অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ। ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা হয়ে নোয়াখালী ঘুরছিলাম। একের পর এক গ্রামের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। ছিমছাম সবুজ গ্রামের ভেতরকার রাস্তাঘাট-বাড়িঘর দেখে মনে হয় উন্নত এক বাংলাদেশ। অথচ এর আগের সপ্তাহেই নীলফামারী-লালমনিরহাট-রংপুরে ঘুরছিলাম। ওই এলাকার বাড়িঘরগুলোর চেয়ে ঢাকার আশপাশের এ জেলাগুলো বেশ উন্নত। কারণটাও বেশ স্পষ্ট। বিদেশে শ্রম অভিবাসন ও প্রবাসী আয়।
কুমিল্লা-নোয়াখালী-মুন্সীগঞ্জের প্রায় সব বাড়ি থেকেই কেউ না কেউ বিদেশে গিয়ে কাজ করছেন। তারা যে প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন, সেটিই এ এলাকাগুলোর গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে শক্ত ভূমিকা রাখছে। সেই তুলনায় উত্তরাঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন বেশ কম। অবশ্য উত্তরাঞ্চলের লোকজন এখন ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে কাজ করতে আসছেন। তারা ঢাকা থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন গ্রামে। এই যে দেশের বাইরে বা ভেতরে যে শ্রম অভিবাসন, সেটি কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভিতটা বেশ মজবুত করেছে। সব মিলিয়ে শ্রম অভিবাসনে বদলে যাচ্ছে বাংলদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এ উন্নয়নের চিত্রটা উঠে এসেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে জন্ম নেয় স্বাধীন এক দেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই বাংলাদেশ তখন ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ। কিন্তু পাঁচ দশক পর বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ৩৯তম অর্থনীতির দেশ। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) ধরলে ২৯তম। গত এক দশক ধরে গড়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হার ধরে রেখে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) বলছে, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বড় ২৫টি অর্থনীতির দেশের একটি হবে। শুধু যে শহরেই উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে তা-ই নয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিও এখন বেশ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। যে গ্রামগুলোতে ছিল অভাবের ছোঁয়া, সেই গ্রামেও আজ লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। এই যে গ্রামগুলোর বদলে যাওয়া, তার পেছনে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বা প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বাংলদেশের অর্থনীতি নিয়ে আমার নিজের একটা তত্ত্ব আছে। আমি বলি বাংলাদেশের অর্থনীতি হলো ইএফজির অর্থনীতি। ই মানে এক্সপার্টিয়েট ওয়ার্কার বা প্রবাসী শ্রমিক। এফ মানে ফার্মারস বা কৃষক। আর জি মানে গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স বা পোশাক শ্রমিক। মূলত এ তিন শ্রেণীর মানুষই বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত টিকিয়ে রেখেছে। এর মধ্যে অভিবাসন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিবাসন মানে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মানুষের স্থানান্তর। এই যে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে যাচ্ছে, দেশ থেকে বিদেশে সবই অভিবাসন। দেশের ভেতরে হলে সেটা অভ্যন্তরীণ আর বাইরে হলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির কারণে অস্থায়ী প্রকৃতির স্থানান্তর ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষ ১০ দেশের একটি। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন। এ প্রবাসীরা মূলত স্বল্পশিক্ষিত। মূলত তারা গ্রামের বাসিন্দা। এ প্রবাসীরা গত সাড়ে চার দশকে ২ লাখ ১৭ হাজার মিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন। বছরে এখন তারা ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন। প্রবাসী আয়ের কারণে নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেই বেশ কয়েকটি নতুন রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয়ন ৪০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে, যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। রিজার্ভের এ সুখবরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল কৃতিত্ব দিয়েছেন প্রবাসী কর্মীদের, যারা মহামারীর সংকটেও প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠিয়ে চলেছেন। অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে এবং ২০২১ সালের মধ্যে তা ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঘর স্পর্শ করবে। অথচ স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আমাদের কোনো রিজার্ভ ছিল না। ছিল ডলারের সংকট। প্রবাসীরা এ অবস্থান বদলে দিয়েছেন। সারা পৃথিবী মিলে বাংলাদেশকে যে ঋণ দেয় বা টাকা বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে আসে, তার থেকে কয়েক গুণ বেশি আসে প্রবাসী আয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রবাসীরা সারা বছরই দেশে অর্থ পাঠান। এ অর্থে চাঙ্গা হয় গ্রামীণ অর্থনীতি। সেই সঙ্গে দেশে আসে বৈদেশিক মুদ্রা। এ বৈদেশিক মুদ্রায় মেটানো হয় আমদানি খরচ। বাড়তে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ। এবার মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর পরই দেশে হঠাৎ থমকে যায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ধস নামে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। কিন্তু এ পরিস্থিতির মধ্যেও থেমে থাকেনি প্রবাসী আয়। করোনাকালে প্রবাসীদের পাঠানো এ আয় অর্থনীতির গতিকে আরো গতিশীল করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ার সুফল পাচ্ছেন অর্থনীতির অন্যান্য খাতের সুবিধাভোগীরাও। রেমিট্যান্স বাড়ার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো চাঙ্গা রয়ে গেছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে। ব্যাংকের আমানতও বাড়ছে।
