একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা কোনোভাবে বলতে পারি না বাংলাদেশ শিল্পসমৃদ্ধ দেশ হয়েছে। পঞ্চাশ বছর আগে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল, এখনো মূলত তাই আছে। তবে এর মধ্যে কিছু শিল্প যোগ হয়েছে। আগে হয়তো এক ফসলি জমি ছিল, এখন তিন ফসলি জমি হয়েছে। এতে বিশেষত গ্রামের মানুষের মধ্যে একটা ব্যাপক পরিবর্তন চলে এসেছে। এ অর্থনৈতিক পরিবর্তনই মানুষের জীবনে সামাজিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এখন গ্রামেও তৈরি হয়েছে একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণী। নিজের একটা অভিজ্ঞতা বিনিময় করা যাক। ছোটবেলায় দেখেছি, মামলা, বিয়েশাদির কেনাকাটা, চিকিৎসক দেখানোসহ প্রভৃতি কারণে গ্রাম থেকে লোকজন আসত। শহর এলাকায় আত্মীয়স্বজন কম থাকায় তারা আমাদের বাসায় উঠত। বিগত পঞ্চশ বছরে যে পার্থক্যটা দেখছি তা হলো, গ্রামের লোকজন আমাদের বাসায় ওঠে না। তাদেরও অনেক স্বজন এখন ঢাকায় আছে। তারা এখানে চাকরি করছে, ব্যবসা করছে। গ্রামের আত্মীয়রা স্বাভাবিকভাবেই তাদের বাসায় উঠছে। এ থেকে গ্রামে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ও সময়ান্তরে তাদের পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত মেলে।
এদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাব একেবারে গ্রামেও চলে গেছে। গ্রামের প্রায় সব ঘরেই কেউ না কেউ মধ্যপ্রাচ্যে আছে, কেউ না কেউ বিদেশে আছে। কেউ না কেউ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ছে। আগে তো এত বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল না। এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৬টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৭টি। গ্রামীণ মধ্যবিত্তদের ছেলেমেয়েরা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। ঢাকা শহরে পড়ার পূর্বশর্ত হলো আর্থিক সচ্ছলতা। আগে এ ধরনের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। আমাদের সময়ে আর্থিক সচ্ছলতার অভাবে কেউ কেউ স্কুলকালীন ঝরে পড়েছে, কেউ কলেজ পাস করার পরে ঝরে পড়েছে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ পেয়েছে তারা কষ্টেসৃষ্টে এগিয়ে গেছে। এখন আর্থিক সচ্ছলতার কারণে খুব একটা ঝরে পড়ছে না। সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য সবার চোখ খুলে গেছে। বর্তমানে মানুষ তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। যদিও আমরা পুঁজিবাদী সমাজে বসবাস করছি, পুঁজিবাদী আদর্শ ধারণ করছি। বলতে দ্বিধা নেই যে পুঁজিবাদী আদর্শ ধারণ করা আর সামন্ত প্রথা চালু থাকা একই কথা। সে কারণে আমাদের জীবনযাত্রায় অন্য রকম পরিবর্তন এসেছে। আগে মানুষ বিনয়ী ছিল, কিন্তু এখন আর বিনয়ী নয়। বিষয়টিকে নানাজন নানাভাবে নেয়। তবে সত্য যে সবাই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। প্রাসঙ্গিক একটা উদাহরণ দিই। আগে শহরে-গ্রামে সহজেই গৃহপরিচারিকা পাওয়া যেত। এখন পাওয়া যায় না। নারীদের অনেকেই পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পোশাক খাতে যাওয়ার ফলে তাদের জীবনমান উন্নত হয়েছে, সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে, নিজেদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা এসেছে। আগে স্বামী নির্যাতন করলে মুখ বুজে সংসার করত। স্বাবলম্বী হওয়ায় এখন সংসার ছেড়ে চলে আসতে খুব একটা দ্বিধা করে না তারা। বলতে গেলে পরিবর্তনটা বিভিন্ন দিক থেকে হয়েছে। গ্রামীণ নারীদের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাদের মধ্যে সচেতনতার জ্ঞান হয়েছে। ভালো-মন্দ বোঝার অবকাশ হয়েছে। ছেলেমেয়েদের তারাও ভালো স্কুলে দিতে চায়, এ বোধগুলো হচ্ছে পরিবর্তনের ছাপ। পুরুষদেরও অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তিন ফসলি চাষ হওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে। কৃষকের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ এসেছে। তারা ছেলেমেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে। বাড়িতে টেলিভিশন, ফ্রিজ প্রভৃতি ইলেকট্রনিক পণ্য এসেছে। এভাবে পরিবর্তনগুলো আমরা লক্ষ করছি।
