দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ চালু হচ্ছে দেশের প্রথম মেট্রোরেল। স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে নগরবাসীর। নতুন এ সংযোজন রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। অসহনীয় ও তীব্র যানজট থেকে কিছুটা হলেও মিলবে মুক্তি। মেট্রোরেল কেবল পরিবহন ব্যবস্থাই উন্নত করবে না। এটি দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অবদান রাখবে। বাঁচবে কর্মঘণ্টা, ক্ষতি কমবে পরিবেশের এবং মেগা প্রজেক্টটি ঘিরে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

দিন দিন ঢাকা শহরের জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে সমস্যাও। অলসভাবে যানবাহনে বসে মূল্যবান সময় নষ্ট করছে নগরবাসী। প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা, সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছতে পারছে না মানুষ এবং দীর্ঘ সময় যানবাহনে বসে ভুগতে হচ্ছে মানসিক যন্ত্রণায়।

২০১৮ সালে বুয়েট পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ঢাকায় যানবাহনের গতিবেগ গড়ে ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার, যা হাঁটার গতির সমান। ফলে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাসে যেতে সময় লাগে ২-৪ ঘণ্টা বা তারও বেশি, যেখানে মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছতে সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট। শুরুতে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলাচল করবে মেট্রোরেল। ১২ কিলোমিটারের কিছুটা কম এ পথ পাড়ি দিতে মেট্রোরেলের সময় লাগবে ১০ মিনিটের মতো। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুসারে আগামীকাল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলাচল শুরু করবে মেট্রোরেল। শুরুতে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ট্রেন চালানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মাঝের কোনো স্টেশনে আপাতত থামবে না। স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে যাবে ১০ মিনিট পরপর। যাত্রীদের নির্দিষ্ট স্টেশন থেকেই সংগ্রহ করতে হবে ডিজিটাল টিকিট। সেই টিকিট পাঞ্চ করে ট্রেনে ওঠার জন্য প্লাটফর্মে প্রবেশ করতে পারবে যাত্রীরা। ভ্রমণ শেষে একই টিকিট পাঞ্চ করে প্লাটফর্ম থেকে বের হতে হবে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, মেট্রোরেলের চলাচল, স্টেশনে থামা, কোথায় কত গতিতে চলবে সেগুলোর পুরোটাই কেন্দ্রীয়ভাবে সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। উত্তরার দিয়াবাড়ীর ডিপোতে থাকা অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারে (ওসিসি) এগুলো নিয়ন্ত্রিত হবে। মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। সংস্থাটি জানিয়েছে, উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত পথে যেখানে লাইন সোজা, সেখানে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে এবং যেখানে বাঁক রয়েছে সেখানে কিছুটা কম গতিতে চলবে।

২০২০ সালে ‘দ্য ফিউচার প্ল্যানিং আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন ঢাকা’ শীর্ষক একটি সেমিনারে অর্থনীতিবিদরা বলেছিলেন, যানজটের কারণে ঢাকা শহরে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষয়ক্ষতি থেকে উত্তরণ এবং একটি আধুনিক পরিবহনবান্ধব শহর হিসেবে গড়ার লক্ষ্যে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ২০২৪ সালের মধ্যে তিনটি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি পথে মেট্রোরেল চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬-এর কাজ চলমান। এ লাইনের উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত উদ্বোধন করা হচ্ছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনের মতে, ঢাকার যানজট ৬০ শতাংশ কমাতে পারলে বাংলাদেশের ২৬০ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে। এর মধ্যে মেট্রোরেল প্রকল্পটি প্রতি বছর ২৪০ কোটি ডলার সাশ্রয় করবে, যা দেশের জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। তাছাড়া রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নব এ সংযোজন ঢাকার দেড় কোটির বেশি মানুষের জন্য যাতায়াত সহজ করবে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে গতিশীল করবে। সব মিলিয়ে এটি অর্থনীতিতে বড় ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে।