বিরাট এ সাফল্যের ভাগিদার এক কোটি প্রবাসী, যার ৭৫ শতাংশই আছেন মধ্যপ্রাচ্যে। এককভাবে শুধু সৌদি আরবেই আছেন ২০ লাখ বাংলাদেশী। আরব আমিরাতে আছেন অন্তত ১৫ লাখ। এছাড়া কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইনে গড়ে তিন থেকে চার লাখ বাংলাদেশী আছেন। এছাড়া সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াতেও অনেক বাংলাদেশী আছেন। তাদের পাঠানো প্রবাসী আয় পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামগঞ্জে। বদলে যাচ্ছে সেখানকার অর্থনীতি।
বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চাকরি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে কুমিল্লা জেলার লোকজন। গত দেড় দশকে এ জেলা থেকে প্রায় ১০ লাখ লোক বিদেশে গেছেন। তালিকায় এর পরে আছে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল, ঢাকা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও ফেনী।
এ জেলাগুলোর অর্থনীতি পুরোটাই এখন প্রবাসনির্ভর। কুমিল্লার প্রবাসী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক রুবাইয়াত হাসানের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, এ জেলার গ্রামগুলোর তরুণ-যুবকরা অধিকাংশ বিদেশে। বিদেশের পাঠানো টাকায় চলে এখানকার গ্রামীণ অর্থনীতি। শুধু যে প্রবাসীদের পরিবারগুলোই এ টাকা ব্যবহার করে তা নয়, এখানকার পুরো অর্থনীতিই সচল রাখে এ প্রবাসী আয়। কৃষি হোক, মত্স্য ছোট-বড় বেশির ভাগ উদ্যোগের পেছনেই বিনিয়োগ প্রবাসীদের। বিভিন্ন গ্রামে গেলে দারুণ দারুণ সব বাড়ি দেখা যায়।
কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ আয় ও ব্যয় খানা জরিপ এবং দারিদ্র্য মানচিত্রের কথা। তাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য কম বা ধনী ১০টি জেলার সাতটিই ঢাকা বিভাগের। এগুলো হলো নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, গাজীপুর, ফরিদপুর, ঢাকা ও নরসিংদী। বাকি তিনটা জেলা হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার ও সিলেট। এ ১০টা জেলা থেকেই বিদেশে শ্রম অভিবাসন হয় সবচেয়ে বেশি। তার মানে আন্তর্জাতিক অভিবাসন এবং প্রবাসী আয় এ জেলাগুলোর অর্থনীতি বদলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ এলাকাগুলোতে নিয়মিতই বিদেশ থেকে টাকা আসছে। সচল এখানকার ব্যাংক, বিনিয়োগ, বাজার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা—সবকিছুতেই প্রবাসীদের মূল অবদান।
৬৪ জেলার মধ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের তালিকার ১১ থেকে ২০-এ আছে যথাক্রমে লক্ষ্মীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার, ফরিদপুর ও হবিগঞ্জ। এর প্রতিটি থেকে গত এক দশকে এক লাখের বেশি লোক বিদেশে গেছেন। তালিকার পরের জেলাগুলো হলো বরিশাল, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, যশোর, বগুড়া, কক্সবাজার, পাবনা, সুনামগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুষ্টিয়া।
অন্যদিকে দারিদ্র্য বেশি, এমন ১০টি জেলার মধ্যে পাঁচটিই রংপুর বিভাগের। এগুলো হলো কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট। এ পাঁচটা জেলা থেকেই বৈদেশিক কর্মসংস্থান খুবই নগণ্য। অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা অন্য জেলাগুলোর মধ্যে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, জামালপুর—এসব জেলা থেকেও বিদেশে খুব বেশি লোক কাজ করতে যায়নি। ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারীরও একই অবস্থা। তার মানে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে যে জেলাগুলো এগিয়ে আর্থিক উন্নয়নেও তারা এগিয়ে। আর যে জেলাগুলোতে লোকজন খুব বেশি বিদেশে কাজ করতে যাননি তারা এখনো পিছিয়ে।
কোনো সন্দেহ নেই, বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে যেসব পরিবার রয়েছে, তাদের যদি বিদেশে পাঠানো যেত এবং এসব পরিবারে প্রবাসী আয় আসত, তাহলে তারা দরিদ্র থাকত না। এটি করতে হলে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আরো সহজ ও সুশৃঙ্খল করতে হবে। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক জরিপ শেষে বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বলে তথ্য প্রকাশ করে, এটি কমাতে হবে।
