অনেক সম্ভাবনা থাকলেও দেশে মোটরসাইকেল শিল্পের কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণের পথে চারটি চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন টিভিএস অটো বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিপ্লব কুমার রায়। এর মধ্যে অন্যতম স্থানীয়ভাবে দক্ষ লোকবল ও কারিগরি দক্ষতা। বিকাশমান এ শিল্পের জন্য এটি খুবই জরুরি বলে মনে করেন তিনি। সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মোটরসাইকেল বাজারের নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি
বর্তমানে দেশে প্রতি বছর মোটরসাইকেলের চাহিদা কেমন?
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান সরকারের শিল্পোন্নয়ন উদ্যোগের কারণে করহার কমেছে, এর প্রভাবে দামও কমেছে। ফলে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের বাজার ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। ২০১৯ সালে মোটরসাইকেলের মার্কেট ছয় লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ২০১৮ সালে দেশে সাড়ে চার লাখের অধিক মোটরসাইকেল বাংলাদেশে বিক্রি হয়েছিল। ২০১৭ সালে বিক্রি হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার। দাম কমায় গত বছর বিক্রি বেড়েছে। কিন্তু বর্তমান অর্থবছরে আমদানির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট নীতিমালার পরিবর্তনের কারণে মোটরসাইকেলের দাম বৃদ্ধি পাবে। এজন্য মার্কেট সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আমরা সবসময় চেষ্টা করি, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতার কথা।
চাহিদার কত শতাংশ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মেটাতে পারছে?
বর্তমানে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্পের শতকরা ৯০ শতাংশ স্থানীয়ভাবেই তৈরি হচ্ছে!
বাংলাদেশের বর্তমান মোটরসাইকেলের বাজার কত টাকার? এখানে মোটরসাইকেলের বাজারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কী?
যদি আমি মোটরসাইকেলের গড় মূল্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ধরে নিই, তাহলে বর্তমান মোটরসাইকেলের বাজারের আকার হবে ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। মোটরসাইকেলের বাজারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা বললে বলতে হবে, খুবই ভালো, যদি অনেক সুদূরপ্রসারী শিল্প ও ক্রেতাবান্ধব সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় এবং এ সেক্টরে সরকারের সদয় দৃষ্টি অব্যাহত থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেল জিডিপিতে দশমিক ৫ শতাংশ অবদান রাখছে। ২০২৫ সালের মধ্যে সরকার এ লক্ষ্যমাত্রা ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। এ সেক্টরে এখন কাজ করছে পাঁচ লাখ মানুষ। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেলের পরিমাণ পাঁচ লাখ ও ২০২৭ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ। আমরা সরকারের এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ও বাংলাদেশের মোটরসাইকেল শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে চাই।
বাংলাদেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেলের মান কেমন? আমদানি করা মোটরসাইকেলের সঙ্গে দামের পার্থক্যের মূল কারণ কী?
আমরা মানের দিক থেকে কোনো রকমের আপস করি না। গাজীপুরের টঙ্গীতে টিভিএসের প্ল্যান্টটি একটি স্টেট-অব-দ্য-আর্ট স্থাপনা, এখানে মোটরবাইক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মান নিয়ন্ত্রণের পর বাজারজাত করা হয়। বছরে দুই লাখ বাইক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রযুক্তি ও স্থাপনা রয়েছে এখানে।
আপনাদের বাজারজাত করা মোটরসাইকেল কোন দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে?
টিভিএসের সাফল্যের একটি বড় নেপথ্য পটভূমি হচ্ছে গ্রাহক চাহিদার দৈনন্দিন পরিবর্তনশীল ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এর উৎপাদন ও নকশা-গবেষণার কৌশলপট বিন্যাস্ত করা হয়। নতুন ডিজাইন, ডিজাইন নবায়ন, উদ্ভাবন, মূল্য সংযোজনামূলক অগ্রগতি—এসব মিলিয়ে বাংলাদেশের অটোমোটিভ শিল্পের ইতিহাসে নজিরবিহীন রেকর্ড গড়েছে টিভিএস।
প্রতি বছর কী পরিমাণ নতুন মোটরসাইকেল বাজারে আসছে? সে তুলনায় পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন সার্ভিস সেন্টার আছে কি?
