গত ২৪ নভেম্বর আইপিডিসি ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় হোটেল সোনারগাঁওয়ে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ ক্রোড়পত্রে প্রকাশ হলো—

অংশ নিয়েছেন যারা

প্রধান অতিথি

মসিউর রহমান : প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা

বিশেষ অতিথি

এমএ মান্নান : প্রতিমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

কাজি আমিনুল ইসলাম   : এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি

আলোচক

নকিব খান : সভাপতি, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি

মমিনুল ইসলাম : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, আইপিডিসি

শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম : ডিন, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি : অধ্যাপক ও ডিরেক্টর, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্সি, বিআইবিএম

মো. রাশেদুল আলম : হেড অব সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, বিকাশ

ইমতিয়াজউদ্দিন চৌধুরী : হেড অব সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, বিএসআরএম

জিতান এম. চান্ডানানি : ব্লক চেইন লিডার, আইবিএম

সৈয়দ আসগর আলী : হেড অব প্রকিউরমেন্ট, লিন্ডে বাংলাদেশ

শাহেদ লতিফ : হেড অব প্রকিউরমেন্ট, পারফেটি ভেনমেল

হাবিবুর রহমান : জিএম, সাপ্লাই চেইন, ম্যারিকো বাংলাদেশ

রকিবুল আলম : জিএম, সাপ্লাই চেইন, বার্জার পেইন্টস

লিয়াকত হোসেন : উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক

জিয়া উদ্দিন : হেড অব সাপ্লাই চেইন, রেকিট বেনকিজার

আনা ক্লিনকিক এনড্রিউস : ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ইভালুয়েশন অ্যান্ড ইমপ্যাক্ট বিশেষজ্ঞ, ইউএনসিডিএফ

আরাফাত হোসেন : চ্যালেঞ্জ ফান্ড ম্যানেজার, নাথান ইনকরপোরেশন

সঞ্চালক

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ সম্পাদক, বণিক বার্তা

 

 

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ&dquote;&dquote;

সম্পাদক, বণিক বার্তা

“আমাদের দেশে যে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে, তা যথাযথভাবে ব্যবহারে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ”

সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট কোথা থেকে এসেছে তা আসলে সবারই জানা। এর সঙ্গে লজিস্টিকের একটি সম্পর্ক রয়েছে। লজিস্টিক বাস্তবে একটি সামরিক শব্দবন্ধ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বড় বড় করপোরেশন গড়ে উঠলে তারা এটিকে বিজনেস লজিস্টিকে রূপান্তর করে। একাডেমিক জগতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ১৯৬০-এর দশকের আগে বিজনেস লজিস্টিক ম্যানেজমেন্ট নামে কোনো কোর্স ছিল না। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি বিজনেস লজিস্টিকের ওপর প্রথম কোর্স চালু করে। বৈশ্বিকভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে বিজনেস লজিস্টিক বা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ১৯৭০-এর দশকে বড় ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়। তখন সবাই চিন্তা শুরু করে কীভাবে ব্যয় কমানো যায়। কারণ কোম্পানি অপারেশনে আগে পরিবহন, ইনভেনট্রি, ওয়্যারহাউজের মতো বিষয়গুলো আলাদা কর্মকাণ্ড ছিল। আলাদা আলাদা অপারেশনে এতে বিপুল ব্যয় হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে এসব বিষয় কীভাবে একীভূত করা যায়, তার চিন্তা এল। ১৯৯০-এর দশকে বিশ্বায়নের সুবাদে নতুন নতুন প্রযুক্তি আসা শুরু করলে লজিস্টিক বিজনেস আরো বৃহত্তর মাত্রায় উন্নীত হয়। তখন থার্ড পার্টির সার্ভিসের প্রচলন শুরু হয়। কারণ একটি কোম্পানির অবস্থান এক জায়গায়, কিন্তু এর ব্র্যান্ড পণ্য উৎপাদন হয় অন্য জায়গায়। এক্ষেত্রে চীন অদ্বিতীয়। দেশটি অনেক কোম্পানিরই বড় সাপ্লায়ার। সুতরাং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট হলো ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড প্রডাক্ট ফ্লো চার্ট। সংক্ষেপে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের মূল সারবত্তা হলো: গতিময়তা, কার্যকারিতা ও ব্যয় সাশ্রয়। শুধু বৈশ্বিক নয়, জাতীয় পরিপ্রেক্ষিত থেকেও উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট অনেক বড় ইস্যু। বিজনেস লজিস্টিক, লজিস্টিক আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের সঙ্গে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের মূল পার্থক্য হলো, প্রযুক্তির সহায়তায় এটি স্টেকহোল্ডার/চ্যানেল পার্টনারদের মধ্যে একটি অধিকতর কার্যকর সমন্বয় ও সম্পর্ক তৈরি করে। আমাদের অর্থনীতি স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের টার্নওভারের চেয়েও ছোট। আলোচ্য কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উপরে। আর আমাদের অর্থনীতি ৩০০ বিলিয়ন ডলারের দিকে সবে যাত্রা করেছে। আমাদের দেশে যে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে, তা যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার সময় এসেছে।

 

নকিব খান&dquote;&dquote;

সভাপতি, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি

“সাপ্লাই চেইন শুরু হয় ভোক্তার কাছ থেকে, একইভাবে তা শেষ হয় ভোক্তার কাছে গিয়ে”

সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাটি শুরু হয় মানুষের ঘর থেকে। একটি পরিবারের জন্য যেসব জিনিসের দরকার হয়, সেগুলো কীভাবে আসবে, তা ঠিক করেন পরিবারের কর্তা। এ ধারণাটিই বড় পরিসরে চিন্তা করলে আজকের সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থা পাওয়া যাবে। অনেকেই বলে থাকেন, সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থা শুরু হয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে, শেষ হয় ভোক্তার কাছে গিয়ে। তবে আমরা এ ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছি। আসলে মানুষের চাহিদা থেকেই সাপ্লাই চেইনের উত্পত্তি। তাই বলাই যায়, সাপ্লাই চেইন শুরু হয় ভোক্তার কাছ থেকে, একইভাবে তা শেষ হয় ভোক্তার কাছে গিয়ে। এর মধ্যে অনেক ধরনের কর্মকাণ্ড আছে, যেখানে ইন্টিগ্রেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাপ্লাই চেইন ধারণাটি খুব বেশি পুরনো নয়, কিন্তু এতে যেসব কর্মকাণ্ড রয়েছে তা অনেক পুরনো। যেমন— পারচেজিং, লজিস্টিক, ডিস্ট্রিবিউশন সবই অনেক পুরনো। এসব কর্মকাণ্ড আলাদা আলাদাভাবে অনেক কোম্পানিতে রয়েছে। যখন আমরা এসব বিষয় ইন্টিগ্রেশন করি, তখন সেটিকে বলি সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট। এ ইন্টিগ্রেশনে কোনো ত্রুটি থাকলে পুরো সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হবে। বলতে গেলে সেখানেই কিন্তু সাপ্লাই চেইনের চ্যালেঞ্জ এবং এখানেই এর সাপোর্ট ফাংশনগুলো প্রয়োজন। সাপ্লাই চেইন কনসেপ্টের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণটি আমাদের পোশাক খাতে ফুটে উঠেছে। আমরা কাপড় আমদানি করছি, আবার রফতানি করছি। এর মাঝে অনেক কর্মকাণ্ড বিদ্যমান। ব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে এখানে আমরা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারি।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঠিক করতে হবে আমরা কোথায় আছি এবং কোথায় যেতে চাই। আমরা ৩০০ বিলিয়ন অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছি। ২০২১ সালে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হব। ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশ হব। দেশের এ দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধিতে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমাদের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। সেখানে বিনিয়োগ আসবে। সেই বিনিয়োগের জন্য আমাদের তৈরি হতে হবে। এজন্য অনেক সম্পদ দরকার। এসব সম্পদ কোথা থেকে আসবে, এটিও একটি চ্যালেঞ্জ। দুর্বল অবকাঠামো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ইস্যু। এটি কীভাবে  দ্রুততর করা যায় তা দেখতে হবে। প্রযুক্তি আরো কীভাবে আমরা সংযোজন করতে পারি, সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি ডিজিটাল যুগ। এ যুগে আমাদের পেছনে পড়ে থাকলে হবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই বড় হচ্ছে। এ বড় হওয়ার পথে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে আমাদের অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