বিএমইটির তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ছয়-সাত লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে যায়। প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ বিদেশে যায়। করোনাকলে সেটি প্রায় বন্ধ। ফিরে এসেছে প্রায় আড়াই লাখ। এগুলো কিছুটা শঙ্কার কারণ। কাজেই সামনের দিনগুলোতে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে হবে। আরো বেশি দক্ষ লোক পাঠাতে হবে। যেসব এলাকা থেকে লোকজন বিদেশে যেতে চায় না, তাদের আগ্রহী করতে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। সরকারও এজন্য দেশের সব এলাকা থেকে দক্ষ করে বিদেশে লোক পাঠাতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে উত্তরাঞ্চল থেকে সেটি কতটা সফল হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
অবশ্য উত্তরাঞ্চলের লোকজনের এই যে নিজ জেলার বাইরে কম যাওয়ার প্রবণতা, সেটি তো নতুন নয়। যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরির আগে উত্তরাঞ্চলের কত লোক ঢাকা বা অন্য শহরে কাজ করতে গেছে সেটাও একটা প্রশ্ন। তবে এই যে এখন উত্তরাঞ্চল থেকে নারীরা অনেকদিন ধরেই ঢাকায় পোশাক কারখানাগুলোতে কাজ করতে আসছে।
অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের পুরুষরা যারা ঢাকা বা অন্য শহরে যান তারা মূলত দিনমজুর। এ মানুষগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম বা যে বড় শহরেই যায়, সেখান থেকে গ্রামে পরিবারের স্বজনদের কাছে টাকা পাঠায়। এক্ষেত্রে বিকাশ বা নগদের মতো সেবা তাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। তাদের পাঠানো এ টাকাও কিন্তু গ্রামীণ অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। তার মানে দেশের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই হোক এই যে শ্রম অভিবাসন সেটাই কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির ভিতকে শক্ত করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গ্রামীণ এলাকায় শহরের তুলনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সেই স্বল্পসংখ্যক দেশের একটি, যেখানে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ জিডিপির অন্তত ১০ ভাগ। তবে অনেকেই মনে করেন এ অবদান আরো বেশি। কেবল যে দেশের বাইরে লোকজন যাচ্ছে তা-ই নয়, দেশের ভেতরেও অভিবাসন বাড়ছে। ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ সালে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পাট ও বস্ত্রশিল্প কারখানা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নগরায়ণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। স্বাধীনতার পর অতিদ্রুত নগরায়ণ ঘটে এবং পরবর্তী পর্যায়ে নগরকেন্দ্রগুলোতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকতা লাভ করে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পোশাক শিল্প-কারখানা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের শহরে অভিবাসন বাড়ছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থ যাওয়া বেড়েছে।
শহরগুলোতে যেহেতু কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রামের চেয়ে অনেক বেশি, তাই শ্রমজীবী মানুষেরাও ছুটছে শহরে। ফলে যেই বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরও কোনো শহরে ১০ লাখ লোক ছিল না, সেখানে ঢাকাতেই আজ দুই কোটি লোক। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা শহরেও জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। শহরে এই যে বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করছেন, তারা কিন্তু টাকা পাঠাচ্ছেন গ্রামে। ফলে সেখানকার অর্থনীতি শক্ত হচ্ছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পাশাপাশি নানা উদ্যোগ বাড়ছে।
তবে এতকিছুর পরও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা বিষয়ে গ্রামগুলো এখনো পিছিয়ে। সংবিধানের ১৬ নং অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতায়নের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রবাসী আয় ব্যবহার করে রাষ্ট্রের এ প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত।
তবে গত পাঁচ দশকে গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোর দারুণ উন্নতি যে হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কৃষি খাতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। শিক্ষা ও চিকিৎসার কিছুটা সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে এগুলো আরো বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি। ১৭ কোটি মানুষের এ দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু শ্রম অভিবাসনের কারণে অনেকেই কৃষিতে আগ্রহ হারাচ্ছে, অনেক সময় কৃষি শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে। এ সমস্যাগুলো সমাধানে স্থানীয়ভাবে বাজার তৈরির পাশাপাশি প্রবাসী আয়কে কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে আরো বেশি কাজে লাগানো যায়, সেটিও ভাবতে হবে।
আমরা সবাই জানি, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনকালে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৩০ সালে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়। সেক্ষেত্রে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো শক্ত ও বহুমুখী করতে হবে। কারণ মোট জনগোষ্ঠীর ৬০ ভাগের বেশি গ্রামে বাস করে। কাজেই কোনো সন্দেহ নেই গ্রাম এগোলো, এগোবে বাংলাদেশ। আর এক্ষেত্রে শহর বা প্রবাসের আয়ের সুপরিকল্পিত ও বহুমুখী ব্যবহার নিঃসন্দেহে দেশকে এগিয়ে নেবে। শুভ কামনা বাংলাদেশ।
শরিফুল হাসান: বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক





