কখন মনে হয়েছিল বা আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে কাজ করবেন? আর সে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণটা কী ছিল?

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভেবেছিলাম ১৯৪৭ থেকে পাকিস্তানের ঘটনাবলি, তৎকালীন ইতিহাসের ওপরে একটি বই লিখব। সেজন্য তথ্য সংগ্রহ করার সময় আমি খেয়াল করলাম প্রচুর তথ্য রয়েছে এ বিষয়ে (ভাষা আন্দোলন)। ভাষা আন্দোলন নিয়েই একটি আলাদা বই হতে পারে। প্রথমে ভাবলাম একটি ১০০-১৫০ পৃষ্ঠার বই হবে। পরে দেখলাম একটি বড় বই হয়ে গেল। বইয়ের ভূমিকায় আমি লিখেছিলাম, ভেবেছিলাম একটি ছোট বই কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রথম খণ্ড লেখার পর আরো একটি খণ্ডও লাগবে। কিন্তু বই লিখতে গিয়ে এমন পরিস্থিতি হলো দ্বিতীয় খণ্ডেও শেষ হলো না। এত তথ্য ছিল তিন খণ্ডে ভাষা আন্দোলনের বই লেখা হলো।

‘‌পূ্‌র্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থ রচনার প্রস্তুতি পর্বটি কেমন ছিল? তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা পদ্ধতি নির্ধারণ করতে কি শুরুতেই পরিকল্পনা করে নিয়েছিলেন?

তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে আমি অনেক জায়গায় লিখেছি। এ কাজ খুব কঠিন ছিল। একটি বিষয় লিখতে গেলে গবেষকরা তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে লাইব্রেরির সাহায্য নেন। সেসব তথ্য ব্যবহার করেন। কিন্তু ইতিহাস লেখার সময় আমি মধ্যযুগ বা প্রাচীন কোনো অতীতের ইতিহাসের বই তেমন লিখিনি। মূলত আমি কন্টেম্পরারি হিস্টোরিয়ান বা সমকালীন ইতিহাসবিদ। ভাষা আন্দোলনের সময়ে বিশেষত খবরের কাগজের সংখ্যাও খুব সামান্য ছিল। মাত্র দু-তিনটি খবরের কাগজ ছিল, সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। এছাড়া অন্য কোনো লেখালেখি ছিল না।

আমি ১৯৭০ সালে আমার বইটি যখন প্রথম প্রকাশ করেছিলাম তার আগ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো বই লেখা হয়নি। কেবল লেখা হতো ছাত্ররা আন্দোলন করেছিল, ছাত্ররা গুলি খেয়ে মারা গেছে, ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে। দেখানো হতো এটি ছিল মূলত শিক্ষিত লোকদের আন্দোলন। ভাষা শিক্ষিত লোকদের ব্যাপার। সেখানে অন্য কারো কথা একেবারেই আসেনি। মনে করা হতো কৃষক বা শ্রমিক ও যারা শিক্ষিত নয় তাদের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল চিন্তা। কারণ ভাষা জিনিসটি গরিবের জন্য আরো অনেক বেশি দরকার। যারা মধ্য শ্রেণীর শিক্ষিত লোক তাদের টাকা-পয়সা আছে, শিক্ষা আছে। তাদের অনেকেই ইংরেজি জানে, তখন অনেকে উর্দুও জানত। কিন্তু কৃষক, শ্রমিক তাদের বাংলা ভাষা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাই ভাষার ওপর আক্রমণ শিক্ষিত লোকের ওপর যত না পড়ে, গরিব লোকের ওপর তার চেয়ে অনেক বেশি পড়ে। সেজন্যই ব্যাপকভাবে গরিব লোকেরা ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। আমার বইয়েও কিছু উদাহরণ আছে, যেখানে গরিব লোকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে। ১৯৭০ সালে আমিই প্রথম বললাম যে ভাষা আন্দোলনের উত্থান, গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশের কৃষক-শ্রমিকদের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্দোলনকে আমি উপস্থিত করার চেষ্টা করেছি। ভাষা আন্দোলন শুধু ছাত্র, শিক্ষক বা শিক্ষিতদের নয়। এটি একটি গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। এর সঙ্গে যে শিক্ষা নীতি অন্য সরকারি নীতিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আছে এটি প্রমাণ করতে আমি নানা রকম তথ্য সংযুক্ত করেছি। এ তথ্যগুলো আমি বহু লোকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছি। কারো থেকে একটি-দুটি লিফলেট পেয়েছি ও পুস্তিকা নিয়েছি। এমনকি আমি তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে তার ডায়েরিও নিয়েছিলাম। তখন যে কয়টি পত্রিকা ছিল সেগুলো থেকে তথ্য নিয়েছিলাম। ঢাকায় ছিল তমদ্দুন মজলিসের সৈনিক আর সিলেট থেকে বের হতো মাহমুদ আলীর নও বেলাল। এ দুটো পত্রিকা খুবই সাহায্য করেছিল। এছাড়া আমি কিছুদিন কলকাতার কিছু নিউজ পেপারের লাইব্রেরিতেও কাজ করেছিলাম। সিলেটে একটি লাইব্রেরি ছিল, মুসলিম সাহিত্য সংসদের লাইব্রেরি। সেখানেও আমি কিছুদিন কাজ করেছিলাম। এভাবে আমি তথ্য সংগ্রহ করেছি। শহীদুল্লা কায়সার আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির গোপন ডকুমেন্টগুলো এনে দিয়েছিলেন। তাদের লিফলেটগুলো দিয়েছিলেন। আমাকে তিনি ’৫২ সালে ইনার পার্টি সার্কুলারগুলোর কপি এনে দিয়েছিলেন। এখন ভাষা আন্দোলনের ওপরে যে লেখালেখি হয়, তা তো প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু না। সবটাই সরকারি প্রোপাগান্ডা। সরকার চলে যাওয়ার পর আবর্জনার স্তূপে নিক্ষিপ্ত হবে।