 

মমিনুল ইসলাম&dquote;&dquote;

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আইপিডিসি

“এসএমই খাতে সাপ্লাই চেইন ফিন্যান্স গুণগত পণ্য সরবরাহে সক্ষমতা তৈরি করবে”

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় পার করছে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছি। উন্নীত হয়েছি মধ্যম আয়ের দেশে। এ উত্তরণে আমাদের একটি সহায়ক শক্তি ছিল সস্তা শ্রম। এখন আমরা এমন এক পর্যায়ে আছি, যেখানে আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার জন্য সস্তা শ্রম আর প্রধান পার্থক্যসূচক ফ্যাক্টর হিসেবে নেই। সত্যিই আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আমরা যদি বাস্তবে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই সার্বিকভাবে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে জাতীয়, শিল্প, কোম্পানি পর্যায়ে সমভাবে মনোযোগ দিতে হবে। আমরা অবকাঠামো ও নীতি ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জের কথা যেমন বলব, তেমনি আমাদের অবশ্যই কী সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলোয়ও দৃষ্টি দিতে হবে। সীমাবদ্ধতা কাটাতে আমরা রাতারাতি বিনিয়োগ বাড়াতে পারব না। তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যমান সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমরা কিছুটা সৃজনশীল হতে পারি। বিশেষত সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে। সাপ্লাই চেইনের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান এসএমই। নীতিনির্ধারকদের খাতটিকে প্রাধিকারে রাখতে হবে। আমরা প্রায়ই বলি, কলাবোরেশন সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন। এ বিষয়ে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। গুণগত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিতে এসএমইতে আমাদের বিপুল অর্থায়ন করা প্রয়োজন। আর্থিক খাত থেকে আমরা নিশ্চিত করছি এসএমই যেন ঋণ পায়। তবে এখনো তাদের অর্থায়ন ব্যালান্স শিট বেজড। ঋণ প্রদানে আমরা এখনো তাদের কাছ থেকে কিছু না কিছু জামানত চাই। এখান থেকে বেরিয়ে আমাদের ক্যাশ ফ্লো বেজড অর্থায়নে যেতে হবে এবং সেটি হতে হবে জামানত ছাড়া।

করপোরেট এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার মাধ্যমে এসএমইকে সহজেই এগিয়ে নিতে পারি। এটি একটি দিক। দ্বিতীয় একটি হলো, ব্লক চেইন। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে আজকাল অনেকেই ব্লক চেইনের কথা বলছেন। ব্লক চেইন নয়, বরং সহযোগিতাবান্ধব একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারি এজেন্সি, করপোরেট বডি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ভালো খবর যে, প্রযুক্তি আমাদের নানা দিক থেকে সাহায্য করতে পারে। এখন প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। কী নেই তা নিয়ে আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিত নয়; বরং চিন্তা হওয়া উচিত আমাদের যা আছে তা দিয়ে আমরা কী করতে পারি। এ মানসিকতা পরিবর্তনের প্রভাব বিপুল। সরবরাহকারীর দিক থেকে আমরা চাহিদা সৃষ্টি করছি। আমরা উৎপাদিত পণ্য ভোক্তাদের কাছে সহজলভ্য করছি। এসএমইকে আমরা বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত বিবেচনা করলে আমাদের অবশ্যই সাপ্লাই চেইনে নজর দিতে হবে। বর্তমানে সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা ও প্রতিকূলতা রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি। তবে শুধু সমস্যা বা প্রতিকূলতা নয়, এর সম্ভাবনার দিকটিতেও একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।

 

মো. রাশেদুল আলম&dquote;&dquote;

হেড অব সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, বিকাশ

“সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে গ্র্যাজুয়েট কীভাবে তৈরি করা যায়, তা নিশ্চিতে সরকারকেও বড় ভূমিকা রাখতে হবে”

আমাদের অর্থনীতি ক্রমেই ভালো করছে। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত। এটা একটা দিক। আরেকটি দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যকার সাম্প্রতিক বাণিজ্যযুদ্ধ কিছু দেশের জন্য খারাপ হলেও কিছু দেশের জন্য সুযোগও তৈরি করছে। এটা বাংলাদেশের জন্যও হতে পারে। সেদিক থেকে সম্ভাবনা প্রচুর। কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে চাই। আমি প্রায় ২০ বছর ধরে সাপ্লাই চেইনে কাজ করছি। আগে মুরুব্বি বা অনেক কোম্পানির ঊর্ধ্বতনরা সেভাবে সাপ্লাই চেইন বুঝতেন না। এখন বাংলাদেশে কাজ করা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সাপ্লাই চেইন নিয়ে কনসার্ন। এক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো অ্যাডাপ্টেশন। দেশীয় কোম্পানিগুলোয় অনেক সময় পারচেজ ডিপার্টমেন্টের লোকবল এমডি বা ডিএমডি পূরণ করতে চায় না। ফলে আলাদা লোকবল থাকে না। তারা মনে করে, এটি আমরাই দেখব। তবে বিকাশে আমরা সাপ্লাই চেইনকে অনেক গুরুত্ব দিই। আমরা মনে করি, সাপ্লাই চেইনে যুক্তরা কেবলই সরবরাহকারী নয়, তারা পরস্পরের পার্টনার। কাজেই এটি একটি উইন উইন গেম। পার্টনার সমকক্ষ না হলে উইন উইন গেম হয় না। দেশীয় পার্টনারদের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ ইআরপি। তাদের রয়েছে দক্ষতা, কার্যকারিতার ঘাটতি। এদিকে অভিভাবক পর্যায়ে সাপ্লাই চেইনের ব্যাপারে সচেতনতা আসেনি। আবার এক্ষেত্রে পঠন-পাঠনের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এখনো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাপ্লাই চেইনের ওপর কোর্স তেমন নেই। কেবল ব্যক্তিখাত নয়, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে গ্র্যাজুয়েট কীভাবে তৈরি করা যায়, তা নিশ্চিতে সরকারকেও বড় ভূমিকা রাখতে হবে। ব্যক্তিখাতও এক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে আমাদের অনেক ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। করপোরেট, সরকার, এনজিও, ব্যক্তিখাত সবারই এটা নিয়ে কাজ করা উচিত। 

 

ইমতিয়াজউদ্দিন চৌধুরী&dquote;&dquote;

হেড অব সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, বিএসআরএম

“সমুদ্রবন্দরে অবকাঠামো ঘাটতির কারণে আমাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে”

গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে বেশ উন্নতি করেছে। তবে সাপ্লাই চেইনকে বিঘ্নিত করে এমন কর্মকাণ্ডও চলছে। পরিবহন খাতে একটা বড় ধরনের সমস্যা আছে। বন্দরের নানা সমস্যা সাপ্লাই চেইনকে বিঘ্নিত করছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যার কারণে ২০১৭ সালে বিএসআরএমের প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এখান থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে। আরেকটি বিষয়, বিধি ব্যবস্থার সমরূপতার অভাব। সার্বিকভাবে বাংলাদেশে কোথাও ওয়েট লোড কন্ট্রোল করা হচ্ছে, কোথাও কন্ট্রোল করা হচ্ছে না। ফলে রিটেইল সেক্টরে গিয়ে প্রতি টনে ২০০-৩০০ টাকা পার্থক্য হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের অ্যাড্রেস করা উচিত। সব জায়গায় কন্ট্রোল করার জন্য আমাদের একটি ইউনিক রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন থাকা উচিত। এটা নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা দরকার। বর্তমানে সব ইনডেক্সে আমরা উন্নতি করেছি। তবে বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক রেটিংয়ে ১৯০টি অর্থনীতির মধ্যে আমাদের অবস্থান ১৭৬তম। যেখানে রুয়ান্ডা ২৯, সেখানে আমরা ১৭৬তম— এটি আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। সমুদ্রবন্দরে অবকাঠামো ঘাটতির কারণে আমাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এটি দূর করা গেলে সার্বিকভাবে আমরা আরো ভালো করতে পারব। পোশাক খাত আমাদের অর্থনীতির বড় শক্তি। এক্ষেত্রে টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম আমরা আরো কীভাবে কমাতে পারি, সেটিও দেখতে হবে।

