আরব আমিরাতে মোট সাতটি প্রদেশ। রাজধানী আবুধাবি ও বাণিজ্যিক রাজধানী দুবাই। বাংলাদেশীদের বসবাস সবচেয়ে বেশি বড় প্রদেশ আবুধাবিতে। দেশটির ১০০ ভাগের প্রায় ৮৫ ভাগই বিস্তৃত আবুধাবি অঞ্চলে। সংগত কারণেই আবুধাবির সব এলাকায়ই কমবেশি বাংলাদেশী রয়েছে। আবুধাবির শিল্পনগরী মোছাফফা ও আল-আইনয়ে প্রচুর বাংলাদেশী। মোছাফফায় বাংলাদেশীদের অবস্থান বেশ শক্ত। ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীর সংখ্যা মোছাফফায় বেশি। এদিকটায় অন্যান্য দেশের মানুষ বসবাস করলেও সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী।

একটা তথ্য বেশ চমত্কার। বাংলাবাজার নামে একটা জায়গা রয়েছে দুবাইয়ে। প্রচুর বাংলাদেশী বসবাস করে সেখানে। দুবাইয়ের পুরনো সিটিতে ও এয়াপোর্ট অঞ্চলে বাংলাদেশীদের সংখ্যা অনেক বেশি। ২০১২ সালের ১২ আগস্ট বাংলাদেশের ভিসা বন্ধ হতে যাচ্ছিল দুবাইয়ে। সেই সময়ে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশী এখানে অবস্থান করছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশীদের মানুষের অবস্থান চোখে পড়ত। ২০১২ সালের পর দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল ভিসা। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশীদের জন্য যে ভিসা উন্মুক্ত হয়েছে, তা অনেকটাই করোনাকালীন শিথিলতার মতো। অর্থাৎ করোনার সময় বিভিন্ন দেশের ভিসা ও ট্রান্সফার বন্ধ ছিল। সেগুলো শিথিল করা হয়েছে পরবর্তী সময়ে। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে এখন ট্রান্সফার ও ভিজিট ভিসা নিয়ে আসতে পারছে অনেকেই। নতুন একটা খবর জানা গেছে। যদিও নিশ্চিত না। বাংলাদেশের ভিসা ট্রান্সফার বা ভিজিট ভিসা নিয়ে যারা এসেছেন, গতকাল থেকে এখানকার কাজের ভিসায় তাদের রিজেক্ট আসতেছে। অবশ্য যথাযথ কারণ জানা যায়নি। বাংলাদেশের দ্বিতীয় শ্রমবাজার আরব আমিরাত। দুবাইয়ে হাঁটাচলা করলে যে কেউ মনে করবে এটা মিনি বাংলাদেশ। প্রচুর বাংলাদেশী এখানে। আবুধাবি ও দুবাই শহরজুড়েই বাংলাদেশী। যখন বাংলাদেশের ভিসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশী অবস্থান করছে। সেটি কমতে কমতে সাত লাখে পৌঁছেছে। ভিজিট ভিসা করা হলো করোনার সময়। করোনার শিথিলতা ও বাংলাদেশের সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এখন প্রায়ই ভিজিটকারীরা এখানে আসে। আগের সেই সাত লাখের সঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ভিজিট ভিসা ও বিভিন্নভাবে আমিরাতে আসছেন। আরব আমিরাতে এখন ১০ লাখের মতো বাংলাদেশী।

