‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট’ প্রত্যাশিত সময়ের অন্তত সাত বছর পর পাস হলো। ১৯২০ সালে ইন্ডিয়ান লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে পাস হওয়া অষ্টাদশ আইনটি হচ্ছে ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট।’ ২৩ মার্চ ১৯২০ গভর্নর জেনারেল এ আইনে তার সম্মতির স্বাক্ষর প্রদান করেন।

১৯২০ সালের অষ্টাদশ আইনের আওতায় সে সময় যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অন্তত সমমান বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে তার তালিকাটি দেখা আবশ্যক:

বিদেশী: এবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়, বেলফাস্ট (কুইনস) বিশ্ববিদ্যালয়, বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়, লিডস বিশ্ববিদ্যালয়, মানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ড জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়, অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয় ও ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়।

ভারতীয়: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষেৗ বিশ্ববিদ্যালয়, মহিশুর বিশ্ববিদ্যালয়, রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দরাবাদ ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়, আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয়, অন্নমালয় বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

মহাদেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কখনো হাজারের পেছনে, কখনো হাজারের বিছুটা নিচে। একালে অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, অজস্র প্রতিকূলতার মধ্যেও পূর্ববাংলার এ বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা ছিল শুভ এবং বেশ আলোড়ন সৃষ্টিকারী।

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থাকতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কী দরকার—এ প্রশ্নকে এড়িয়ে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’—এ খ্যাতি সত্যি সত্যিই ছড়াতে শুরু করেছিল। যখন ডক্টর ফিলিপ জোসেফ হার্টগকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আশুতোষ মুখার্জি। ১৯০৬-১৯১৪ এবং ১৯২১-১৯২৩ দুদফায় তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

তখন ঢাকায় আবার বিশ্ববিদ্যালয় কেন—এ প্রশ্নের মতোই তির্যক জিজ্ঞাসা ছিল ভারতবর্ষে কি যোগ্য লোকের অভাব হয়েছে যে বিলেতি ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিতে হবে?

গুরুদাস ব্যানার্জি, নীলরতন সরকার ও আশুতোষ মুখার্জিকে দিয়ে যদি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চালানো যায়, ঢাকার জন্য বিলেতি সাহেব কেন?

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা বিলেতি ভাইস চ্যান্সেলর জেমস উইলিয়াম কোলভিনের হাতে ১৮৫৭ সালে। তখন থেকে টানা ৩০ বছর বিলেতি অধ্যাপকরাই ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। মাঝখানে দুই বছর গুরুদাস ব্যানার্জির দায়িত্বকাল (১৮৮৭-১৮৮৯) বাদ দিলে পরবর্তী ১৪ বছর আবার বিলেতি অধ্যাপকদের হাতে। ১৯০৪ থেকে ১৯০৬ আশুতোষ মুখার্জির প্রথম দফা দায়িত্ব পালনের পর পরবর্তী ১২ বছর আবার বিলেতি অধ্যাপক।

তখনকার বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় বিলেতি অধ্যাপকদের বেতন-ভাতা নিয়ে তির্যক মন্তব্য করা হয়েছে। ভাইস চ্যান্সেলরের বেতন ও ভাতার অংক শুনে কলকাতার অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী এবং এমনকি ঢাকার রাজনীতিবিদদেরও চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়। কেবল লাইব্রেরিয়ানের উদাহরণ টানছি: যেখানে ‘১৫০ টাকা দিয়ে শুরু, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ১০ টাকা—শেষ বেতন ২০০ টাকা’—এ বেতনস্কেলে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ করেছে, মাসে ১ হাজার ৭৫০ টাকা বেতন দিয়ে বিলেতি লাইব্রেরিয়ান নিয়োগের ধৃষ্টতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখাচ্ছে কেন?

বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর বাংলার মুসলমানদের মধ্যে যে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠছিল তা প্রশমনের লক্ষ্যে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ পূর্ববঙ্গে একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।

৪ এপ্রিল ১৯১২ ব্রিটিশ সরকারের সেক্রেটারি অব স্টেট সম্মতি জানালে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা দাখিল করার জন্য ২৭ মে ১৯১২ ব্যারিস্টার আর ন্যাথানেইলের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৩ সদস্যের ন্যাথান কমিশন।

ন্যাথান কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেন: ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন জি ডব্লিউ কিচলার, কলিকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ডক্টর রাসবিহারী ঘোষ, নওয়াব সৈয়দ আলী চৌধুরী, নওয়াব সিরাজুল ইসলাম, জমিদার ও আইনজীবী আনন্দ চন্দ্র রায়, আলীগড়ের মোহাম্মদ আলী, কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপাল এইচ আর জেমস, ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল ডব্লিউ এটি আর্চিবোল্ড, কলিকাতা সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল সতিশ চন্দ্র আচার্যি, ঢাকা জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজের প্রিন্সিপাল ললিত মোহন চ্যাটার্জি, প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রফেসর সি ডব্লিউ পিক এবং ঢাকা মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট শামসুল ওলামা আবু নসর মুহাম্মদ ওয়াহিদ। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্য ডিএস ফ্রেজার কমিশনের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

ন্যাথান কমিশনের সদস্যরা

২৫টি সাব-কমিটির মাধ্যমে সুপারিশমালা প্রণয়ন করে ১৯১২ সালের ডিসেম্বরে কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে।

কমিশনের সুপারিশ সারসংক্ষেপ:

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে একটি রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। পরিচালনার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের হাতে থাকবে। ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সব কলেজ ও বিভাগ পরিদর্শনের ক্ষমতা রাখবেন। ২. বিশ্ববিদ্যালয় হবে ‘ইউনিটারি টিচিং অ্যান্ড রেসিডেন্সিয়াল ইউনিভার্সিটি’। কলেজগুলো হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি ইউনিট। ৩. বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থাকবে এবং একজন ইউরোপীয় অধ্যাপক এ বিভাগটির ব্যবস্থাপনা ও সংগঠনের দায়িত্ব পালন করবেন। ৪. বর্তমান ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল স্কুলের মর্যাদা কলেজে উন্নীত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটো বিভাগের পরিণত করা হবে। ৫. ইডেন গার্লস স্কুলকে কলেজে উন্নীত করা হবে। ৬. ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত হবে। ৭. আইন বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হবে, কিন্তু পরীক্ষা পরিচালনা করবে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য কমিশন ঢাকার রমনায় ৪৫০ একর জমিও শনাক্ত করে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কায়েমি স্বার্থবাদী মহল শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে থাকে। ন্যাথান কমিশনের সুপারিশ ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের যন্ত্রণাকেই আবার উসকে দেয়। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, এর সঙ্গে বঙ্গভঙ্গের আর তফাত রইল কোথায়? বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক চালে সময় গড়িয়ে যায়। শুরু হয় প্রথম মহাযুদ্ধ।

মহাযুদ্ধের জন্য সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশীয় উন্নয়নে কৃচ্ছ  ও ঋণাত্মক প্রচারণা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে আরো পিছিয়ে দেয়। মহাযুদ্ধকালীন ৭ মার্চ ১৯১৭ নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিল আনয়নের প্রস্তাব উত্থাপনের পর বিষয়টি আবার উজ্জীবিত হয়।

ফিলিপ হার্টগ

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেজিস্ট্রার ফিলিপ হার্টগকে ১৯২১ সালের জুলাইয়ের ক’মাস আগেই ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে ৪ হাজার টাকা বেতনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে যোগ দিতে হয়। শুরুর দিকের কাজগুলো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিধিবিধান প্রণয়ন, শিক্ষক নিয়োগ আগেভাগে না করলে জুলাইয়ের প্রথম দিন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু করা সম্ভব হতো না।

ফিলিপ জোসেফ হার্টগের জন্ম ১৮৬৪ সালের ২ মার্চ, লন্ডনে। তার বাবা আলফোঁস হার্টগ নেদারল্যান্ডসের ইহুদি পরিবারের সন্তান। তিনি বসতি স্থাপন করেন প্যারিসে। লন্ডনে আসেন ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ টিচার হিসেবে। জোসেফের পড়াশোনা লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুলে, আর ম্যানচেস্টার ওয়েনস কলেজে। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে বিএসসি, লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে আরো একটি বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করলেন। ফ্রান্স ও জার্মানিতে ক’বছর গবেষণার কাজ করে ওয়েলস কলেজ এবং ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে কিছুকাল শিক্ষকতা করে ১৯০৩ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগ দিলেন। তিনি ১৭ বছর এ দায়িত্ব পালন করেন।

