ট্রাফিক সিগন্যালে যে সময় ব্যয় হয় মেট্রোরেলে সেই সময় কমে আসবে। যানজট, বায়ুদূষণ, গাড়ির নির্গত গ্যাস কমে যাবে। স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব কমবে। সব মিলিয়ে বহুমুখী প্রভাব পড়বে। মেট্রোরেলের নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ড. শামসুল আলম, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী

প্রথম মেট্রোরেল চালু হতে যাচ্ছে। এটা একটা ইতিহাস। কীভাবে দেখছেন?

বাংলাদেশের একটা ঐতিহাসিক স্থাপনার উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ২৮ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের প্রথম, স্কাই ট্রেন বা মেট্রোরেল অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। মেগা প্রকল্পের যুগে একটি অদ্বিতীয় প্রকল্পের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পর আমরা পদ্মা সেতু করেছি, যা প্রায় দেড় কিলোমিটার বেশি। কিন্তু পদ্মা সেতু আমরা একটি ঝুঁকিপূর্ণ নদীতে করেছি এবং নিজেদের অর্থায়নে করেছি, সেদিক থেকে সেটাও ছিল ব্যতিক্রমী। তবে আমাদের স্কাই ট্রেন বা মেট্রোরেল একেবারেই নতুন। স্বাধীনতার পর অবকাঠামোয় প্রথম পদক্ষেপ রাখলাম, যা অর্থনীতির রূপান্তরে বড় ভূমিকা রাখবে, এটা ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী আনা-নেয়া করবে। দিনে প্রায় পাঁচ লাখের বেশি যাত্রী চলাচল করবে উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত। এটি একটি বিশাল আয়োজন এই অর্থে, এত যাত্রী এত অল্প সময়ে পরিবহন করায় যথেষ্ট সময় বেঁচে যাবে। পাঁচ লাখ যাত্রীর প্রত্যেকের অর্থের সাশ্রয় হবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল ক্যাবে আসতে চাইলে ৬০০-৭০০ টাকার কমে কেউ আসতে পারবে না এবং সময়ও প্রচুর ব্যয় হবে। সিএনজি অটোরিকশা নিলেও ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার কমে সম্ভব হবে না, সেখানে ১০০ টাকায় যাতায়াত করা সম্ভব হবে অনেক কম সময়ে। উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। উদ্বোধন হবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার এমআরটি লাইন। বাকিগুলো আগামী এক বছরের মধ্যে চালু হবে। ২০১২ সালে যখন প্রকল্পটি অনুমোদন হয়, তখন এটার ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। মেয়াদ কল্পনা করা হয়েছে জুলাই ২০১২ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত। আগামী দেড় বছরে প্রকল্পটি কমলাপুরে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা। সেই অর্থে এটি বিশাল অবকাঠামো স্থাপনা। একটা নতুন উন্নত, সর্বশেষ প্রযুক্তি এতে সংযুক্ত রয়েছে। যেমন ধরুন, শব্দ নিরোধক অনেক দেশে, অনেক ব্রিজে থাকে। এখানে নতুন প্রযুক্তিতে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অত্যন্ত অত্যাধুনিক শব্দ নিরোধক ব্যবহার করার ফলে কম্পন কম হবে ও শব্দও খুব একটা শোনা যাবে না। সেই অর্থে এটা নতুন ধরনের প্রযুক্তি। মেট্রো ট্রেন বা স্কাই ট্রেন বিদ্যুতে চলবে। বিদ্যুতে ট্রেন চলাচলও একধরনের প্রথম অভিজ্ঞতা। টিকিটের সিস্টেম হবে আধুনিক। টিকিট না ঢোকালে গেট খুলবে না, টাকা দিলেই টিকিট বেরিয়ে আসবে। দোতলায় টিকিট কাটা হবে, তিনতলায় গিয়ে ট্রেনে চড়তে হবে। এভাবে বিপুল পরিমাণ যাত্রী চলাচলের কারণে যে ফলাফলটা আসবে বা লাভ হবে সেটা কিন্তু অনুমেয়। এই যে পাঁচ লাখ যাত্রীর সময় বেঁচে যাওয়া সেটাকে যদি উৎপাদনশীল কাজে লাগাই তাতে উৎপাদন সংযুক্ত হবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল ১০০ টাকায় চলে আসায় পাঁচ লাখ মানুষের অর্থের সাশ্রয় হবে। এমনকি এয়ারকন্ডিশন বাসে এলেও ১৪০ টাকার নিচে আসতে পারবে না। এই যে অর্থের বড় রকমের সাশ্রয়, সে টাকাটা যদি সে ভোগে ব্যয় করে, তাহলে ভোগব্যয়ের কারণে আমাদের দেশজ আয়ে যুক্ত হবে। ভোগব্যয়ের ফলে উৎপাদন কার্যক্রমে প্রভাব পড়বে, উৎপাদনে অনেকে যুক্ত হবে এবং উৎপাদকরা উৎসাহী হবে পণ্য উৎপাদনে। বেশি পণ্য উৎপাদনের কারণে আমাদের দেশজ আয় বাড়বে। এটা হলো টাকা সাশ্রয় ও ব্যয়ের দিক থেকে। আবার যদি টাকাটা ব্যাংকে রেখে দিই, তাহলে টাকা থেকে দেশের সঞ্চয় তৈরি হবে। পাঁচ লাখ মানুষের দৈনিক সঞ্চয় তৈরি হবে। সঞ্চয় মানেই হলো বিনিয়োগের জন্য পুঁজি তৈরি হওয়া। কর্মসংস্থান, ভোগ ব্যয়, সঞ্চয়, সময় বেঁচে যাবে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক সিগন্যালে বসে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ মুক্ত হবে। সব মিলিয়ে এর অর্থনৈতিক ফলাফল আমাদের দৃশ্যমানভাবে প্রভাবিত করবে।

