ধর্মীয় ভাষা বলে গণ্য হলেও সারা বিশ্বে এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবেই সমাদৃত। তাই ইউরোপ আমেরিকা থেকে বহুসংখ্যক অমুসলিম জর্ডানে আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি শিখতে আসে। দেশটি উদার মনোভাবাপন্ন হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশের চেয়ে এখানেই বেশি বিদেশী ছাত্র মূলত আরবি শিখতেই আসে।

কোনো উল্লেখযোগ্য খনিজ সম্পদ না থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো ধনী দেশ নয় জর্ডান। ফসফেট, পটাশ, গার্মেন্টস ও পর্যটন দেশটির মূল আয়ের উৎস। ৮৯ হাজার ৫৫৬ বর্গকিলোমিটারের দেশটিতে দশ মিলিয়ন জনগণ বাস করে। রাজধানী আম্মানে সবকিছুই খুব ব্যয়বহুল। ভালো-মন্দ মিলিয়ে মানুষ সব দেশেই। তবে আমার কপাল এমনই যে দেশে-বিদেশে সব জায়গায়ই আমার সঙ্গে মন্দ মানুষের কম দেখা হয়। এই ভাগ্যগুণেই জর্ডানেও বেশির ভাগ ভালো মানুষের সঙ্গেই আমার দেখা হয়েছে।

এই যে আমার শৈশবের স্মৃতিময় আরব দুনিয়া, যত দোষ-ত্রুটিই থাক, মাতৃভূমির পরে আরব ভূমিকেই তাই খুব নিজের মনে হয়। আকাবা, ইরবিদ, সাহাব, আদ দুলাইল, আল তাজাম্মু এলাকায় গার্মেন্টস ও শিল্প-কারখানা, তাই এসব এলাকায় বাংলাদেশীদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। এছাড়া বিভিন্ন মাজরা বা কৃষি খামারেও বাংলাদেশী শ্রমিকরা কাজ করছেন। জর্ডানে শুধু গার্মেন্টস বা গৃহকর্মী হিসেবেই বাংলাদেশীরা আসতে পারে। তাই এ দেশে বাংলাদেশীদের প্রধান পরিচয় শ্রমিক।

জর্ডান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় ধনী না হলেও এখানে কাজ করে বাংলাদেশীরা সন্তুষ্ট। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ দেশ জর্ডান। এখানে গার্মেন্টস শিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এ দেশের গার্মেন্টসগুলোয় কর্মীর অর্ধেকের বেশিই বাংলাদেশী। বিভিন্ন দেশের কর্মীর মধ্যে বাংলাদেশীদের দক্ষতা প্রশংসিত। হাতে গোনা দুই-তিনজন হলেও উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা এখানে সম্মানের সঙ্গে কাজ করছে। সিআইপির মর্যাদাসহ পেয়েছেন জর্ডানের নাগরিকত্ব। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে আছেন গ্যালাক্সি এপেরালের চেয়ারম্যান। ব্যবসায়ীদের অভিমত, জর্ডানে ব্যবসার পরিবেশ অত্যন্ত অনুকূল ও নিরাপদ। জর্ডান সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে সব রকম সহযোগিতা করে থাকেন।

এছাড়া বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা পরিচালনা করছেন বিভিন্ন পোশাক কারখানা, কৃষি খামার ও দোকানপাট। ফল ও ফুলের বাগানে জর্ডানের কৃষি খামারগুলো নিজ দেশের চাহিদা পুরণ করার পর বিদেশেও রফতানি করে। বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও কর্মীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই দেশের ফল-সবজি ও ফুলের ফার্মে কাজ করছে বেশ কয়েক দশক ধরে। জর্ডানের একমাত্র সমুদ্রবন্দর আকাবার রেস্টুরেন্ট ও ফাইভ স্টার হোটেলগুলোয় বহুসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী আছে। এখানে সারা বছর পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে। বাংলাদেশীরা অত্যন্ত পেশাদার ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন।

ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ছাড়া জর্ডানে বাংলাদেশী হিসেবে আছে বহুসংখ্যক গৃহকর্মী। বেশির ভাগ ভালো পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেলেও কেউ কেউ দালালের মাধ্যমে জর্ডানে প্রবেশ করে হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। তবে বাংলাদেশ দূতাবাস রাষ্ট্রদূত মিসেস নাহিদা সোবহানের নেতৃত্বে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন এসব বিপদগ্রস্ত নারীদের জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত মিসেস সোবহান দূতাবাসে যোগদানের পর থেকেই জর্ডানসহ সারা বিশ্ব ভয়াবহ করোনা মহামারীর মুখোমুখি হয়। এ সময় কর্মহীন ও চাকরিচ্যুত হয়ে পড়ে অসংখ্য বাংলাদেশী কর্মী। কিন্তু বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রদূতের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে জর্ডানের সর্বত্র খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন। বর্তমানে জর্ডানে করোনা নিয়ন্ত্রণে আছে এবং স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ ফিরে এসেছে। ভাষাগত সমস্যার কারণে গৃহকর্মীসহ অন্য শ্রমিকরা হাসপাতাল, পুলিশ কাস্টডি বা আদালতে প্রতিনিয়তই জটিলতায় পড়েন। এ সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রদূত একজন বাংলাদেশী অনুবাদক নিয়োগ করেছেন বোয়েসেলের মাধ্যমে। এছাড়া স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে বা কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে প্রায়ই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো পরিদর্শন করে থাকেন দূতাবাস কর্মকর্তারা।

জর্ডানে বাংলাদেশ দূতাবাসের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। বোয়েসেলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনা খরচে জর্ডানে আসছেন গার্মেন্টস কর্মীরা। তাই গৃহকর্মীদের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে আছেন পোশাক শ্রমিকরা। তবে কিছু পোশাক কারখানায় নানা সমস্যার মুখোমুখিও হচ্ছেন শ্রমিকরা। দূতাবাস তাদের অধিকার আদায়ে ও সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। দালালের মাধ্যমে নিরক্ষর এবং অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ সরল নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে এ দেশে এসে পড়ছে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে। যদি এ দেশের পরিবেশ ও কাজের ধরন সম্পর্কে তার ন্যূনতম ধারণা থাকত, তবে সে অনেকটাই ভালোভাবে কাজ করতে পারত। গৃহকর্মীরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়, তা অনেকটাই এড়ানো যেত, যদি তারা সামান্য সাক্ষরতাসম্পন্ন হতো। তবু অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানকার গৃহকর্মীরা ভালো পরিবেশে কাজের সুযোগ পাচ্ছে। ৩০ শতাংশ যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকে। শুধু প্রশিক্ষিত ও সাক্ষরতাসম্পন্ন গৃহকর্মীরই বিদেশে আসা উচিত।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিও বাংলাদেশী কর্মকর্তাও কর্মসূত্রে বসবাস করছেন জর্ডানে, যদিও তারা সংখ্যায় খুবই কম।

জর্ডান থেকে বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রতি বছর বাংলাদেশে মেডিকেলসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে যায়। এই সূত্রে অনেকেই বাংলাদেশীর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়। ভিনদেশীকে বিয়ে করার মাধ্যমে একটি মিশ্র সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে জর্ডানে। উল্লেখ্য, বর্তমান বাদশাহ চাচা প্রিন্স হাসানও বাংলাদেশী মেয়ে বিয়ে করেছিলেন।

জর্ডানের যারকা শহরের পাকিস্তান কলোনিতে বেশকিছু বাংলাদেশী বসবাস করছে, যারা পাকিস্তান আমলে এ দেশে এসেছিল। স্বাধীনতার পর এরা কেউ পাকিস্তানের আর কেউ বাংলাদেশের পাসপোর্ট গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে আরবদের সঙ্গে বিবাহসূত্রে পুরোপুরি আরবদের মতো হয়ে গেলেও বাংলাদেশের পাসপোর্টই বহন করছে। এদের বর্তমান প্রজন্ম শুধু আরবিতেই কথা বলে। শহর পরিচ্ছন্নকর্মী, কৃষিকাজ বা ড্রাইভার হিসেবেই এরা জীবিকা নির্বাহ করে।

 

ড. তাসনীম আলম: অনুবাদক ও লেখক। বর্তমানে বাংলাদেশ দূতাবাস, আম্মান, জর্ডানে কর্মরত