নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে পদ্মা সেতু এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। এ দৈর্ঘ্য এখন এক দীর্ঘ প্রত্যাশা ও অমিত সম্ভাবনার নাম, ওই প্রস্থ নতুন এক দিগন্তের নাম, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় এক মনোবলের নাম।

এসবের বাইরে সদ্য সমাপ্ত পদ্মা সেতু নতুন এক উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। কারণ এ সেতু বাংলাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে বিশ্বের কাছে; বাংলাদেশকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবনার জায়গা তৈরি করেছে। নিজস্ব অর্থে এ রকম একটি সেতু নির্মাণ করতে সক্ষম হওয়ার ফলে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সম্ভাবনার একটি শক্ত ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কারণ বাংলাদেশের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ খুবই একটি চ্যালেঞ্জিং ছিল। চ্যালেঞ্জ ছিল শুরুর পর শতভাগ সমাপ্ত করার সফলতারও। বলা বাহুল্য, পুরো ইভেন্টে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যর্থতা নেই, পুরোটাই সফলতার। এ সফলতায়ই একটি উচ্চতম কৃতিত্ব তৈরি করে দিয়েছে এবং এ কৃতিত্বই উচ্ছ্বাসের এবং এরও কারণ রয়েছে, সেটি হলো এটি শুধু একটি বড় সেতু নির্মাণ শুরু ও শেষ করা নয়; এটি অর্থনৈতিক অগ্রগতির, ক্রমাগত জিডিপি প্রবৃদ্ধির এবং বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতির দ্বার উন্মুক্ত করেছে।

পদ্মা সেতুকে শুধু একটি সেতু হিসেবে দেখা হচ্ছে না; দেখা হচ্ছে সম্পদ হিসেবে, সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া হিসেবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাব দেখুন। তারা বলছে পদ্মা সেতুর ফলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং আঞ্চলিক জিডিপি ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়বে। অন্য এক হিসাবে সারা দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যাবে ২ দশমিক ২ শতাংশে, যা কিনা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, দারিদ্র্যের হার কমাবে প্রায় ১ শতাংশ করে, দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও অর্থায়ন ত্বরান্বিত করবে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক যে আঞ্চলিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলছে, সেটা নিয়ে চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। অন্যদিকে এ সেতুকে ঘিরে যেসব সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে তা নিয়েও চলছে নানা হিসেবনিকেশ। বলা হচ্ছে, সেতুটি রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। সেতুটি একটি বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্ম দিতে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা হতে সহায়তা করতে যাওয়ার পাশাপাশি একটি বিশেষ অঞ্চলের মধ্যে একটি কানেক্টিভ ভূরাজনীতির পরিমণ্ডল তৈরি করতে যাচ্ছে। অঞ্চলটি হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। তিনটি বিভাগের ২১টি জেলার সন্বিবেশ এ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। জেলাগুলো হচ্ছে খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা। বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী।