ট্রাফিক সিগন্যালে যে সময় ব্যয় হয় মেট্রোরেলে সেই সময় কমে আসবে। যানজট, বায়ুদূষণ, গাড়ির নির্গত গ্যাস কমে যাবে। স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব কমবে। সব মিলিয়ে বহুমুখী প্রভাব পড়বে। সব মিলিয়ে এটা আমাদের অর্থনীতিতে ১ শতাংশ বা তার বেশি প্রবৃদ্ধিতে যোগ হবে। এটি অর্থনীতির জন্য একটি সুখকর বার্তা। আর তার থেকেও বড় কথা, এতজন মানুষের যে ঢাকা শহরে চলাচল আরামদায়ক হচ্ছে সেই বিষয়টি অভূতপূর্ব আমি মনে করি। জীবনমান বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, সেই ধরনের সুযোগ-সুবিধাও তো দিতে হবে। এসবই পরিপূরক। আমাদের আয় বাড়ছে, রুচি বাড়ছে, সে ক্ষেত্রে এ প্রকল্প আমাদের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শৃঙ্খলা তৈরি করবে, যে টিকিট দিয়ে আমি যাচ্ছি, টিকিট দিয়ে আমার গেট পার হতে হচ্ছে। এ বিষয়গুলো মানুষকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসবে। অর্থনীতির দিক থেকেও বেশ স্বচ্ছতা আসবে কারণ টাকার লেনদেন স্বচ্ছ হবে, এখানে অপব্যয়ের কোনো সুযোগ নেই, যত টিকিট কাটা হবে ততটাই কোষাগারে জমে যাবে। টিকিট না দিলে গেট খুলবে না, একজন যাবে গেট খুলবে, তারপর গেলেই আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে। আরেকজন পরে টিকিট দিয়ে ঢুকবে। এটা বিদেশেও আছে। বিদেশেও নিয়ন্ত্রিত হয় এভাবেই।

বর্তমান সরকার অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে আপনাদের কোন শক্তি কাজ করেছে?