আজ থেকে ১০ বছর আগেও বাংলাদেশের অবস্থা ছিল ভিন্ন। তখন বাংলাদেশীদের গণ্য করা হতো গরিব, অল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত দেশের মানুষ হিসেবে। বিভিন্ন দেশের লোকজন ও এদেশের নীতিনির্ধারকরাই সেটা মনে করতেন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ভিসা বন্ধ থাকার একটা পজিটিভ দিক রয়েছে। এটা সত্য, এখানে যারা ছিলেন তারা অনেক বেশি অভিজ্ঞ ছিলেন। তবে ভিসা বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের অবস্থান একটা জায়গা থেকে চলে গেছে। ২০১২ সালে আবুধাবি ও দুবাইয়ের ক্লিনিং কোম্পানিগুলোয় ৯৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশী। রাস্তাঘাট, মসজিদ, শপিং মল থেকে শুরু করে সব জায়গায়ই পরিচ্ছন্নের কাজে দেখা যেত বাংলাদেশী। কেউ ওয়াশরুমে গেলেও দেখতে পেত বাংলাদেশী। স্বভাবত একে একটি ছোট কাজ বলে ধারণা করা হয়। ভিআইপি লোকজন দেখত বাংলাদেশী লোকেরা এ কাজ করছে। বাংলাদেশীদের ওই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হতো তখন। ভিসা বন্ধ হওয়ার কারণে ওই সেক্টরটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশের জন্য। তার বদলে লোক এসেছে নেপাল থেকে। ফলে আগে বাংলাদেশীরা যে নিম্নমানের কাজগুলো করত, সেগুলো এখন নেপালিরা করে। বাংলাদেশ থেকে এখন শিক্ষিত মানুষই আসছে। ফলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আগের চেয়ে পরিবর্তিত হয়েছে অনেকটাই। আমরা যখন ২০০৬ সালে আমিরাতে আসি, তখন বাংলাদেশীদের বিভিন্ন দেশের মানুষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। এখন সে অবস্থা নেই। আমাদের সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং এখানে থাকা মানুষের এ দেশের আইনকানুন মেনে চলা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা অন্যান্য উন্নত দেশের অবস্থার মতো পরিণত হয়েছে।

শুরুর দিকে যেসব বাংলাদেশী এসেছেন, তারা এসেছেন মূলত টেকনিক্যাল কাজে। গ্যারেজ, বিভিন্ন স্টিল ওয়ার্কশপ, ওয়েল্ডিং গ্যারেজ, গাড়ির গ্যারেজ—অর্থাৎ গ্যারেজ জাতীয় কাজগুলো। হয়তো লেখাপড়া তেমন না থাকায় টেকনিক্যাল কাজ নিয়ে এসেছিলেন। ফলে মোছাফফা, শারজাহ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকাগুলোয় বাংলাদেশীদের অবস্থান বেশ শক্ত। গাড়ির গ্যারেজ থেকে গ্রিল ওয়ার্কশপ—গ্যারেজ জাতীয় কাজগুলোর ৮০ শতাংশই বাংলাদেশীদের দখলে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরে বাংলাদেশের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। করোনা শুরুর সময় বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অবস্থা এক রকম ছিল, করোনার পর চিত্র বদলে গেছে পুরোটাই। আরব আমিরাতে বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশের লোক থাকে। করোনার সময় বিভিন্ন দেশের লোকজন ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেছে, অথচ বাংলাদেশের জন্য হয়েছে উল্টো স্রোত। বাংলাদেশীরা প্রচুর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এ সময়ে। টাইপিং সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, সুপারমার্কেট, সেলুনের মতো সব সেক্টরেই বাংলাদেশের অবস্থান করোনার পরে মজবুত হয়েছে। প্রতিদিন দু-তিনটি করে চালু হয়েছে বাংলাদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। পরিবেশ এখন কিছুটা বাংলাদেশীদের অনুকূলে। আগে তো ভারতীয়দের মাড়োয়ারিদের আধিপত্য ছিল। জনতা ব্যাংকে কতজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্ট আছে, বিষয়টা আমি জানতে চেয়েছিলাম। তারা জানিয়েছে, প্রায় ২০ হাজার ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এখানে যে ব্যাংকগুলো রয়েছে, সেগুলোর হিসাব করে ছোট-বড় ব্যবসায়ী অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে আনুমানিক ৪০ হাজার ব্যবসায়ী অ্যাকাউন্ট আছে বাংলাদেশীদের। তাই বলতে গেলে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অবস্থা অনেক ভালো। আগে গ্যারেজে থাকলেও রেস্টুরেন্ট ও সুপারমার্কেটে তেমন দেখা যেত না। এখন নানা ধরনের পেশায় জড়িত দেখা যাচ্ছে।