সাম্প্রতিক সময়ে অর্থাৎ গত তিন বছরে গড়ে সাড়ে চার লাখ করে মোটরসাইকেল বাজারে নেমেছে। আমাদের গ্রাহকসেবা দেশব্যাপী প্রায় ২০০টির অধিক ডিলার নেটওয়ার্ক ও সুচারু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করা হয়ে থাকে, যেন টিভিএসের গ্রাহকরা বিশ্বমানের সেবা পেয়ে থাকেন। এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে ‘থ্রি-এস’ অর্থাৎ সেলস, সার্ভিস ও স্পেয়ার পার্টসের সুবিধা। গ্রাহকদের বিক্রয়োত্তর সেবায় এক হাজারের বেশি সার্টিফায়েড সার্ভিস পয়েন্ট। এছাড়া সারা দেশে টিভিএসের মোট ১২টি নিজস্ব শোরুম/ সার্ভিস সেন্টার রয়েছে।
মোটরসাইকেলের বাজারজাত ও বিপণনে চ্যালেঞ্জ কোনগুলো?
মোটরসাইকেল কোনো বিলাসপণ্য নয়, বরং এটি এখন মানুষের প্রয়োজনীয় বাহন। এ শিল্পের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় এখনো দাম বেশি। অতিরিক্ত শুল্কের কারণে দাম অনেক বেশি পড়ছে। ফলে এ খাতের শিল্পটি যেভাবে সম্প্রসারণ হওয়ার কথা, সেভাবে হচ্ছে না। মোটরসাইকেলের দামের সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে পণ্যটির দাম সবচেয়ে বেশি।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে না ওঠা। মোটরসাইকেল উৎপাদনকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আগে বিভিন্ন সহযোগী শিল্পকে উন্নত করতে হবে। দেশে এখনো এমন শিল্পের অভাব রয়েছে। এ প্রয়োজন মেটাতে ভেন্ডরনির্ভর ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। কাঁচামাল আমদানিসহ প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষ কর কমানো প্রয়োজন।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ স্থানীয় দক্ষ লোকবল ও কারিগরি দক্ষতা। এ শিল্প এরই মধ্যেই বড় হওয়া শুরু করে দিয়েছে। এ বিশাল দক্ষ লোকবলের চাহিদা মেটাতে আমাদের স্থানীয় লোকবলকে আরো বেশি করে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ মূলধন ও ঋণ সুবিধা। এ বিষয় দুটি ক্ষেত্র সহজলভ্য করতে হবে। প্রথমত, যারা এ শিল্প নিয়ে ও এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ নিয়ে কাজ করতে চায়, তাদের সহজ শর্তে ঋণের মাধ্যমে মূলধনের ব্যবস্থা করা এবং দ্বিতীয়ত, গ্রাহক পর্যায়ে মোটরসাইকেল ক্রয়ে স্বল্পসুদে ও সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
নিরাপত্তার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
দেখুন, যত বেশি মোটরসাইকেল রাস্তায় নামবে, এ বিষয়টি নিয়ে তত বেশি কথা হবে। আমরা আমাদের পর্যায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। বর্তমান আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চালকদেরকে আইন সম্পর্কে আরো বেশি অবহিত করা প্রয়োজন। মোটরসাইকেল কোম্পানি হিসেবে সহায়তা করতে আমরা প্রস্তুত আছি। এছাড়া সিএসআরের আওতায় নারীদের মোটরসাইকেল প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া হেলমেট সরবরাহকারী করে থাকি। সোস্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন রকমের বাইকিং গ্রুপের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় ও নিরাপদ ড্রাইভিংয়ের ব্যাপারে অবহিত করে থাকি।
আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই
টিভিএস মানে হচ্ছে ট্রাস্ট, ভ্যালু অ্যান্ড সার্ভিস। আগামী দিনে আমরা চাই আমাদের দক্ষ কর্মীদল, সুযোগ্য ব্যবস্থাপনা দিয়ে এ তিনটি সেক্টরেই নাম্বার ওয়ান হতে।