 

জিতান এম. চান্ডানানি&dquote;&dquote;

ব্লক চেইন লিডার, আইবিএম

“সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে ক্যাশ ফ্লো ফিন্যান্সিং একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ”

আজকের আলোচনার ফোকাল পয়েন্ট ইন্টিগ্রেশন ও কলাবোরেশন। কোনো কোম্পানি অপারেশনে গেলে সাপ্লায়ার, ব্যাংক প্রভৃতি পক্ষের সঙ্গে কানেক্ট করতে হয়। এক্ষেত্রে দরকার পড়ে ইন্টিগ্রেশন। আমাদের লজিস্টিক, ট্রাভেল ও ডকুমেন্টেশনে সমস্যা থাকলে আমরা কী করি? এক্ষেত্রে আমরা নিশ্চিত করি টেকনোলজি ইন্টিগ্রেশন, প্রসেস ইন্টিগ্রেশন। এটাই আসলে প্রথমে করা দরকার। এতে বাস্তবে সুবিধা পাই আমরা। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে আমরা এর মাধ্যমে পর্যাপ্ত তথ্য পাই। আর সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এতে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ে। ইন্টিগ্রেশন সম্পন্ন হলে তবেই যেতে হবে পরবর্তী ধাপে। পরবর্তী ধাপে কি-ওয়ার্ড হবে কলাবোরেশন। অর্থনীতির পরবর্তী পর্যায়ে এটিই হবে কি-ওয়ার্ড, তখন ইন্টিগ্রেশন কি-ওয়ার্ড হবে না। কলাবোরেশন আসলে অর্থনীতি, ব্যবসা বাড়ায়। কলাবোরেটিভ ইকোনমিতে যা প্রয়োজন সেটি হলো, কিছু প্রযুক্তি। কলাবোরেশনকে একটি অপশন হিসেবে রাখলে এটি অবশ্যই একটু ভিন্নতর। কারণ আজকে আমরা উবার, অ্যামাজনসহ সব ট্র্যাভেল ওয়েবসাইট ব্যবহার করি। তারা কেবল কলাবোরেশন এজেন্ট। উবার কোনো ট্যাক্সি তৈরি করে না, অ্যামাজনের কোনো প্রডাক্ট নেই, ট্রাভেল এজেন্সির কোনো এয়ারলাইনস নেই। কিন্তু তারা কলাবোরেটেড। এ কারণে তারা এত বড় হয়েছে। আমরা কীভাবে সহযোগিতামূলক হতে পারি, আমরা কীভাবে একত্রে বৃহত্তর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারি, সেটি পরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের একটু সৃজনশীলভাবে চিন্তা করতে হবে। উবার, অ্যামাজন বিষয়গুলো সৃজনশীলভাবে চিন্তা করেছে বলে তারা এত দ্রুত বিকাশ লাভে সমর্থ হয়েছে। তাদের সৃজনশীলতার একটি ভালো উদাহরণ ক্যাশ ফ্লো বেজড ফিন্যান্সিং। আমরা কি ক্যাশ ফ্লো বেজড ফিন্যান্সিং করতে পারি? হ্যাঁ, আমরা সেটা পারি। এটা কি ফিজিবল প্রপোজিশন? এটি ফিজিবল প্রপোজিশন। এক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হলো, আস্থা। আস্থা আনা যায় ট্রান্সপারেন্সির মাধ্যমে। এখন পর্যাপ্ত প্রযুক্তি রয়েছে। প্রযুক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আইবিএম থেকে প্রযুক্তি সরবরাহ করি বটে, তবে এক্ষেত্রে বিজনেস ব্রেনটা আপনার। আমাদের অপারেশনাল অপটিমাইজেশন নিশ্চিত করতে হবে, যা নতুন রাজস্ব নিয়ে আসবে। কাজেই সাপ্লাই চেইনে ক্যাশ ফ্লো ফিন্যান্সিং একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইন্টিগ্রেশন অব সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট অবশ্যই ভালো। কিন্তু ইন্টিগ্রেশন অব ফিন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকস আরো ভালো পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার জন্য।

সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রযুক্তি ব্লক চেইন। ব্লক চেইন খুবই সহজ প্রযুক্তি। এটি দ্বারা লেনদেন সহজ হয়। ধরুন, আমি একজন উৎপাদক। আমি একজন সাপ্লায়ার ধরেছি। আমি বললাম, তুমি আমাকে চারটি পণ্য (এ, বি, সি, ডি) দেবে। ‘এ’ পণ্যের দাম ১০০, ‘বি’ পণ্যের দাম ২০০, ‘সি’ পণ্যের দাম ৩০০, ‘ডি’ পণ্যের দাম ৪০০। প্রতি ১০ কোয়ান্টিটিজে ১০ শতাংশ ডিসকাউন্ট এবং প্রতি ২০ কোয়ান্টিটিজে ৭ শতাংশ ডিসকাউন্ট। এটিই হলো মাস্টার এগ্রিমেন্ট। আমাদের দুজনেরই মাস্টার এগ্রিমেন্ট রয়েছে। আমরা সেটি ডিজিটাল লেজারে রেখেছি। আমরা দুজনই বলছি, এটিই আমাদের ডকুমেন্ট। সেক্ষেত্রে আমাদের আর বিতর্ক থাকবে না। আমাদের সব কাজ হবে চুক্তি অনুযায়ী, সম্মত উপায়ে। এর মাধ্যমে সহজ উপায়ে পুরো পার্টিসিপেন্টগুলোকে সমন্বয় করা যায়। কাজেই ব্লক চেইন এমন এক প্রযুক্তি, যা তথ্য কপি করে। এটি সাপ্লাই চেইনের ১৩টি পার্টিসিপেন্টের মধ্যে তথ্য শেয়ার করে। তথ্য শেয়ারের ক্ষেত্রে এটি খুবই সতর্ক। এটি সেটাই শেয়ার করে, যা আপনি চান। এর বাইরে এটি কোনো তথ্য শেয়ার করে না। ব্লক চেইন নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখে। প্রকৃতপক্ষে এটিই ব্লক চেইনের গুরুত্বপূর্ণ ফিচার। এটি বিদ্যমান প্রযুক্তি থেকে স্বতন্ত্র, কিন্তু এটি কাজ করে কলাবোরেশনের ভিত্তিতে। এটিই এ প্রযুক্তির সৌন্দর্য।

 

সৈয়দ আসগর আলী

&dquote;&dquote;

হেড অব প্রকিউরমেন্ট

লিন্ডে বাংলাদেশ

“ব্লক চেইন, ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা— সবই সাপ্লাই চেইনের ইকোসিস্টেম”

২০০৪ সালে আমরা ঢাকা চেম্বারে সাপ্লাই চেইন এডুকেশন শুরু করি। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টার, ডব্লিউটিও এবং আঙ্কটাডের সহযোগিতায় ঢাকা চেম্বার নেটওয়ার্ক পার্টনার হিসেবে এ প্রকল্প চালু করে। এখন আমাদের ২৪টি ব্যাচ এরই মধ্যে সাপ্লাই চেইন এডুকেশন শেষ করেছে। এটা আমাদের বড় অর্জন। এখানে আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করছি। ঢাকা চেম্বার কিন্তু আইসিটিতে দুবার বেস্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছি। আমার প্রতিষ্ঠান তিনবার এশিয়ান এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড জয়ী হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কেপিআইতে আমরা পাঁচবার প্রথম হয়েছি। কাজেই আমরা অনেক কিছু করতে পারি। মনে রাখতে হবে, একটি হলো বর্তমান চ্যালেঞ্জ, আরেকটি হলো ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। এ দুটি বিষয় দেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এখন আমাদের ফোরজি ইন্ডাস্ট্রি। এ ইন্ডাস্ট্রিতে ব্লক চেইন, ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা-সবই আসছে। এটিকে বলা হচ্ছে সাপ্লাই চেইনের ইকোসিস্টেম। এ সিস্টেমে সবকিছু ইন্টিগ্রেটেড। এক্ষেত্রে মানুষ, মেশিন সবাই সবার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করবে। ভবিষ্যতে এটা কমপ্লিকেটেড হবে। কাজেই এটি সম্পর্কে আবারো আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।

