শামীম জেড বসুনিয়া, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। পদ্মা সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জ, জটিলতা নিরসন, রেল সংযোগ ও বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে
সেতুর নির্মাণকাজ শুরু থেকে
উদ্বোধন অর্থাৎ ২০১৪ থেকে
২০২২ সাল
পর্যন্ত কী
কী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে
হয়েছে?
পদ্মা সেতুতে মোট ৪১টি
স্প্যান। মাওয়ার
পাশে ১
নম্বর এবং
জাজিরা পয়েন্টে
৪১ নম্বর
স্প্যানটির অবস্থান।
দুই প্রান্তের
মধ্যে এক
পাশে প্রচুর
স্রোত। এ
স্রোতের মধ্যে
কাজ করা
খুবই কঠিন
ছিল। আবার
আরেক প্রান্তে
ছিল প্রচুর
পলিমাটি। এত
পলিমাটি ছিল
যে পিলার
বসানোই যাচ্ছিল
না। তখন
আবার ড্রেজিং
করতে হয়েছে।
এতে অনেক
সময় লেগেছে। দেখা যেত,
একটি ঋতু
শেষ হওয়ার
পর অনেক
পলি জমত।
এত পলি
জমত যে
কাজ করাই
কঠিন হয়ে
উঠত।
কী পরিমাণ পলি আসত?
২০-২৫
ফুট পর্যন্তও
পলি এসেছে।
সেসময় স্রোতের গতিবেগ কেমন
ছিল?
স্রোতের গতিবেগ
তিন মিটারের
বেশি ছিল।
এক পিলার
থেকে অন্য
পিলারের দূরত্ব
৪৫০ ফুট।
আর ফেরির
চওড়া ৫০
ফুট। তারপরও
ফেরির সঙ্গে
পিলারের ধাক্কা
লাগার ঘটনা
ঘটেছিল। ভাগ্য
ভালো ছিল
ফেরি উল্টে
যায়নি।
পলি আর
স্রোত ছাড়া
অন্য কোনো
চ্যালেঞ্জের মুখে
পড়তে হয়েছে?
আরেকটা চ্যালেঞ্জ
ছিল, ১২২
মিটার পাইল
করা। এ
কাজে দুই
ধরনের হ্যামার
ব্যবহার করা
হয়েছে। আমি
হ্যামার দুটির
নাম দিয়েছি
জুনিয়র হ্যামার
ও সিনিয়র
হ্যামার। জুনিয়র
হ্যামার দিয়ে
৮০ মিটার
পর্যন্ত পাইল
করা হয়েছে।
বাকিটা সিনিয়র
হ্যামার দিয়ে
করা হয়েছে।
এ কাজে
তিন-চারটি
সিনিয়র হ্যামার
ভেঙে গিয়েছে।
এগুলো রিপ্লেস
করতে অনেক
সময় লাগে।
এটিও চ্যালেঞ্জিং
ছিল। বাংলাদেশীরা
যেভাবে কাজ
করেছে, তা
প্রশংসার দাবি
রাখে। পদ্মা
সেতু তৈরিতে
ব্যবহূত পাইল,
প্লেট যেভাবে
আসত তা
খুব নিখুঁতভাবে
বাংলাদেশীরা নিয়ন্ত্রণ
করেছে। চীনারাও
করেছে। টেকনিক্যালি
বাংলাদেশীরা অনেক
কাজ করেছে।
এটা অনেক
বড় অভিজ্ঞতা।
তাহলে তো
এ কাজেও
বাংলাদেশী প্রকৌশলীরা অনেক অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। তাই না?
অবশ্যই। আমাদের
অনেক অভিজ্ঞতা
হয়েছে। অনেকে
চাকরি পাচ্ছেন।
বিদেশী অনেক
কনসালটেশনে আমাদের
লোক নেয়া
হচ্ছে। এমন
অভিজ্ঞ লোক
তারা পাবে
কোথায়?
চ্যালেঞ্জগুলোর জন্যই
কি উদ্বোধন করতে দেরি
হলো?
