ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তিতে সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান সম্পর্কে নানা মূল্যায়ন চলছে। বিগত ১০০ বছরে পূর্ব বাংলা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের সব অগ্রযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ জনপদের অধিবাসীদের চেতনাগত পরিবর্তনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের জীবনধারায় প্রত্যক্ষ প্রভাব রাখলেও এ জনপদের সব অধিবাসীদের ওপর পরোক্ষ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবজ্ঞার পাত্রী নারীসমাজকে ‘জেনানা মহলে’র স্বেচ্ছা অথবা আরোপিত নির্বাসন থেকে সভ্যতার আলোয় বের করে আনতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনবদ্য। অবশ্য এ পথ নারীরই রচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দর্শন দিয়েছে অন্তরাত্মাকে জাগ্রত করার আর অনুপ্রেরণা দিয়েছে সামনে এগোনোর।

যে সময় ও পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ ছিল অনেকটা ভাবনারও অতীত। রক্ষণশীল মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলায় সহশিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার প্রচেষ্টা অধিবাসীদের মনে অসন্তোষ জন্ম দিতে পারে। সে ভাবনা ব্রিটিশ সরকারের মনে ছিল। এ রক্ষণশীলতা শুধু যে মুসলিমদের মধ্যে ছিল তা নয়, এটি পুরো ভারতীয় সংস্কৃতিরই অংশ। তত্কালীন সময়ে পুরুষের ভাবনায় নারীর প্রধান কর্তব্য ‘জেনানা মহলে’ অবস্থান করে স্বামীকে খুশি রাখা আর পরিবারের সদস্যদের ইচ্ছানুযায়ী গৃহস্থালির কাজ করা। কলকাতা কমিশন এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের সুপারিশ না করে সেকেন্ডারি পর্যায়ে নারী বিদ্যালয় বৃদ্ধি করে নারীশিক্ষা ১৫-১৬ বছরে উন্নীত করার প্রস্তাব করে। জেনানা মহলের ‘পর্দানসীন’ নারীকে প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করলে জনমত ব্রিটিশদের বিপক্ষে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল ব্রিটিশ সরকারের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত রিপোর্ট প্রণয়নের সময় ‘পর্দানসীন’ নারী, ‘জেনানা’ প্রচলিত মূল্যবোধ ইত্যাদি টার্ম অনেকবার ব্যবহার করেছে। (ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি কমিশন ১৯১৭-১৯, রিপোর্ট, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ৩৬৪-৭৩) এ ধরনের রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় নারীর উচ্চশিক্ষার বিষয়টি কতখানি গ্রহণযোগ্য হবে সেটিই ছিল মূল ভাবনা। ১৯১৭ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের’ পরিচালকদের কনফারেন্সে তত্কালীন ভাইসরয় এক বক্তব্যে বলেন, প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি আমাদের যে সীমাবদ্ধতা দিয়েছে তা মেনেই নারীশিক্ষা উন্নয়নে সামর্থ্যের মধ্য থেকে সবকিছু করব। তবে ক্রমান্বয়ে জনমতের পরিবর্তন ছাড়া কার্যকর কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। এ ধরনের বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থী ভর্তির কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে প্রতিষ্ঠিত ভারতবর্ষের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটেছিল। পূর্ববর্তী তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই নারী শিক্ষার্থী ভর্তির আইন ছিল না। ১৮৭৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনভোকেশন বক্তৃতায় তত্কালীন ভাইস চ্যান্সেলর প্রথম ভর্তিপ্রার্থী নারী চন্দ্রমুখী বসুর আবেদনের কথা উল্লেখ করেন। অনেক ভেবে-চিন্তে সিন্ডিকেট সভা নারী শিক্ষার্থী ভর্তির অনুকূলে সিদ্ধান্ত নেয়। ছেলেদের মতো একই পদ্ধতিতে পরীক্ষা হবে। তবে কোনো নারী পর্যবেক্ষকের তত্ত্বাবধানে আলাদা জায়গায় ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়। ১৮৮২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তীতে প্রথমবারের মতো চন্দ্রমুখী বসু এবং কাদম্বিনী গাঙ্গুলি গ্রাজুয়েট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৮৩ সালের কনভোকেশনে এ ডিগ্রি দেয়া হয়। এদের মধ্যে কাদম্বিনী গাঙ্গুলি বেথুন কলেজের এবং চন্দ্রমুখী বসু ফ্রি চার্চ স্কুলে কিছুদিন তারপর বেথুন কলেজে পড়া লেখা করেন। অর্থাৎ নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রি তারা পান। ভাইস চ্যান্সেলর তার বক্তৃতায় ভারতীয় নারীর প্রতিনিধিত্বকারী এ দুজনের মাধ্যমে ভারতবর্ষের সব নারীকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন। এ ঘটনাকে নারীশিক্ষার অধিকারের স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণনা করে পুরুষ সমাজকে নারীশিক্ষায় উৎসাহিত করার আহ্বান জানান। এ দুজন মহীয়সী নারীর এ ঐতিহাসিক অর্জনের প্রায় চার দশক পর আমরা পূর্ববঙ্গে এ রকম দুজন সাহসী নারীর সন্ধান পাই। এরা সরাসরি ছেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেয়ার সুযোগ পান।