 

শাহেদ লতিফ&dquote;&dquote;

হেড অব প্রকিউরমেন্ট পারফেটি ভেনমেল

“সরকারি পর্যায়ে সাপ্লাই চেইন ইনস্টিটিউট করা প্রয়োজন”

বর্তমানে বাংলাদেশে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সাপ্লাই চেইন নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া সিআইপিএস, আইপিএসএফ প্রভৃতি কোর্স করানো হয় আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে কোনো সাপ্লাই চেইন ইনস্টিটিউট করা হয়নি। আইসিএমের মতো সাপ্লাই চেইনের ওপর ইনস্টিটিউট করার দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে। কারণ বেসরকারি পর্যায়ে যেসব ইনস্টিটিউট আছে সেগুলো গ্লোবাল বেজড; এক্ষেত্রে লোকাল বেজড ইনস্টিটিউট করা যায় কিনা। আর আইপিডিসির কাছে একটি অনুরোধ রইল। যেহেতু তারা বাংলাদেশ সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সোসাইটির সঙ্গে কাজ করে, সেহেতু আমার মনে হয় সব সোসাইটির সঙ্গে তারা কাজ করবে। বিদ্যমান সাপ্লাই চেইন সোসাইটি ছাড়াও আরো চারটি যে প্রতিষ্ঠান আছে তাদের সঙ্গে আইপিডিসির সম্পৃক্ত হতে হবে। এটি হলে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট আরো বড় আকারে ব্যাপ্তি লাভ করবে।

 

হাবিবুর রহমান&dquote;&dquote;

জেনারেল ম্যানেজার, সাপ্লাই চেইন, ম্যারিকো বাংলাদেশ

“অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য লজিস্টিকস লাগবে”

সাপ্লাই চেইন নিয়ে কথা উঠলে আমরা একটি কথা প্রায় বলি— কস্ট ইফিশিয়েন্সি। কস্ট ইফিশিয়েন্সি আমরা সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করি। ধরুন, মাম বা স্পার একটি পানির বোতলের দাম ১৫ টাকা। এক্ষেত্রে একজন অপারেটর হয়তো ২৫ শতাংশ মুনাফা করে, আবার একজন অপারেটর হয়তো ৩০ শতাংশ মুনাফা করে। এ মুনাফা নির্ভর করে সাপ্লাই চেইন কতটা দক্ষ তার ওপর। এভাবে সাপ্লাই চেইন বাজারে প্রচুর পরিবর্তন এনেছে। কেন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন? এর কারণ বটমলাইন ইনক্রিজ, টপলাইন ইনক্রিজ নয়। ১৫ বছর ধরে আমরা দেখেছি বটম লাইন ইনক্রিজে সাপ্লাই চেইন লক্ষণীয় ভূমিকা রেখেছে। ইউনিলিভার, রেকিট বেনকিজার কিংবা ম্যারিকো বাংলাদেশের মতো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাদের বটমলাইন বাড়ছে। এজন্য বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসছেন। 

সাপ্লাই চেইনের একটি বড় কাজ হলো, মেক ফাংশন। সাপ্লাই চেইনে সবকিছু কিন্তু ইনবাউন্ড ও আউটবাউন্ড হবে, মাঝখানে হবে মেক ফাংশন। মেক ফাংশন আকর্ষণীয় করার জন্য ক্ষুদ্র শিল্পগুলো উঠে আসছে। কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে আমরা ক্ষুদ্র শিল্পগুলোকে কাজে লাগাতে পারি। হঠাৎ করে দেখলাম, কস্ট অব গুডস সোল্ডের ওপর ১০-১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। কয়েক বছর আগে যা আকর্ষণের ক্ষেত্র ছিল, এখন সেটি নিরুৎসাহিত হচ্ছে। যেমন— ডিও স্প্রে, লোশন প্রভৃতি পণ্য ছোট ছোট স্থানীয় কোম্পানি তৈরি করতে পারে। মাল্টিপল কোম্পানি এসব পণ্য সাপ্লাই করতে পারে। এটি হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও লাভযোগ্যতা বাড়বে। আমদানি কমে আসবে। তবে সিওজিএসের ওপর কর আরোপ করায় কস্ট বেড়ে যাচ্ছে। এমনটি হলে মানুষ পেছনে যাবে এবং আবার ইমপোর্ট করা শুরু করবে।

লজিস্টিক ও ডিস্ট্রিবিউশনের দিক থেকে আমরা একটি সমস্যার সম্মুখীন হই। সেটি হলো, ভ্যাট ল’। ভ্যাট আইনে বলা হচ্ছে, ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে আমার যে ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, তার ভিত্তিতে পণ্য নিয়ে আসব। সেখান থেকে পণ্য পাঠাতে হবে থার্ড পার্টির কাছে একটি ভ্যাট চালান দিয়ে। তারপর আমি যখন পণ্য তৈরি করব তখন আবার আমাকে নিয়ে আসতে হবে আমার গোডাউনে। তারপর আবার ভ্যাট দিতে হবে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন, আমার একটি ফ্যাক্টরি আছে ঢাকায়। কিন্তু আমার থার্ড পার্টির ফ্যাক্টরি চট্টগ্রাম। তাহলে আমি যখন র ম্যাটেরিয়াল নিয়ে এলাম, তখন চট্টগ্রামে কিন্তু সেটি দিতে পারব না। আমার এ ৩০০ টন পণ্য ৩০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসতে হবে। আবার এ কাঁচামাল ৩০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে পাঠাতে হবে থ্রি পির ফ্যাক্টরিতে। চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনের পর তা আবার ঢাকায় নিয়ে আসতে হবে। তার মানে মোট ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার আমাদের ট্রাভেল করতে হবে। এটা অর্থের অপচয়। আমরা বেশি ফুয়েল খরচ করলে আমাদের বেশি পেট্রোডলার খরচ হবে। এটি অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য সাপোর্ট সিস্টেম লাগবে। লজিস্টিকস লাগবে। যেমন— ওয়্যারহাউজ ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম। আমরা এটাকে বলি হরাইজন্টাল কলাবোরেশন। মিরসরাইয়ে  বিদ্যমান ওয়্যারহাউজে অনেক শিল্প সুযোগ পেলে ২০-৩০টি কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউশনে ২০-২৫ লোক লাগবে না। এক লাখ স্কয়ার ফিট বা দুই লাখ স্কয়ার ফিট ওয়্যারহাউজ অনেক কোম্পানি শেয়ার করতে পারবে। বৈশ্বিক প্লাটফর্মের জন্য এটা বড় সুবিধা হবে।

 

রকিবুল আলম&dquote;&dquote;

জেনারেল ম্যানেজার, সাপ্লাই চেইন, বার্জার পেইন্টস

“সবার জন্য ওয়ান সাইজ ফিটস অল অ্যাপ্রোচ সত্যিই কাজ করছে না”

দেশে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এক. অবকাঠামো চ্যালেঞ্জ, দুই. রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জগুলো খুবই জটিল। আমাদের মাঝে মাঝে বুঝতে কষ্ট হয় যে, বিজনেস রেগুলেশন (কাস্টমস বা এনবিআর রেগুলেশন) প্রণয়নের উদ্দেশ্য কী। এটা বিজনেসকে সহজীকরণ করতে, নাকি নিয়ন্ত্রণ করতে? আমাদের সাধারণভাবে মনে হচ্ছে আলোচ্য রেগুলেশন দ্বারা দ্বিতীয়টি করা হচ্ছে। সুনির্দিষ্টভাবে এসই কোডের কথা বলতে চাই না। সেটি অবশ্যই একটি ওপেন চ্যালেঞ্জ। আমাদের এখানে ৬০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার রয়েছে। পারচেজ পাওয়ারের দিক থেকে সত্যিই বৈশ্বিক লেভেলেও আমাদের মার্কেট শেয়ার অনেক বড়। সুতরাং আমরা এর সুবিধা পাই। তবে কাস্টমসের মুখোমুখি হলে তারা প্রায়ই বলে, আমরা জানি বার্জার আন্ডার ইনভয়েস করে না। বার্জার কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। সমস্যা সৃষ্টি করে নন-কমপ্লায়েন্ট ছোট কোম্পানিগুলো। এ কারণে তারা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে সবার জন্য ওয়ান সাইজ ফিটস অল অ্যাপ্রোচ সত্যিই কাজ করছে না।