আপনিই প্রথম এ আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্যটিকে সামনে এনেছিলেন। অন্যদের চেয়ে আপনার এ দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?

তার কারণ আমার রাজনীতি। বেশির ভাগ লেখক যারা ভাষা আন্দোলনের ওপরে লিখেছে, তারা রাজনৈতিক ব্যক্তি না। তারা কোনো না কোনো ধরনের বুদ্ধিজীবী কিংবা সাহিত্য চর্চা করে। রাজনৈতিক লোকও যারা লিখেছে, তাদের ও আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্যরকম ছিল। আমি একজন মার্ক্সবাদী, আমি কমিউনিস্ট। আমি এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ভাষা আন্দোলনের বইটি লিখেছি। প্রথম খণ্ড বের হয়েছিল ১৯৭০ সালের নভেম্বরে। দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৭৬ সালে। আর তৃতীয় খণ্ড বের হয় ১৯৮৪ সালে। তখন আমি মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এ ইতিহাস লিখেছিলাম। যে দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদের মধ্যে পাওয়া যায় না।

তিন খণ্ডের গ্রন্থটি প্রকাশে আপনাকে বেশ অনেক বছর কাজ করতে হয়েছে। এর মধ্যে আপনি সক্রিয় বিপ্লবী রাজনীতি করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্মৃতি যদি কিছুটা শোনান আমাদের।

আমি তো ৬৮ সালে রাজশাহী থেকে চলে আসার পর বরাবরই সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কাজ করেছি। বেশির ভাগ সময়ই রাজনৈতিক কাজ করতে হয়েছে। নানা রকম ট্যুর করতে হয়েছে, সাংগঠনিক কাজ করতে হয়েছে। তার মধ্যেই আমি কাজটি করি। ভাবলে আমি নিজেও বিস্মিত হই, কীভাবে কাজটি করেছিলাম। তার মধ্যেই এত তথ্য সংগ্রহ করেছি। তার মধ্যেই লোকজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তার মধ্যেই লেখালেখি করেছি। আমার লেখালেখির কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকেনি। যেকোনো সময় আমি লিখেছি। সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা, রাতে—যখনই সুযোগ পেয়েছি, লিখেছি। তবে আমি ঘোরাঘুরির সময় লেখালেখি করিনি। আমার অভ্যাস হচ্ছে, আমি বাইরে বা ট্যুরে থাকার সময় পড়াশোনা করতে পারি না। লেখালেখি তো করতেই পারি না। কাজে আমি যখন বাইরে যাইনি, ঢাকাতে ছিলাম, সে সময় আমি বই লিখেছি। সেজন্য ১৯৭০ সারে প্রথম খণ্ড, ১৯৭৬ সালে দ্বিতীয় খণ্ড। ১৯৭৬ সালে যখন বইটা বেরিয়েছে, তখন আমি আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলাম। ১৯৭৬ সালের বইটা মোটামুটি আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার সময় বের হয়েছিল। তারপর তৃতীয় খণ্ড বের হয়েছে ১৯৮৪ সালে। এ সময়ের মধ্যে আমি ভীষণ রাজনৈতিকভাবে কর্মব্যস্ত ছিলাম। এ ব্যস্ততার মধ্য থেকেই এ কাজ করেছি। বলা চলে, আমি রাজনৈতিক কাজ করেছি বলেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যেভাবে আমি লিখেছি, সেভাবে লেখা সম্ভব হয়েছে। আমি যদি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না থাকতাম। রাজনৈতিক কাজে যদি নিজেকে নিযুক্ত না রাখতাম। মানুষের সঙ্গে সেভাবে মেলামেশা না করতাম। তাহলে কিন্তু যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বইটি লেখা হয়েছে, একটা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের দিক থেকে সেটা হতো না। সেজন্য আমি ভাষা আন্দোলনের বইটি (পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি) কোনো লোককে উৎসর্গ করিনি। উৎসর্গ করেছি বাংলাদেশের জনগণকে। যারা আসলে এ সংগ্রাম করেছিল। সংগ্রামের মূল বীজ ছিল। কিন্তু এখন যে ভাষা আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে আলোচনা হয়, সেখানে জনগণের কোনো খবর নেই। ভাষা আন্দোলন হয়ে গেছে একজনের আন্দোলন। যার ভূমিকা প্র্যাকটিক্যালি অতিসামান্য ও অনুল্লেখযোগ্য ছিল।

[ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শানজিদ অর্ণব ও আনিকা মাহজাবিন। ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বণিক বার্তার বিশেষ আয়োজন ‘বদরুদ্দীন উমর ও ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক অন্তর্দৃষ্টি’-এ প্রকাশিত ]