এত সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার মূলে ছিল আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় হাত দিয়েছিলাম। ২০১০ সালে আমরা ২০২১-এ দেশ কোথায় নিয়ে যাব, মাথাপিছু আয় কত হবে—সেই স্বপ্ন ওখানে ধারণ করা ছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮-৯ শতাংশে নিয়ে যাব সেই স্বপ্ন ছিল। আমাদের কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ছিল। ২০১৫ সাল পর্যন্ত কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, ২০২০ পর্যন্ত কত কর্মসংস্থান যুক্ত হবে। এই যে আমরা বলেছিলাম মাথাপিছু আয় ২০২১ সালের মধ্যে ২০০০ ডলারে উন্নীত হবে, যদিও তা বেশি হয়েছে। ২০২০-২১-এ ২৩৫০ ডলার হয়েছে। এখন ২৮২৪ ডলার মাথাপিছু আয়। এই যে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করার চিন্তা করেছি এবং প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়ার চিন্তা করেছি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়া সেসব সম্ভব ছিল না। সেই কারণেই আমরা এসব মহাপরিকল্পনায় হাত দিয়েছি, যা অতীতে কখনো ভাবা হয়নি। তবে যখন এসব ভাবা হয়েছে তখন আওয়ামী লীগ দুই টার্ম ক্রমান্বয়ে থেকে যাবে সেটা কিন্তু ভাবা হয়নি। কিন্তু সবকিছুই ধারণ করেছে আগামী দিনকে সামনে রেখে। ২০২১ পর্যন্ত কোথায় যাব, স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমরা দেশকে কোথায় নিয়ে যাব ভাবা হয়েছে। সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী জায়গা থেকেই প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল, প্রথমে এটার সম্ভাব্যতা যাচাই করে জাইকা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই জাইকাকে আহ্বান জানায়। পরে তারা ২০০৯-১০ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করে। জাইকা থেকে সম্ভাব্যতা রিপোর্ট পাওয়ার পর, অর্থনৈতিক সুবিধাদি কী হবে, ব্যয় কী হবে এসব জানার পর সরকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করে সাহসের সঙ্গে। তার আগে থেকেই পদ্মা সেতু নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল। পদ্মা সেতু নিয়ে আগেও কথাবার্তা হয়েছে। তখন বিদেশী সহায়তায় করা হবে সেই লক্ষ্য এগিয়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এসে ঘটনাচক্রে সেটা নিজস্ব অর্থায়নে করার ঝুঁকি গ্রহণ করে। এটি অত্যন্ত সাহসী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ ছিল। এটা অবশ্যই এখন সবাই স্বীকার করবে এবং বিশ্বব্যাপীও সবাই সেভাবেই বলে থাকে। মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে আরেকটি বড় প্রকল্প বা ব্যতিক্রমী প্রকল্প হলো, নদীর নিচ দিয়ে টানেল। এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সেই সময়েও আমাদের মাথাপিছু আয় কিন্তু এত বাড়েনি। মাত্র ৫৫০ ডলার ছিল। সেই সময়েই আমরা ভেবেছি যে আমরা টানেল করব যত ব্যয়ই হোক। নদীকে রক্ষা করার জন্য। সেটা হবে বাংলাদেশে প্রথম। আশা করছি ২০২৪ সালের শুরুতে এটা উদ্বোধন হবে। সেটিও হবে বাংলাদেশের এমন ব্যতিক্রমী প্রথম পদক্ষেপ, নদীর নিচ দিয়ে টানেল নিয়ে যাওয়া। সেটিও একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প। এ মেট্রোরেলও সাহসী পদক্ষেপ ছিল আর পদ্মা সেতুর ঝুঁকিটা তো সাহসী ছিলই। অনেকের শঙ্কা, অনেকের সন্দেহ সত্ত্বেও বাংলাদেশ পদ্মা সেতুতে সাহসের সঙ্গে এগিয়েছে ও সফল হয়েছে। সেই সঙ্গে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যে চিন্তা করা হয়েছে, সেটা অনেকেই সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখে যে এত ব্যয়বহুল, এত ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও আজকাল আর ঝুঁকিপূর্ণ বলা যায় না এই কারণে যে, এমন প্রযুক্তি হয়েছে যেখানে বিকিরণ বা বিচ্ছুরণের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। সেটি করা হয়েছে স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ তৈরি করার জন্য। সেখানেও তো প্রায় ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি হবে, দুটি ধাপ সম্পন্ন হলে। সেটাও কিন্তু অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও খুব সাহসী পদক্ষেপ ছিল। এ প্রকল্পগুলো দেশের উন্নয়নের সঙ্গে, আর্থসামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে, মাথাপিছু আয় যেভাবে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে সবকিছুর চিন্তা-চেতনার মধ্যেই একটা দূরদৃষ্টি ছিল এবং প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল দেশকে এগিয়ে নেয়া ও রূপান্তর করার। সবকিছুর ঊর্ধ্বে গত ১৪ বছরে এ সরকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। সমতালে বিবেচনায় রেখেছে পরিবেশ উন্নয়নকে। যেখানে ১০০ বছরের পরিকল্পনাও করতে হয়েছে বা করা হয়েছে, যা আগামী ১০০ বছর পরিবেশ ও প্রতিবেশকে রক্ষার জন্য পথ দেখাবে। আমরা যে একটা নতুন যুগে প্রবেশ করছি নতুন নতুন প্রকল্প তৈরির মাধ্যমে সেটা আমাদের টেনে নিয়ে যাবে। একটা উন্নত দেশ গড়ে তোলার জন্য যা যা অবকাঠামো প্রয়োজন, এগুলো হবে তার ভিত্তি। আমরা একটা উন্নত দেশ হতে পারব। ২০৪১ বা তার নিকটতম পরবর্তী সময়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব। এ প্রকল্পগুলোর সাফল্য প্রমাণ দেয় যে আমরা যেখানে স্বপ্ন নিয়ে ্ন পথযাত্রা চিহ্নিত করেছি পরিকল্পনাগুলোতে, রূপকল্প ২০২১, রূপকল্প ২০৪১ বা ১০০ বছরের পরিকল্পনা, এসবই হলো দেশকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেয়ার সুচিন্তিত পদক্ষেপ। এ পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং তাতে আমরা সক্ষম হব।

অনেকেই মেট্রোরেলের টিকিটের দাম কমানোর কথা বলেছিলেন। আপনার মত কী?