১৮৮৩ সালে প্রকাশিত হান্টার কমিশনের রিপোর্টে বাংলার নারীশিক্ষা বিষয়ে একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। এ তথ্যানুসারে বাংলায় ৩৫ মিলিয়ন নারীর মধ্যে মাত্র ৪১ হাজার নারী স্কুলে যায়। হান্টার কমিশন শিক্ষাবিষয়ক ১৭টি স্মৃতিকথা সংগ্রহ করেছিল। এর মধ্যে আটটি ছিল নারীশিক্ষা-বিষয়ক, যার সবক’টিই পূর্ব বাংলার বরিশাল, ফরিদপুর, যশোর, ঢাকা, বিক্রমপুর ও সিলেট থেকে প্রাপ্ত। এ তথ্য পূর্ব বাংলার শিক্ষামনস্ক নারীসমাজের সন্ধান দেয়। কাজেই উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণযোগ্য নারী পূর্ব বাংলায় ছিল না সে কথা ঠিন নয়। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীশিক্ষার অনুকূলে ছিল না।

নয় বছরের ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংগ্রাম শেষে ১ জুলাই ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করে। বেথুন কলেজের স্নাতক লীলা নাগ (পরবর্তীকালে রায়) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করেন। সঙ্গে যুক্ত হন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ নরেশ সেনগুপ্তের মেয়ে সুষমা সেনগুপ্ত। কিন্তু এখানে নারী শিক্ষার্থী ভর্তির কোনো আইন ছিল না। হিন্দু ও মুসলিম জাতির জন্য হলের ব্যবস্থা হয়েছিল, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী জাতির হলের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তবে তারা হাল ছাড়ার পাত্রী নন। দেনদরবার শুরু করেন। এদের ঘটনা চন্দ্রমুখী বসু ও কাদম্বিনী গাঙ্গুলির ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এদের অনমনীয় মনোভাবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিথিল করে তত্কালীন উপাচার্য পিজে হার্টগ তাদের ভর্তির ব্যবস্থা করেন। মেয়েদের হল না থাকায় হল সংযুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে ছেলেদের হলেই তাদের সংযুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৫৬ সালে রোকেয়া হল প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত এ ব্যবস্থাই কার্যকর ছিল। এভাবেই ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ে নারীর উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়। এক্ষেত্রে নারীকে সংগ্রাম করেই তা আদায় করতে হয়েছে। সমাজের পুরুষতন্ত্র নারীকে মুক্তির আলোয় সঙ্গী হতে কখনই স্বাগত জানায়নি। নারীকে সংগ্রাম করতে হয়েছে নিজের সঙ্গে, পরিবারের আপনজনের সঙ্গে তথা সমাজের প্রচলিত তথাকথিত জনমতের সঙ্গে। কাকতালীয় হলেও একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর বর প্রথমবারের মতো দুজন নারী শিক্ষার্থীকে স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম থেকেই নারী শিক্ষার্থী পেয়ে যায়। যদিও এটি তাদের অর্জন করে নিতে হয়েছিল। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেটি নাকচ করেনি। চন্দ্রমুখী বসু ১৮৭৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করলেও সম্ভবত নারী শিক্ষার্থী ভর্তিবিষয়ক সিদ্ধান্ত নিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক বছর লেগে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেটি তাত্ক্ষণিক করে।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