এর মধ্যে ১৯১৭ সালে মাইকেল স্যাডলারের নেতৃত্বে গঠিত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে ১৯২৫ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ভারতীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য নিযুক্ত হন। আর ১৯২৮-২৯-এ ভারতীয় শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান। তিনি ভারতীয় স্ট্যাচুটরি কমিশন অন কনস্টিটিউশনাল অ্যাডভান্স ইন ইন্ডিয়ার পক্ষে অনুসন্ধানমূলক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩০ সালে ব্রিটেন তাকে নাইটহুড প্রদান করে। ১৭ জুন ১৯৪৭ তার মৃত্যু হয়। তিনি রসায়ন শাস্ত্রের শিক্ষার্থী ছিলেন, কিন্তু গ্রন্থ রচনা করেছেন সংস্কৃতির সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাস নিয়ে ‘কালচার : ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড মিনিং’। শিক্ষা ও পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়ে তার আরো দুটি বই রয়েছে। উপমহাদেশীয় ভাষা হিন্দি, উর্দু ও বাংলা তিনি রপ্ত করেছিলেন। ইউরোপীয় ভাষা জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজিতেও তিনি দক্ষ ছিলেন। পরবর্তীকালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন: ‘স্যার ফিলিপ হার্টগ অতি যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। প্রথমাবধিই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য যথেষ্ট চিন্তা ও পরিশ্রম করতেন। তিনি যেসব নিয়মকানুন প্রবর্তন করেছিলেন, পরবর্তীকালে তারই ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক রকম উন্নতি সম্ভবপর হয়েছিল। সাধারণত এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব দোষ-ত্রুটি দেখা যায়, তার অনেকগুলো যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেনি, তার জন্য হার্টগের যথেষ্ট কৃতিত্ব আছে।’

হার্টগ সাহেবের সময় রাজনৈতিক দলদাস চাটুকার সৃষ্টি হয়নি। কাজেই তিনি স্বাধীনভাবে শিক্ষক নিয়োগ করতে পেরেছেন। একালে সম্ভব নয়, কারণ ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ারও এটিই প্রধান যোগ্যতা দলদাসত্ব। অন্যসব যোগ্যতায় অনুত্তীর্ণ হলেও তেমন কিছু এসে যায় না, যদি দাসত্ব সূচকে তিনি এগিয়ে থাকেন বলেই অন্যদের নকআউট করতে পারেন। হার্টগ সাহেব যোগদান করেই ক’জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ করলেন। ১৯২১ সালের মে মাসে তাদের সবাইকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি তাদের নিয়ে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, শিক্ষক নিয়োগবিধি, পরীক্ষাপদ্ধতি, শিক্ষকদের বিদায় ও অবসর, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করলেন। সে সভায় কলকাতা থেকে রমেশচন্দ্র মজুমদারও এসেছিলেন। মেধাবী ও পরিশ্রমী ফিলিপ হার্টগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সম্মানজনক উচ্চতায় তুলতে পেরেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা ১ জুলাই ১৯২১ তিনটি ফ্যাকাল্টি ১২টি বিভাগ ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৪৭ জন ছাত্র নিয়ে। শুরু থেকেই তিনটি আবাসিক হল।

জর্জ হ্যারি ল্যাঙ্গলি

জর্জ হ্যারি ল্যাঙ্গলি দর্শনের ছাত্র, ১৯১৩ সালে ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসে যোগ দেন। ল্যাঙ্গলি প্রেসিডেন্সি কলেজ ও ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেন। শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন অধ্যাপনার দায়িত্ব নেন। ১৯২১ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা হলের প্রভোস্ট ছিলেন। প্রফেসর ল্যাঙ্গলি ১ জানুয়ারি ১৯২৬ থেকে ৩০ জুন ১৯৩৪—সাড়ে আট বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন।

ওয়াল্টার অ্যালেন জেঙ্কিন্স ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিএসসি এবং ক্যামব্রিজের এলএলডি ওয়াল্টার জেঙ্কিন্স ১৯১৬ সালে ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসে যোগ দেন। ঢাকা কলেজের পদার্থবিদ্যায় অধ্যাপক জেঙ্কিন্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন ১৯২১ সালে। তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং ঢাকা হলের প্রভোস্ট ছিলেন। ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব গ্রহণের আগে চার বছর নর্থ স্ট্র্যাটফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটি কলেজের রেজিস্ট্রার ছিলেন। তিনিও ভালো বাংলা জানতেন।

