এ এস এম মইনউদ্দিন মোনেম দেশের সবচেয়ে বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানটি দেশের সবচেয়ে বড় পদ্মা সেতুর নির্মাণ সহযোগী। প্রকল্পের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি

পদ্মা সেতু, কল্পনা থেকে এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এ বাস্তবতায় আপনার মন্তব্য কী?

বাংলাদেশের গর্ব ও চিরলালিত স্বপ্ন সোনার সেতু পদ্মা বহুমুখী সেতুর শুভ উদ্বোধন হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিবচর প্রান্ত থেকে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন। আগামীকাল শুরু হবে গাড়ি চলাচল। পদ্মা বহুমুখী সেতুর বাস্তবায়ন বঙ্গবন্ধুকন্যার স্বপ্নের সফল বাস্তবায়নের আর এক বর্ণিল মাইলফলক নিঃসন্দেহে।

মানুষের প্রত্যাশা কেমন দেখছেন?

বাংলাদেশের সব মানুষ অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে সে শুভ মুহূর্তের অপেক্ষায় কখন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। তখন দুটি অঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রে আর পদ্মা নদী বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। স্বপ্নের এ সেতু বাংলাদেশের সব অঞ্চলকে একই গ্রন্থিতে বেঁধে ফেলবে। সৃষ্টি হবে নতুন এক দৃঢ় মেলবন্ধন। সবাই আছে সে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের অপেক্ষায়।

পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের গর্ব ও অহংকার। এর রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যিনি তার তুলির আঁচড়ে বাংলাদেশের ক্যানভাসে উন্নত বিশ্বের ছবি এঁকে যাচ্ছেন। একের পর এক বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে উন্নত বিশ্বের সারিতে নিয়ে চলেছেন। পদ্মা বহুমুখী সেতুর বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে নতুন মর্যাদার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।

সেতুটা যতটা বড়, তার থেকেও অনেক বড় ছিল স্বপ্নটা। সে স্বপ্ন পূরণে বাধাও এসেছে অনেক। কিন্তু লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন একজন, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার অদম্য ইচ্ছা আর প্রচেষ্টা এ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।

গর্বের এ সেতু নির্মাণে আবদুল মোনেম লিমিটেড কীভাবে যুক্ত হলো?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জটিল এ নির্মাণ কর্মকাণ্ডে তাকে সহায়তা দেয়ার জন্য ডেকে নেন তারই একান্ত আস্থাভাজন আবদুল মোনেম লিমিটেডের কর্ণধার আবদুল মোনেমকে। বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণ শিল্পে যার নিরলস ভূমিকা, দক্ষতা ও নির্ভরশীলতা সর্বজনস্বীকৃত।

স্বপ্ন বাস্তবায়নের এ যাত্রা ২০০৯ সালে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় শুরু হয় পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নের কাজ।

নকশা চূড়ান্ত হলে ২০১১-এর শুরুতে পদ্মা সেতু প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। সে বছরই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সেতুর অর্থায়নে ঋণচুক্তি সই করে সরকার।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের আওতায় মূল সেতু ছাড়াও আরো কী রয়েছে?

পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ মূল পাঁচটি ভাগে বিভক্ত ছিল, যেমন—জাজিরা প্রান্তে ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড, টোলপ্লাজা ও সার্ভিস এরিয়া-৩ নির্মাণ; মাওয়া প্রান্তে ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড, টোলপ্লাজা ও সার্ভিস এরিয়া-১ নির্মাণ; জাজিরা প্রান্তে সার্ভিস এরিয়া-২ নির্মাণ; সড়ক ও রেললাইনসংবলিত ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল ব্রিজ নির্মাণ; নদীশাসন।

শুরুতে পদ্মা সেতুর তিনটি সার্ভিস এরিয়া আর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সে দরপত্রে অংশ নেয়ার যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই করে বিশ্বব্যাংক। আহ্বান করে জাজিরা অংশের সংযোগ সড়ক নির্মাণের দরপত্র। যেখানে সবচেয়ে কম দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয় আবদুল মোনেম লিমিটেড। বিশ্বের নামকরা সব নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিশ্বব্যাংকের কাছে নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করে এএমএল তথা আবদুল মোনেম লিমিটেড।

তখনই শুরু হয় অর্থায়ন জটিলতা?