‘জেনানা মহল’ থেকে রাজপথ, ডাকসু থেকে সংসদ সব ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ের প্রাক্তনীদের উজ্জ্বল উপস্থিতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের জয়যাত্রাকে সাফল্যমণ্ডিত করেছে, করেছে অংশগ্রহণমূলক। অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা কার্যক্রমে আড়ষ্ট নারী শিক্ষার্থীরা একসময় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ করেন। মেয়েদের হলে ১৯৫৭ সালে প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয়। এ নাটকের পুরুষ চরিত্রে মেয়েরাই অংশগ্রহণ করে। তবে পর্দার অন্তরালে থেকে পুরুষ কণ্ঠ প্রদান করা হয়। পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক নারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নেতৃত্বের ভূমিকায় এগিয়ে আসেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনে পাকিস্তান সরকারের প্রতিবন্ধকতা ও রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরবর্তীকালে ছায়ানট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সনিজদা খাতুন। পরে ১৯৬৪ সালে তিনি রমনার বটমূলে বাংলা বর্ষবরণের আয়োজন করেন, যা জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম মঞ্চে পরিণত হয়। বাংলা বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পাকিস্তান সরকারের ক্ষমতার ভিত নড়বড়ে করে দেয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে আজ সর্বত্র নারীর গর্বিত উপস্থিতি। সংগ্রামে-সমরে জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে আজ সর্বত্রই আমাদের নারীরা যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন। গৃহস্থালি থেকে রাজনীতি, শিক্ষা থেকে প্রশাসন, কৃষি থেকে গবেষণাগার, লোকোশেড থেকে ককপিট সর্বত্রই আজ নারীর দৃপ্ত পদচারণে উদ্ভাসিত।

মাত্র ১০০ বছর আগে ‘জেনানা মহলে’র চার দেয়ালে বন্দি নারীরা প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত আলোয় নিজেকে চিনতে পারে। তারপর সেই আলোয় আলোকিত হয়ে মধ্যযুগীয় ঘুণে ধরা সমাজের অন্ধকার গলিতে আলোক প্রক্ষেপণ করে সব মূঢ়তা দূর করতে এগিয়ে যায়। আর আলোকের এ অভিযাত্রা অনুসরণ করে বঙ্গের অন্য সব নারী। শতবর্ষ আগে যে বিদ্যামন্দিরে পূজারিরূপে আগমনের সুযোগই রাখা হয়নি, যার জন্য সেইজন আজ বিদ্যার দেবীরূপে জ্ঞানের আলো দান করে চলে প্রসন্নচিত্তে। শতবর্ষ আগে নারী শিক্ষার্থীদের কুণ্ঠিত পথচলা আজকের নারীকে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর অবারিত সম্ভাবনার মহাসড়কের সন্ধান দিয়েছে। আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীর পথ আরো প্রসারিত। জাতির চেতনার বাতিঘর ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ের শতবর্ষের পথচলায় অনেক অর্জনের মধ্যে এ এক অনন্য অর্জন। কেননা এ অর্জন তো জাতির অর্ধেক মানবসম্পদের লুপ্ত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। সম্মিলিত পথচলায় অর্জিত হয়েছে রাজনৈতিক স্বাধীনতার। দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে, সাম্য ও সমতার পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে।

লীলা রায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে নাথান কমিশনের রিপোর্টে পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম মুসলিম নারী শিক্ষার্থী পেতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯২১ সালে ফজিলতুননেসা ঢাকা বোর্ডে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম হয়ে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯২৩ সালে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। কিন্তু সামাজিক ভ্রূকুটির ভয়ে তার পিতা মেধাবী এ কন্যাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না দিয়ে কলকাতায় বেথুন কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। অবশেষে ১৯২৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ শ্রেণীতে ভর্তি হন।