এ নিবন্ধে বিলেতি শিক্ষকদের নিয়ে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল ও পরে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, তার কিছু উপস্থাপন করা হয়েছে। সে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ও মুসলমান শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধাসংক্রান্ত কয়েকটি প্রশ্নোত্তরও তুলে ধরা হলো। উল্লেখ্য, সে সময় সংসদীয় সব কার্যক্রমে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হতো। প্রশ্নোত্তরগুলো অনূদিত।

১৯২১-৩৬ সময়কালে শিক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন গভর্নরের নির্বাহী কাউন্সিলের চারজন সদস্যের একজন। কখনো একজন মন্ত্রীও এ দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রভাস চন্দ্র মিত্র (পিসি মিত্র) প্রথমে মন্ত্রী ও পরে নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য হন।

১৯৩৭-৪৭ শিক্ষার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন একজন পূর্ণমন্ত্রী একটি উল্লেখযোগ্য সময় শিক্ষামন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন একই ব্যক্তি।

এ নিবন্ধে ১৯২১ থেকে ১৯৩৯ সময়কালের কিছু প্রশ্নোত্তর উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা তত্কালীন সামাজিক, মানসিক ও রাজনৈতিক অবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরবে। উল্লেখ্য, সংসদীয় ভাষা ছিল ইংরেজি। প্রশ্নোত্তরগুলো নিবন্ধকার কর্তৃক অনূদিত।

টার্নার সাহেব কেন লাইব্রেরিয়ান পদে?

২৯ আগস্ট ১৯২১ সুরেন্দ্রনাথ মল্লিক শিক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে বললেন: ক. মাননীয় মন্ত্রী জানাবেন কি মিস্টার টার্নারকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে কিনা? খ. যদি হয়ে থাকে, তাহলে কোন যোগ্যতায় তাকে লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে? গ. তার কি ভারতবর্ষে কিংবা ইউরোপে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কোনো অভিজ্ঞতা রয়েছে? ঘ. লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছিল কি? ঙ. যদি বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে ক’টি আবেদন জমা পড়েছে? চ. যারা আবেদন করেছেন, তাদের নাম ও যোগ্যতার একটি স্টেটমেন্ট দাখিল করবেন কি?

মন্ত্রী পিসি মিত্রের জবাব— ক. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিধিবদ্ধ নিজস্ব ক্ষমতাবলে মিস্টার টার্নারকে লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগ দিয়েছে। খ-গ. ঢাকা ও চট্টগ্রাম কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালনকালে লাইব্রেরি ব্যবস্থাপনা ও সংগঠন নিয়ে তিনি ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতার অধিকারী হন। এ পদে যোগদানের লক্ষ্যে তিনি ইংল্যান্ডে সাড়ে তিন মাস পাঠাগার বিজ্ঞানের ওপর পড়াশোনা করেছেন এবং অনেক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেছেন।

ঘ. এ পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯২১-এর ৫০ (বি) ধারার ক্ষমতাবলে চ্যান্সেলর হিসেবে বাংলার গভর্নরের অনুমোদন নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলর তাকে নিয়োগ প্রদান করেছেন।

ঙ-চ. ওপরের জবাবের পর প্রশ্ন দুটি অবান্তর।

স্মিথ সাহেব যোগ দিলেন না

৩০ আগস্ট ১৯২১ কিশোরীমোহন চৌধুরী শিক্ষামন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন:

ক. এটা কি সত্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে কোনো প্রফেসর কর্মরত নেই? একজন রিডার বর্তমানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন আর কেবল লেকচারাররা ইংরেজির ক্লাস করাচ্ছেন?

খ. যদি প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ-বোধক’ হয়ে থাকে, তাহলে মাননীয় মন্ত্রী এর কারণ জানাবেন কি?

শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী পিসি মিত্রের জবাব—

ক. বর্তমানে একজন রিডার ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে সহযোগিতা করছেন দুজন অবৈতনিক রিডার, উভয়েই ঢাকা কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন প্রফেসর। ইংরেজি বিভাগে সাতজন লেকচারার রয়েছেন, যাদের মধ্যে ছয়জনই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কোনো না কোনো কলেজের প্রফেসর ছিলেন।

খ. ঢাকা কলেজের সাবেক প্রফেসর মিস্টার এভারটন স্মিথকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত কারণে তিনি যোগদান করেননি। এদিকে প্রাদেশিক ব্যয় সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে অন্যান্য বিভাগের মতো ইংরেজি বিভাগও চাকরি সংকোচন নীতি অনুসরণ করছে।

কতজন শিক্ষার্থী নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়

৩১ আগস্ট ১৯২১ কিশোরীমোহন চৌধুরী শিক্ষামন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন—

ক. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে?

খ. এর মধ্যে ক’জন কলা বিভাগে, ক’জন বিজ্ঞান বিভাগে? আর ক’জন স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে?

মন্ত্রী পিসি মিত্র বললেন—

ক. ২৪ আগস্ট ১৯২১ পর্যন্ত ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৩৪।

খ. এর মধ্যে কলা বিভাগে ৪৬৮ ও বিজ্ঞান বিভাগে ১২৩ জন। স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ভর্তির হিসাব সরকারের হাতে নেই।

৫ সেপ্টেম্বর ১৯২১ সুরেন্দ্রনাথ মল্লিকের একাধিক প্রশ্নের জন্য শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২৪ আগস্ট ১৯২১ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মোট ১০ হাজার টাকার বৃত্তি ও স্টাইপেন্ড দেয়া হয়েছে। এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় বাজেট বরাদ্দের মধ্যেই সীমিত থাকবে এবং কোনো ঘাটতির আশঙ্কা নেই।

ল্যাঙ্গলি ও টার্নার সাহেবের বেতন কত?

১৭ জানুয়ারি ১৯২২। বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা ১ জুলাই ১৯২১। দিনাজপুরের সদস্য মৌলভি ইয়াকুইনউদ্দিন আহমেদ শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত। জিজ্ঞেস করলেন—

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ, বিএসসি ও এমএ ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত? মি. ল্যাঙ্গলি (জি এইচ ল্যাঙ্গলি) ক’জন অনার্স শিক্ষার্থীকে পড়ান? লাইব্রেরিয়ান মি. টার্নারের মাসিক বেতন কত?

এ পদে কম বেতনে কোনো ভারতীয়কে কি নিয়োগ দেয়া যেত না? কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ানের বেতন কত? তার যোগ্যতা কী?

মাননীয় সদস্য পিসি মিত্রের জবাব—

বিএ অনার্স ক্লাসে ১৯৩ জন, বিএসসি অনার্স ক্লাসে ৫৬ জন, এমএ ক্লাসে ১১৭ জন, পাঁচজন ইংরেজির অবৈতনিক লেকচারারের দায়িত্ব পালনসহ মি. ল্যাঙ্গলি ঢাকা হলের প্রভোস্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান। তার বেতন ১ হাজার ৭৫০ টাকা। উল্লেখ করা দরকার তিনি ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে যে বেতন পেতেন, এখন তার চেয়ে ১৫০ টাকা কম পাচ্ছেন। তাকে প্রিন্সিপাল হিসেবে কোথাও বদলি করা হলে তিনি ১ হাজার ৯০০ টাকা পাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে তিনি সম্মিলিতভাবে যেসব দায়িত্ব পালন করছেন তা সম্পাদন করার জন্য কম বেতনে কোনো যোগ্য ভারতীয় প্রার্থী পাওয়া যায়নি।

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ানের বেতন স্কেল ১৫০-১০-২০০ টাকা। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইম্পেরিয়াল গ্রান্ট

রায় রাধাচরণ পাল বাহাদুর ২০ জানুয়ারি ১৯২২ শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় সদস্যকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজকীয় অনুদান প্রাপ্তি-সংক্রান্ত কয়েকটি প্রশ্ন করলেন—

এটা কি সত্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে ভারত সরকার ৬০ লাখ টাকার ইম্পেরিয়াল গ্রান্ট-রাজকীয় অনুদান প্রদান করেছে? এটা কি সত্য অনুদানের অর্থ বাংলার প্রাপ্য অর্থের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে? ইম্পেরিয়াল গ্রান্ট থেকে তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কত পেয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের কাছ থেকে এ অনুদানের বাকি কত টাকা দাবি করতে পারে?