সম্প্রতি বার্জার একটি ইন্টারন্যাশনাল কেমিক্যাল কোম্পানির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এনবিআর কাস্টমসের বিভিন্ন কোয়ারি সিস্টেমের কারণে প্রথম অপারেশনে এটি লোকসান করে। তখন স্কটল্যান্ডের বিনিয়োগকারীরা বলা শুরু করলেন, কেন আমরা এ ব্যবসায় থাকব? আমরা যখন বলছি, এখানে সমস্যা কী? তারা বলেছে, এনবিআর ও কাস্টমস সমস্যা নয়, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সত্যিই তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু  সমস্যা হলো, আমাদের বিদ্যমান জয়েন্ট ভেঞ্চারের ব্যবসা মূল্যায়ন করার যে সুযোগ, সেটি বিদ্যমান রেগুলেশনে নেই। দ্রুততার সঙ্গে এসব বিষয়ের সমাধান দরকার।

 

প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি &dquote;&dquote;

অধ্যাপক ও ডিরেক্টর, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্সি, বিআইবিএম

“সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্রাউড ফান্ডিং”

সাপ্লাই চেইন নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা একটি-দুটি টার্ম সম্পর্কে জানেন। একটি হলো ফ্যাক্টরিং, আরেকটি হলো রিভার্স ফ্যাক্টরিং। আমরা বার্জারসহ বড় বড় কোম্পানির কথা শুনেছি। কিন্তু যেগুলো ক্ষুদ্র শিল্প, তাদের প্রকৃতি সবাই জানে না। তারা কেনে নগদে। কিন্তু তাদের পণ্য বেচে ক্রেডিটে/বাকিতে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আবার তারা ব্যাংক থেকে কোনো নগদ অর্থ পায় না। কারণ তাদের কোনো জামানত থাকে না, অন্য কোনো সম্পদও থাকে না। যাকে বলে রিভার্স ফ্যাক্টরিং। যারা সাপ্লাই চেইনের ওপর কাজ করছেন, তাদের রিভার্স ফ্যাক্টরিংয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। আজকে আড়ংয়ে যারা সাপ্লায়ারস আছে, তারা এক-দুই মাস পরে টাকা (বিল) পায়। তারা ব্যাংকে গেলে টাকা পায় না। আমরা যদি রিভার্স ফ্যাক্টরিং করতে পারি কিংবা আড়ংয়ের সঙ্গে যদি কোনো ব্যাংক চুক্তি করি (যা আইপিডিসি করছে), তাহলে সাপ্লায়ার পণ্য সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে অর্থ পেয়ে যাবে। তখন তাদের ক্যাশের জন্য, পরবর্তী লটের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে ডমেস্টিক ফ্যাক্টরিং প্রবর্তনে একটি ম্যানুয়াল দিয়েছিলাম। আমাদের অত্যন্ত ভালো লাগছে যে, বাংলাদেশের অনেক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেটি বাস্তবায়ন করছে। সম্প্রতি এটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্টরিংয়ের ওপর আমরা একটি কাজ করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য সাপ্লায়ারদের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন। সাপ্লায়াররা তাদের পণ্য সরবরাহ করছে। কিন্তু আমরা তাদের জন্য কী করছি। আমাদের বিদ্যমান সাপ্লাই চেইনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম অ্যাসাইনমেন্ট চ্যালেঞ্জ। যেটি ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টে আছে। সেটি মিনিমাইজ করা গেলে ফ্যাক্টরিং আরো বেগবান হবে। ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্টরিংয়ে বর্তমানে ব্লক চেইন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার ফ্যাক্টর চেইন ইন্টারন্যাশনালের (এফসিআই) সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে, যাদের হেড অফিস নেদারল্যান্ডসে। বিভিন্ন দেশে ব্লক চেইন কীভাবে কাস্টমাইজ করা যায়, সেটি চেষ্টা করছে তারা। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্রাউড ফান্ডিং। আজকে এ ইস্যুটি আসেনি, বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণী মহলে থাকা ব্যক্তিরা ক্রাউড ফান্ডিং বা ক্লাস্টার ফিন্যান্সিংয়ে গুরুত্ব দিলে সাপ্লাই চেইনের কাজটি অনেক সহজতর হবে।

 

লিয়াকত হোসেন&dquote;&dquote;

ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক

“ভ্যালু চেইন মেথডকে বাংলাদেশে আরো জনপ্রিয় করতে হবে”

এসএমই অর্থায়নে এখনো যে সমস্যাগুলো রয়ে গেছে, তার একটি হলো সুদহার সমস্যা, আরেকটি হলো সিকিউরিটি সমস্যা। এ দুটি বিষয় আরো কীভাবে সহজ করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা উচিত। সাপ্লাই চেইনে অংশগ্রহণকারীরা যেন সুযোগগুলো পায়, সেজন্য আমাদের অনেক বেশি কিছু করার দরকার রয়েছে। ভ্যালু চেইন মেথডে আমরা আরেকটু বেশি এগোতে পারি। ভ্যালু চেইন মেথডে যারা বড় পারচেজার রয়েছেন, তারা যদি ছোট ছোট সাপ্লায়ারকে অর্থায়ন করেন সেক্ষেত্রে ব্যাংক হয়তো— বড় যারা সাপ্লায়ার তাদের যেহেতু সিকিউরিটি রয়েছে— তাদেরকে ফিন্যান্স করতে পারে, সেক্ষেত্রে ছোট প্রডিউসার বা সাপ্লাই যারা করে তাদের ওইসব বড় পার্টিসিপেন্ট যারা থাকেন, তারা ফিন্যান্স করতে পারেন। ভ্যালু চেইন মেথডকে বাংলাদেশে আরো বেশি জনপ্রিয় করা যায় কিনা, তা নিয়ে পলিসি মেকিংয়ে যারা রয়েছেন তাদের চিন্তা করতে হবে।

 

শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম&dquote;&dquote;

ডিন, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

“আমরা সঠিকভাবে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট করতে পারলে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বাড়বে”

আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ‘বুম’ হবে, প্রবৃদ্ধিও দারুণ হবে। শ্রমিকদের দিক থেকে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, ন্যায্যমূল্যে আমাদের এখানে যথেষ্ট শ্রমিক রয়েছে। বৈশ্বিক অবস্থানও খুব ভালো। আমাদের ডান দিকে রয়েছে ভারত, বাম দিকে চীন। এ দুই দেশের প্রবৃদ্ধির গতি খুব ভালো। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কিছু ইস্যু রয়েছে। আমাদের অনেক ইপিজেড, ইজেড রয়েছে। অনেক শিল্প খাত গড়ে উঠতে যাচ্ছে, অনেক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে আসছে স্থানীয় বাজার দখল করতে। ফার্মাসিউটিক্যাল, ওষুধ, সিরামিকসহ অন্যান্য খাত আরএমজির সঙ্গে বেড়ে উঠছে। তবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়েছে। এছাড়া অবকাঠামোগত ইস্যুর দিকেও নজর দিতে হবে। আইটির দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে সবসময় কথা হয়, এ সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ বিভিন্ন কোর্স চালু করেছে, যা দক্ষ মানবসম্পদ গড়তে সাহায্য করবে। এখনকার দিনে ব্যবসা বেশি মনোযোগ দাবি করে। ব্যবসার বিভিন্ন দিকে যদি মনোযোগ না দেয়া হয়, তবে উৎপাদনশীলতা বাড়বে না। আপনি যখন মনোযোগ দেবেন এবং জানবেন আপনি কী করছেন, তখন আপনার ‘রেট’ ও ‘কস্ট অব প্রডাকশন’ কমে যাবে। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যবসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশি সুবিধা পাবে এবং বিশ্বের আরো বেশি মনোযোগ কাড়তে পারবে। আমাদের প্রচুর সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। যেভাবে আইটি খাত, ই-গভর্ন্যান্স এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আশা করা যেতে পারে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে এ সুবিধা পৌঁছে যেতে পারবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে আইটি সেক্টর ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। ফ্যাক্টরিং সব জায়গায় ছড়িয়ে যাবে। দেশে ফ্যাক্টরিংকে চালু করতে আইপিডিসি ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ আপনি এটি আইনগতভাবে করতে পারবেন। ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র ও মধ্যম সাপ্লায়ারদের সহযোগিতা করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের আর্থিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। অবকাঠামোর দিক থেকে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, কিন্তু বেসরকারি খাত এত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে যে সরকারি খাত পিছিয়ে পড়েছে। আমাদের সামনে ২০২১, ২০৪১ লক্ষ্যমাত্রা ও ডেল্টা প্ল্যান রয়েছে। আমরা যদি আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে পারি তাহলে অবকাঠামোগত সমস্যা দূর হবে, যেভাবে আমরা জ্বালানি সমস্যা যেমন— বিদ্যুতের সমস্যা দূর করেছি। আমরা যদি সঠিকভাবে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ইস্যুর ব্যবস্থাপনা করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বাড়বে, উৎপাদন ব্যয় কমবে।

 

জিয়া উদ্দিন&dquote;&dquote;

হেড অব সাপ্লাই চেইন

রেকিট বেনকিজার

“বিতরণ চ্যানেল হয়ে ওঠায় কুরিয়ার সার্ভিসগুলো গত তিন বছরে ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি করেছে”

ই-কর্মাস বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি ট্রাডিশনাল সাপ্লাই চেইনে সুনামি বয়ে আনবে। সাধারণ ট্রাডিশনাল সাপ্লাই চেইন হলো ওয়্যারহাউজ-ডিস্ট্রিবিউশন-রিটেল হাউজ-কাস্টমার। বাংলাদেশে শেষ দুই বছরে ই-কমার্স ৭০ শতাংশের বেশি সম্প্রসারণ করেছে। আমরা অনুমান করছি, এটি আরো বেশি সম্প্রসারণ করবে। আমাদের কোম্পানিতে আমরা এরই মধ্যে ই-কমার্স উইং খুলেছি, সেখানে এর প্রবৃদ্ধি ১০০ শতাংশের বেশি। কাস্টমাররা এখন ওয়্যারহাউজ থেকে সরাসরি পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। কীভাবে তারা এটা করছেন? তারা এটা ই-কমার্স সাইটগুলোর মাধ্যমে করছেন। আমাদের যে চ্যালেঞ্জ তা হলো, একই ব্যয়ে পণ্য ওয়্যারহাউজ থেকে কাস্টমারের ঘরে পৌঁছানো। আমরা এখন বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানিগুলোকে ব্যবহার করছি বিতরণের চ্যানেল হিসেবে। যে কারণে আমাদের ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। চীনের রেকিট বেনকিজারের কোম্পানির ৪৫ শতাংশ বিজনেস হয় ই-কর্মাসের মাধ্যমে। তাই আমরা যাদের নিয়ে ফিন্যান্স করার চিন্তা করছি, ডিস্ট্রিবিউটর রিটেইলাররা ভবিষ্যতে আদৌ ডিস্ট্রিবিউটর রিটেইলার থাকবে কিনা, সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ১০ বছর পর এমন হতে পারে, রিটেইল শপগুলোয় মানুষ কেনার জন্য যাবে না, সেখানে কিছু লোকজন থাকবে ওখান থেকে পণ্য বিতরণে। এর ইতিবাচক-নেতিবাচক দুটো দিকই রয়েছে; কিছু চ্যালেঞ্জ, কিছু সুযোগ দেখা যাচ্ছে। বিতরণ চ্যানেল হয়ে ওঠায় কুরিয়ার সার্ভিসগুলো গত তিন বছরে ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি করেছে। আগে পণ্য কেনার জন্য ক্রেতারা শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকতে পছন্দ করতেন, এখন যেতে চাইছেন না। যেমন লন্ড্রি সার্ভিসের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আগে লন্ড্রিতে কাপড় দিয়ে ও নিয়ে আসতে হতো। এখন লন্ড্রি সার্ভিসকে রিকোয়েস্ট করা হচ্ছে যেন সে আমার বাসায় এসে কাপড় নিয়ে যায় এবং তা সেবা দিয়ে ফেরত দিয়ে যায়। এই যে এডিশনাল জব, কাপড় নিয়ে যাওয়া ও আবার ফেরত দেয়া, এ দুই সেবার জন্য গ্রাহক বেশি টাকা দিতে চান না। তাই চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এটিকে কস্টের মধ্যে রেখে কীভাবে আমরা সার্ভিস দেব। এ ধরনের এডিশনাল জবের জন্য কিছু লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

 

আনা ক্লিনকিক এনড্রিউস&dquote;&dquote;

ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ইভালুয়েশন অ্যান্ড ইমপ্যাক্ট বিশেষজ্ঞ, ইউএনসিডিএফ

“রিভার্স লজিস্টিকস সাপ্লাই চেইনের সক্ষমতা বাড়ায়, গ্রাহকসেবা উন্নত করে, মুনাফা বৃদ্ধি করে”

ইউনাইটেড নেশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড দীর্ঘদিন ধরে দেশে রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে আর্থিক খাতের আগামী হবে ডিজিটাল। আর্থিক খাতে প্রযুক্তিগত ট্রান্সফরমেশন ঘটছে। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে চারটি বিষয় আমরা দেখেছি। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের চারটি ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে গ্লোবালি, এক. সাপ্লাই চেইন ডিজিটালাইজেশনে মূলত সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি সাপ্লাই চেইনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। দুই. ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাপ্লাই চেইনের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। সরবরাহকারীদের মূল্যায়ন ও রেটিং পর্যালোচনার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তৃতীয়. সাপ্লাই চেইনের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, অনেক কোম্পানি বিভিন্ন ঝুঁকি যেমন— জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রস্তুত করছে। পণ্য স্টোরিং, পণ্য বহুমুখিতা, সাপ্লাই নিরাপত্তা নিয়ে নতুন নতুন চর্চা আমরা দেখতে পাচ্ছি। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের মধ্যেই কীভাবে এসব ঝুঁকি প্রতিরোধ করা যায়, তার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ. সার্কুলার সাপ্লাই চেইন কনসেপ্ট। সাধারণ ধারণায় মূলত ‘র’ প্রডাক্ট থেকে ফিনিশড প্রডাক্ট বোঝায়। কিন্তু বৈশ্বিকভাবে সার্কুলার সাপ্লাই চেইনের দিকে মনোযোগ বাড়ছে। অন্যভাবে বললে, কাঁচামাল ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহার এবং পণ্য প্রস্তুত। এটিকে বলা হচ্ছে রিভার্স লজিস্টিকস। আমরা দেখতে পেয়েছি এগুলো সাপ্লাই চেইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, গ্রাহকসেবা উন্নত করে, মুনাফা বৃদ্ধি করে। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে আমরা প্রধানত এ চারটি ট্রেন্ড দেখতে পেয়েছি। আমরা ধারণা করছি, বাংলাদেশে এ ট্রেন্ডগুলো অদূরভবিষ্যতে চালু হবে।

 

আরাফাত হোসেন&dquote;&dquote;

চ্যালেঞ্জ ফান্ড ম্যানেজার

নাথান ইনকরপোরেশন

“প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে”

প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে। সাপ্লাই চেইন ফিন্যান্সিংয়ের জন্য টেকনোলজি ইন্টিগ্রেশন ও সেসব ব্যবসাকে অন্তর্ভুক্ত করা, যেগুলো আগে আনুষ্ঠানিক ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

 

কাজি আমিনুল ইসলাম&dquote;&dquote;

এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি

“আগামী দিনে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হবে। সে অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুত হতে হবে”

