প্রায় ৩০০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে আসছে রেজিস্ট্রেশন বিভাগ। বর্তমানে এ বিভাগটি শুধু দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তির স্বত্ব হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত নয়; জাতীয় রাজস্ব আহরণেও এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। গত বছর এ খাত থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা সরকারি রাজস্বে যুক্ত হয়েছে। মানুষের সম্পত্তির অধিকার ও লেনদেনের আইনগত প্রমাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটি দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। ২০১৭ সাল থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিদপ্তর থেকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা, নিয়োগবিধি প্রণয়ন এবং কর্মকর্তাদের পেশাগত মর্যাদা ও পদোন্নতির সুযোগ সম্প্রসারণ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বর্তমানে কর্মকর্তাদের দ্বিতীয় গ্রেড পর্যন্ত পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর। দলিল ডিজিটাইজেশন, পুরনো নথি আর্কাইভিং, দ্রুত তথ্য অনুসন্ধান এবং মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে সরকার ৬৩২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছে। এর পাইলট কার্যক্রম চলছে। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে দলিল সংরক্ষণ ও অনুসন্ধানের পাশাপাশি সেবাগ্রহীতার ভোগান্তিও কমবে।

তবে ডিজিটালাইজেশন শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়; এর মূল লক্ষ্য হতে হবে সেবাকে দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ করা। একজন মানুষ যেন একটি সেবা নিতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে না হয়, সেটিই প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আমরা সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, অর্থাৎ জনগণের সেবক। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় একটি ছোট বিষয়কে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তোলা হয়। আইন ও বিধিবিধান অবশ্যই মানতে হবে, কিন্তু এর প্রয়োগে মানবিকতা ও নমনীয়তার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ। এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যেখানে আইন মেনে চলার নাম করে একজন সেবাগ্রহীতার স্বাভাবিক কাজটি কঠিন হয়ে পড়ে।

একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি নিজেকে সেবাগ্রহীতার জায়গায় কল্পনা করেন, তাহলে মানুষের ভোগান্তি বোঝা অনেক সহজ হয়। আমি যে চেয়ারে বসে সেবা দিচ্ছি, সেখানে যদি অন্য কেউ বসতেন আর আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সেবা নিতে আসতাম, তাহলে যে সমস্যার মুখোমুখি হতাম, সে সমস্যাই হয়তো আজ অন্য একজন মানুষ মোকাবেলা করছে। এ উপলব্ধি প্রশাসনিক আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে।

মানুষকে অকারণে ঘোরানো, একটি কাজের জন্য বারবার দপ্তরে আসতে বাধ্য করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করাও এক ধরনের অনিয়ম। সেবাগ্রহীতার সময় ও শ্রমের মূল্য আছে। তাই সরকারি সেবার ক্ষেত্রে ভালো আচরণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত ও জনবান্ধব মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমি যে জেলায় দায়িত্ব পালন করছি, সে মুন্সিগঞ্জকে নিয়েও আমার একটি স্বপ্ন রয়েছে। আমার বিশ্বাস, উন্নয়ন বড় কোনো পরিকল্পনা দিয়ে শুরু হয় না; বরং ছোট পরিসরের পরিবর্তন থেকেই এর সূচনা। একটি পরিবার উন্নত হলে তার প্রভাব সমাজে পড়ে, কয়েকটি পরিবার বদলালে একটি গ্রাম বদলায়। এভাবে গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা—একটি পর্যায়ের পরিবর্তন অন্য পর্যায়ের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। শেষ পর্যন্ত এর সম্মিলিত প্রভাব পড়ে পুরো দেশের ওপর।

এ ভাবনা থেকেই মুন্সিগঞ্জের রেজিস্ট্রেশন কার্যালয়কে আরো সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব করার চেষ্টা হচ্ছে। দায়িত্ব নেয়ার সময় ভবন ও আশপাশের পরিবেশ ছিল অনেকটাই অব্যবস্থাপনার মধ্যে। সরকারি বরাদ্দ এনে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ করা হয়েছে। অফিস প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেয়া, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সতর্কতা এবং সেবাগ্রহীতাদের বসার ব্যবস্থা করার মতো ছোট উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই একটি প্রতিষ্ঠান আধুনিক হয় না। প্রয়োজন কর্মীদের জবাবদিহি ও সেবার মান নিশ্চিত করা। এজন্য নিয়মিত পরিদর্শনের পাশাপাশি আকস্মিক পরিদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে অফিসের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগও রয়েছে। কোথাও সেবার ঘাটতি বা মানুষের ভোগান্তি চোখে পড়লে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।

প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কষ্ট কমানো। আমরা শতভাগ সফল হয়েছি—এ দাবি করার সুযোগ নেই। মানুষের আচরণ, প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের অভ্যাসে পরিবর্তন আনতে সময় লাগে। অনেক সময় সাময়িকভাবে কোনো পরিবর্তন এলেও কিছুদিন পর আবার পুরনো অভ্যাস ফিরে আসে। তাই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিক রাখতে হবে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আইন ও বিধিবিধান মেনে দ্রুততম সময়ে জনগণকে সেবা দেয়া, মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া। একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কেবল নতুন ভবন, প্রযুক্তি বা বড় প্রকল্পের মাধ্যমে হয় না; মানুষের সঙ্গে আচরণ, কাজের গতি ও সেবার মানও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

রেজিস্ট্রেশন বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর সে পরিবর্তনের বড় একটি সুযোগ। দলিলের ডিজিটাল সংরক্ষণ, দ্রুত তথ্য অনুসন্ধান এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু হলে মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং সেবার স্বচ্ছতা বাড়বে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন মানবিক প্রশাসন। কারণ শেষ পর্যন্ত সরকারি সেবার কেন্দ্রবিন্দু প্রযুক্তি নয়, মানুষ।

বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রত্যেককে নিজের দায়িত্বের জায়গা থেকে কাজ করতে হবে। দেশের প্রতি ভালোবাসা শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; মানুষের সেবা, অধিকার নিশ্চিত করা, তার সময় ও শ্রমের মূল্য দেয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা তৈরি করাই হতে পারে দেশপ্রেমের বাস্তব প্রকাশ। রেজিস্ট্রেশন বিভাগও সে লক্ষ্যেই আরো দক্ষ, স্বচ্ছ, ডিজিটাল ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে চায়।