চলতি বছরের বাজেটে আবর্তক, অনাবর্তক, স্থাপনা নির্মাণ বাবদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কত টাকার অনুদান প্রদান করা হয়েছে?

জবাব: ৩১ মার্চ ১৯২১ প্রদত্ত অনুদানের জের ছিল ৫১,৩৬,০০০ টাকা।

উত্থাপিত বিষয়টি সত্য। সব অনুদান একীভূত হয়।

১৯২০-২১ অর্থবছরে ইম্পেরিয়াল গ্রান্ট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ২২,৬৯,০০০ টাকা। অনুদানে পৃথকভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা নেই। প্রাপ্ত সব অর্থই প্রাদেশিক সরকারের সম্পদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাকি কোনো অর্থ সরকারের কাছে দাবি করতে পারবে না। তবে এখনো অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ৫১,৩৬,০০০ টাকা।

শিক্ষা বাজেটে আবর্তক ৫,০০,০০০, অনাবর্তক ৪,০০,০০০। স্থাপনা নির্মাণে ৬,০২,৭০০ টাকার কাজ চলছে গণপূর্তের বাজেটে নতুন কাজের জন্য রয়েছে ৫১,৬০৭ টাকা। মোট ১৫,৫৪,৩০৭ টাকা।

ড. হল্টের নিয়োগের দায় কার?

বাবু কিশোরী মোহন চৌধুরী শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যকে জিজ্ঞেস করলেন—

ক) ১. এটা কি সত্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ডক্টর হল্টের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে? ২. এটা কি সত্য, তাকে দু’বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল এবং তাকে মোট ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে পদত্যাগ করানো হয়েছে? ৩. তার পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট কত টাকা খরচ হয়েছে?

৪ এ সময় তিনি কী কী কাজ করেছেন?

তার কাজের ধরন কী? ক) সপ্তাহে তিনি ক’ঘণ্টা কাজ করেছেন? খ) এটা কি সত্য মাননীয় মন্ত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো জিমন্যাশিয়াম নেই বা তা নির্মাণের প্রয়োজনীয় তহবিল নেই। ফলে ডক্টর হল্টেরও কোনো কাজ নেই? গ. মন্ত্রী কি দয়া করে বলবেন, তাকে নিয়োগ প্রদানের দায়িত্ব কে নেবে?

মাননীয় সদস্য সুভাষ চন্দ্র মিত্রের জবাব

ক) ১. সত্য; ২. দুবছরের চুক্তিতে তাকে নিয়োগ করা হয়েছিল। উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতেই চুক্তি রহিত করা হয়েছে। তাকে মোট ৮,১৯৫ টাকা ১৩ আনা ৪ পয়সা এবং ২২৮ পাউন্ড স্টার্লিং প্রদান করা হচ্ছে; ৩. ১৬,৪৭৫ টাকা ১০ আনা ৮ পয়সা এবং ২২৮ পাউন্ড স্টার্লিং; ৪-৬. শিক্ষকদের ফিজিক্যাল ট্রেনিং দেয়ার জন্য ড. হল্ট এনাটমি ও ফিজিওলজি ল্যাবরেটরি স্থাপনের স্কিম দাখিল করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে আর্থিক অবস্থায় এ স্কিম বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেয় পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তার চুক্তি বাতিল করা হবে। তার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে না দেখে তার কাজের বিশদ বিররণ ও কর্মঘণ্টার হিসাব নেয়া হয়নি। খ) একটি যথাযথ সজ্জিত জিমন্যাশিয়ামই তাকে দেয়া হয়েছে—তবে এটাও সত্য, ফিজিক্যাল এডুকেশনের একটা বড় অংশ জিমন্যাশিয়াম ছাড়াই বাস্তবায়ন করা যায়—তার হাতে যে সম্পদ ছিল তাতে ড. হল্টের করার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। গ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা সরকার ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্টের ৫০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিয়োগ প্রদান করেছে।

ওয়াল্টার অ্যালেন জেঙ্কিন্স

জেঙ্কিন্স সাহেব কত বেতন পান?