কখনোই না।
কারণ, এটা
চার বছরের
প্রজেক্ট না।
চার বছরের
প্রজেক্ট যারা
বলছে, তারা
কেন এটি
বলছে আমি
জানি না।
এটা কোনোভাবেই
চার বছরের
প্রজেক্ট না।
তাদের জিজ্ঞাসা
করেন তারা
কীভাবে এটা
চার বছরের
জন্য বলছেন?
তাহলে কয়
বছরের প্রজেক্ট?
এটা ন্যূনতম
৮-১০
বছরের প্রজেক্ট।
কারণ এসব
ফাইল দেখতে,
সমীক্ষা চালাতে,
জমি নিতে
কত বছর
লাগে সেটা
বুঝতে হবে।
একটা পাইলের
দৈর্ঘ্য ৪২২
ফুট। তার
সঙ্গে আবার
লোহা। আমার
অভিজ্ঞতা থেকে
বলছি, একটা
পাইলের দৈর্ঘ্য
২০ ফুট।
একটার সঙ্গে
আরেকটা পাইলের
জোড়া লাগাতে
হয়েছে। জোড়া
লাগিয়ে ৮০
ফুট করতে
হয়েছে। এসব
কাজ করতে
সময় লেগেছে।
তাহলে আট
বছর কি
সেতুটি নির্মাণের জন্য উপযুক্ত সময়?
তা না।
সাত বছরে
সম্ভব ছিল।
করোনা না
থাকলে আরো
কম সময়
লাগত। ছয়
বছর লাগত।
দেরি হওয়ার
পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কোনটিকে দেখছেন?
জমি অধিগ্রহণে
অনেক সময়
লেগেছে। তারপর
নদী শাসনের
একটা কারণ
ছিল। জায়গা
নির্বাচনের একটা
বিষয় ছিল।
সেতুর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। এ
বিষয়ে কী
বলবেন?
এটা তো
তারা বলবেই।
শোনেন, এসব
যারা করে
তারা অনেক
শিক্ষিত। অনেকে
তো বলেছিল
১০ হাজার
কোটি টাকায়
সেতু তৈরি
হয়ে যাবে।
হাজার কোটি
টাকা তো
শুধু জমি
দখলেই লেগেছে।
আমি আপনাকে
বলছি, টেন্ডার
যে প্রক্রিয়ায়
করা হয়েছে
এখানে এক
পয়সা খাওয়ার
সুযোগ নেই।
এখানে যত
চুক্তি হয়েছে,
গাড়ি কেনা
থেকে শুরু
করে সব
যন্ত্র, বোটসহ
যতকিছু ক্রয়
করা হয়েছে
সবকিছু চাইনিজদের
টেন্ডারের মধ্যে
রয়েছে। এখানে
এক পয়সার
আত্মসাতের সুযোগ
নেই। কাজের
জন্য যে
গাড়িগুলো কেনা,
এখনো ওই
গাড়িগুলোর সব
খরচ চীনা
কোম্পানি বহন
করছে। গাড়িচালকের
বেতনও তারা
দিচ্ছে। প্রথমে
যে ব্যয়
প্রাক্কলন করা
হয়েছিল, সেই
১০ হাজার
কোটি টাকা
কিছুই না।
রেলের প্রজেক্ট
হলো ৪০
হাজার কোটি
টাকা। এটা
লোহার সেতু।
লোহার দাম
কংক্রিটের চেয়ে
কত গুণ
বেশি। অনেকে
বলে দাম
বাড়ল কেন?
এটা বলাটাও
স্বাভাবিক। অনেক
জিনিসের দাম
বেড়েছে। যারা
আত্মসাতের কথা
বলে তারা
বলার জন্য
বলে। রাজনৈতিকভাবে
সরকারকে চাপে
রাখার জন্য
অনেক কথা
বলতে হয়।
তাই তারা
বলার জন্য
এসব বলে।
আপনার কাছে
পদ্মা সেতুর
বিশেষত্ব কী?