ফজিলতুননেসা

এরও প্রায় ১০ বছর পর দ্বিতীয় মুসলিম নারী শিক্ষার্থী খোদেজা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ফজিলতুননেসা পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষায় বিলেত গমন করেছিলে। যদিও নানা কারণে তাকে উচ্চশিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল। তিনি প্রথম মুসলিম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে বেথুন কলেজের ছাত্রী, শিক্ষক ও ভাইস প্রিন্সিপালের পদে আসীন হয়েছিলেন। দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে পূর্ব বাংলায় ফিরে এলেও তার জীবন সংগ্রাম আরো কঠিন হয়ে পড়ে। ইডেন কলেজের ছাত্রীদের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে তিনি পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়েন। তিনি পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস না করে ইডেন কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম নারী শিক্ষার্থী ফজিলতুননেসা নারীসমাজ তথা বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে রয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকে নারী শিক্ষার্থীদের শ্রেণীশিক্ষা কার্যক্রম খুব বেশি অংশগ্রহণমূলক ছিল না। বুদ্ধদেব বসুর মতে, ‘ক্লাসে তাঁদের জন্য বসার ব্যবস্থা আলাদা, আমাদের বেঞ্চিগুলো থেকে দূরে বসানো চেয়ারে: সেখানে তাঁরা চক্ষু নত রাখেন পুথির উপর, কোন প্রশ্ন করেন না অধ্যাপককে, পাঠ্য বিষয়ে হাসির কথা থাকলেও তাঁদের গাম্ভীর্যে টোল পড়ে না। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরে প্রকাশ্যে ছাত্রীকণ্ঠ শুনেছিলাম একবার মাত্র।’ বুদ্ধদেব বসুর এ বর্ণনায় সাহিত্যের অলংকরণ থাকলেও বাস্তবতা ছিল তেমনি। প্রক্টরের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্যে নারী সহপাঠীদের সঙ্গে আলাপ করা বারণ ছিল সে সময়। একসময় নাট্যাভিনয়ে নারী চরিত্রে ছেলেরাই অংশগ্রহণ করত।

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের পরিকল্পিত অংশগ্রহণ দেখেছি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। সরকার ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভাঙার কাজে নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অনেক নারী শিক্ষার্থী সেদিন রাজপথের আন্দোলনে আহতও হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির এ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন সাফিয়া খাতুন, সুফিয়া ইব্রাহিম, রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন নাহারসহ আরো অনেকে। পরবর্তীকালে সুফিয়া আহমেদ নারীদের মধ্যে প্রথম জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি একুশে পদকসহ বিভিন্ন পদকে ভূষিত হয়েছিলেন।

অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা খুব একটা আলোচিত হয়নি। তবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর রাজপথে নারীর অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। এ অংশগ্রহণের স্রোত মফস্বল শহরেও সম্প্রসারিত হয়। বায়ান্নর পর রাজপথে আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। এ আন্দোলনের সম্প্রসারিত ঢেউ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি শাসনের বাস্তিল দুর্গকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি সাংগঠনিক নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (প্রথম নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ) নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা শিক্ষার্থীদের জন্য গণতান্ত্রিক রীতিনীতি চর্চার এটি একটি প্রাথমিক পর্ব। ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুতে প্রথম নারী ভিপি নির্বাচিত হন জাহানারা বেগম। এরপর ১৯৬৭-৬৮ সালে মাহফুজা খানম ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা এ শিক্ষাবিদ শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সমতা বিধান এবং অর্থনৈকিভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অদ্যাবধি কাজ করে চলেছেন। তার খেলাঘর আন্দোলন অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নতুন প্রজন্ম গড়তে অনবদ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। ১৯৬৩-৬৪ সালে মতিয়া চৌধুরী ডাকসুর জিএস নির্বাচিত হন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী সক্ষম নারী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অগ্নিকন্যা খ্যাত মতিয়া চৌধুরী বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামের এক অগ্রণী সৈনিক। তিনি বাংলাদেশের সব অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন সর্বদা। এ কারণে তাকে অনেকবার পুলিশি নির্যাতন, জেল-জুলুম ভোগ করতে হয়েছে। সৎ আদর্শ নির্ভীক এ রাজনীতিক বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রীদের জন্যও অনুকরণীয়।

অধ্যাপক মাহফুজা খানম

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের বর্তমান চিত্র তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য অনুকরণীয়। বাংলাদেশকে এ অবস্থানে পৌঁছতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ও মানবিক সমতার নীতি নারীর মনোবল সুদৃঢ় করেছে। বাংলাদেশের সর্বস্তরে নারীর গর্বিত প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এ প্রতিনিধিত্বের ব্যাপ্তি শেকড় থেকে শিখর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাথমিক শিক্ষায় যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রীরা গভীর মমতায় প্রজন্ম বিনির্মাণে ভূমিকা রাখছে, তেমনি রয়েছেন ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতেও। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন। তিনি ইডেন কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ প্রাক্তনী চারবার বাংলাদেশ সরকারে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। অন্যদিকে তিনি চার দশক ধরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। বর্তমানে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণের যে চিত্র আমরা দেখছি তাতে শেখ হাসিনার অবদান অনন্য। বর্তমান পার্লামেন্টে স্পিকারের দায়িত্ব পালনকারী শিরীন শারমিন চৌধুরীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী।

 

মো. আবদুর রহিম

সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়