মহাসমারোহে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কাজগুলো শুরু হলেও মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থসংস্থান। শুরুতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও উন্নত বিশ্বের দাতা সংস্থাগুলো অর্থ প্রদানে রাজি থাকলেও মূলকাজ শুরুর সময়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক অর্থ প্রদানের আশ্বাস প্রত্যাহার করে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলোও অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়ায়। এতে পদ্মা সেতু নির্মাণে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণে অবিচল ও অনড় থাকেন এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে শক্ত হাতে সেতু নির্মাণে হাল ধরেন। সংকল্পে অটল থেকে এর ঠিক নয়দিনের মধ্যে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন এবং সংসদেও ঘোষণা দেন। বিশ্বব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের অনুরোধ ফিরিয়ে নেয় সরকার।

সম্পূর্ণ নতুন প্রক্রিয়ায় শুরু হয় পদ্মা সেতু নির্মাণের বন্ধ হয়ে যাওয়া কাজগুলো। নতুন করে আহ্বান করা হয় দরপত্র।

বিশ্বব্যাংক চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সহযোগীরা এ প্রকল্পে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কঠিন সে সময়ে আবদুল মোনেম লিমিটেডের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সে আস্থার প্রতিদান দিতে আবদুল মোনেম লিমিটেডেও ছিল বদ্ধপরিকর। আর ঠিক এরই সমর্থনে আবদুল মোনেম লিমিটেড মুনাফার দিকে না তাকিয়ে সবচেয়ে কম ব্যয়ে কাজগুলো করার প্রস্তাব করে। ফলে সরকারের আহ্বান করা দরপত্রের সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের কী কী কাজের সঙ্গে যুক্ত আবদুল মোনেম লিমিটেড?

২০১৩ সালের ৫ জুন, ১০ ডিসেম্বর আর ১৭ ডিসেম্বর, আবদুল মোনেম লিমিটেডের সঙ্গে পূর্বে উল্লেখকৃত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাজগুলোর জন্য তিনটি আলাদা নির্মাণ চুক্তি সই করে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেতু কর্তৃপক্ষ। প্রথম ও দ্বিতীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য সময় নির্ধারণ করে মাত্র ১২ মাস এবং শর্ত থাকে প্রতিদিনের বিলম্বে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা। শুধু প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া কথা রক্ষার জন্য জনাব আবদুল মোনেম কঠিন শর্ত মেনে কাজ শুরু করেন।

জলাভূমিতে কাজ করা ছিল খুবই দুরূহ। আবদুল মোনেম হতাশ হননি। তিনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শমতো কাজে এগিয়ে যান। বুয়েটসহ দেশের প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এ জটিল কাজটি এগিয়ে নিতে থাকেন। ড. জামিলুর রেজার (প্রয়াত) এ প্রকল্পে অবদান অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

মাওয়া প্রান্তের সার্ভিস এরিয়া ব্যবহার যোগ্য হলে ২০১৫ সালের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পদ্মা সেতুর অগ্রগতির ওপর পর্যালোচনা সভা ও ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। সুদীর্ঘ আলোচনায় সেতু নির্মাণের জটিলতা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হয় এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া সেতু নির্মাণ বিঘ্নিত হবে বলে চিহ্নিত হয়। সবাই সেতু নির্মাণে সব ধরনের সাহায্য করতে একমত প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প এলাকায় জলাভূমির নরম (লুজ) মাটিতে কাজের সমস্যার দিকে বিশেষ লক্ষ রাখার জন্য মোনেমকে অনুরোধ করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে লুজ মাটিকে দ্রুত প্রকল্প কাজের উপযোগী করার জন্য জার্মানি থেকে জরুরি ভিত্তিতে হেভি স্যান্ড পাইলিং মেশিন আমদানি করেন, যা ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। এতে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করে সবার প্রশংসা অর্জন করে।

এতকিছু কীভাবে সামাল দিয়েছে আবদুল মোনেম লিমিটেড?

