বাংলাদেশে এখনো মোটরসাইকেল ক্রয়ে ঋণ পাওয়া একটি বড় সমস্যা। ভিয়েতনামের একটি ব্যাংকেরই মোটরসাইকেল ঋণ পোর্টফোলিও আড়াইশ কোটি ডলারের, সেখানে বাংলাদেশে বাইকারদের অর্থায়নে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না ব্যাংকগুলো। বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় এমনটাই বলেছেন এসিআই মোটরস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাসনিম মহসিন
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মোটরসাইকেলের বাজার এখনো পরিণত নয়। বাংলাদেশে এ বাজারে সম্ভাবনা কী দেখেন?
বিষয়টিকে সঠিকভাবে বললে, বাংলাদেশে ৯৭ জনে একজনের মোটরসাইকেল রয়েছে। যেখানে ভিয়েতনামে প্রতি চারজনে একটি, ভারতে প্রতি ২০ জনে একটি, পাকিস্তানে প্রতি ১৭ জনে একটি রয়েছে। এ হিসাবে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের ঘনত্ব কম। এর মূল কারণ দাম। অবশ্য মোটরসাইকেলের দাম আগের চেয়ে কমে আসছে। বর্তমানে মোটরসাইকেলের বাজার প্রবৃদ্ধি হচ্ছে প্রতি বছর ২৫ শতাংশে। এ হিসাবে এর বাজার পাঁচ লাখের কিছু বেশি। আশা করছি, ২০২১ সালের মধ্যে এটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। ফলে বাজারটি বেশ সম্ভাবনাময়। এক্ষেত্রে সরকার উৎপাদনে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ শিল্প নিয়ে সরকারের জাতীয় কমিটিও রয়েছে। সরকার খাতটি নিয়ে বেশ কাজ করছে। কারণ এ খাত থেকে সরকার কমপক্ষে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান চায়।
বণিক বার্তা: বাজার বড় হওয়ার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী?
সুব্রত রঞ্জন দাস: মোটরসাইকেল ক্রয়ের জন্য জরুরি হলো অর্থায়ন। মোটরসাইকেল কিনতে গেলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ভিয়েতনামের একটি ব্যাংকের মোটরসাইকেল পোর্টফোলিও আড়াইশ কোটি ডলারের। আমরা বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছি। কিন্তু ব্যাংকগুলো এখনো অর্থায়ন করছে না। তারা বাইকারদের অর্থায়নে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না। মোটরসাইকেল বৃদ্ধির সঙ্গে নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচারণাগুলো বাড়াতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সও একটি ইস্যু। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে জোর দিতে হবে। থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামে ইয়ামাহা বা অন্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে পারে। সরকারের সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। পূর্ণ প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা এটি করছে। আমরাও এ ধরনের ব্যবস্থায় যেতে পারি। আর মানুষের চাহিদার দিকটিতে খেয়াল রাখতে হবে। সিসি লিমিট একটি সমস্যা। এক্ষেত্রে সাড়ে ৩০০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল অনুমোদন করলে আরেকটি ধাপের মোটরসাইকেল বাংলাদেশের বাজারে আসার সুযোগ হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, বেশি সিসি মানে শুধু বেশি গতি নয়। এর সঙ্গে বেশি নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। বেশি সিসির মোটরসাইকেলগুলোয় নিরাপত্তা দিয়ে অনেকগুলো সেফটি ফিচার থাকে, যাতে দুর্ঘটনা আরো কমে আসবে।
সরকার এবারের বাজেটে পরিবেশকদের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছে। একদিক থেকে উৎপাদনে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, অন্যদিকে কর আরোপ করছে। তবে তার পরও সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে, যার কারণে বাজার ২ লাখ থেকে ৫ লাখে চলে এসেছে। অন্য কোনো পণ্যে এ প্রবৃদ্ধি আসেনি, যা মোটরসাইকেলে এসেছে।
বণিক বার্তা: বর্তমানে নারীরাও মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। নারীদের মোটরসাইকেলের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ চাহিদার প্রতিবন্ধক কী দেখছেন?