যেদিন থেকে আমরা রবিনসন ক্রুসোর মতো বেরিয়ে পড়েছি, সেদিন থেকে সাপ্লাই চেইনের শুরু হয়েছে। যা-ই হোক, তিনটি বিষয় চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করছে। একটি হলো গ্লোবালাইজেশন, আরেকটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং তৃতীয় হলো প্রযুক্তি। এটি মানুষের জন্য বিপুল সুযোগ বয়ে নিয়ে এসেছে। গত তিন দশকে যে পরিমাণ সম্পদ তৈরি হয়েছে, তা আমরা আগের দশকগুলোয় কখনো ভাবিনি। একই সময় এটি অনেক চ্যালেঞ্জও বয়ে নিয়ে এসেছে। আমরা আর্থিক সংকটের কথা মনে করতে পারি, যেটির আবির্ভাবের জন্য ফিন্যান্সিয়াল ইনোভেশন বহুলাংশে দায়ী। আমরা যদি পরিস্থিতির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব, সাপ্লাই চেইন হলো গ্লোবাল, রিজিওনাল ও লোকাল। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন এতে আগ্রহী হবে? আমরা আরএমজি দিয়ে শুরু করেছি, যেটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু পুরো খাতটি শ্রমিকনির্ভর। কিন্তু শ্রমিকনির্ভর প্রতিযোগিতা সুবিধা ক্রমেই ক্ষয় পেতে শুরু করেছে। এখন জ্ঞান ও প্রযুক্তির সময়। এমনকি বাংলাদেশের আরএমজি খাত বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতা সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের কীসের প্রতি নজর দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে? আমরা নিশ্চিত, এটা শ্রমিক নয়। আমাদের প্রতিযোগী হতে হবে, আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে এবং নতুন করে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ। সাপ্লাই চেইন হলো অন্যতম একটি ক্ষেত্র। কারণ আমরা যদি আরএমজির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব, সিএমভিত্তিক সুবিধা আর নেই। অন্য অনেক ক্ষেত্র থেকে অ্যাডভান্টেজ আসছে, এদের মধ্যে সাপ্লাই চেইন রয়েছে। দ্য বেটার ইফিশিয়েন্ট ইউ আর, দ্য বেটার বটম লাইন ইউ হ্যাভ। আমাদের এক্ষেত্রে দৃষ্টি দিতে হবে। সহযোগিতা (কোলাবোরেশন) অপরিহার্য, কিন্তু ইন্টিগ্রেশনও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোলাবোরেশন অ্যামং দি এজেন্টস, ইন্টিগ্রেশনস অ্যামং দ্য সিস্টেমস (এজেন্টের মধ্যে সহযোগিতা আর সিস্টেমের মধ্যে ইন্টিগ্রেশন)।

বিশ্ব ক্রমেই আরো কাছাকাছি বা ছোট হয়ে উঠছে, তবে অবশ্যই আয়তনের দিক থেকে নয়; বরং অন্যান্য ক্ষেত্রে। আমাদের সমাজে বিভিন্ন বিভক্তি, দূরত্ব রয়েছে। এমনকি সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যেও। এ সরকারি-বেসরকারি খাত কী ধরনের সমস্যায় পড়ছে, এ খাতের ইস্যুগুলো কী তা শুনছে। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে এখনো তেমন কোনো আলোচনা হচ্ছে না। যদি সাধারণভাবে জিজ্ঞাসা করা হয়, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট কী? অনেকে বুঝবেন না। আমরা আমাদের নিয়মে কাজ করি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ইস্যুগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে হবে, যাতে নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে জানতে পারেন। এজন্য নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। দিন শেষে মানুষ যুক্তিবাদী প্রাণী। সহযোগিতা নিয়ে কথা হয়েছে। সহযোগিতার একটি অর্থ হতে পারে ইনসেনটিভ। আমরা যদি সঠিক ইনসেনটিভ পাই, তবে আমি সহযোগিতা করব। যদি না পাই তবে করব না। বিষয়টি এমন। এজন্য আমাদের সঠিক ইনসেনটিভ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আমাদের সঠিক নিয়মনীতির প্রয়োজন পড়বে। আমরা কিন্তু একা নই, অন্যরা এটি করেছে। এমন নয় যে, আমরা নতুন কিছু আবিষ্কার করেছি। প্রবলেম আর ইউনির্ভাসাল, বাট সলিউশনস আর অলওয়েজ লোকাল। আমাদের নিজেদের সমাধান কাস্টমাইজ করতে হবে। আমাদের যেমনটা প্রয়োজন পড়বে, সমাধান সেভাবে করতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে সেরা সুযোগ দিচ্ছে। সম্প্রতি জাপানিজ একটি এজেন্সি জেটরো বাংলাদেশকে পিয়ার (সমকক্ষ) দেশের সঙ্গে তুলনা করেছে। আমরা যদি দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করি, তবে অবশ্যই আমি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি প্রতিযোগীক্ষম। আমি নই কি? কারণ মুনাফা তো অবশ্যই উচ্চ। আমাদের বিভিন্ন ইস্যু রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সুযোগও রয়েছে। যেসব ইস্যু রয়েছে তা সমাধান করতে হবে। এটি আপনাদের দায়িত্ব সংস্কার ও পরিবর্তনের পেছনে লেগে থাকা। একই সঙ্গে অন্যদের জানানো যে, এ দেশে আপনারা কতটা ভালো করছেন এবং এ দেশে কী কী সুবিধা পাওয়া যায়। আমার দায়িত্বের একটি অংশ হলো পলিসি অ্যাডভোকেসি। তাই ব্যবসা-বিনিয়োগের জন্য নীতি পরিবর্তনের সুপারিশ করব এবং এটি করার জন্য আমাদের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে। আমি সামর্থ্য বৃদ্ধির ওপর বেশি জোর দেব। কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি আগামী দিনে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হবে।

 

এমএ মান্নান&dquote;&dquote;

প্রতিমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা

“আমাদের কাজ হবে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টকে এগিয়ে নেয়া”

সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি সারা বিশ্বে আলোচিত হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতি যেহেতু কৈশোর থেকে তারুণ্যের পর্যায়ে যাচ্ছে, সেহেতু তার অনেক কিছু প্রয়োজন। সাপ্লাই চেইনে দুটি প্রবাহ আছে। গুডস ও ফিন্যান্স। এ দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি সমন্বয় সাধন করা দরকার, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ হয়। সাপ্লাই চেইন নিশ্চয়ই বিশাল সাবজেক্ট, যেহেতু বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তৃত। আমাদের সরকারের দর্শন হলো, বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নেয়া। বিশ্বায়নের সুবাদে এ মুহূর্তে স্বাভাবিক কারণে আমাদের দেশে বেসরকারি খাতের প্রাধান্য প্রবল। আমাদের কাজ হলো, এটিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা, সহায়তা করা। কাজটি আমরা করে যাব। এটি আমাদের জন্য আখেরে মঙ্গল বলে বিশ্বাস করি। পাশাপাশি আমাদের দেখতে হচ্ছে যে, মূল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব জনগণের কল্যাণ এবং সর্বজনীন পরিবেশ নিশ্চিতের বিষয় দুটি আমাদের কাজের মধ্যে ফ্যাক্টরিং করতে চায়। এছাড়া আমাদের ডিজিটাল দেশ গড়ার উদ্দেশ্যের সঙ্গেও আপনাদের উদ্দেশ্যের মিল আছে। যদি আমাদের শুরু করা ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়া আপনাদের সহায়ক হয়, তাহলে মনে করব কাজটি কল্যাণকর।

 

মসিউর রহমান&dquote;&dquote;

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা

“ছোট ও মাঝারি শিল্প সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, অগ্রাধিকারভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থায় তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা”