দেশের সড়ক নির্মাণের অন্যতম অভিজ্ঞ আর পুরোধা ব্যক্তিত্ব এএমএলের প্রয়াত চেয়ারম্যান আবদুল মোনেমের সরাসরি নির্দেশনায় স্বপ্নের প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করে গেছে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষ কর্মিবাহিনী। ব্যবহার হয়েছে এএমএলের সুবিশাল হেভি কনস্ট্রাকশন ইকুইপমেন্ট ও যন্ত্রপাতির বহর।

অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিসহ প্রায় ২৫০ প্রকৌশলী আর পাঁচ হাজার শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাত্র চার বছরের মধ্যে আবদুল মোনেম লিমিটেড শেষ করেছে পদ্মা সেতুর সার্ভিস এরিয়া আর সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ। জাজিরা অংশে সাড়ে ১০ কিলোমিটার আর মাওয়ার দুই কিলোমিটার সংযোগ সড়কের নির্মাণ শেষ হয় ২০১৬ সালে। যার সঙ্গে এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘের পদ্মা সেতু। পর্যায়ক্রমে শেষ করে সার্ভিস এরিয়া নির্মাণকাজ। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া সময়মতো শেষ হওয়ায় সেতু নির্মাণকাজ সহজতর ও নির্বিঘ্ন হয়।

সার্ভিস এরিয়া এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে পরবর্তী সময়ে একে রিসোর্টে রূপান্তরিত করা যায়। দৃষ্টিনন্দন অভ্যর্থনা কেন্দ্র আর মোটেলের বাইরে আছে ৩০টি আকর্ষণীয় ডুপ্লেক্স বাড়ি। ব্যাডমিন্টন আর ভলিবল কোর্টের সঙ্গে সুইমিং পুল দিয়ে সাজানো এ স্থাপনা একটি আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্টে পরিণত হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের আগেই আবদুল মোনেম লিমিটেড তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করে স্বপ্নের সেতু নির্মাণে পূর্ণতা দেয়। এতে আবদুল মোনেম লিমিটেডের কর্মক্ষমতা, ইকুইপমেন্ট বহর, দক্ষ লোকবল এবং সুচারু ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা যেকোনো বড় মাপের/জটিল কাজের উপযোগী বলে সরকারি এবং বেসরকারি সব মহলে আবারো প্রমাণ হলো।

নানামুখী অনিশ্চয়তায় দেশের অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন প্রকল্পটিকে ঝুঁকির্পূণ মনে করেছে। তখন যমুনা ব্যাংক এএমএলের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রকল্প কাজে আর্থিক সহায়তা দানের জন্য। আন্তরিকভাবে তাদের ধন্যবাদ জানাই।

দীর্ঘ এ যাত্রায় সড়ক, মহাসড়ক ও সেতুমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এএমএলকে সহায়তা করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তাদের প্রতি এএমএল কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ।

পদ্মা সেতু বিনির্মাণে দেশের প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট পেশার লোকবল এত বিশাল কাজ নিজেরাই করতে পারে বলে আস্থাভাজন হয়েছে। এটা দেশের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশাল প্রাপ্তি। প্রযুক্তিগত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নতুন করে ভাবতে শিখবে।

বহু বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আজ স্বপ্নের সেতু দৃশ্যমান। এটা শেখ হাসিনা তথা বাংলাদেশের জনগণের গর্ব ও অহংকার। প্রধানমন্ত্রীর এ সাফল্যে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে, তার ঐতিহাসিক আর গর্বের এ যাত্রায় আবদুল মোনেম লিমিটেডের ওপর পূর্ণ আস্থা ও স্বপ্নের সেতু নির্মাণে সম্পৃক্ত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আশা করি আবদুল মোনেম লিমিটেডের ওপর প্রধানমন্ত্রীর আস্থা উত্তরোত্তর বাড়বে।