১৫ আগস্ট ১৯২৩।

কলকাতা আগে থেকে নির্বাচিত সদস্য ডাক্তার প্রথমনাথ ব্যানার্জির প্রশ্ন : মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কি জানেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অনেক শিক্ষককে নোটিস দিয়ে বলা হয়েছে যে তাদের আর প্রয়োজন নেই?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যারা আইইএস, ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসের সদস্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত তাদের ছাড়া যাবে না?

প্রফেসর জেঙ্কিন্সকে প্রতি মাসে আরো ২০০ টাকা বাড়িয়ে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে?

তার মানে ভাতা ও পেনশন কন্ট্রিবিউশনসহ প্রফেসর জেঙ্কিন্সের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মাসে ১৬৫০ টাকা খরচ করবে?

আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ল্যাঙ্গলির পেছনে ভাতা ও পেনশন কন্ট্রিবিউশনসহ খরচ করছে প্রতি মাসে ১৯০০ টাকা?

এটা কি মাননীয় মন্ত্রীর জানা নেই উচ্চতর শিক্ষা গৌরব ও ইউরোপীয় মানের খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ দুই ব্যক্তির চেয়ে অনেক কম বেতনে কর্মরত রয়েছেন?

শিক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য প্রভাস চন্দ্র মিত্র দফাওয়ারি জবাবে বললেন— সরকার অবহিত হয়েছে যে বিষয়টি সত্য। সরকার অবহিত হয়েছে যে বর্ণিত বিষয়টি সত্য নয়।

সরকার অবহিত হয়েছে যে ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসের সদস্য হিসেবে তার প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরো ১০০ টাকা দিত। ১৯২২-২৩ সালে বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে মাসে আরো ১০০ টাকা ভাতা প্রদান করা হয়। আইইএস হিসেবে প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে আরো ২০০ টাকা বাড়িয়ে দেয়া না হলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি নবায়নে সম্মত হবেন না বলে জানিয়ে দেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল এবং সরকার প্রফেসর জেঙ্কিন্সকে বিশেষ দরকারি মনে করে তার প্রস্তাব সম্মতি দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার পেছনে কত খরচ করবে, তা নির্ভর করবে আইইএস সদস্য হিসেবে কত টাকা পেয়ে থাকবেন তার ওপর। গত বছর প্রফেসর ল্যাঙ্গলি ১,২৫০ টাকা বেতন, ৩৯০ টাকা পেনশন কন্ট্রিবিউশন এবং প্রভোস্টের দায়িত্ব পালনের জন্য ১০০ টাকা ভাতা পেয়েছেন।

উভয়ের চেয়ে কম বেতনে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। কিন্তু তারা ইউরোপীয় খ্যাতির অধিকারী কিনা, এ সম্পর্কে সরকার কোনো মতামত ব্যক্ত করতে আগ্রহী নয়।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আবাসন সংকট

৬ মার্চ ১৯৩৯ ঢাকার সদস্য আবদুল হাকিম বিক্রমপুরী শিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন—

ক) ১. মাননীয় মন্ত্রী কি বলবেন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মুসলমান ছাত্র সংখ্যা কত? ২. হলে প্রকৃতপক্ষে কতটি সিট রয়েছে?

খ) এটা কি সত্য বর্তমানে হলের মুসলমান ছাত্র সংখ্যা প্রায় ৬০০-তে দাঁড়িয়েছে? গ) এটা কি সত্য আসলে এই হলে মাত্র ২৮৪ জনের সিট রয়েছে। ঘ) এটা কি সত্য কেবল আবাসিক সুবিধা না থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আগ্রহী অনেককেই নেয়া যাচ্ছে না? ঙ) এ আবাসন সংকট নিরসনের লক্ষ্যে মাননীয় মন্ত্রী কি মুসলমান ছাত্রদের জন্য আর একটি আবাসিক হল নির্মাণের কথা বিবেচনা করবেন?