বলা হচ্ছে, সেতুটি এ অঞ্চলের রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক কাঠামোয়ও অনেক রদবদল ঘটাতে যাচ্ছে। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে উন্নয়ন বণ্টন বৈষম্যের যে দীর্ঘ সংস্কৃতি চলে আসছে তার ওপর বড় রকমের আঘাত করতে যাচ্ছে সেতুটি এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিষ্ক্রিয় করে দিতে যাচ্ছে এসব বৈষম্যের সব শাখা-প্রশাখা। কারণ সেতু সক্রিয় থাকলে যোগাযোগ সক্রিয় থাকবে, যোগাযোগ সক্রিয় থাকলে অর্থনীতি সক্রিয়ভাবেই নিজস্ব প্রবাহ তৈরি করতে সক্ষম হবে। আমরা যদি মোটাদাগে এসব জেলার বর্তমান অর্থনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর দিই, উপরোক্ত কথার সত্যতা পেয়ে যাব। দীর্ঘ সময় ধরেই এ জেলাগুলো সরকারি বা ব্যক্তি উদ্যোগে অর্থনৈতিক প্রবাহে সক্রিয় ছিল। সারা দেশের অনেক জেলার মধ্যে কোনো কোনো জেলা অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালীও বটে। যেমন বাগেরহাটের মোংলা বন্দর; যেমন কুষ্টিয়া, যা দীর্ঘ সময় ধরে দারিদ্র্যসীমার বাইরে থাকার সক্ষমতার একটি জেলা। এ সেতু এগুলোকে আরো বেগবান করতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা দেখছি সেতু নির্মাণ শুরু হওয়ার পর পরই এ অঞ্চলের চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতের স্বপ্নে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচ কোটি মানুষ উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর খুলনা বিভাগে বেসরকারি উদ্যোগে নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। উল্লেখযোগ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে জুট অ্যান্ড টেক্সটাইল, এলপি গ্যাস, অটো রাইস মিল, মাছের হ্যাচারি ও হিমায়িত মত্স্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস, ক্যাটল, পোলট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিড, প্রকৌশল শিল্প, রসায়ন শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যাল, ফার্টিলাইজার, কোল্ড স্টোরেজ, প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, উড অ্যান্ড পার্টিকেল বোর্ড প্রসেসিং, ডকইয়ার্ড শিল্প, সার্ভিস (সেবা শিল্প), ডেইরি প্রডাক্টস অ্যান্ড ডেইরি ফার্ম, অটোমেটিক ব্রিক ফিল্ড, প্লাস্টিক প্রডাক্টস, নির্মাণ শিল্প, পোলট্রি হ্যাচারি, পাওয়ার প্লান্ট এবং চামড়া ও টেনারি শিল্প ইত্যাদি।

এদিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বহুগুণ সম্প্রসারিত হতে শুরু করেছে। পদ্মা সেতু রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের ব্যবসা-বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে মোংলা বন্দরের যোগাযোগ বাড়িয়ে দেবে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাবে। এ কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যে মোংলা বন্দরে আমদানি ও রফতানীকৃত মালপত্র ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোয় পৌঁছানো সম্ভব হবে। ফলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মোংলা বন্দর ব্যবহারে আরো বেশি আগ্রহী হবে।

আমরা সুনীল অর্থনীতির কথা বলছি। দেশের দক্ষিণাঞ্চল এ সুনীল অর্থনীতির জনপদ। এখানে বিস্তীর্ণ এলাকা মত্স্য চাষ ও আহরণের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ আসে মূলত দক্ষিণাঞ্চল থেকে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে আছে অসংখ্য মাছের ঘের। সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। তাতে কাজ করছে অসংখ্য মানুষ। পদ্মা সেতুর ফলে নিবিড় মত্স্য চাষ উৎসাহিত হবে। রেণু পোনাসহ মাছের উৎপাদন বাড়বে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিদেশে মত্স্য প্রেরণ সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হবে। তাতে মাছের অপচয় কমবে। আয় বাড়বে ক্ষুদ্র মত্স্যচাষীদের। তাছাড়া সুনীল অর্থনীতি হবে গতিশীল। সামুদ্রিক মত্স্য আহরণের পরিমাণ বাড়বে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বলা হয় শস্যভাণ্ডার। অনেকে আবেগ দিয়ে বলেন প্রাচ্যের শস্যভাণ্ডার। কিন্তু এ ভাণ্ডারকে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। কারণ দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শস্য নিবিড়তা অপেক্ষাকৃত কম। অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের অন্য অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব অনেকটাই সফল হয়েছে। এটার প্রধান কারণ যোগাযোগের অসুবিধা, যা জন্ম দিয়েছে উপকরণ পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা। এতে উৎপাদিত পণ্য বিপণনে দুর্ভোগ। যার ফল অর্থ আয় প্রবাহে দুর্বলতা। পদ্মা সেতু এ অঞ্চল থেকে এ সীমাবদ্ধতা দ্রুত তুলে নেবে। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ত্বরান্বিত করবে। বিপণন সহজ হওয়ার কারণে দ্রুত বেড়ে যাবে শস্যের উৎপাদন। গড়ে উঠবে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা। সেখানে মানুষের বাড়বে কর্মসংস্থান, বাড়বে আয়।