১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এদেশে সফর করেছিলেন। তখন থেকেই আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শুরু। তারপর থেকে আমিরাতের এমন কোনো স্থাপনা নেই, যেখানে বাঙালি শ্রমিকদের হাত নেই। বুর্জ খলিফা নির্মাণেও প্রচুর বাংলাদেশী কাজ করেছেন। বস্তুত কনস্ট্রাকশন সেক্টর শতভাগ বাংলাদেশীদের দখলে ছিল এক সময়। বাংলোদেশের ভিসা বন্ধ হয়ে গেলে এ সেক্টরে প্রভাব কমে আসছে। তবে এখনো কনস্ট্রাকশন সেক্টরে বাংলাদেশীদের উপস্থিতি বেশি। আমিরাতের পরিচ্ছন্ন সিটি, দেশ ও আধুনিকায়নের পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা বাংলাদেশী শ্রমিকদের। প্রত্যেকটি বড় কনস্ট্রাকশন কোম্পানির রেজিস্ট্রি দেখলেও সবচেয়ে বাংলাদেশীদেরকেই খুঁজে পাওয়া যাবে। ভিসা বন্ধের ইস্যুর কারণে একটু কমলেও এখনো অবস্থানে ভালো।

আমিরাতের মাটিতে বাংলাদেশের অবস্থানও বর্তমানে নির্দ্বিধায় বলা যায় ভালো। বিশ্বের ২০০ দেশের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপিনস হয়তো সবার ওপর। বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে থাকবে। ব্যবসার দিক দিয়েই হোক আর শ্রমিকের দিক দিয়ে। আমিরাত গড়ার পেছনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বাংলাদেশের। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে থাকবে। মোটামুটি কম্পিটিশনের সঙ্গে বাংলাদেশ এগিয়ে। বাংলাদেশের ইমেজটাও অনেক ভালো। বিশেষ করে গতবারের আগের যে বিশ্বকাপটা ছিল, যেখানে ইন্ডিয়ার কাছে বাংলাদেশ হেরে গেছে। এখানে সবাই দেখছেন সেই খেলা। এক সময় বাংলাদেশের খেলা হলে স্টেডিয়ামে লোক থাকত না। অথচ ওই সময়ে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশ ম্যাচ দেখেছে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। খেলা দেখা খুব ব্যয়বহুল। এত লোকের খেলা দেখা, বাংলাদেশের অবস্থানের একটা সিম্বল হিসবে দেখা যেতে পারে। আমিরাতে অন্যান্য যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশী প্রবাসীরা ভালো অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য গৌরবের একটা বিষয় রয়েছে। এখানে বাংলাদেশের একটা সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে জনতা ব্যাংক। যেকোনো লাইসেন্স করতে গেলে এখানে লোকাল স্পন্সর লাগে। বাংলাদেশের সরাসরি লোকাল কোনো স্পন্সর নেই। স্পন্সরের ভূমিকা পালন করে একটা কাগজ। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দেশে এসেছিলেন। তখন এ দেশের জাতির জনক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানকে অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের শ্রমিকরা কীভাবে বাংলাদেশে টাকা পাঠাবে? আপনি একটা ব্যাংক স্থাপন করার অনুমতি দিন।’ তখন শেখ জায়েদ একটা কাগজে লিখেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান, আপনাকে আমি ব্যাংকের অনুমতি দিলাম।’ ওই কাগজটাই এখন জনতা ব্যাংকের স্পন্সর হিসেবে কাজ করছে। প্রত্যেক ব্যাংকের লোকাল স্পন্সর আছে। জনতা ব্যাংকের স্পন্সর সেই কাগজ। মূলত আমিরাতের প্রাচীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আমাদের জনতা ব্যাংক। প্রাচীন ব্যাংকের মধ্যে ব্যাংক অব বারোদা প্রথম। তবে জনতা ব্যাংকের বর্তমানে যারা ম্যানেজমেন্টে আছেন, তারা যদি ব্যাংকটাকে আরেকটু ডেভেলপ করতেন, ভালো হতো। কম্পিটিশন রয়েছে বিজনেসে। একজন আজকে দিচ্ছে ১ দিরহামে ৩০ টাকা। আপনি যদি ২৮ টাকা দেন মানুষ গ্রহণ করবে না। টাকার রেট পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নির্ধারণ করতে হবে। এদেশে ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে দিরহাম দিয়েই করতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে হিসাব করলে ১ টাকায় ৩০ টাকা হবে। এদেশে ব্যবসা করতে ও থাকতে চাইলে এ দেশের হিসাবেই কাজ করে চলতে হবে। জনতা ব্যাংককে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কিংবা জনতা ব্যাংকের কোনো বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এদেশ থেকে যখন হিসাব দেয়া হয়। তখন বাংলাদেশের সঙ্গে জনতা ব্যাংকের এমডি মিলিয়ে দেখেন যে বাংলাদেশের ১ কোটি টাকা লাগছে কিনা। ১ কোটি বা বেশি হলে তখন তারা ওইটা অফ করে দেন। বাংলাদেশের জন্য ১ কোটি টাকা হলেও এদেশের জন্য এটি কিছুই না। তাছাড়া ব্যবসা তো করছে এ দেশেই। এটা শুধু একটা উদাহরণ। জনতা ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টটা যদি আরেকটু শক্ত হতো তাহলে এখানে ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের রেমিট্যান্স অর্জনও আরো বেশি হতো।