সুব্রত রঞ্জন দাস: বর্তমানে মধ্যবিত্ত মেয়েদের জন্য গণপরিবহনে চলাচল দায় হয়ে গেছে। গণপরিবহনে তাদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। স্কুটার নিয়ে আমাদের যে বাজার জরিপ রয়েছে, তাতে করপোরেট নারী নির্বাহীদের যদি উৎসাহ দেয়া যায়, তবে তারা মোটরসাইকেল চালাবেন। স্কুটার বিক্রির প্রবৃদ্ধি মোটরসাইকেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তবে সংখ্যার দিক থেকে ধরলে তা এখনো খুবই নগণ্য। আগে যা ৫ হাজার বিক্রি হতো, এখন তা ১০ হাজার হচ্ছে। প্রবৃদ্ধি ১০০ শতাংশ। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে, মেয়েদের কাছে নগদ অর্থ কম। ফলে তারা মূল্য নিয়ে সংবেদনশীল। বর্তমানে স্কুটারে কর ১৫২ শতাংশ। স্কুটারের কর কমানো উচিত। কম গতির হওয়ায় ভারতে স্কুটারের ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগে না। এটি এখানেও বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। অর্থায়ন একটি বড় বিষয় এবং প্রশিক্ষণের বিষয়টিও রয়েছে। এজন্য প্রতি শনিবার আমরা ঢাকা শহরে মেয়েদের জন্য স্কুটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রেখেছি।
বণিক বার্তা: গ্রামীণ জনপদে মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়ছে। এ বাজার মাথায় রেখে ইয়ামাহা কী পরিকল্পনা করছে?
সুব্রত রঞ্জন দাস: ঢাকা আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী বাজার। ঢাকার বাইরেও আমাদের বিক্রির প্রবৃদ্ধি ভালো। আমরা ১২৫ সিসির মোটরসাইকেল নিয়ে আসছি, যা গ্রামীণ জনপদের জন্য মূল্যের দিক থেকে প্রতিযোগিতামূলক হবে। আমাদের বর্তমানে ঢাকার বাইরে ৬০টি আউটলেট রয়েছে। এটি আমরা বাড়াতে চাই।
বণিক বার্তা: ইয়ামাহাকে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বাজারে কোথায় দেখতে চান?
সুব্রত রঞ্জন দাস: বাংলাদেশের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় আমাদের বাজার বাড়াতে চাই। বাংলাদেশে আমরা ১০ শতাংশের কম বাজার ধরে রাখতে চাই না। যখন বাংলাদেশে ১০ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হবে, তখন আমরা এক লাখ বিক্রি করতে চাই। আমাদের প্রস্তুতিটি এ রকম। বাজার প্রবৃদ্ধি আসে ১০০ সিসির মোটরসাইকেল দিয়ে। এক্ষেত্রে এ সেগমেন্টে আমাদের তেমন কোনো মোটরসাইকেল নেই। এর কারণে ৫০ শতাংশ বাজার আমাকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। বাকি ৫০ শতাংশের মধ্যে আমি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ধরে রাখতে চাই। এটাই আমাদের অগ্রাধিকার।
বণিক বার্তা: বিক্রয়-পরবর্তী সেবায় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ইয়ামাহাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
সুব্রত রঞ্জন দাস: এসিআই মোটরস বিক্রয়-পরবর্তী সেবায় সেরা। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে আমরা নিজস্ব একটি সার্ভিস সেন্টার খুলেছি। এখানে ১৮টি বে’র মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা হয়। সেই সঙ্গে ৩০ মিনিটের মধ্যে আপনার সেবা শুরু করা হয়। এখানে কম্পিউটারের মাধ্যমে সমস্যা নির্ণয় করা হয়। সেবা নিয়ে গ্রাহকের মূল্যায়ন নেয়া হয়। আমাদের পরিবেশকদেরও বিক্রয়-পরবর্তী সেবা স্টেশন রয়েছে। সেখানেও কম্পিউটারের মাধ্যমে সমস্যা নির্ণয় করা হয়। এগুলো আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি।