বিশেষত্ব হচ্ছে
এ সেতু
অর্থনৈতিকভাবে অনেক
গুরুত্ব বহন
করবে। বাংলাদেশসহ
বিশ্বের বিভিন্ন
দেশের মানুষ
এখন ঘুরতে
পছন্দ করে।
আবার ব্যবসার
ক্ষেত্রেও এটি
অনেক সহায়ক
হবে। এছাড়া
এ সেতু
আমরা নিজেদের
অর্থায়নে করতে
পেরেছি। আমার
মনে হয়,
এটি শুধু
অর্থনৈতিকভাবে না,
আমাদের আর্থসামাজিক
পরিস্থিতিকেও অনেক
পরির্বতন করবে;
সময় বাঁচাবে
অনেক।
প্রকৌশলগত দিক
থেকে কেমন
পরিবর্তন এসেছে?
প্রকৌশলগত দিক
থেকে আমাদের
এখন সাহস
বেড়েছে। এখন
আরেকটা সেতু
বানাতে দিলে
আমরা পারব।
আসলে বিদেশী
প্রকৌশলীরা যে
বই পড়েছেন,
আমরাও সে
বই পড়েছি।
শুধু এতদিন
আমরা সুযোগ
এবং সাহস
পাইনি, এখন
পেয়েছি। বাংলাদেশে
একসময় ক্রেনই
ব্যবহার করা
হতো না।
এখন অনেক
ক্রেন ব্যবহার
করা হচ্ছে।
পাইলের ক্ষেত্রেও
এখন আধুনিক
প্রযুক্তি ব্যবহার
হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এ
রকম সুযোগ
পেলে তা
কীভাবে ব্যবহার করবেন?
আমরা অবশ্যই
এমন সুযোগ
পেলে নেতৃত্ব
দিতে পারব।
চীনের উহানে
গিয়ে আমার
চোখ খুলে
গিয়েছে। কারণ
আমাদের দেশে
যেসব সেতু
রয়েছে তার
সবই জয়েন্ট
করা। কিন্তু
ওদের সেতুগুলোর
কোনো জয়েন্ট
নেই। ওখানে
একেকটি প্লেট
তিন বা
চার ইঞ্চি
করে রয়েছে।
পদ্মা সেতুতেও
এখন এগুলো
বসানো হয়েছে।
উহানে গিয়ে
দেখেছি, তাদের
এসব প্লেট
কম্পিউটার দিয়ে
কাটা হচ্ছে।
আমরা দেখেছি,
কাটা প্লেটগুলোর
কোয়ালিটি ঠিক
আছে কি-না।
এগুলোর একটা
কোড আছে
সেগুলোও ঠিক
আছে কি-না
দেখেছি। তাতে
কোনো সমস্যা
নেই। মোটকথা
কোনো জয়েন্ট
নেই সেগুলোয়।
সবই প্লেটের
ওপর। টেকনোলজির
অনেক অগ্রগতি
হয়েছে।
পদ্মা সেতু
দিয়ে যাত্রীবাহী বাসের পাশাপাশি অন্যান্য ভারি
যানও চলবে।
সেতু পারাপারে ওজন নিয়ন্ত্রণে কতটা কঠোর
হওয়া জরুরি
এবং সর্বোচ্চ ওজন কত
থাকা উচিত?
ওজন নিয়ন্ত্রণের
বিষয়টা অনেকে
বোঝেন না।
ওজন সমস্যা
নয়, সমস্যা
হলো ট্রাকের
চাকা নিয়ে।
অতিরিক্ত এক্সেল
রয়েছে এমন
ট্রাক নিয়ন্ত্রণ
করতে পারলে
ভালো। একটা
সেতু যখন
নকশা করা
হয় তখন
সংশ্লিষ্ট দেশের
পরিস্থিতি বিবেচনা
করেই করা
হয়। আমাদের
দেশের কথা
চিন্তা করেই
পদ্মা সেতু
তৈরি করা
হয়েছে। এজন্য
এ সেতু
নিয়ে আশঙ্কার
কিছু নেই।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূমিকম্প মোকাবেলায় কতটা
সক্ষম এ
সেতু?