এখানে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা প্রচুর। তার জন্য কয়েকটি কাজ করতে হবে। এখানে সাত লাখ বাংলাদেশী রয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশী ভিজিট ভিসা নিয়ে এসেছেন। ভিজিট ভিসা নিয়ে আসা ব্যক্তিদের তথ্য সরকারের কাছে নেই। আমরা যারা সংবাদকর্মী, আমরা যখন দূতাবাসে, রাষ্ট্রদূত, দুবাই কনস্যুলেট জেনারেলদের প্রশ্ন করি, তারাও আমাদের প্রশ্ন করে যারা বেড়াতে যায়, তাদের হিসাব কি রাখা হয়? তারা যেহেতু ভিজিট ভিসা নিয়ে এসেছেন, তাই সরকারের কাছে তাদের তথ্য নেই। আমাদের প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা ও বর্তমান পরিস্থিতি দুটো মিলিয়েই সরকারের অবস্থা বুঝতে হবে। এখানে বাংলাদেশের শ্রমিক ভিসা বন্ধ সরাসরি। তারা ভিজিট ভিসা নিয়ে এখানে এসে ইন্টারনালি ভিসা নিচ্ছেন। যেহেতু সরাসরি বন্ধ সেহেতু ভিজিট ভিসা নিয়ে এসেছেন। যারা আমিরাতে ভিজিট ভিসা নিয়ে এসেছেন, তাদের হিসাব সরকারের রাখা উচিত ছিল। ভিজিট ভিসা নিয়ে এলেও বিষয়টা সরকার আর প্রবাসী সবাই জানে, তারা আসলে কাজের জন্য আসেন। এসব দেশে বেড়ানোর জন্য তেমন কেউ আসেন না। আসে অল্প কিছু লোক, যেগুলো তাদের পাসপোর্ট ও পজিশন দেখলেই বোঝা যায়। এই লোকগুলো এ দেশ সম্পর্কে, এখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানেন না, ফলে অনেক সময় তারা আইনবহির্ভূত কাজ করে বসছেন। ভিজিট ভিসার মেয়াদ চলে গেলে যে আবার নবায়ন করতে হবে বা বর্ধিত করতে হবে, এটাও অনেকেই জানেন না। ফলে একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা এখানে অবৈধ হয়ে যান। দেশটি যখন দেখবে অনেক মানুষ অবৈধভাবে রয়েছে তখন ভিজিট ভিসা বন্ধ করে দেবে। তখন বাংলাদেশীদের জন্য যেসব সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে তার অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে।