পদ্মা সেতুর ওপারে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে রয়েছে ফসল চাষের বিস্তীর্ণ জমি। শাকসবজি ও মসলাজাতীয় ফসল উৎপাদনের জন্য এসব জমি খুব উপযোগী। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় এখানে ফসলের পচনশীলতা কমবে। বিভিন্ন শাকসবজি এবং মসলা ফসলের, বিশেষ করে পেঁয়াজ ও রসুনের উৎপাদন বাড়বে। এ তিন জেলার চরাঞ্চলের বাদাম ও পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়বে। বাড়বে উৎপাদন। গড়ে উঠবে পাটভিত্তিক শিল্প। বরিশাল ও পটুয়াখালীজুড়ে প্রচুর তরমুজ উৎপাদন হয়। দেশের বিশেষ কিছু অঞ্চল ব্যতীত রাজধানীর দুই কোটি মানুষের বাজারে তা আসা খুবই কষ্টকর। কারণ যোগাযোগ অপ্রতুলতা। অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণের অসুবিধাসহ বিপণন সমস্যার কারণে কৃষক তরমুজ চাষে তেমন লাভবান হন না। পদ্মা সেতু এ সমস্যা দূর করবে। দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরে নারকেল ও সুপারির চাষ হয়। সমতলে হয় পান ও তেজপাতার। পটুয়াখালীতে মুগ ডালের চাষ হয় বাণিজ্যিকভাবে। সেতুর ফলে এসব কৃষিপণ্য বাণিজ্য ধরতে পারবে। এতে চাষ উৎসাহিত হবে ব্যাপকভাবে।

কুষ্টিয়ার খাজানগরে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম। এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় চাল শিল্প এলাকা। দেশের চালের চাহিদার ৩০ শতাংশ জোগান হয় খাজানগর থেকে। কুষ্টিয়া জেলা খাদ্য অফিস সূত্র দেখাচ্ছে, খাজানগরসহ আশপাশের এলাকায় বর্তমানে ৪২টি অটো (স্বয়ংক্রিয়) রাইস মিল ও হাসকিং (ম্যানুয়াল) মিল আছে চার শতাধিক। প্রতিদিন এ মোকামে চার হাজার টন চাল উৎপাদন হয়। এখান থেকেই দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে প্রতিদিন গড়ে ২০০ ট্রাক চাল যায়। যার বাজারমূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা। এছাড়া খুদ, গুঁড়া, পালিসসহ অন্যান্য অংশ মিলিয়ে প্রতিদিন খাজানগর মোকামে ২০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। তাই এলাকায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শাখাও রয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান খাজানগরে। প্রায়ই হঠাৎ বেড়ে যায় চালের দাম। এর প্রভাবক প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি হচ্ছে অল্প খরচের যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব। চালের বড় বাজার রাজধানী। অথচ সেখানে চাল সরবরাহ খুবই কষ্টসাধ্য। পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করে দেবে। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার বেসরকারি ওয়্যার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বিশ্বজুড়ে যার খ্যাতি বিআরবি গ্রুপ একাই জেলার জিডিপির প্রায় দুই ভাগ অবদান রেখেছে।