মেট্রোরেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক লোকবলের প্রয়োজন হচ্ছে, যা অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুসারে, প্রতিটি মেট্রো রেলস্টেশনে একটি অপারেটিং রুম, টিকিট কাউন্টার, লাউঞ্জ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট, প্রার্থনার স্থান, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, এসকেলেটর, লিফট এবং আরো অনেক কিছু থাকবে। কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে এবং আরো নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। তাছাড়া স্টেশনগুলোর আশপাশের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোয় ব্যবসা পরিচালনার জন্য একদল কর্মীর প্রয়োজন হবে। এসব কর্মসংস্থান আর্থিক কার্যক্রম বাড়িয়ে তুলবে এবং শেষ পর্যন্ত তা অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

মেট্রোরেলের কারণে মানুষের চলাচল বাড়বে এবং স্টেশনগুলোর আশপাশে অসংখ্য ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত ব্যবসা গড়ে উঠবে। উন্নত পরিবহন পরিকাঠামোর কারণে নতুন ব্যবসা বিকাশের সুযোগ পাবে এবং বর্তমান ব্যবসাগুলো উপকৃত হবে। সামগ্রিকভাবে স্টেশন ও রুটের কাছাকাছি স্থাপন করা এ ব্যবসাগুলো দেশের জিডিপিতে অবদান রাখবে।

এদিকে ঢাকার রাস্তায় চলমান সব যানবাহনই জীবাশ্মচালিত। সেগুলো পরিবেশ দূষণ করে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায়ও ঢাকা শীর্ষে রয়েছে। এক্ষেত্রে বিদ্যুচ্চালিত মেট্রোরেল রাজধানীর পরিবেশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। যেহেতু মেট্রোরেল পরিবেশবান্ধব এবং প্রতি ঘণ্টায় অনেক বেশি যাত্রী বহন করতে পারে, তাই ঢাকায় বাস ও অন্যান্য পরিবহনের মাধ্যমে যাতায়াতের প্রবণতা কমে যাবে। সব মিলিয়ে রাজধানীর পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব কমে আসবে।

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের প্রথম মেট্রোরেল যাতায়াতের সময় এবং যানবাহন পরিচালনার খরচের ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করবে। এমআরটি লাইন-৬ উত্তরা-মতিঝিল রুটে বিদ্যুচ্চালিত ট্রেনগুলো অন্য যানবাহনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে। এতে বার্ষিক দুই লাখ টন কার্বন নিঃসরণ কমে যাবে।

চলতি বছরের মাঝামাঝিতে একটি সেমিনারে মেট্রোরেল বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক মেট্রোরেল নিয়ে বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন। সেখানে বলা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকার জন্য একটি বৃহত্তর ১৩০ কিলোমিটার মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে। এতে ১২ হাজার প্রকৌশলীর কর্মসংস্থান হবে। তাছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিল্প ও পরিষেবা বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তিন গুণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে। নেটওয়ার্কটি তৈরি হলে প্রতিদিন ৫০ লাখেরও বেশি যাত্রী মেট্রোরেল ব্যবহার করতে সক্ষম হবে।

৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার লাইনটির দুটি অংশ থাকবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ লাইনসহ ১৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার ও নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত প্রায় ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার এলিভেটেড লাইন। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। উত্তরা-মতিঝিল থেকে আগারগাঁও হয়ে ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার এমআরটি লাইন-৬ নির্মাণে ব্যয় করা হচ্ছে ২২ হাজার কোটি টাকা। তবে লাইনটি কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ হলে খরচ বাড়বে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।

দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বজুড়েই ব্যাপকভাবে সমাদৃত মেট্রোরেল। এটি বিশ্বের অনেক বড় শহরে গণপরিবহনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যমও। ১৮৬৩ সালে লন্ডনে প্রথম দ্রুত ট্রানজিট সিস্টেম চালু করা হয়েছিল। ১৮৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দ্রুত ট্রানজিট রেল ব্যবস্থা চালু করে। এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ১৯২৭ সালে জাপান এবং ১৯৭২ সালে ভারত কলকাতায় মেট্রো সিস্টেম নির্মাণ শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশে মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদন হয়। এখন পর্যন্ত লাইনটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। নির্মাণ ব্যয়ের সিংহভাগ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। উত্তরা থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত লাইনটির জন্য কেনা হয়েছে ২৪টি ট্রেন। সেগুলো দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা যাবে।