তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়। সে সময় বড় ধরনের জনসমাবেশ ওখানেই হতো। ১৯৬৯ সালে সেখানে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের মিটিং ছিল। সব জাতীয় নেতা ও ছাত্রনেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেদিন প্রায় ১০ লাখ লোকের সমাবেশ ঘটেছিল। ওই সমাবেশ থেকে তৎকালীন ডাকসুর ভিসি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন।

আমি জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মিছিল সহকারে ওইদিনের সমাবেশে যোগদান করি। ঠিক মঞ্চের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে সময় ডাকসুর এজিএস ছিলেন নাজিম কামরান চৌধুরী। তিনি সে সময় ভালো বাংলা বলতে পারতেন না। তিনি সেদিন সভা পরিচালনা করছিলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দেন ‘‌নাও মিস্টার তোফায়েল আহমেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট টু ডাকসু এড্রেস টু ইউ..’ এগুলো বলে তিনি চলে গেলেন। এরপর তোফায়েল ভাই বক্তৃতা করা শুরু করেন। 

৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দান ছিল জনমানুষে জমজমাট। আমি সেদিনও স্টেজের ঠিক নিচে ছিলাম। মঞ্চে যেখানে কামাল ভাই (বঙ্গবন্ধুর পুত্র) তার ঠিক নিচেই ছিলাম। সমাবেশস্থলে জাতির পিতা আসলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে গাজীপুরের মোস্তফা সাহেব বঙ্গবন্ধুকে স্টেজে নিয়ে আসলেন। সেদিনের ভাষণটা তো ঐতিহাসিক। অলিখিত ১৯ মিনিটের সে ভাষণ আমার মনে হয় দুনিয়ার যত রাষ্ট্রনায়ক, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট; সবার বক্তব্য যদি পর্যালোচনা করা হয় ওই ভাষণটি দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ।

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বোমারু যুদ্ধবিমান সমাবেশস্থলের চারপাশে উড়ছিল। তারা মনে করেছিল যদি তখন স্বাধীনতার ঘোষণা করা হয়, তাহলে তারা বম্বিং করে সবাইকে মেরে ফেলবে। কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত বঙ্গবন্ধু সেদিন যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে দায়িত্বরত পাকিস্তানি অফিসাররাও হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন।

সে সময় আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএসের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তখন ১২-১৩ দিনের মতো ক্লাস করেছি। বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের ওই ভাষণ থেকে উজ্জীবিত হয়েই আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই। রাজনৈতিকভাবে আমরা ছিলাম বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএলএফ), যা মুজিব বাহিনী নামে পরিচিত। আমরা ট্রেনিং নিই ভারতের উত্তর প্রদেশের দেরাদুনে। পরে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের টিম লিডার ছিলেন বর্তমান গণফোরাম নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু।

বিজয় দিবসের দিন আমরা কেরানীগঞ্জের নদীর অন্য পারে ছিলাম। লোকজনের মাধ্যমেই পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের খবর পাই। একজন জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী স্যারেন্ডার করবে। দিনটি আমাদের কাছে যেমন ছিল মুক্তির আনন্দ, অন্যদিকে ছিল সঙ্গী হারানোর ব্যথায় ব্যথাতুর। আমাদের সহযোদ্ধাদের একটি অংশ যুদ্ধ শেষে ঢাকায় আসার জন্য ওইদিন নৌকায় ওঠে। মানুষ ও অস্ত্রের ভারে নৌকাটি তলিয়ে যায়।

ওই নৌকায় থাকা কেউই উঠতে পারেনি। ওই মরদেহগুলো বুঝিয়ে দিয়ে এসে বাসায় আসি। বাসায় ঢুকে আমি আমার বাবা-মাকে কদমবুসি করি, তখন দেখি আমার বাবা মায়ের চোখে পানি। আমি বললাম আজকে আনন্দের দিন তোমরা কাঁদছ কেন? তখন আমার ছোট ভাইটা জানাল আমাদের বড় ভাইকে পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে গেছে তার কোনো খবর নেই। আমি বললাম আমি খোঁজখবর নেব, চিন্তার কারণ নেই। পরে মানিকগঞ্জের এক সিপাহির খোঁজ পাই। তিনি ও আমার ভাইসহ অনেকে একই জায়গায় ছিলেন। তখন তিনি আমাকে জানালেন সবাইকে মিরপুর ব্রিজে নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা মেরে ফেলেছে। আমি বললাম আপনি কীভাবে বেঁচে ফিরলেন? তখন তিনি বললেন, যখন মিলিটারিরা গুলি করে মারছিল তখন ট্রিগার চাপার আগেই পানিতে লাফ দিই। পরে ডুব সাঁতার দিয়ে কোনো রকম বেঁচে যাই।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য