একটি বিষয় বুঝতে হবে, এটা যে ব্যয়বহুল স্থাপনা করা হয়েছে, এই যে সংরক্ষণের কথা বললাম, সেই টাকাটা কিন্তু উঠে আসতে হবে। দৈনিক, মাসিক, বার্ষিক—একে পূর্ণ চালু অবস্থায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যয়ের প্রয়োজন। প্রশিক্ষণও চলমান থাকতে হবে। কারণ অনেকে ছেড়ে যায়, রিটায়ারমেন্টে যায়। তার স্থলাভিষিক্ত করার জন্য প্রশিক্ষণ চলমান রাখতে হবে, সংরক্ষণ ব্যয়ও রাখতে হবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার প্রায়, সেখানে ১০০ টাকা কী খুব বেশি? যে যানে করেই যান, রিকশা থেকে শুরু করে, সিএনজি ক্যাব বা বাস সবক্ষেত্রেই এ ভাড়া কম। এটা অনেকেই দাবি তোলে। সরকারি হলেই অনেকে মনে করে বিনামূল্যে ভোগ করব, সেই দৃষ্টিভঙ্গি এখন পাল্টানো দরকার। এখন আমি সেবা চাই। সেবার বিপরীতে যেটুকু সংরক্ষণ ব্যয়, চালু করা ও রাখার ব্যয় সেটা উঠে আসতে হবে। তা না হলে যত আধুনিক হোক বা যতই আরামদায়ক হোক একসময় ধসে পড়বে। রেল খাতে অনেক টাকা ব্যয় করা হয়েছে কিন্তু যেহেতু সেখানে টাকাটা উঠে আসেনি, কয়েক গুণ হয় ব্যয় আর আয় হয় ৪-এর ১ ভাগ। তাই রেলের পূর্ণ সেবা জনগণকে দেয়া যায় না এটা বাস্তবতা। কারণ খরচটা তো জনগণের থেকেই আবার আনতে হয়। জনগণকেই সেটা বহন করতে হবে। তাই এভাবে বহন করার থেকে যিনি সুবিধা ভোগ করবেন তার থেকেই কিছুটা তুলে আনা যুক্তিসংগত। তবে সেটা যেভাবেই হোক জনগণের থেকে উঠিয়ে নিতে হবে, তা না হলে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়, প্রশিক্ষণের ব্যয়, যন্ত্রপাতি পরিবর্তনের ব্যয় আবার জনগণের টাকা দিয়েই করতে হবে। যারা সুবিধা ভোগ করছে তাদের কাছে টাকাটা নেয়াই ইকোনমিক জাস্টিস বা অর্থনৈতিক বিচার। সেদিক থেকে এ ব্যয় অত্যন্ত যৌক্তিক, এমনকি আর একটু বেশি হলেও আমি অর্থনীতিবিদ হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে খুব একটা দোষারোপ করতাম না।

মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় বেশি হয়েছে কী?

সেখানেও একটা যুক্তি আছে। অন্য দেশের তুলনায় ব্যয় বেশি বলা হচ্ছে। অন্য দেশ সেটা কবে করেছে? একই সময়ে হলে না হয় যৌক্তিক হতে পারে। যেমন থাইল্যান্ড তৈরি করল ১৯৮৫ সালে। সেটার ব্যয় দেখে যদি বলেন, ওরা অনেক কমে করেছে তাহলে ২৫-৩০ বছর আগের করা ব্যয় আর আজকের ব্যয় কী একই হবে। ধরেন পাঁচ বছর আগে ব্যয় করেছে অন্য দেশ বা আমাদের দেশ, এখন কি সেই ব্যয় হবে? বর্তমান মূল্যে বর্তমান ব্যয়টা অধিক ব্যয় মনে হতে পারে তবে অযৌক্তিক বলব না এই জন্য যে, এ ব্যয় অনেক যাচাই-বাছাই করে করা হয়েছে। কমিটি করে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে, জানা হয়েছে। তার পরও এর গুণগত মান বজায় রাখার জন্য জাইকার সবসময়ই ব্যয়ের অংশ একটু বেশিই থাকে, সেটা আমি সরলভাবেই স্বীকার করব। কারণ তারা গুণের ক্ষেত্রে, মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করে না, সেদিক থেকে আমি বলব ঠিকই আছে। তাছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের ব্যয় কাঠামো ভিন্ন। জিনিসপত্রের দরদাম একেবারেই এক নয়। ভূ-স্তর, মাটির ধরন সেটাও একেক দেশে একেক রকম। নতুনত্বের ঝুঁকি নিতে হয়তো কিছুটা বাড়তি হতেই পারে। তবে সব ব্যয় পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই হয়।