ক্ষুদ্র পরিবার থেকে একটি বড় কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের মডেলে গেলে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ভালো করে বোঝা যায়। একটি কারখানা বা প্রতিষ্ঠান ভোক্তাদের চাহিদা অনুসারে পণ্য উৎপাদন করে। এখানে কিছু জিনিস প্রয়োজন হয়। জিতান যথার্থই বলেছেন, একটি পণ্যের সরবরাহ নিগড়ে ১৩ বা তারও বেশি পার্টিসিপেন্ট যুক্ত। যে ফার্ম মডেল আমরা জানি, সেটি প্রধানত পদানুক্রমিকভাবে একীভূত (হায়ারার্কিক্যালি ইন্টিগ্রেটেড)। তারা কাঁচামাল সংগ্রহ করে কৃষক থেকে বা কৃষি খাত থেকে। তারপর উৎপাদন প্রক্রিয়া হয় কারখানার মধ্যে। কাজেই পরস্পরের সঙ্গে পরস্পর যুক্ত। দ্বিতীয় বিষয় হলো, অধিকাংশ পশ্চিমা অর্থনীতি বিকাশ লাভ করে ওই সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক বাজারে তাদের আর্থিক প্রবেশাধিকার ছিল। যখন উপনিবেশ স্বাধীন হলো, তারা বিকাশ লাভ করে হাই-প্রটেক্টিভ ট্যারিফের আশ্রয়ে। সুতরাং এমন কোনো সময় ছিল না, যখন ফার্ম ও অর্থবান মানুষদের প্রতিযোগীদের শোষণ করে মুনাফা করার চাপ ছিল না।

সাম্প্রতিক বাণিজ্য তত্ত্বে দেখা যায়, কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠান যখন কোনো বৃহৎ বাজারে প্রবেশাধিকার পায়, তখন প্রান্তিক ব্যয় অন্তত এক পয়েন্ট কমে আসে। যদি ভোক্তা বিভিন্ন ধরনের পণ্য চায়, তাহলে বড় উৎপাদকরা বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরিতে উৎসাহী হন। এটি তাদের অধিকতর বৃহত্তর বাজারে প্রবেশে সহায়তা করে। প্রবৃদ্ধি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপলব্ধি হলো, ম্যাটেরিয়াল গুডস প্রবৃদ্ধির অর্ধেক দিক ব্যাখ্যা করে। অন্য অর্ধেক কেন ঘটে, সেটি আসলে আমরা জানি না। উৎপাদনের জন্য ম্যাটেরিয়াল গুডস কতটা সাপ্লাই করা যাবে তার একটা সীমা আছে। কাজেই প্রবৃদ্ধি ক্রমেই জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতার মতো ইন্টানজিবল বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। আমরা যদি বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইনের অংশ হতে চাই তাহলে দক্ষতা খুব আবশ্যিক শর্ত। নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রযুক্তি প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েছে। যথাযথ সামাজিক পরিবেশ থাকলে প্রযুক্তি প্রবর্তন সহজ হয়। যদি সমাজ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের বিরোধিতা করে, তখন নতুন প্রযুক্তি সংযোজনে অনেক সময় লাগে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা থাকলেও কেন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রযুক্তি সংযোজনে অনীহা? প্রতিটি প্রযুক্তির পেছনে একটি শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী মহল থাকে এবং তাদের স্বার্থের বাইরে গেলে তারা নতুন প্রযুক্তি প্রবর্তনে বিরোধিতা করে এ চিন্তা থেকে যে, এটি কর্মী চাহিদা কমানো, মজুরিতে নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি বা কিছু মানুষের ব্যবসা সংকোচনসহ নানামুখী প্রভাব ফেলতে পারে। 

জাপানে ষাটের দশকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে বৃহৎ শিল্পের সংযোগের উন্নয়ন ঘটে। এসব ছোট শিল্প বড় শিল্পের অনেক কাঁচামাল সরবরাহে ভূমিকা রাখে; যতক্ষণ বড় শিল্পগুলো নতুন প্রযুক্তি ও শ্রমিক প্রতিস্থাপনকারী প্রযুক্তি সংযোজন করেনি। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি মর্মন্তুদ বিষয়। মডার্ন ফার্ম সেক্টর রেগুলেশনের অধীন। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রেগুলেশনের অধীন নয়। জাপানের অভিজ্ঞতা বলে, তারা চাহিদার ওঠানামা অ্যাবজর্ব করেছে। কাজেই ফার্মস হেলদি থেকেছে এবং প্রেসার পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে।

সরবরাহ উন্নয়ন ও সাপ্রেস করতে ইন্ডাস্ট্রি স্ট্রাকচার সাপ্লাই চেইনে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিল্প খাতে পোশাক খাতের বিকাশ ঘটেছে। এখানে কেবল কিছুটা সাপ্লাই চেইন অপারেশন বিদ্যমান। কিন্তু চকবাজারে কয়েক লেয়ারের সাপ্লাই চেইন বিদ্যমান। তারা কাঁচামাল আমদানি করে, তারপর তা থার্ড পার্টিকে উৎপাদনের জন্য দেয় এবং তারা বিপুল আর্থিক ঝুঁকি নেয়। এটিও অন্য একটি দিক। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতি আমাদের অ্যাপ্রোচ হলো, প্রেফারেনশিয়াল ক্রেডিট নিশ্চিত করা। কিন্তু যতটা ব্যাপক (রোবাস্ট) ভেবেছিলাম, সেটি সেভাবে কাজ করেনি। কৃষি ব্যাংক বোধ হয় কিছুটা উদার। কারণ তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা রিফিন্যান্স করে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহায়তায় ব্যাংকিং খাতে সংস্কার করা হলে কৃষি ব্যাংক তার বাইরে রাখা হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল, ক্রেডিট ফ্লো না থাকলে ক্ষুদ্র শিল্প শুকিয়ে/মারা যাবে। তাই এটিকে জ্ঞাতসারে সংস্কারের বাইরে রাখা হয়েছিল। 

এক্ষেত্রে একটি সলিউশন হতে পারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অপারেশনে দক্ষতা উন্নয়ন। এটা সম্ভব। ধরুন, মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রি। মোটরসাইকেলের প্রতিটি পার্ট একই কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে তৈরির দরকার পড়ে না। কিছু পার্ট বাইরেও তৈরি করা যায়। মোটরসাইকেলের জন্য দরকার অ্যাসেম্বলি ফ্যাক্টরি, পূর্ণাঙ্গ ফ্যাক্টরি নয়। এ শিল্প ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাবে। কিন্তু বলতে হবে ৩০টি পার্টস তারা তৈরি করবে, ৩০টি পার্টস তারা ইমপোর্ট করবে এবং বাকিটা তারা আউটসোর্স করবে। এক্ষেত্রে ট্যাক্স রেজিমও সেই অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে। সেখানে বলতে হবে, ফার্মে তৈরি করলে তারা এত শতাংশ ট্যাক্স বেনিফিট পাবে। এটি হলে তারা প্রডাকশন বাড়াতে পারবে এবং তাদের মার্কেট শেয়ারও বাড়বে। একটি অর্থনীতির জন্য রেগুলেটরি রেজিম, মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং, যোগাযোগ এবং কীভাবে শিল্প কাজ করে, এসব বিষয়ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের সমস্যা রয়েছে। আমাদের অ্যাকচুয়াল ফিজিক্যাল ব্যারিয়ার রয়েছে, যা সিরিয়াসলি দেখা হয় না। উল্লিখিত বিষয়গুলো সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। এসবে উন্নতি না হলে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট দক্ষ ও কার্যকর করা সহজ হবে না।

বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অংশীদার হতে হলে দক্ষতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। আর দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনেই প্রযুক্তি এখন শিল্প ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার প্রসারেও প্রযুক্তি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাম্প্রতিক তত্ত্বে দেখা যায়, প্রযুক্তি এখন প্রতিষ্ঠানের আকার বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে আছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে অদৃশ্য কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিষয়গুলো হলো জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা। বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতগুলো সম্পর্কে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, অগ্রাধিকারভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থায় তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এ শিল্পগুলোকে এখন দক্ষতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে প্রযুক্তিগত দক্ষতা। এজন্য সরকার কী ধরনের সহযোগিতা দিতে পারে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেবে বেসরকারি খাত।

 

শ্রুতিলিখন: হুমায়ুন কবির ও সাঈদ সরকার

আলোকচিত্রী: সোহেল আহমেদ