সাধারণত মধ্যবিত্তরা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে। গ্রামীণ মধ্যবিত্তদের মধ্যেও এ ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা কিছুটা লক্ষ করা যাচ্ছে। নিজেদের ঘরবাড়ির শোভাবর্ধন করছে। সুন্দর সুন্দর ছবি টাঙিয়ে রাখছে। এটা একটা রুচির পরিচয়। গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে যে তুলনায়, তার চেয়ে বেশিটুকু পরিবর্তন ঘটেছে গ্রামীণ মধ্যবিত্ত মনের। এই যে গ্রামীণ মধ্যবিত্ত বা গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তনের ফলে আমাদের সংস্কৃতিরও রূপান্তর ঘটেছে। আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে বড় কিছু উৎসব। এসব উৎসবে থাকত নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন। জারি, সারি, কিস্সা, ভাটিয়ালি, পালাগানের আসর বসত। গ্রামাঞ্চলে লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, দাঁড়িয়াবান্ধা, বলীখেলা, মোরগ লড়াই, ষাঁড় লড়াইসহ হাজারো গ্রামীণ খেলার আয়োজন করা হতো উৎসব ঘিরে। গ্রামীণ পরিসরে বাঙালির বিনোদিত মনে এ আমোদিত উৎসবগুলো ভাটার টানে বিলুপ্তপ্রায়। বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গে আয়োজন করা হতো নৌকাবাইচ। নদীপাড় এবং হাওড় এলাকায় নৌকাবাইচের মতো জনপ্রিয় খেলার আয়োজন করা হতো। আবহমান বাংলার সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে নৌকাবাইচ এক সুবিশাল এবং সুপ্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে। রংচঙে মাখানো এসব নৌকা তৈরির ব্যয়ভার বহন করাটা ছিল শৌখিনতা। আর শৌখিনতার বশেই অর্থবিত্তশালীরা গ্রামীণ কৃষক-যুবা, মজুরদের বিনোদনের জন্য নৌকা তৈরি করে দিত। এখন গ্রামীণ মধ্যবিত্তরা গ্রামীণ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখায় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এভাবে মধ্যবিত্তের চিরায়ত ভূমিকা কিছুটা হলেও তারা পালন করছেন।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে গ্রামীণ পরিসরে আসলে পরিবর্তন অনেক রকমের এসেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে দ্রুততম সময়ে এখন অনেক জায়গায় যাওয়া যায়। আয় বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। মানুষ আগের চেয়ে সচেতন হয়েছে। সবাই ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছে। গ্রামীণ মধ্যবিত্তরা ছেলেমেয়েদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে, আর্থিক সংগতি আছে বলেই পড়াচ্ছে। এখন গ্রামের ছেলেরাও বিয়ে করতে গিয়ে দেখে যে তার হবু স্ত্রী কোনো চাকরি করে কিনা, মানুষের মধ্যে একটা বোধ জন্মেছে যে একক আয়ে হয় না। দুজনের আয় হলে একটা সচ্ছলতা আসে। পরিবারের একটা উপকার হয়। বাইরে যাওয়ার একটা প্রবণতা এখন সবার মধ্যে কাজ করে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেট ব্যবহার করে এটা-ওটা পায়। এগুলো আগে কল্পনা করা যায়নি। বছর পাঁচেক আগেও এতটা উন্নতি হয়নি, এখন যতটা হয়েছে। হাতে হাতে স্মার্টফোন। ফলে পৃথিবীটা মুঠোবন্দি। গুগলে সার্চ করলেই মুহূর্তেই সবকিছু জানা যাচ্ছে। এর ছোঁয়ায় গ্রামীণ সমাজটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। পঞ্চাশ বছর আগে গ্রামে টিনের ছাদের পাঁচটি বাড়িও ছিল না। এখন পাঁচটা ঘর খড়ের, বাকিসব টিনের বা পাকাবাড়ি। বিভিন্নভাবে পরির্বতন ঘটেছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, মানুষের রুচির পরিবর্তন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও একটা পরিবর্তন