ধরেন, আমি একজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী হিসেবে যখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করব তখন আমি অবশ্যই চাইব, আমার দেশ থেকে শ্রমিক এনে এখানে কাজে লাগানোর জন্য। কারণ অন্য দেশের শ্রমিক অনেক ব্যয়বহুল। যেটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বেশ কম। অবৈধভাবে থাকার ফলে ভিসা বন্ধ করে দেয়ায় অনেক শ্রমিক এ দেশে আসতে পারবেন না, আর যারা এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চান তারাও করতে পারবেন না। সে সময়ে সব ধরনের সম্ভাবনার দ্বার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্য মাথায় রাখতে হবে আমরা যে দেশে আছি, অবশ্যই সে দেশের আইন মানতে হবে। অনেকই এমন করেন যে দেশের কোনো ঝগড়া-বিরোধ তারা এ দেশে টেনে নিয়ে আসেন। পরে এখানে তারা দ্বন্দ্ব করেন, কখনো কখনো খুনাখুনিও হয়। কিন্তু এখানকার আইনে কাউকেই ছাড় দেয়া হয় না। সবাইকে বলব, মনে রাখবেন আপনার একটা অপরাধের জন্য অন্যদের ভিসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় বা পাকিস্তানিদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে প্রশাসনিক লেভেলে লোকজন একটু বেশি। ফলে তাদের কেউ কোনো অপরাধ করলে সেটা এশিয়ান হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের কেউ অপরাধ করলে তাদের গ্রামের নামসহ সবকিছু লিখে দেয়। সেজন্য বাংলাদেশীদের একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। এখানকার আইনকানুন মেনে চলতে হবে।

একজন পুলিশ অফিসার আমাকে জানিয়েছিলেন, এখানকার কারাগারে বন্দিদের মধ্যে বেশির ভাগই বাংলাদেশী। ব্যাংক থেকে টাকা লুট করা বা এ ধরনের কোনো অপরাধে বাংলাদেশীর নাম নেই। বরং পারিবারিক বিরোধ, ঝগড়া, ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি, পান খাওয়া, সিগারেট খাওয়া এসব অপরাধে বেশি বাংলাদেশীরা কারাগারে আটক রয়েছেন। তিনি আমাকে বলছিলেন, বাংলাদেশীরা যদি একটু সতর্ক হয়, তাহলে এখানে তাদের অবস্থান আরো ভালো হবে। তাছাড়া আমার মনে হয়, বাংলাদেশের যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা রয়েছে সেটা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের যে মিশনগুলো আছে, সেগুলো ছাড়াও আরো মিশন বাড়াতে হবে। দূতাবাস কনস্যুলেটে লোকবল বাড়াতে হবে, কারণ প্রশাসনিক কাজ করতে করতেই তাদের সারা দিন শেষ হয়ে যায়। তারপর যে তারা জনসচেতনতামূলক কোনো প্রোগ্রাম দেবেন বা জনগণের কাছে গিয়ে তারা কী করছে দেখবেন, তার কোনো সুযোগ নেই। সেখানে জনবল বাড়ালে তারা নিজেদের কাজের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কাজ যেমন আইন কী, অপরাধ কী সেগুলো নিয়ে কাজ করলে প্রবাসী বাংলাদেশীরা আরো বেশি সতর্ক হবে। তাতে করে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় ও মজবুত হবে। 


মুহাম্মদ মোরশেদ আলম: সহসভাপতি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব ইউএই