অপেক্ষার প্রহর শেষে আলোর মুখ দেখল স্বপ্নের মেট্রোরেল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রবেশ করেছে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ে। মেট্রোর কল্যাণে রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনের পাশাপাশি নগরবাসীর জীবনমান আরো সহজ হবে। দেশের বুকে প্রথম মেট্রোরেল উদ্বোধন নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এমপি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন

দেশে প্রথম মেট্রোরেল উদ্বোধন হচ্ছে, আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ প্রথমে ব্রিটিশরা শোষণ করেছে। এরপর পাকিস্তানিরা আমাদের চরম দারিদ্র্য করে ছেড়েছে। বৈষম্যই ছিল তাদের প্রধান হাতিয়ার। এ সময় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল এ দেশ একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ হবে। দুঃখজনক সত্য হলো, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর বাংলাদেশ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। চরম দারিদ্র্য, দুঃশাসন, স্বপ্নভঙ্গ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর শাহাদত থেকে জাতি ভিন্ন কিছু পায়নি। একটা সময় বিশ্বের বুকে বাঙালি ভিক্ষুক ও মিসকিন জাতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। সে দেশটিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আসার পর নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। কিন্তু আমাদের জন্য এমন স্বপ্ন দেখা দুরূহু ছিল—এ দেশের মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামো নির্মাণ হবে এবং বাংলাদেশের জনগণ মেট্রোরেলে চড়ে নিত্যনৈমিত্তিক কাজ করবে। আজ যখন এ স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করল, এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে, সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার কাছে সত্যিই খুব গর্ববোধ হচ্ছে। ভাবতেই ভালো লাগছে, আমাদের সেই হতদরিদ্র দেশের মানুষ আজ মেট্রোরেলের অধিকারী হলো। এটা সত্যিই খুব উপভোগের বিষয় যে, উন্নত বিশ্বের মানুষ যে সুবিধা ভোগ করে নিয়মিত যাতায়াত করত, সেটা এখন আমাদের দেশের মানুষও ব্যবহার করবে। সরকারের এ অগ্রগতির ফলে আমরা গর্বিত জাতির মর্যাদা পাব। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল এ দেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার, সে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, সুপরিকল্পিত লক্ষ্য নিয়েই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এগিয়ে যাচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে পদ্মা সেতু হলো, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল হলো, রাজধানীর বুকে মেট্রোরেল হলো, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে। আমাদের খাদ্য এখন আমরা উৎপাদন করি। আমাদের শতভাগ ছেলে-মেয়ে স্কুলে যায়, আমাদের সব গ্রামে এখন স্কুল আছে। গৃহহীন মানুষের দেশ যেন কেউ আমাদের বলতে না পারে সে জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গৃহহীনদের উপহারের ঘর দেয়া হচ্ছে। এ কর্মসূচিও প্রায় সফলতার দ্বারপ্রান্তে। এসব সফলতা দেখে আমরা স্বপ্ন দেখি আগামী প্রজন্ম এ দেশকে অনেক উন্নত দেশ বানাবে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে ফাউন্ডেশন দরকার সে ফাউন্ডেশন কিন্তু হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছিল, বাঙালি জাতি যে স্বপ্ন দেখেছিল সে স্বপ্ন এখন বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে। আবারো বলছি, এসব কারণে এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গর্ববোধ করি। এ গর্ববোধ মন্ত্রী হিসেবে নয়। এখন আমাদের ফকির-মিসকিনের জাতি কেউ বলবে সে সুযোগ নেই। অন্যদিকে অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্পায়ন, ডিজিটালাইজেশন এসবের কল্যাণে আজ আমাদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮১৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। ফলে আমাদের আগামী স্বপ্নগুলোও বাস্তবায়নের বিষয়ে এখন আমরা আস্থা রাখতে পারি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।