বদলে যাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের চিত্র। ভোগান্তির যে চিত্র দেখে আসা হচ্ছে সেটি এখন স্বস্তির অপর নাম। পদ্মা সেতু চালু হলে চিরায়ত রূপ পাল্টে যাবে নৌরুটটির। পাশাপাশি কমবে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর অপেক্ষা করতে হবে না দক্ষিণবঙ্গের মানুষের। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) বলছে, পদ্মা সেতু চালু হলে এ নৌরুটের যানবাহন চাপ কমে যাবে প্রায় ৪০ শতাংশ। তখন যানবাহনগুলোকে আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। এটি সম্ভব হলে খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঢাকা জেলার রাজবাড়ী আরো বাড়তি সুবিধা পাবে। অতি স্বল্প সময়ে এ জেলাগুলো ঢাকা ছুঁতে পারবে।

তথ্য বলছে, পদ্মা সেতুর কারণে এ ২১ জেলার কোনো কোনো অংশে জায়গা-জমির দাম অনেক বেড়ে গেছে। সেতুর এপাশে মুন্সীগঞ্জ এবং ওপাশে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে বহু মানুষ এখন নতুন স্বপ্ন দেখছে। লেবুখালী সেতু উদ্বোধনের পর বরিশালের সঙ্গে পটুয়াখালী জেলার আর কোনো ফেরি চলাচলের প্রয়োজন হচ্ছে না। এখন ঢাকার সঙ্গেও যানচলাচল সহজ হয়েছে। তাতে ফেরি পারাপারের ও লঞ্চে চলাচলের দুর্ভোগ ঘোচানো সম্ভব হয়েছে। ওই অঞ্চলে দ্রুত বেড়েছে জমির দাম। তাছাড়া পদ্মা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত এলাকায় নদীশাসনের ফলে অনেক কৃষিজমি নদীভাঙন থেকে রেহাই পেয়েছে।

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ এ বাংলাদেশ, যার সিংহভাগজুড়েই রয়েছে নদী। এ নদীমাতৃক বৈশিষ্ট্য এ ভূখণ্ডকে যেমন দিয়েছে উর্বব পাললিক ভূ-ভাগ, তেমনি নদীশাসনে আমাদের সক্ষমতার অভাবে এ নদীই হয়েছে অনেক বেদনার কারণ। বড় দুটি নদী যমুনা ও পদ্মা রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে। এ সেতু নির্মাণে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগে সক্ষম হলো। এটি মানুষের সক্ষমতার ক্ষেত্রকে অনেক সম্প্রসারিত করবে। এ অঞ্চলে পাটকল, চালকল পুরো মাত্রায় বিকশিত হবে। তৈরি হবে ইপিজেড এলাকা। মোংলা, পায়রাবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুন্দরবন ও সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।

ইতিহাস বলছে, পূর্ব থেকে নিজ ভূখণ্ডেই সমৃদ্ধ ছিল বাংলা জনপদ; ছিল একটি দেশজ সমৃদ্ধি, যা এ অঞ্চলকে দিয়েছিল এক কোমল সামাজিক পরিবেশ। যেখানে সুখ-ঐশ্বর্য ও শান্তি বিরাজমান ছিল একটি অব্যাহত ধারার মতো, সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলার এক বাংলা। একই কারণে এ অঞ্চলের ওপর লোলুপ দৃষ্টিও ছিল বিভিন্ন শাসক-শোষক ও স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠীর। নানা কৌশল, যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এক সময় তারা অনেকেই সফলও হয়। এ ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশের ১৯০ বছর, পাকিস্তানের ২৫ বছর ছিল শুধু ধারাবাহিক শোষণ, শাসন আর লুটতরাজ। এ বাংলায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক যে বিপর্যয় সেটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের সূত্র ধরেই। পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে সব শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামও ছিল অঞ্চলের মানুষের। দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহানায়ক ছিলেন এ ভূখণ্ডেরই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমাদের জাতির পিতা। বাংলাদেশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত পরিকল্পনা, তার দীর্ঘ লালিত সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের লক্ষ্য ধরেই শেখ হাসিনার সুযোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।

 

ড. আমানুর আমান: লেখক ও গবেষক