এসেছে। প্রবাসীদের একটা বড় ভূমিকা এখানে বিদ্যমান। ধার-কর্জ করে বাইরে গিয়ে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠাচ্ছে। তাতে একটা পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে অনেকে আরো ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে, যদিও সবাই পারছে না। জমিজমার নিত্য হাতবদল হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পত্তন ঘটছে। মানুষের রুচিগত পরিবর্তন অনেক হয়েছে। আর্থিক সংগতি আছে বলে চিকিৎসা করতে ঢাকা শহরে চলে আসে। এগুলো তাদের আর্থিক সামর্থ্যেরই প্রতিফলন।
গ্রামীণ মধ্যবিত্তের ধ্যানধারণা এবং আচরণেও আগের চেয়ে পরিবর্তন এসেছে। আগে যেমন গ্রামের অবস্থাসম্পন্নরা কাজের লোকদের রিকশার পাদানিতে বসিয়ে নিয়ে যেত, এখন সেটি করে না। জমিদারদের বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে প্রজারা জুতা খুলে যেত। এখন সেটি নেই। এসব সামন্তীয় আচার-আচরণের অনেকটাই বদল ঘটেছে। গ্রামীণ মধ্যবিত্তদের শহরমুখী হওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। যেহেতু শহরে সবকিছুর সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চালু আছে বলেই সবকিছু রাজধানীকেন্দ্রিক। সেজন্য সবাই শহরে আসে। শহরে এলে তারা আগের তুলনায় ভালো চলতে পারে, আয় করতে পারে। ফলে গ্রামীণ মধ্যবিত্তরাও শহরমুখী হচ্ছে।
এদিকে গ্রামীণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে এখন একটা আভিজাত্যের ভাবও চলে এসেছে। সেটি এ রকম যে আমরা কৈবর্ত্য হলেও নতুন সম্বন্ধ করতে গেলে আমরা সবাই পরিবার খুঁজি। কেন খুঁজি? আমাদের একটা ধারণা যে চাকরিজীবী হলে একটা মূল্যবোধ কাজ করবে, একটা পিছুটান থাকবে—সে চাপরাশি হোক কিংবা বড় কর্মকর্তা হোক। আর যারা আত্মকর্মে নিয়োজিত তাদের কোনো রকম সাধারণ বোধ কাজ করবে না। তারা জীবনটা নিজেদের মতো করে চালায়। ওই পরিবারের ছেলেমেয়েরা যেহেতু অসীম সম্পদে বড় হয়, তাই তাদের চিন্তাধারাও অন্য রকম। চাকরিজীবী মেয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ী ছেলের বিয়ে হলে সোনায় সোহাগা। কিন্তু ব্যবসায়ী মেয়ের সঙ্গে চাকরিজীবী ছেলের বিয়ে হলে অসুবিধা হবে। তবে ব্যতিক্রমও আছে, ওই চাকরিজীবী যদি বড় করপোরেটের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয় তাহলে খুব একটা অসুবিধা হবে না। কেননা তারা ভালো বেতন পায়। সুতরাং তারা চলতে পারবে। অন্যরা পারবে না। কতগুলো ব্যাপার আছে এখানে। এ কারণে সবাই নতুন সম্পর্ক করার ক্ষেত্রে পরিবার দেখি। পরিবার মানে কোনো চাকরিজীবী আছে কিনা। থাকলে তার মধ্যে একটা মূল্যবোধ কাজ করে। তার একটা পিছুটান থাকবে বলেই সে স্ত্রীর গায়ে হাত তুলবে না। গ্রামীণ মধ্যবিত্তের মধ্যেও বিয়ের ক্ষেত্রে পরিবার দেখার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
উল্লেখ করা দরকার যে কিছু ক্ষেত্রে উদার মনোভাবের প্রতিফলন ঘটলেও গ্রামীণ মধ্যবিত্তদের কিছু আচরণগত রক্ষণশীলতা এখনো রয়ে গেছে। অনেক বাসায় কাজের লোকদের ভিন্নভাবে দেখা যায়। অনেক বাসা আছে যেখানে দুই রকমের চাল রান্না হয়। কাজের লোকদের জন্য এক রকম, নিজেদের জন্য আরেক রকম। অনেক বাসা আছে কাজের লোক বাড়ি যাওয়ার সময় ব্যাগ তল্লাশি করে। পাশাপাশি গ্রামীণ মধ্যবিত্তদের মধ্যে এখন আগের চেয়ে বেশি ধর্মীয় রক্ষণশীলতা লক্ষ করা হচ্ছে। এছাড়া রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গেও অনেকেই যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে সমাজ রূপান্তরে মধ্যবিত্তরা একটি ক্যাটালিস্ট ভূমিকা পালন করে থাকে। উল্লিখিত প্রবণতাগুলোর পরিবর্তন না হলে আমাদের দেশের গ্রামীণ মধ্যবিত্তরা সমাজ ব্যবস্থার ইতিবাচক রূপান্তরে ঐতিহাসিক ভূমিকাটি কতটা রাখতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়ের অবকাশ রয়ে যায়।
ড. নেহাল করিম: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