শিক্ষামন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের উত্তর

ক) ১. নভেম্বর ১৯৩৮-এ মোট সংখ্যা ৬২২ জন। এর মধ্যে ৩৪৮ জন আবাসিক এবং ২৭৪ জন হলের সঙ্গে সংযুক্ত।

২. ২৮৫ জন হলে থাকছে আর ৬৫ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবনে। খ) হ্যাঁ। গ-ঘ) প্রকৃত সিট ২৮৫। নির্ধারিত সীমার বাইরের বহুসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা সম্ভব হবে না।

ঙ) সরকার মুসলমান শিক্ষার্থীদের জন্য অপর একটি মুসলিম হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সে উদ্দেশ্যে তহবিল সরবরাহ করা হচ্ছে।

জেঙ্কিন্স সাহেবের পদ বিলোপের প্রস্তাব

১৯ ডিসেম্বর ১৯৩৯

সিরাজগঞ্জের সদস্য আবদুল্লাহ আল মাহমুদ শিক্ষামন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন— ক) ১. ডক্টর ডব্লিউ এ জেঙ্কিন্স, ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিস বর্তমানে কোন পদে কাজ করছে? ২. তিনি মাসে কত বেতন নিচ্ছেন?  ৩. এছাড়া কোনো ভাতা যদি নিয়ে থাকেন তা কী? এ সময়ে তিনি কোন কাজগুলো করছেন?  ৪. তিনি কি কোনো পরিকল্পনা/পরিকল্পনাগুলো পেশ করেছেন?

খ) প্রশ্ন ক (৪)-এর উত্তর যতি ঋণাত্মক হয়, তাহলে সরকার কি পদটি বিলুপ্তি করার বিবেচনা করছে?

শিক্ষামন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের জবাব

ক) ১. বাংলার ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন অফিসে স্পেশাল অফিসার হিসেবে কর্মরত। ২. ২,১৭৫ টাকা এবং সেই সঙ্গে ৩০ পাউন্ড স্টার্লিং বিদেশ ভাতা। ৩. আইন অনুযায়ী প্রাপ্য ক্যালকাটা হাউজ অ্যালাউন্স পেয়ে থাকেন। ১৭ অক্টোবর ১৯৩৯ থেকে এক বছরের জন্য নিম্নবর্ণিত কাজগুলোর জন্য স্পেশাল অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে।

ক. ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি বিল; খ. সেকেন্ডারি এডুকেশন বিল; গ. স্কুলের জন্য বৃত্তি পরিকল্পনা; ঘ. ইন্সপেক্টর কার্যালয় পুনর্গঠন; ঙ. প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কমিটি; চ. তফসিলভুক্ত সম্প্রদায় কমিটি; ছ. প্রাথমিক শিক্ষা আইন (সংশোধনী); জ. প্রাথমিক শিক্ষা (অর্থায়ন); ঝ. চট্টগ্রাম ও জলপাইগুড়িতে মহিলাদের ইন্টারমিডিয়েট কলেজ স্থাপন; ঞ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত বিষয় যেমন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি প্রতিষ্ঠা

৪. ডক্টর জেঙ্কিন্সকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৩৭ নিম্নবর্ণিত কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য স্পেশাল অফিসার নিয়োগ করা হয়েছিল।

ক. মাধ্যমিক শিক্ষা; খ. মেয়েদের শিক্ষা; গ. সিটি কলেজ ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনের কলেজ শাখায় অনুদানের আবেদনের ওপর তদন্ত; ঘ. শিক্ষা বিভাগ সংক্রান্ত

ডক্টর জেঙ্কিন্স ওপরের বিষয়গুলো নিয়ে পরিকল্পনা পেশ করেছেন। এ ছাড়াও তাকে অন্য যেসব বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তিনি তা সম্পন্ন করেছেন; ঙ. পদ অবলুপ্ত করার প্রশ্নই আসে না।

আবদুল্লাহ আল মাহমুদের সম্পূরক প্রশ্ন: তার দাখিলকৃত পরিকল্পনাগুলো সরকার কি পরীক্ষা করছে?

স্পিকার বললেন, এ প্রশ্ন এক্ষেত্রে অবান্তর। প্রশ্ন হতে হবে স্পেশাল অফিসার হিসেবে ডক্টর জেঙ্কিন্সকে নিয়ে।

তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ক (৪)-এ বর্ণিত পরিকল্পনা প্রণয়নে তিনি কতটা সময় ব্যয় করেছেন?

শিক্ষামন্ত্রী বললেন, তিনি দিনের পুরো সময়ই অফিসে কাজ করেছেন। আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে তিনি সারাক্ষণই ব্যস্ত।

 

আন্দালিব রাশদী

প্রাবন্ধিক ও লেখক