একজন মন্ত্রীর ভাবনায় মেট্রোরেল সম্পর্কে বলুন।

মন্ত্রী হিসেবে আমি নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করি। যে নেত্রীর নেতৃত্বে আমি কাজ করছি, সে নেত্রী তার দক্ষতা ও দূরদর্শিতা দিয়ে এদেশের মানুষের অনেক সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম হয়েছেন। জনগণের সমস্যা সমাধানে তিনি শুধু স্বপ্ন দেখান না, স্বপ্ন পূরণও করেন। আমার জীবনে আমি শ্রেষ্ঠতম কর্মময় জীবন কাটানোর সুযোগ পেয়েছি আমার নেত্রীর সঙ্গে কাজ করতে পেরে। এ কর্মজীবন দেশ ও জাতির জন্য আমি উৎসর্গ করেছি।

পদ্মা সেতুর পর মেট্রোরেল একটি বড় প্রকল্প, চ্যালেঞ্জও ছিল অনেক। পদ্মা সেতুতে প্রধানমন্ত্রীর বহু সাহসী সিদ্ধান্তের গল্প শুনেছি। এক্ষেত্রে মেট্রোরেলে কী ঘটেছে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথমবার ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করেন। তখন থেকেই তিনি পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছার জন্য প্রথমে খাদ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেন। খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষককে ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের যারা অর্থায়ন করবে সে বিদেশী অর্থদাতা ভর্তুকি দেয়া যাবে না—এ শর্ত প্রদান করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের সে শর্ত না মেনে ভর্তুকি দিয়েছেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে আমদের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন করার কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে তারা বেহুদা একটা অজুহাত দেখিয়ে অর্থপ্রদান প্রত্যাহার করেছে। আমার এক বন্ধু ওয়ার্ল্ডব্যাংকে কাজ করে। সে আমকে বলল, ওয়ার্ল্ডব্যাংক তোমাদের থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহারের কারণে তোমরা খুবই ভাগ্যবান হয়েছে। কেননা, তোমরা আমাদের থেকে ঋণ না নেয়ার কারণে সুন্দরভাবে পদ্মা সেতু সম্পন্ন করতে পেরেছ। যদি এখানে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করত, তাহলে এই শর্ত ওই শর্ত দিয়ে তোমাদের কাজটি এখন যেভাবে গুছিয়ে করেছ, সেভাবে করতে পারতে না। ১০ টাকা বেশি গেলেও ব্রিজটি এখন ভালো হয়েছে। যেটা আমাদের অর্থে করলে তোমরা পারতে বলে মনে হয় না। তোমাদের যখন প্রয়োজন হয়েছে তোমরা স্বাধীনভাবে পরিকল্পনা বদলাতে পেরেছ, মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করেছ। যেটা আমাদের অর্থায়নে করলে সম্ভব হতো না। সময়ও আরো বেশি লাগত। মেট্রোরেলের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী দূরদর্শিতার প্রমাণ দেখিয়েছেন। ঢাকার যোগাযোগের অনেক বিকল্পের মধ্য থেকে তিনি মেট্রোরেলকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রমাণ করেছেন তার দক্ষতার কাছে বাঙালি জাতি জনম জনম ঋণী থাকবে।

মেট্রোরেল বাস্তবায়নে আপনার অংশগ্রহণ কেমন ছিল?

এটা পুরোটাই যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কাজ হওয়ার পরও আমার ভূমিকা কম ছিল না। বিশেষ করে ঢাকা শহরে মেট্রোরেল নির্মাণ হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে ঢাকা আমার আওতাভুক্ত শহর। আবার আমি ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান ২০২২-৩৫ (ড্যাপ)-এর সভাপতিও। ফলে মেট্রোরেল নির্মাণের ক্ষেত্রে যখনই আমাদের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয়েছে, আমি সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ড্যাপ সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্তৃপক্ষকে দ্রুত তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছি। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন এলাকায় জায়গা ছাড় দেয়া, রাজধানীবাসীর যোগাযোগ সমস্যা, মানুষের অস্বস্তিকর পরিবেশ যেন কম হয় এ বিষয়গুলো আমি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছি। বিভিন্ন মিটিংয়ে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। সমস্যা তুলে ধরে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে দিকনির্দেশনাও দিয়েছি।