মাঝে মাঝে
যদি সেতুর
পিলারে ফেরি
বা জাহাজের
ধাক্কা লাগে,
তাতে কোনো
ক্ষতি হওয়ার
সুযোগ নেই।
পদ্মায় যদি
বড় ধরনের
বন্যা বা
স্রোতও আসে,
তাহলেও কোনো
ক্ষতি হবে
না। তবে
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
বা বড়
কোনো ভূমিকম্প
হলে এ
সেতু ঝুঁকিতে
পড়তে পারে।
বিশেষ করে
রিখটার স্কেলে
ভূমিকম্পের মাত্রা
ছয় ছাড়ালে।
আমরা অনেক
সময় বলে
থাকি নয়
মাত্রা পর্যন্ত
সহনশীল। ছয়
মাত্রায় যে
ক্ষতি হয়,
সাত-এ
তার ১০
গুণ বেশি
হয়। সাত-এ
যে ক্ষতি
হয় আট-এ
তার ১০
গুণ বেশি
ক্ষতি হয়।
আর আট,
নয় হলে
তা অত্যন্ত
বিপজ্জনক হবে
এ সেতুর
জন্য।
সেতু চালুর
পর ঢাকার
ওপর যেহেতু চাপ বাড়বে,
রাজধানী কী
এ চাপ
সামাল দিতে
পারবে?
নিঃসন্দেহে চাপ
বাড়বে রাজধানীতে।
কিন্তু এ
চাপ ঢাকা
সামাল দিতে
পারবে না।
পরিস্থিতি এমনও
হতে পারে,
দেখা যাবে
সব গাড়ি
রাস্তায় দাঁড়িয়ে
আছে। একটাও
নড়ছে না।
এ সমস্যা সমাধানে কী
করণীয়?
রাজধানীর সড়কের
এ সমস্যা
সমাধানে অনেক
সার্কুলার রোড
করা দরকার
হাতিরঝিলের মতো।
আমরা হাতিরঝিলে
সার্কুলার রোড
তৈরি করে
অনেক সুবিধা
পাচ্ছি। একটু
ঘরতে হচ্ছে,
কিন্তু জ্যামের
ভয়াবহতা থেকে
রক্ষা পাওয়া
গেছে। সার্কুলার
রোড না
হলে ঢাকার
সড়কগুলোর পরিস্থিতি
খুবই খারাপ
হবে।
পদ্মা সেতুতে দুটি রেললাইন না হওয়ার
কারণ কী?
ঢাকা-চট্টগ্রামে
একটা লাইন
হলে পদ্মায়
দুটি দিতে
হবে কেন?
আমাদের আসলে
দুটি লাগে
না। ১০০
বছরের প্ল্যান
করলেও আমাদের
এত রেললাইনের
প্রয়োজন নেই।
২৪ ঘণ্টায়
কয়টি ট্রেনই
বা চলে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম
রেললাইনের বয়স
প্রায় ৮০
বছর, তাতে
তো কোনো
সমস্যা হয়নি।
তাই পদ্মা
সেতুর এক
লাইনের রেল
সড়কেও কোনো
সমস্যা হবে
না।
উদ্বোধনের দিন
পদ্মা সেতুতে ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে
না কেন?
যদিও রেলওয়ে বলছে, কাজটা
শেষ করতে
ছয় মাস
সময় লাগবে।
রেলওয়ে ছয়
মাস বললেও
কাজটি এত
সহজ না।
রেললাইন স্থাপনের
ক্ষেত্রে অনেক
কাজ এখনো
বাকি রয়েছে।
মাটি বসাতে
হবে, তারপর
রেলের লাইন,
যন্ত্রপাতি কত
কিছু বসাতে
হবে। এখনো
আমার জানা
মতে এসবের
কিছু এখনো
হয়নি।
এসব
কাজে যথেষ্ট
সময় লাগবে।
আমরা কিছু
কাজ এরই
মধ্যে শেষ
করেছি। তারা
এখন রেললাইন
বসাবে।
কেন সম্ভব
না?
ট্রেন চলাচলের জন্য যেসব যন্ত্র বা জিনিস প্রয়োজন তা আমদানি করতে হবে। আমদানি করতে সময় লাগবে। তাছাড়া রেললাইন বসাতে সময় লাগবে তাদের। পদ্মা সেতু নিয়ে অবশেষে অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। আমরা ২৫ জুন, ২০২২ উদ্বোধন করতে যাচ্ছি। আমি প্রথমে চেয়েছিলাম, গত বছরের ১৬ ডিসেম্বরে হোক। তারপর মার্চে হোক। জুনের পরে হোক এটা আমি আর চাইনি।





